জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৪
মোহরানা ফরয ও যৌতুক হারাম। সুতরাং যৌতুকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলুন। সকলেই যৌতুককে না বলুন। যৌতুক উপহার নয়, যৌতুক এক ধরনের ভিক্ষবৃত্তি। বিয়ে একটি সামাজিক বন্ধন। এ পবিত্র বন্ধন হচ্ছে- আল্লাহর হুকুম এবং হযরত মুহম্মাদ সা: এর সুন্নত। এ বন্ধন মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে। বর্তমানে সময়ে এ কন্ধনকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে বানিয়ে ফেলেছে এক ধরনের অসভ্য সমাজ। মানুষের মনুষত্ব ও নীতি নৈতিকতা দিন দিন এতটাই লোপ পাচ্ছে যে, যা নিষিদ্ধ তা প্রচলিত হচ্ছে এবং যা ফরয অর্থাৎ মোহরানা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে, মানুষের অধ:পতন ও চারিত্রিক বিপর্যয় ঘটেছে।’
একটি ছেলে একটি মেয়ের বিবাহের মাধ্যমে নতুন দুটো পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি হয়। এই আত্মীয়তার মধ্যে থাকে পরস্পরের প্রতি ভালবাসা, মধৃর সম্পর্ক, নতুন প্রীতির বন্ধন সৃষ্টির আনন্দঘন পরিবেশ। কিন্তু এই পবিত্র বন্ধনে কোন বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদিত হলে, তাদের মধ্যে আন্তরিক বন্ধন সৃষ্টি হয় না। মেয়ে বা মেয়ের বাবা কোনদিন এই পরিবারকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না।
চিরজীবন মেয়ের বাবার কাছে এরা হীন, নীচ ও কুৎসিত মানসিকতার লোক বলে জানবে। সত্যিকারার্থে ছেলের বাবা-মা কতটা নিচে নামলে এবং কতটুকু নিম্ন মানসিকতার হলে এ ধরণের যৌতুক দাবী করতে পেের। তবে সত্য কথা হলো, এ ধরণের সম্পর্ক বেশীদিন টিকে থাকতে পারে না। এ ধরণের যৌতুক লোভীরদের কাছে কত বাবা, মা ও বোনেরা চীরদিন অবহেলিত, কঠোর নির্যাতন ও মৃত্যুর শিকার হয়েছে তার পরিসংখ্যান দেয়া কঠিন। আমাদের চারপাশের সমাজে হর-হামেশা এ ধরনের নির্যাতিন ও নিপীড়িত মা-বোনদের দেখে আসছি, যারা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের বলির পাঠা হয়েছে। অশান্তির আগুনে পুড়ে কত সুখের সংসার ছাড়খার হয়ে গেছে।
ইসলামী শরী’আতে যৌতুকের কোন অস্তিত্ব নেই। তাই যৌতুক গ্রহীতা একজন জালিম হিসাবে চিহ্নিত হবে। বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী ও একজন পুরুষের জীবন পরিপূর্ণতা ল্ভা করে। তাদের পবিত্র বন্ধন ও সামাজিক চুক্তির একটি নতুন জীবনের দিগন্ত উন্মোচিত হয় এবং একটি নতুন ইনষ্টিটিউট প্রতিষ্ঠা লাভ করে। একজন পুরুষ যখন মানসিক, দৈহিক ও আর্থিকভাবে বৈবাহিক জীবন নির্বাহ করার সক্ষমতা লাভ করবেন, তখনই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন। কিন্তু পবিত্র এই বন্ধনের মধ্যে যদি শর্ত করে যৌতুক দাবী করেন তবে এটি হবে সামাজিক দুর্নীতি এবং অবৈধ অর্থলোভী।
মানুষের মাঝে নিকৃষ্ট বন্য প্রাণী কুকুরের উগ্র লালসা ও অতৃপ্ত কামনার বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান হলে এ ধরনের কাজ করতে পারে। কুকুরের যেমন লালসা ও কামনার জন্য জিভটি সর্বদা ঝুলে থাকে এবং এ ঝুলন্ত জিভ থেকে অনবরত লালসার লালা টপকে পড়তে থাকে। চলাফেরার পথে তার নাক সব সময় মাটি শুকতে থাকে, হয়তো কোথাও কোন খাবারের গন্ধ পাওয়া যাবে এ আশায়। তার গায়ে কেউ কোন পাথর ছুঁড়ে মারলেও তার ভূল ভাঙ্গবে না। বরং তার মনে সন্দেহ জাগে, যে জিনিষটি তাকে মারা হয়েছে সেটি হয়তো কোন হাড় বা রুটির টুকরা হবে। পেট পূজারী লোভী কুকুর একবার লাফিয়ে দৌড়ে গিয়ে সেই নিক্ষিপ্ত পাথরটিও কামড়ে ধরে। সে তার পেটের দৃষ্টি দিয়ে সারা দুনিয়াকে দেখে। মানুষের মধ্যে যৌতুক লোভী প্রাণীগুলোর লালসার জিভটি সর্বদা ঝুলে থাকে।
এই প্রাণীগুলো নষ্ট জন্মের ফসল। এরা বিয়েকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানায়। এরা স্ত্রীকে হকভাবে দেনমোহর প্রদান করে না। স্ত্রীর অন্যান্য চাহিদা পূরণ করে না। স্ত্রীকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। অথচ বিয়ের সময় স্ত্রীকে আমানত হিসাবে গ্রহণ করে। ইসলামও তাকে আমানত হিসাবে ন্যস্ত করেছে, দাসী বা গোলাম হিসাবে নয়। যারা স্ত্রীকে বিশেষ মর্যাদা দান করে না বরং তাকে চাকরানী হিসাবে দেখে তারা ইসলামে নাফরমান ও মুনাফিক হিসাবে চিহ্নিত হবে। সে পবিত্র এই ইনষ্টিটিউটটিতে ফাসাদ সৃষ্টি করে এবং পুরো প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে উপনিত হয়।
পরবর্তি প্রজন্মকে ধ্বংস করা হয়। সুতরাং ইসলামে যৌতুকের কোন অস্তিত্ব নেই; যৌতুক গ্রহীতাকে জালিম ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী চিহ্নিত করা যায়। তাই সামাজিকভাবে যৌতুককে না বলুন এবং মোহরানা আদায় করার পরিবেশ সৃষ্টি করুন।
ইসলামে মোহরানা স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার। স্ত্রী সম্পুর্ন মোহরানা হালাল হিসাবে গ্রহণ করবেন। স্বামী আনন্দ চিত্তে ও ভালবেসে নববধুকে মোহরানা প্রদান করবেন। মনে রাখতে হবে এটি ফরয বিধান। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ আর আনন্দের সাথে (ফরয মনে করে) স্ত্রীদের মোহরানা আদায় করে দাও। তবে যদি তারা নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছায় মোহরানার কিছু অংশ মাফ করে দেয়, তাহলে তোমরা সানন্দে তা খেতে পারো।”(সুরা নিসা:৪)
সুতরাং দেনমোহর বিবাহিত মুসলিম নারীর একটি বিশেষ অধিকার। এই অধিকার কুরআন দ্বারা স্বীকৃত। মোহর স্ত্রীর অধিকার সংরক্ষণের জন্য এবং স্ত্রীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য দেয়া হয়। এটি স্বামীর ওপর ইসলামী আইন কর্তৃক আরোপিত একটি বিধান ও স্বামীর দায় হিসাবে চিহ্নিত। বিবাহের অন্যতম শর্ত দেনমোহর। এই শর্ত পূরণ ব্যতীত কোন বিবাহ বৈধ হতে পারে না। কেহ যদি দেনমোহর আদায় করার সক্ষমতা না থাকে তাহলে সে স্বাধীন মেয়ে বিয়ে করবে না বরং বাঁদী বিয়ে করবে। তাও যদি সক্ষম না হয় তাহলে সওম পালন করবে।
দেন-মোহরের গুরুত্ব নিম্নের হাদীস থেকে আমরা অনুমান করতে পারি।
সাহল রা হতে বর্ণিত যে, এক মহিলা নবী সা: এর কাছে এলো এবং বিয়ের জন্য নিজেকে তাঁর কছে পেশ করলো। তিনি বললেন, এখন আমার কোন মহিলার প্রয়োজন নেই। এরপর উপস্থিত একজন বললো, হে আল্লাহর রাসুল! তাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিন। নবী সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি আছে? লোকটি বলল, আমার কিছু নেই। নবী সা: বললেন, তাকে একটি লোহার আংটি দিয়ে হলেও দাও। লোকটি বললো, আমার কাছে কিছুই নেই। নবী সা: বললেন, তোমার কাছে কি পরিমাণ কুরআন আছে? লোকটি বললো, এই এই পরিমাণ। নবী সা: বললেন, তুমি কুরআনের যা জান, তার বিনিময়ে এই মাহলাকে তোমার মালিকানায় দিয়ে দিলাম।”(বুখারী:৫১৪১, কিতাবুন নিকাহ, বাবু ইজা কালাল কাতিবু……..অর্থাৎ যদি কোন বিয়ে প্রার্থী পুরুষ অভিভাবককে বলে, অমুক মেয়েকে আমার কাছে বিয়ে দিন এবং মেয়ের অভিভাবক বলে, তাকে এত মোহরানার বিনিময়ে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিলাম, তাহলে এই বিয়ে বৈধ হবে যদিও সে জিজ্ঞেস না কওে, তুমি কি রাযী আছ? তুমি কি কবুল করেছো? আ;প্র:৪৭৬২, ইফা:৪৭৬৫)
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর জায়গায় অন্য স্ত্রী আনার সংকল্প করেই থাকো, তাহলে তোমরা তাকে স্তুপীকৃত সম্পদ দিয়ে থাকলেও তা থেকে কিছুই ফিরিয়ে নিয়ো না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ও সুস্পষ্ট জুলুম করে তা ফিরিয়ে নেবে?” (সুরা নিসা:২০) আনাস রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা: কোন এক মহিলাকে বিয়ে করলেন এবং তাকে মোহরানা হিসাবে খেজুর দানা পরিমাণ স্বর্ণ দিলেন। যখন নবী সা: তার মুখে বিয়ের খুশির ছাপ দেখলেন তখন তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন সে বলল: আমি এক নারীকে খেজুর আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে বিয়ে করেছি।(২০৪৯) কাত্দ্হ আনাস থেকে বর্ণনা করেন যে, আব্দুর রহমান বিন আওফ রা: খেজুরের দানা পরিমাণ স্বর্ণ মোহর হিসাবে দিয়ে কোন মহিলা বিয়ে করেন।(বুখারী:৫১৪৮, কিতাবুন নিকাহ, বাবু কাউলিহি তা’আলা……., আ:প্র: ৪৭৬৮, ইফা:৪৭৭১)
অতএব, যৌতুক নামক কু-প্রথা উচ্ছেদ করুন এবং ইসলামের ফরয বিধান মোহরান পরিশোধের ব্যবস্থা করুন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর আনন্দের সাথে (ফরয মনে করে) স্ত্রীদের মোহরানা আদায় করে দাও। তবে যদি তারা নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছায় মোহরানার কিছু অংশ মাফ করে দেয়, তাহলে তোমরা সানন্দে তা খেতে পারো।”(সুরা নিসা:৪) এ ব্যাপারে হযরত উমর রা: ও কাযী শুরাইহর ফায়সালা হচ্ছে:- যদি কোন স্ত্রী তার স্বামীকে সম্পুর্ণ মোহরানা বা তার অংশবিশেষ মাফ করে দেয় এবং তারপর আবার তা দাবী করে, তাহলে তা আদায় করার জন্য স্বামীকে বাধ্য করা হবে। কেননা তার দাবী করাই একথা প্রমাণ করে যে, সে নিজের ইচ্ছায় মোহরানার সমুদয় অর্থ বা তার অংশবিশেষ ছাড়তে রাজী নয়। মহরানা ফরয, তা আদায় না করলে সালাত, সওম ছেড়ে দেয়ার মতো গোনাহ হবে। আর যৌতুক এক ধরনের চাঁদাবাজি বা ভিক্ষাবৃত্তি। এই ঘৃণ্য কাজ পরিত্যাগ করুন।
Posted ১:৩৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh