জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারি ২০২৬
মানুষ ও জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ মানবীয় গুণ। মানুষ ও জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন মানে সকলের প্রতি সহানূভ’তি, ভালোবাসা, সম্মান ও যত্ন দেখানো। নৈতিক ও ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে এটি একটি গুরুত্বপুর্ণ সামাজিক দায়িত্বও বটে। দয়ার দ্বারা আল্লাহর রহমত লাভ হয়, পরকালে মুক্তি মেলে এবং এটি একটি সুস্থ পরিবেশ ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচায়ক। যা আমাদের চারপাশের জীবজগতকে সমুদ্ধ করে। ইসলামের নির্দেশনা অনুাযায়ী ‘তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আকাশের মালিক তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আর তোমরা সবাই আল্লাহর বন্দেগী করো। তাঁর কাউকে শরীক করো না। বাপ-মার সাথে ভালো ব্যবহার করো। নিকট আত্মীয় ও এতিম-মিসকিনদের সাথে সদ্ব্যবহার করো। আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্বসাথী, মুসাফির এবং তোমাদেও মালিকাধীন বাদী ও গোলামদের প্রতি সদয় ব্যবহার করো। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ এমন কোন ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না যে আত্ম অহংকারে ধরাকে সরা জ্ঞান করে এবং নিজের বড়াই করে।”(সুরা নিসা:৩৬)
উমার রা: বলেন, যে ব্যক্তি দয়া করে না, সে দয়া পায় না। যে বক্তি ক্ষমা করে না, সে ক্ষমা পায় না। যে ব্যক্তি উদারতা প্রদর্শন করে না, সে উদারতা পায় না। যে ব্যক্তি অন্যকে রক্ষার জন্য সচেষ্ট হয় না সে রক্ষা পায় না।( আল আদাবুল মুফরাদ: ৩৭২,পর্ব: বদান্যতা, কুপণতা ও চারিত্রিক দোষ-ত্রুটি, বাবু কাউলির রাজুলি…….)
আবু হুরাইরা রা: বলেন, আমি সত্যবাদী এবং সত্যবাদী বলে সমর্থিত নবী আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: হতভাগা ছাড়া আর কারো অন্তর থেকে দয়ামায়া তুলে নেয়া হয় না।(আদাবুল মুফরাদ:৩৭৫, পর্ব: বদান্যতা, কৃপণতা ও চারিত্রিক দোষ-ত্রুটি, পরিচ্ছদ: জগতবাসীর প্রতি দয়া করো, তিরমিযি, আবু দাউদ, আহমাদ ও হাকিম)
আমর ইবনে শুআইব রাহ: হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে লোক আমাদের শিশুদের আদর করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।(তিরমিযি:১৯২০, কিতাবুল বির্রি ওয়াস সিলাহ আন রাসুলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বাবু মা জা’আ ফি রহমাতিস সিবইয়ান)
আবু হুরাইরা রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: যে লোক কোন ঈমানদারের দুনিয়া থেকে কোন মুসীবত দূর করে দিবে, আল্লাহ তা’আলা বিচার দিবসে তার থেকে মুসীবাত সরিয়ে দিবেন। যে লোক কোন দু:স্থ লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দূরবস্থা দূর করবেন। যে লোক কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাই এর সহযোগীতায় আত্মনিয়োগ করে আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগীতা করতে থাকেন। যে লোক জ্ঞানার্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোন সম্প্রদায় আল্লাহর গৃহসমূহের কোন একটি গৃহে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে(কুরআন) অধ্যায়নে লিপ্ত থাকে তখন তাদের উপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়।
রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তা’আলা তাঁর নিকটবর্তীদের ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে লোককে আমলে পিছনে সরিয়ে দিবে তার বংশ(মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করে দিবে না।(মুসলিম:৩৭৪৬, আন্ত.নাম্বার:২৬৯৯, কিতাবুয যিকর ওয়াদ দু’আ ওয়াত তাওবা ওয়াল ইসতেগফার, বাবু ইজতেমা আ’লা তিলাওয়াতিল কুরআন ওয়া আ’লা যিকরে, ইফা:৬৬০৮, ই.সে:৬৬৬১)
দয়া-মায়ার বিপরীত শব্দগুলো হলো, নিম্নরূপ: অকরুণ, অনুভূতিহীন, কঠিণ,কঠোর, কাঠকুট্টা, কৃপাহীন, ক্রুদ্ধ, ক্রুদ্ধমতি, দয়াশূণ্য, দয়াহীন, নিকরুণ, নির্দয়া, নির্মম, নিস্কুরুণ, নিষ্ঠুর, নির্দয়, নৃশংস, পাষাণহৃদয়, মমতাহীন, মায়াহীন, হিয়াহীন, হৃদয়শূন্য, হৃদয়হীন ইত্যাদি। এর যে কোন একটি ব্যবহার করা হলে মানুষের কষ্ট হয়। সমাজ জীবন অশান্তিতে ভরে উঠে। নুমান ইবনে বাশীর রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মু’মিনদের একটি দেহের মত দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ¦রে অংশ নেয়।”(বুখারী:৬০১১, কিতাবুল আদাব, বাবু রহমাতিন নাসি ওয়াল বাহাইমি, মুসলিম:২৫৮৬,আহমাদ:১৮৪০১, আ:প্র:৫৫৭৭, ইফা:৫৪৭৩)
জারীর ইবনে আবদুল্লাহ রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সা: বলেছেন: যে (সৃষ্টির প্রতি) দয়া করে না, (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তার প্রতি দয়া করা হয় না।(বুখরিী:৬০১৩, ৭৩৭৬, কিতাবুল আদাব, বাবু রহমাতিন নাস ওয়া বাহায়িম, মুসলিম ২৩১৯, আ.প্র:৫৫৭৯, ্ফা:৫৪৭৫)
আনাস ইবনে মালেক রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সা: বলেছেন: কোন মুসলিম যদি গাছ লাগায়, আর তা থেকে কোন মানুষ বা জানোয়ার কিছু খায় তবে তা তার জন্য সাদাকায় পরিণত হবে।(বুখারী:৬০১২ ও ২৩২০ কিতাবুল আদাব, বাবু রহমাতিন নাস ওয়া বাহায়িম, ই.ফা:৫৪৭৪)
আবু হুরাইরা রা: সূত্রে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: একদা এক লোক রাস্তায় চলতে চলতে পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লো। সে একটি কূপ দেখতে পেয়ে তাতে নেমে পানি পান করল। অতপর উঠে এলো; হঠাৎ করে দেখলো একটি কুকুর হাপাচ্ছে, পিপাসায় কাতর হয়ে কাঠ চাটছে; অতপর লোকটি বলল: এ কুকুরটি পিপাসায় সেরূপ কষ্ট পাচ্ছে, যেরূপ কষ্ট আমার হয়েছিল। অতপর সে কূপে অবতরণ করলো এবং তার মোজার মধ্যে পানি ভরলো, তারপর তা মুখ দিয়ে কামড়ে ধরে উপরে উঠে এলো। তারপর সে কুকুরটিকে পানি পান করালো। তারপর আল্লাহ তাকে তার প্রতিদান দিলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসুল সা:! জীব-জন্তুর জন্যও কি আমাদের পুরস্কার আছে? জবাবে তিনি বললেন: হ্যাঁ, প্রত্যেক সতেজ হৃদয়ের (সাথে ভাল ব্যবহারের) জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে।(আবু দাউদ:২৫৫০,কিতাবুল জিহাদ, বাবু মা ইউমারু মিনহু………হাদীসটি সহীহ)
ইসলাম দয়া ও অনুকম্পার জীবন ব্যবস্থা। সুতরাং যারা আমরা মুসলমান হিসাবে নিজেদের দাবী করি তাদের মধ্যে এ আবশ্যিক গুণটা থাকা অপরিহার্য। একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয় আল্লাহ তা’আলা এভাবে দিয়েছেন যে, ”ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার স্ত্রীলোকেরাই প্রকৃতপক্ষে পরস্পর পরস্পরের দায়িত্বশীল বা সাহায্যকারী বন্ধু। এদের পরিচয় এবং বৈশিষ্ট্য এই যে, এরা নেক কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, নামায কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও রাসুলের বিধান মেনে চলে। প্রকৃতপক্ষে এদের প্রতিই আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন।” (সুরা-তাওবা-৭১) যারা আল্লাহ তা’আলা, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ও সাহাবায়ে কেরামের এ গুণের অধিকারী হতে পারবেন না তিনি আল্লাহর বান্দাহ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মত ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের অনুসারী দাবী করার অধিকার রাখেন না। অতিতের অনেক জাতি তাদের কঠিন হৃদয় ও নির্দয়তার জন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। আল কুরআনে এদের কঠিণ হৃদয় ও জুলুম-নির্যাতন ও ধ্বংসের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। আমাদের মধ্যে এমন চরিত্রের লোক পাওয়া খুব সহজ হয়ে দাড়িয়েছে, যারা সামান্য ক্ষমতা পেলে অথবা সামান্য ধন-সম্পদের মালিক হলে, তাদের থেকে দয়া-মায়া ও অনুকম্পা দূরীভূত হয়ে যায়। এটি কোন মুমিন ও মুসলমানের বৈশিষ্ট্য হওয়া ঠিক নয়।
রহম বা দয়া মানবতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। দয়া বিবর্জিত হৃদয় সাধারণত উৎপীড়ক ও অত্যাচারী হয়ে থাকে। দয়াদ্র হৃদয় মহান দয়ালুরই করুণার দান। যার হৃদয়ে দয়ার উদ্রেগ হয়না মনে করতে অবশ্যই দয়ার আধার মহা মহিম রহিম ও রাহমানের দয়া থেকে সে বঞ্চিত আছে। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,“যে ব্যক্তি মানুষের ওপর দয়া করে না আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিও রহমত বর্ষণ করেন না। (বুখারী) অন্য এক হাদীসে বণির্ত হয়েছে কঠিণ হৃদয় ব্যক্তি আল্লাহ নৈকট্য থেকে দুরে অবস্থান করবে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠিণ অন্তর এবং অশ্রহীীন চক্ষুকে নাফরমান বলে আখ্যা দিয়েছেন।
Posted ১২:৫৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh