জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৫
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আমি মানুষকে এক সংমিশ্রণ বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছি। যাতে তার পরীক্ষা নিতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমি তাকে শ্রবণশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তির অধিকারী করেছি।” (সুরা আদ দাহর:২) এটাই হলো দুনিয়ায় মানুষের এবং মানুষের জন্য দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থান ও মর্যাদা। মানুষ নিছক গাছপালা বা জীব-জন্তুর মত নয় যে, তার সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য এখানেই পূরণ হয়ে যাবে এবং প্রকৃতির নিয়মানুসারে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তার নিজের অংশের করণীয় কাজ সম্পাদন করার পর এখানেই মৃত্যুবরণ করবে এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাছাড়া এ দুনিয়া তার জন্য আযাব বা শাস্তির স্থান নয় যেমনটা খৃষ্টান পাদ্রীরা মনে করে, প্রতিদানের ক্ষেত্রও নয় যেমনটা জন্নান্তরবাদীরা মনে করে, চরণ ক্ষেত্রে বা বিনোদন কেন্দ্র নয় যেমন বস্তুবাদীরা মনে করে আবার দ্বন্ধ ও সংগ্রাম ক্ষেত্রও নয় যেমন ডারউইন ও মার্কসের অনুসারীরা মনে করে থাকে। বরং দুনিয়া মুলত তার জন্য একটা পরীক্ষাগার।
যে জিনিসকে সে বয়স বা আয়ুস্কাল বলে মনে করে আসলে তা পরীক্ষার সময় যা তাকে এ দুনিয়ায় দেয়া হয়েছে। দুনিয়ায় যে ক্ষমতা ও যোগ্যতা তাকে দেয়া হয়েছে যেসব বস্তুকে কাজে লাগানোর সুযোগ তাকে দেয়া হয়েছে, যে মর্যাদা নিয়ে বা অবস্থানে থেকে সে এখানে কাজ করছে এবং তার ও অন্যান্য মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান তার সবই মূল অসংখ্য পরীক্ষপত্র। জীবনের সর্বশেষ মুহুর্ত পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে পরীক্ষা চলবে। এ পরীক্ষার ফলাফল দুনিয়ায় প্রকাশ পাবে না। বরং আখেরাতে তার সমস্ত পরীক্ষা পত্র পরীক্ষা ও যাঁচাই-বাচাই করে ফায়সালা দেয়া হবে। সে সফল না বিফল। তার সফলতা ও বিফলতা সবটাই নির্ভর করবে এ বিষয়ের ওপর যে, সে তার নিজের সম্পর্কে কি ধারণা নিয়ে এখানে কাজ করছে এবং তাকে দেয়া পরীক্ষার পত্রসমূহে সে কিভাবে জবাব লিখেছে।
নিজের সম্পর্কে যদি সে মনে করে থাকে যে, তার কোন আল্লাহ নেই অথবা নিজেকে সে বহু সংখ্যক ইলাহর বান্দা মনে করে থাকে এবং পরীক্ষার সবগুলো পত্রে এ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে জবাব লিখে থাকে যে, আখিরাতে তার স্রষ্টার সামনে কোন জবাবদিহি করতে হবে না তাহলে তার জীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ড ভুল হয়ে গিয়েছে। আর যদি সে নিজেকে একমাত্র আল্লাহর বান্দা মনে করে আল্লাহর মনোনীত পথ ও পন্থা অনুসারে কাজ করে থাকে এবং আখেরাতে জবাবদিহির চেতনা বিবেচনায় রেখে তা করে থাকে তাহলে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেলো। এ বিষয়টি আল কুরআনুল মাজিদে এত বেশী জায়গায় ও এত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এখানে উল্লেখ করা সম্ভব হলো না।
মহান আল্লাহ এই পরীক্ষার জন্য প্রথমত: আমাদেরকে শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির অধিকারী করেছেন যা উল্লেখিত আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, “এর উদ্দেশ্যে আমি তাকে শ্রবণশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তির অধিকারী করেছি।” এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে বিবেক-বুদ্ধি। অর্থাৎ “আমি তাকে শ্রবণশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তির অধিকারী করেছি”মানে বিবেক-বুদ্ধি দান করেছি। আরবী ভাষায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা জানেন যে, জন্তু জানোয়ারের বেলায় এ দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয় না। অথচ জন্তু-জানোয়ারেরাও শুনতে পায় এবং দেখতে পায়। অতএব, এখানে শোনা ও দেখার অর্থ শোনার ও দেখার সেই শক্তি নয় যা জন্তু-জানোয়ারকেও দেয়া হয়েছে। এখানে এর অর্থ হলো, শোনা ও দেখার সেসব উপায়-উপকরণ যার সাহায্যে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।
তাছাড়া শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি যেহেতু মানুষের জ্ঞানার্জনের উপায়-উপকরণের মধ্যে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ তাই সংক্ষেপে এগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য আমরা প্রায়শই বলে থাকি যে,‘দেখে-শুনে কাজ করিও’ দেখে-শুনে সিদ্ধান্ত নিও”ইত্যাদি। মুলত এর অর্থ হলো জ্ঞান-বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করো এবং জ্ঞান-বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিও। মানুষকে যেসব ইন্দ্রিয় ও অনুভূতি শক্তি দেয়া হয়েছে তার ধরণ প্রকৃতিগত দিক দিয়ে পশুদের ইন্দ্রিয় ও অনুভূতি শক্তি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ মানুষের প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের পেছনে একটি চিন্তাশীল মন-মগজ বর্তমান যা ইন্দ্রিয়সমূহের মাধ্যমে লব্ধ জ্ঞান ও তথ্যসমূহকে একত্রিত ও বিন্যস্ত করে তা থেকে ফলাফল বের করে মতামত স্থির করে এবং এমন কিছু সিদ্ধান্ত করে যায় যার ওপরে তার কার্যকলাপ ও আচরণের ভিত্তি স্থাপিত হয়। তাই মানুষকে সৃষ্টি করে আমি তাকে শ্রবণশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তির অধিকারী করেছি।” কথাটি বলার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আল্লাহ তা’আলা তাকে জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধির শক্তি দিয়েছেন যাতে সে পরীক্ষা দেয়ার উপযুক্ত হতে পারে। আর যদি আয়াতটির অর্থ শুধু ‘শ্রবণশক্তি এবং দৃষ্টিশক্তি’ করা হয়, তাহলে অন্ধ ও বধির ব্যক্তিরা এই পরীক্ষা থেকে বাদ পড়ে যায়। অথচ জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধি থেকে যদি কেউ পুরোপুরি বঞ্চিত না হয় তাহলে তার এ পরীক্ষা থেকে বাদ পড়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না।
মানুষের পরীক্ষা নেয়ার জন্য দ্বিতীয় যে বিষয় দান করেছেন তাহলো, “আমি তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছি। এরপর হয় সে শোকরগোজার হবে নয়তো হবে কুফরের পথ অনুসরণকারী।”(সুরা আদ দাহর:৩)
অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা মানুষকে জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধি দিয়েই ছেড়ে দেননি। বরং এগুলোর পাশাপাশি তাকে পথও দেখিয়েছেন যাতে সে জানতে পারে শোকরিয়ার পথ কোনটি এবং কুফরীর পথ কোনটি। এরপর যে পথই সে অবলস্বন করুক না কেন তার জন্য সে নিজেই দায়ী। এ বিষয়টি সুরা বালাতে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে“আমি কি তাকে দু’টি সুস্পষ্ট পথ দেখাইনি?”(আয়াত:১০) সুরা আশ শামসে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে “শপথ প্রবৃত্তির আর সে সত্তার যিনি তাকে আভ্যন্তরিন শক্তি দিয়ে শক্তিশালী করেছেন। আর পাপাচার ও তাকওয়ার অনুভূতি দু’টোই তার ওপর ইলহাম করেছেন।” (আয়াত:৮)
এ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সামনে রাখলে বুঝা যায় মানুষের হিদায়াতের জন্য আল্লাহ তা’আলা যেসব ব্যবস্থার কথা কুরআন মাজিদে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন তাও সামনে রাখলে বুঝা যায় যে, এ আয়াতে পথ দেখানো যে কথা বলা হয়েছে তার দ্বারা পথ প্রদর্শনের কোন একটি মাত্র পন্তা ও উপায় বুঝানো হয়নি।বরং এর দ্বারা অনেক পন্থা ও উপায়ের কথা বলা হয়েছে যার কোন সীমা পরিসীমা নেই। য়েমন:
এক, প্রত্যেক মানুষকে জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধিও যোগ্যতা দেয়ার সাথে সাথে একটি নৈতিক বোধ ও অনুভূতি দেয়া হয়েছে যার সাহায্যে সে প্রকৃতিগতভাবেই ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করে,কিছু কাজ-কর্ম ও বৈশিষ্ট্যকে খারাপ বলে জানে যদিও সে নিজেই তাতে লিপ্ত। আবার কিছু কাজ-কর্ম ও গুণাবলীকে ভাল বলে মনে করে যদিও সে নিজে তা থেকে দূরে অবস্থান করে। অর্থাৎ ভালো-মন্দের জ্ঞান প্রাকৃতিকভাবে তার মধ্যে বিরাজমান।
দুই,প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আল্লাহ তা’আলা বিবেক(তিরস্কারকারী নফস) বলে একটি জিনিস রেখে দিয়েছেন। যখন সে কোন মন্দ কাজ করতে উদ্যত হয় অথবা করতে থাকে অথবা করে ফেলেছে তখন এ বিবেকই তাকে দংশন করে। যতই হাত বুলিয়ে বা আদর-সোহাগ করে দিয়ে মানুষ এ বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে দিক, তাকে অনুভূতিহীন বানানোর যত চেষ্টাই করুক সে তাকে একদম নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম নয়। সেটি তাকে দংশন করতেই থাকবে।
তিন, মানুষের নিজের সত্তায় এবং তার চারপাশে যমীন থেকে আসমান পর্যন্ত গোটা বিশ্ব-জাহানের সর্বত্র এমন অসংখ্য নিদর্শনাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে যে এমনসব জিনিস এক আল্লাহ ছাড়া হতে পারে না কিংবা বহু সংখ্যক প্রভু এ বিশ্ব-জাহানের সৃষ্টিকর্তা বা পরিচালক হতে পারে না। বিশ্ব চরাচরের সর্বত্র এবং মানুষের আপন সত্তার অভ্যন্তরে বিদ্যমান এ নিদর্শনাবলীই কিয়ামত ও আখিরাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করেছে। মানুষ যদি চোখ বন্ধ করে থাকে অথবা বুদ্ধি-বিবেক কাজে লাগিয়ে সব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা না করে অথবা তা যেসব সত্যের প্রতি ইংগিত করছে তা মেনে নিতে টালবাহানা ও গড়িমসি করে তাহলে তা তার নিজেরই অপরাধ। আল্লাহ তা’আলা নিজের পক্ষ থেকে তার সামনে সত্যের সন্ধান দাতা নিদর্শনাদি পেশ করতে আদৌ কোন অসম্পূর্ণতা রাখেননি।
চার, মানুষ নিজের জীবনে তার সমসাময়িক পৃথিবীতে এবং তার পূর্বের অতীত ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় এমন অসংখ্য ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং হয়ে থাকে যা প্রমাণ করে যে, একটি সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর শাসন-কর্তত্ব তার ওপর এবং সমগ্র বিশ্ব-জাহানের ওপর কর্তত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। যাঁর ইচ্ছা সবকিছুর ওপর বিজয়ী এবং যাঁর সাহায্যের সে মুখাপেক্ষী।
পাঁচ, মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও প্রকৃতিগত জ্ঞানের অকাট্য ও চুড়ান্ত রায় হলো, অপরাধের শাস্তি এবং উত্তম কার্যাবলীর প্রতিদান অবশ্যই পাওয়া উচিত। এ উদ্দেশ্যে দুনিয়ার প্রত্যেক সমাজে কোন না কোন রূপে বিচার-ব্যবস্থা কায়েম করা হয় এবং যেসব কাজ-কর্ম প্রশংসনীয় বলে মনে করা হয় তার জন্য পুরস্কার ও প্রতিদান দেয়ারও কোন না কোন ব্যবস্থা গ্রহণকরা হয়। যদি এ কথা স্বীকার করা হয় যে, পৃথিবীতে এমন অসংখ্য অপরাধ রয়েছে যার যথাযথ শাস্তি হয় না বা শাস্তি দেয়া সম্ভব হয় না। আবার এমন অনেক সেবামূলক বা কল্যাণমূলক কাজ আছে যার পুরস্কার সে দুনিয়াতে পায় না। তখন আখিরাত মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না। কারণ উল্লেখিত অপরাধ ও ভালো কাজের পুরস্কারের জন্য আখিরাতে যেতে হবে।
ছয়, এসব উপায়-উপকরণের সাহায্যে মানুষকে হিদায়াত ও পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীতে নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন। এসব কিতাব পরিস্কার ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে শোকরের পথ কোনটি এবং কুফরের পথ কোনটি এবং এ দু’টি পথে চলার পরিণামই বা কি। নবী রাসুল এবং তাঁদের আনীত কিতাবসমূহের শিক্ষা জানা-অজানা, দৃশ-অদৃশ্য অসংখ্য উপায় ও পন্থায় সারা পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে পৌঁছে গেছে। সুতরাং এখন কেউ পৃথিবীর এই পরীক্ষগৃহে তার পরীক্ষা খাতায় যা মনে চায় তাই লিখতে পারে না। যদি এমনটি কেউ করে তবে সে আখিরাতে অকৃতকার্য বা বিফল হবে। আর যারা আল্লাহ নির্দেশিত ও রাসুল সা: কর্তৃক প্রদর্শিত পথে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় সে অবশ্যই কৃতকার্য ও সফল হবে।
Posted ১:৩১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh