জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০৬ মার্চ ২০২৫
রমযান মাস বিশ্ব মুসলিমের জন্য রহমত ও বরকতের অবারিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রতি বৎসর আবর্তিত হয়। যারা সচেতন মুসলিম, তারাই কেবল এই সুযোগ-সুবিধা নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পারে এবং এরাই মূলত: সৌভাগ্যবান। ইসলামের পাঁচটি খুঁটির মধ্যে সাওম একটি বিশেষ খুঁটি। আল হাদীসের পরিভাষায় রোযাদারদের জন্য অনেকগুলো সুখবর রয়েছে। নিচে সুসংবাদগুলো আমাদের সম্মানিত সায়েমদের জন্য পেশ করা হলো।
আবু হুরাইরা রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সা: বলেন: আল্লাহ তা’আলা বলেন, সওম ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য, কিন্তু সিয়াম আমার জন্য। তাই আমি এর প্রতিদান দেব। সিয়াম ঢাল স্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন সিয়াম পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন সায়িম। যাঁর কবজায় মুহাম্মদের প্রাণ, তাঁর শফত! অবশ্যই সায়িমের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিসকের গন্ধের চাইতেও সুগন্ধি। সায়িমের জন্য রয়েছে দু’টি খুশি যা তাকে খুশি করে। যখন সে ইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাত করবে তখন সওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে।”(বুখারী:১৯০৪, ১৮৯৪, কিতাবুস সাওম, বাবু হাল ইয়াকুলু
……মুসলিম:১১৫১, আহমাদ:৭৭৯৩, আ. প্রকা: ১৭৬৯ ইফা:১৭৮০)
আবু হুরাযরা রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন যে, তোমাদের নিকট রমযান উপস্থিত হয়েছে, যা একটি বরকতময় মাস। তোমাদের উপরে আল্লাহ তা’আলা অত্র মাসের সওম ফরয করেছেন। এ মাসের আগমনে জান্নাতের দরজাসমুহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। আর আল্লাহর অবাধ্য শয়তানদের গলায় লোহার বেড়ী পরানো হয়। এ মাসে একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যান থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল সে প্রকৃত বঞ্চিত রয়ে গের।(সুনানে নাসাঈ:২১০৬, কিতাবুস সাওম, ইফা)
প্রথম সুখবর: সওমের প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা দিবেন: উল্লেখিত হাদীসটিতে রোযাদারদের পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা নিজে প্রদান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। বিষয়টির প্রতি একটু গভীর মননিবেশ করলে এর গুরুত্ব অনুধাবন করা আপনার জন্য সহজ হবে। মনে করুন, আপনি দেশের এক বিশেষ কাজে অংশ গ্রহণ করেছেন, যার গুরুত্ব এত বেশী যে, তার সম্মাননা দেশের প্রধান ব্যক্তি নিজের হাতে প্রদান করেন। সাওম এমনি এক বিশেষ ইবাদাত যার গুরুত্ব এতবেশী যে, এর পুরস্কার আল্লাহ নিজে প্রদান করবেন। দ্বিতীয়ত: ইসলামে লৌকিকতা বা রিয়া হারাম বা ছোট্র শিরক হিসাবে গণ্য করা হয়। এর পরও মানুষ ইচ্ছা করলে প্রতিটি ইবাদাতে লৌকিকতা প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু সওম এমন এক ইবাদাত যে, ইচ্ছা করলেও কেউ এখানে লৌকিকতা প্রদর্শন করতে পারে না। সুতরাং কেউ যখন সওম পালন করে তা আল্লাহর জন্যই করে। কারণ সে ইচ্ছা করলে আড়ালে আবঢালে খানা, পানীয় ও যৌনসম্ভোগ সেরে নিতে পারে, মানুষ তা দেখতে পাবে না। কিন্তু এর পরও সে এগুলো করে না কারণ সে জানে ও মানে আল্লাহ রাকিব, তিনি আলীম, সামিউ ও বাছির। কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন। আল্লাহর ভয় ও বিশ্বাসের কারণেই সে সওম ভঙ্গ করে না। সুতরাং সওমে লৌকিকতা প্রদর্শন করতে পারে না। সুতরাং কেউ সওম রাখলে তা খালেছভাবে আল্লাহর জন্যই রাখে।
দ্বিতীয় সুখবর: আল্লাহর সাথে সাক্ষাত। বেহেশতীরা অনাবিল সুখের সাগরে অবগাহন করার পরও একটি অতৃপ্তি তাদের মধ্যে থেকে যাবে। সেটি হলো, স্বচক্ষে আল্লাহর দর্শন লাভ। কিন্তু সকল বেহেশতী হয়তাবা সে সুযোগ পাবে না। উল্লেখিত হাদীসের শেষে বলা হয়েছে,“ সায়িমের জন্য রয়েছে দু’টি খুশি যা তাকে খুশি করে। যখন সে ইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাত করবে তখন সওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে।”
তৃতীয় সুখবর: সায়েম জান্নাতে প্রবেশ করবে। হযরত হুজায়ফা রা: বলেন, আমি আল্লাহ নবী সা: কে আমার বুকের সাথে মিলিয়ে নিলাম, তারপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির কামনায় একদিন সাওম রাখবে, পরে তার মৃত্যু হয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোন দান-সদকা করে তারপর মৃত্যু হয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসনাদে আহমাদ:২৩৩২৪) হযরত আবু উমামা রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা: এর দরবারে আগমন করে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবো। তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ, কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই। আমি পুনরায় তাঁর নিকট এসে একই কথা বললাম। তিনি বললেন, তুমি রোযা রাখ। (মুসনাদে আহমাদ:২২১৪৯, সহিহ ইবনে খুযাইমা: ১৮৯৩, নাসাঈ: ২৫৩০)
চতুর্থ সুখবর: সায়েমরা বিশেষ দরজা ‘রাইয়ান’ দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে। হযরত সাহল ইবনে সা’দ রা: হতে বর্ণিত। নবী সা: বলেছেন, জান্নাতে একটি দরজা আছে, যার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন এ দরজা কেবল সায়েম ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষনা করা হবে- কোথায় সে সৌভাগ্যবান সায়েমগণ? তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা ব্যতীত কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। অত:পর সায়েমগণ যখন প্রবেশ করবে, তখন তা বন্ধ করে দেয়া হবে। ফলে কেউ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী: ১৮৯৬, কিতাবুস সাওম, বাবুর রাইযান লিস সায়িমিন, মুসলিম:১১৫২, মুসনাদে আহমাদ:২২৮১৮, আ;প্র: ১৭৬১, ইফা:১৭৭২)
পঞ্চম সুখবর: সায়েমদের জন্য সাওম দোযখের ঢাল স্বরূপ: সাওম জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল ও দূর্গ স্বরূপ। হযরত জাবির রা: হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: আমাদের মহান রব বলেছেন-সাওম হল ঢাল। বান্দা এর দ্বারা নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। সাওম আমার জন্য আর আমিই এর পুরস্কার দিবো। (মুসনাদে আহমাদ:১৪৬৬৯) উসমান ইবনে আবিল আস রা: বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা: কে বলতে শুনেছি, সাওম হল জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল, যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদেও (শুত্রুর আঘাত হতে রক্ষাকারী) ঢালের মতো। (সুনানে ইবনে মাযাহ:১৬৩৯, আহমাদ:১৬২৭৮, ইবনে খুযাইমা:২১২৫, ইবনে হিব্বান:৩৬৪৯) আবু হুরাইরা রা: হতে বর্ণিত। নবী সা: বলেছেন: সাওম হল (জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ লাভের) ঢাল এবং সুরক্ষিত দূর্গ।(মুসনাদে আহমাদ: ৯২২৫, বাইহাকী:৩৫৭১)
ষষ্ট সুখবর: সওম কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হবে। সাওম কিয়ামতের দিন সায়েমের জন্য সুপারিশ করবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা: হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: সাওম ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সাওম বলবে, হে রব! আমি তাকে খাদ্য ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি। অতএব, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসুলুল্লাহ সা: বলেন, অত:পর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (মুসনাদে আহমাদ: ৬৬২৬, মুসতাদরিকে হাকিম: ২০৮০)
সপ্তম সুখবর: হাশরে সাওম সম্মানিত বিশেষ ব্যক্তিদের সাথী বানাবে। হযরত আমর ইবনে র্মুরা আল জুহানী রা: হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সা: এর দরবারে এসে বললো, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি যদি এ কথার সাক্ষ্য দিই যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং অবশ্যই আপনি আল্লাহর রাসুল। আর আমি যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, রমযান মাসের সাওম ও কিয়াম আদায় করি তাহলে আমি কাদের দলভুক্ত হবো? তিনি বললেন: সিদ্দিকীন ও শহীদদের দলভুক্ত হবে।(সহীহ ইবনে খুযাইমা: ২২১২, সহীহ ইবনে হিববান: ৩৪২৯)
সবচেয়ে বড় সুখবর হলো, যেহেতু রমযানের সাওম একটি তাকওয়াভিত্তিক সমাজ কায়েম করে। তাই মহান আল্লাহ তা’আলা ঐ তাকওয়াভিত্তিক সমাজের জন্য আসমান ও যমীনের ধনভাণ্ডার,স্বচ্ছলতা ও বরকতের দরজা খুলে দেন। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহের দুয়ার খুলে দিতাম। কিন্তু তারার তো প্রত্যাখ্যান করেছে। কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে যাচ্ছিলো তার জন্যে আমি পাকড়াও করেছি।”(সুরা আরাফ: ৯৬) তাছাড়া আমাদের মর্যাদার মানদন্ড যা-ই করা হোক, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো মর্যাদার মানদন্ড নয়। মর্যাদার প্রকৃত মানদন্ড হচ্ছে, তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে বেশী মর্যাদার অধিকারী যে বেশী তাকওয়ার অধিকারী।”(সুরা হুজরাত: ১৩)
Posted ১:১১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ মার্চ ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh