মুহাম্মদ সালমান শফী : | মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামি বর্ষপঞ্জির পবিত্র রাতগুলোর মধ্যে শাবান মাসের মধ্যরাতে পালিত লাইলাতুল বরাত মুসলমানদের কাছে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই রাতকে রহমত, ক্ষমা ও ভাগ্য নির্ধারণের রাত হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এ রাতে মহান আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য করুণা ও ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং তাদের তওবা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ প্রদান করেন।
লাইলাতুল বরাত কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এর মধ্যে নিহিত রয়েছে গভীর নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা, যা আজকের অশান্ত বিশ্বে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহতায়ালা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন এবং আগামীর জীবনের জন্য তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। এ সময় আন্তরিক তওবা কবুল হয়, দোয়া গ্রহণ করা হয় এবং আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়। তাই মুসলমানরা সারারাত নফল নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার ও তওবা-ইস্তেগফারে কাটান। তবে লাইলাতুল বরাতের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আত্মসমালোচনা, নৈতিক সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের আহ্বান। ভোগবাদ, স্বার্থপরতা ও সংঘাতে পূর্ণ আধুনিক বিশ্বে এই রাতের শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাইলাতুল বরাতের মূল শিক্ষা হলো ক্ষমা। ইসলাম শেখায়Ñ আল্লাহতায়ালা পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল, যিনি আন্তরিকভাবে ফিরে আসা বান্দাকে কখনই নিরাশ করেন না। তবে ক্ষমা শুধু মুখে চাওয়ার বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন সত্যিকার অনুশোচনা, পাপ ত্যাগের দৃঢ় সংকল্প এবং সৎ পথে চলার অঙ্গীকার। বর্তমান বিশ্ব গভীর নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতি, অসততা, লোভ ও অবিচার বহু ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতি, ব্যবসা এমনকি সামাজিক সম্পর্কেও মূল্যবোধ বিসর্জনের চিত্র স্পষ্ট। লাইলাতুল বরাত আমাদের আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলাম বলে, সফলতা সম্পদ বা ক্ষমতায় নয়, বরং হৃদয়ের পবিত্রতা ও ন্যায়ের পথে চলায়। এই রাত মানুষকে নিজের ভুল চিনতে, সংশোধনের পথে এগোতে অনুপ্রাণিত করে। ইসলাম মনে করে, আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। ব্যক্তি যদি সততা, ন্যায় ও মানবিকতায় ফিরে আসে, তবে সমাজও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হবে। তাই লাইলাতুল বরাত এক ধরনের নৈতিক প্রশিক্ষণের রাতÑ যেখানে মানুষ শেখে শৃঙ্খলা, বিনয় ও দায়িত্ববোধ। লাইলাতুল বরাত কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের রাত নয়; এটি সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলাম সর্বদা গরিব, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। এই রাতে নিজের ক্ষমার জন্য দোয়ার পাশাপাশি মানবজাতির কল্যাণ কামনা করা এবং বাস্তব জীবনে দান-খয়রাত ও সেবামূলক কাজে অংশ নেওয়াই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য। আজ বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বৈষম্য বাড়ছে। এমন সময়ে লাইলাতুল বরাত আমাদের সহমর্মিতা শেখায়। প্রকৃত ধার্মিকতা কেবল ইবাদতে নয়, বরং মানুষের কষ্ট লাঘবে অংশগ্রহণেই পূর্ণতা পায়।
সংঘাত, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ে ভরা এই বিশ্বে লাইলাতুল বরাতের শিক্ষা আশার আলো। ক্ষমা হৃদয় সারায়, আত্মশুদ্ধি নৈতিকতা ফিরিয়ে আনে আর সহমর্মিতা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে। আসুন, এই পবিত্র রাতে আমরা আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে সত্যিকার পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হই। সারা বছর যদি আমরা এই শিক্ষাকে ধারণ করি, তবে ব্যক্তি, সমাজ ও বিশ্ব- সবক্ষেত্রেই শান্তি ও ন্যায়ের বিজয় সম্ভব হবে।
মুহাম্মদ সালমান শফী : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা
Posted ২:৪৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh