জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪
“আমি তাকে রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছি। এরপর হয় সে শোকরগোজার হবে নয়তো হবে কুফরের পথ অনুসরণকারী।”(সুরা আদ দাহর:৩) মহান আল্লাহ মানুষকে শুধু জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে ছেড়ে দেননি। যা দুই নং আয়াতে বলা হয়েছে। বরং জ্ঞান বুদ্ধি দেয়ার সাথে সাথে তাকে পথও দেখিয়েছেন যাতে সে জানতে পারে শোকরিয়ার পথ কোনটি এবং কুফরীর পথ কোনটি। এই দুই পথের যেটিই সে গ্রহণ করুক না কেন তার জন্য সে নিজেই দায়ী হবে। যেমন: আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আমি কি তাকে দু’টি সুস্পষ্ট পথ দেখাইনি?”(সুরা বালাদ:১০) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,“তারপর তার পাপ ও তার তাকওয়া তার প্রতি ইলহাম করেছেন।”(সুরা শামস:৮) এ সব আয়াত সামনে রেখে বিচার করলে এবং পৃথিবীতে মানুষের হিদায়াতের জন্য আল্লাহ তা’আলা যেসব ব্যবস্থার কথা কুরআন মাজিদে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন তাও সামনে রাখলে বুঝা যায় যে, এ আয়াতে পথ দেখানোর যে কথা বলা হয়েছে তার দ্বারা পথপ্রদর্শনের কোন একটি মাত্র পন্থা ও উপায় বুঝানো হয়নি। বরং এর দ্বারা অনেক পন্থা ও উপায়ের কথা বলা হয়েছে যার কোন সীমা পরিসীমা নেই। যুগে যুগে নবী ও রাসুলগণ এসেছেন, আসমানী কিতাব প্রেরণ করা হয়েছে, যুগে মুজাদ্দিদ ও ইসলামে দায়ী এসেছেন। তাছাড়া আল্লাহকে জানার জন্য পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিতে তিনি নিদর্শন রেখে দিয়েছেন। আসমান-জমিনের সৃষ্টি কৌশল ও দিন-রাত্রির আবর্তনের মধ্যে অসংখ্য নিদর্শন রেখেছেন। যেমন:
নৈতিক বোধ ও অনুভূতি: প্রত্যেক মানুষকে জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধির যোগ্যতা দেয়ার সাথে সাথে তাকে একটি নৈতিক বোধ ও অনুভূতি দেয়া হয়েছে যার সাহায্যে সে প্রকৃতিগতভাবেই ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করে, কিছু কাজ-কর্ম ও বৈশিষ্ট্যকে খারাপ বলে জানে যদিও সে নিজেই তাতে লিপ্ত। আবার কিছু কাজ-কর্ম ও গুণাবলীকে ভাল বলে জানে বলে মনে করে যদিও সে নিজে তা থেকে দূরে অবস্থান করে। এমনকি যেসব লোক তাদের স্বার্থ ও লোভ-লালসার কারণে এমন সব দর্শন রচনা করেছে যার ভিত্তিতে তারা অনেক খারাপ ও পাপকার্যকেও নিজেদের জন্য বৈধ করে নিয়েছে তাদের অবস্থাও এমন যে, সে একই মন্দ কাজ করার অভিযোগ যদি কেউ তাদের ওপর আরোপ কওে, তাহলে তারা প্রতিবাদে চিৎকার করে উঠবে এবং তখনই জানা যায় যে, নিজেদের মিথ্যা ও অলীক দর্শন সত্বেও বাস্তবে তারা নিজেরাও সেসব কাজকে খারাপই মনে করে থাকে। অনুরূপ ভাল কাজ ও গুণাবলীকে কেউ মূর্খতা, নির্বুদ্ধিতা এবং সেকেলে ঠাওরিয়ে রাখলেও কোন মানুষের কাছ থেকে তারা যখন নিজেরাই নিজেদের সদাচরণের সফল ও উপকার লাভ করে তখন তারার সেটিকে মূল্যবান মনে করতে বাধ্য হয়ে যায়।
বিবেক-বুদ্ধি: প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আল্লাহ তা’আলা বিবেক বলে একটি জিনিস রেখে দিয়েছেন। যখন সে কোন মন্দ কাজ করতে উদ্যত হয় অথবা করতে থাকে াথা করে ফেলে তখন এ বিবেকই তাকে দংশন করতে থাকে। যতই হাত বুলিয়ে বা আদর-সোহাগ করে দিয়ে মানুষ এ বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে দিক, তাকে অনুভূতিহীন বানানোর যত চেষ্টাই সে করুক সে তাকে একদম নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম নয়। হঠকারী হয়ে দুনিয়ায় সে নিজেকে চরম বিবেকহীন প্রমাণ করতে পাওে, সে সুন্দও সুন্দও অজুহাত খাড়া করে দুনিয়াকে ধোঁকা দেয়ার সব রকম প্রচেষ্টা চালাতে পাওে, সে নিজের বিবেককে প্রতারিত করার জন্য নিজের কর্মকাণ্ডের স্বপক্ষে অসংখ্য ওজর পেশ করতে পাওে; কিন্তু এসব সত্বেও আল্লাহ তার স্বভাব-প্রকৃতিতে যে হিসাব পরীক্ষককে নিয়োজিত রেখেছেন সে এত জীবন্ত ও সজাগ যে, সে নিজে প্রকৃতপক্ষে কি তা কোন অসৎ মাপনুষের কাছেও গোপন থাকে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“মানুষ যত ওজরই পেশ করুক না কেন সে নিজেকে নিজে খুব ভাল করেই জানে।”(সুরা কিয়ামাহ:১৫)
নিজের সত্তা ও বিশ্ব-জগত: মানুষের নিজের সত্তায় এবং তার চারপাশে যমীন থেকে আসমান পর্যন্ত গোটা বিশ্ব-জাহানের সর্বত্র এমন অসংখ্য নির্দেশনাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে যে, এমনসব জিনিস কোন আল্লাহ ছাড়া হতে পারে না কিংবা বহু সংস্যক রব এ বিশ্ব-জাহানের সুাষ্টকর্তা বা পরিচালক হতে পাওে না। বিশ্ব চরাচরের সর্বত্র এবং মানুষের আপন সত্তার অভ্যন্তরে বিদ্যমান ক্রিয়াশীল এ নিদের্শনাবলীই কিয়ামত ও আখেরাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করেছে। মানুষ যদি এসব থেকে চোখ বন্ধ করে থাকে অথবা বুদ্ধি-বিবেক কাজে লাগিয়ে সব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা না করে অথবা তা যেসব সত্যের প্রতি ইংগিত করছে তা মেনে নিতে টালবাহানা ও গড়িমসি করে তাহলে তা তার নিজেরই অপরাধ। আল্লাহ তা’আলা নিজের পক্ষ থেকে তার সামনে সত্যেও সন্ধান দাতা নিদর্শনাদি পেশ করতে আদৌ কোন অপূর্ণতা রাখেননি।
সম-সাময়িক ও অতীত ইতিহাস: মানুষের নিজের জীবনে, তার সমসাময়িক পৃথিবীতে এবং তার পূর্বের অতীত ইতিহাসের অভিজ্ঞতায়, এমন অসংখ্য ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং হয়ে থাকে যা প্রমাণ করে যে, একটি সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর শাসন-কর্তৃত্ব তার ওপর এবং সমগ্র বিশ্ব-জাজানের ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছে যাঁর সামনে সে নিতান্তই অসহায়। যাঁর ইচ্ছা সবকিছুর ওপর বিজয়ী এবং যাঁর সে মুখাপেক্ষী। মানুষের নিজের প্রকৃতির মধ্যেও সর্বোচ্চ শাসন-কর্তৃত্বের প্রমাণ বিদ্যমান যার কারণে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে খারাপ সময়ে নাস্তিকরাও আল্লাহকে ডাকতে শুরু করে দেয়। প্রচণ্ড ঝড়-তুফানের সময় একান্তভাবে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করে। তার মানে সে জানে যে, এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে একমাত্র তিনিই উদ্ধার করতে পারেন। মিথ্যা প্রভু, যাদেরকে তারা ডাকে, তারা এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখে না।
শাস্তি ও পুরস্কার: মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও প্রকৃতিগত জ্ঞানের অকাট্য ও চুড়ান্ত রায় হলো অপরাধের শাস্তি এবং উত্তম কাজের কাজের প্রতিদান অবশ্যই পাওয়া উচিত। এ উদ্দেশ্যে প্রত্যেক সমাজে কোন না কোন রূপে বিচার-ব্যবস্থা চালু আছে এবং শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যবস্থাও চালু থাকতে পারে। কিন্তু পৃৃথিবীতে এমন অসংখ্য অপরাধ, জুলুম-নির্যাতন, হক থেকে বঞ্চিত কাজ আছে যার যথাযোগ্য শাস্তি দুনিয়াতে পায় না। এবং এমন অসংখ্য সেবামূলক ও কল্যাণমূলক কাজ আছে যার যথাযোগ্য প্রতিদান সে দুনিয়াতে পায় না। তাহলে আখিরাতকে মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না। সেখানেই প্রত্যেকে তার যথাযোগ্য শাস্তি ও পুরস্কার পাবে। সেখানে কারো প্রতি জুলুম করা হবে না। এটি ন্যায় ও ইনসাফের দাবীও বটে।
এসব উপায়-উপকরণের সাহায্যে মানুষকে হিদায়াত ও পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীতে নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন। এসব কিতাব পরিস্কার ভাষায় বলে দিয়েছে, শোকরের পথ কোনটি এবং কুফরের পথ কোনটি এবং দু’টি পথে চলার পরিণামই বা কি। নবী-রাসুল এবং তাদেরকে প্রদত্ত কিতাবসমূহের শিক্ষা জানা-অজানা, দৃশ্য-অদৃশ্য অসংখ্য উপায় ও পন্থায় এত ব্যাপকভাবে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে যে, কোন জনপদই আল্লাহ ও আখেরাতের ধারণা, সৎ ও অসৎ কাজের পার্থক্য বোধ এবং তাঁদের পেশকৃত নৈতিক নীতিমালা ও আইন-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ নয়, নবী-রাসুলদের উপর নাযিলকৃত বিতাবসমূহের শিক্ষা থেকেই তারা এ জ্ঞান লাভ করেছে তা তাদেও জানা থাক বা না থাক। বর্তমানে যেসব লোক নবী-রাসুলগণ এবং আসমানী কিতাবসমূহকে অস্বীকার করে অথবা তাদের সম্পর্কে কোন খবরই রাখে না তারাও এমন অনেক জিনিস অনুসরণ করে থাকে যা মূলত ঐ সব শিক্ষা থেকে উৎসারিত ও উৎপন্ন হয়ে তাদেও কাছে পৌঁছেছে। অথচ মূল উৎস কি সে সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না।
সুরা রাদের পরের আয়াতগুলোতেই শোকরের পথ অবলম্বনকারী ও কুফরের পথ অনুসরণকারীর পুরস্কার ও শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “আমি কাফেরদের জন্য শিকল, বেড়ি এবং জলন্ত আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি। নেককার লোকেরা পনপাত্র থেকে এমন শরাব পান করবে যাতে কর্পুর সংমিশ্রিত থাকবে। এটি হবে একটি বহমান ঝর্ণা। আল্লাহর বান্দারা যার পানির সাথে শরাব মিশিয়ে পান করবে এবং যেখানেই ইচ্ছা সহজেই তার শাখা-প্রশাখা বের করে নেবে।”(সুরা রাদ:৪-৬)
Posted ১:৫৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh