জাফর আহমাদ | বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হজ্জের মাসগুলো সবার জানা। যে ব্যক্তি এই নির্দিষ্ট মাসগুলোতে হজ্জ করা নিয়ত করে, তার জেনে রাখা উচিত, হজ্জের সময়ে সে যেন যৌন সম্ভোগ, দুস্কর্ম ও ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত না হয়। আর যা কিছু সৎকাজ তোমরা করবে আল্লাহ তা জানেন। হজ্জ সফরের জন্য পাথেয় সংগে নিয়ে যাও আর সবচেয়ে ভালো পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। কাজেই হে বুদ্ধিমানেরা! আমার নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকো।”(সুরা বাকারা:১৯৭) যেহেতু হজ্জ সফরের ভালো পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। সেই তাকওয়া অর্জনের ট্রেনিং তো সবেমাত্র শেষ হলো।
অর্থাৎ রমযানের একটি মাস সারাবিশ্বের মূসলমানগণ তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণশালা থেকে বেরিয়ে এসেই তাদের সামর্থবানরা হজ্জ সফরের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। এখখনি তাকওয়া নামক পাথেয়-এর পাশাপশি অন্যান্য আনুষাঙ্গিক পাথেয় নিয়ে আল্লাহর মেহমান হিসাবে মক্কার পথে রওয়ানা করবেন। তাই আল্লাহ তা’আলা উল্লেখিত আয়াতে জানিয়ে দিলেন, হজ্জ সফরে পাথেয় নিয়ে যাও। তবে আসল পাথেয় হচ্ছে, আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হওয়া, তাঁর বিধি-নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করা থেকে বিরত থাকা এবং জীবনকে পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও কুলষমুক্ত করা।
যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে সৎচারিত্রিক গুণাবলী সৃষ্টি করে বটে কিন্তু সে অনুযায়ী নিজের চারিত্রকে নিয়ন্ত্রিত করেনি এবং আল্লাহর ভয়ে ভীত না হয়ে অসৎকাজ করতে থাকে, সে যদি পাথেয় সংগে না নিয়ে নিছক বাহ্যিক ফকীরী ও দরবেশী প্রদর্শনী করে বেড়ায়, তাহলে তাতে তার কোন কোন লাভ নেই। আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের দৃষ্টিতে সে লাঞ্জিত হবে। যে ধর্মীয় কাজটি সম্পন্ন করার জন্য সে সফর করছে তাকেও লাঞ্জিত করবে। কিন্তু তার মনে যদি আল্লাহর প্রতি আল্লাহর ভয় জাগরূক থাকে এবং তার চরিত্র নিষ্কলুষ হয় তাহলে আল্লাহর ওখানে সে মর্যাদার অধিকারী হবে এবং মানুষও তাকে মর্যাদা দৃষ্টিতে দেখবে। তার খাবারের থলিতে খাবার ভরা থাকলেও তার এ মর্যাদার কোন কম-বেশী হবে না।
হজ্জের সবচেয়ে ভালো পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর ভয়। আপনি যে ঘরটির যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, সেটি এমন একটি ঘর যেই ঘরকে কেন্দ্র করে মানুষের সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থা আবর্তিত হয়। তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে আমরা সে-ই স্বীকৃতিই দিচ্ছি। কিন্তু দু:খের বিষয় হলো, বাস্তবে আমরা আমাদের সালাত ছাড়া জীবনের অন্যান্য কাজ এই ঘরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেনি।
আমাদের সালাত ছাড়া আমাদের জীবনের সামগ্রীক কাজ তথা আমাদের দৈনন্দিন লেনদেন, আইন-কানুন, আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন মানুষের মস্তিস্ক প্রসূত আইন ও কানুন দিয়ে পরিচালিত হয়। কেবল সালাতের সময়েই আমরা কা’বার দিকে দিক-নির্দেশনা ঠিক করি কিন্তু জীবনের অনান্য কার্যাবলীর কেবলা তাগুতের দিকে নির্ধারণ করি। তার মানে আমরা আমাদের রবকে শুধু সালাতের মধ্যে আবদ্ধ করেছি আর জীবনের বিশাল অংশ থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করেছি।(নাউযুবিল্লাহ) এটি সুস্পষ্ট শিরক।
এটি সুস্পষ্টরূপে তাকওয়া বিরোধী কাজ। এটি সুস্পষ্ট মুনাফেকী আচরণ। এ ধরণের শিরক ও তাকওয়াহীন অবস্থায় আল্লাহর ঘরের কাছে মিথ্যা শ্লোগান দিয়ে উপস্থিত হলেও আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন না। সে মিথ্যাটি হলো: তালবিয়া পাঠ কালে আপনি বলছেন, হাজির! হে আল্লাহ! আমি হাজির। তোমার কোন শরীক নাই…….। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আপনি তো শিরকের সাথে জড়িত। কারণ আপনি সালাত ছাড়া সকল কিছু পরিচালনা করছেন তাগুতের আইন অনুসারে।
হ্জ্জ একটি ঐতিহাসিক ইবাদাত। হজ্জের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, শিরকমুক্ত জীবন প্রতিষ্ঠার দীপ্ত সফত নেয়া। হজ্জের পদে পদে হযরত ইবরাহিম আ: এর স্মৃতি-চিহ্ন জড়িয়ে আছে। এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর হযরত ইবরাহিম আ: যেই দু’আগুলো করেছিলেন, তাতে লক্ষ্য করবেন যে, তিনি কিভাবে মহান রবের দরবারে শিরক থেকে বেঁেচ থাকার আকৃতি পেশ করেছেন। হযরত ইবরাহিম আ: এর মতো আমাদেরকে সকল প্রকার মিথ্যা প্রভু তথা তাগুত থেকে মুখ ফিরিয়ে এক ও লা-শরিক আল্লাহর কাছে নিশর্ত আত্মসমর্থন করতে হবে বা পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হতে হবে। অর্থাৎ সকল প্রকার মিথ্যা প্রভুর তথা শিরকের গলায় ছুরি চালিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। এটিই তাকওয়া এটিই হজের ভালো পাথেয়। হযরত ইবরাহিম (আঃ) সে কাজটিই আগে করেছিলেন।
তিনি যে পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, সেটি ছিল পুরোহিত পরিবার, যে পরিবার নক্ষত্র পুজার দেশবাসীর নেতৃত্ব দিতো। যে পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেন সে সমাজটি ছিল আপাদামস্তক শিরক ও মূর্তি পুজায় নিমজ্জিত। তিনি নিজ জাতি ও পরিবারের গড্ডালিকা প্রবাহে গা এলিয়ে দেননি। তিনি পৈতৃক মন্দিরের পৌরহিত্যের মহাসম্মানিত যে গদিটি তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল, যেখানে বসলে তিনি অনায়াসেই শিরকী জাতির নেতা বনে যেতেন। কিন্তু তিনি এ বিরাট স্বার্থের উপর পদাঘাত করে সত্যের জন্য দুনিয়া জোড়া বিপদের গর্ভে ঝাপিয়ে পড়লেন।
তিনি বললেন ”আমি সব দিক হতে মুখ ফিরিয়ে বিশেষভাবে কেবল সেই মহান সত্তাকেই ইবাদাত-বন্দেগীর জন্য নির্র্দিষ্ট করলাম, যিনি সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের মধ্যে শামিল নহি।” আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে বললেনঃ ”ইসলাম গ্রহণ কর অর্থাৎ স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পন কর, আমার দাসত্ব স্বীকার কর। তিনি উত্তরে পরিস্কার ভাষায় বললেন: আমি ইসলাম কবুল করলাম, আমি সারা জাহানের প্রভুর উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করলাম, নিজেকে তার নিকট সোপর্দ করলাম।
তিনি দেশ ও জাতিকে অসংখ্য রবের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। এ জন্য কায়েমী স্বার্থবাদীসহ দুনিয়া জোড়া তাবত তাগুতী শক্তি কমর বেঁধে তাঁর বিরুদ্ধে নেমে আসে। তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে এর মোকাবেলা করতে থাকলেন। আগেই বলা হয়েছে যে তিনি যেই পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থায় আগমন করেছিলেন তা ছিল শিরকের ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্র শক্তি পরিপূর্ণভাবে শিরকের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। তিনি সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি আরো জানতেন যে তাওহীদের সন্ধান পেয়েছেন তা তারা কখনো মেনে নেবে না। বরং এ জন্য তাঁকে কঠিণ নির্যাতন ও শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে। তবু তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে উঠে দাঁড়ালেন। রাত-দিন তিনি কেবল একটি চিন্তা করতে থাকলেন, দুনিয়ার মানুষকে অসংখ্য রবের গোলামীর নাগপাশ হতে মুক্ত করে কিভাবে এক আল্লাহর বান্দায় পরিণত করা যায়।
তিনি প্রথমে নিজের পিতাকে, নিজের খান্দানকে, নিজের জাতিকে, এমনকি রাজাকে পর্যন্ত শিরক থেকে বিরত থাকতে এবং তাওহীদের আকীদা কবুল করতে দাওয়াত দিলেন। এর ফলশ্রুতিতে তিনি একদিকে একা অপরদিকে গোটা দেশ ও জাতি তাঁর মোকাবেলায় এক সাড়িতে এসে দাঁড়ালো। কিন্ত এর পরও হতোদ্যম হননি, তার মুখ অবসন্ন হয়নি। সিদ্ধান্ত হলো তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার। তাতেও তিনি বিরত হলেন না। বরং এ কাজের জন্য লেলিহান অগ্নিগর্ভে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে পছন্দ করলেন।
সুতরাং প্রত্যেক হজ্ব যাত্রীকে যে কোন পরিবেশে শিরক উচ্ছেদ ও তাওহীদের দাওয়াত দানের জন্য দাঁড়াতে হবে। সকল প্রকার ভয়-ভীতি ও জানমালের ক্ষতির আশংকা থাকতে পারে। যুগে যুগে কালে কালে আল্লাহর প্রিয়জনেরা এ পথ অবলম্বন করার অসংখ্য নজির দেখতে পাওয়া যায়। মানবতার মহান বন্ধুকেও আমরা এ পথ অবলম্ভন করতে দেখেছি। হযরত ইবরাহিম (আঃ) আগুন থেকে বাঁচার পর এ দেশে থাকা তাঁর জন্য আর সম্ভব হলো না। তাওহীদের জন্য তিনি বহিস্কৃত জীবনই পছন্দ করলেন।
তাওহীদের দাওয়াতের জন্য তিনি দেশের পর দেশ ঘুরতে থাকলেন। কিন্তু চারদিকে শিরক আর শিরকের অনুসারী থাকায় কোথাও তিনি ঠাই পেলেন না। তিনি সিরিয়া, ফিলিস্থিন, মিসর ও হিযাযে গিয়েছেন। মোট কথা আরাম আয়েশকে পিছনে ঠেলে দিয়ে গোটা জীবনই দেশ দেশান্তরে চষে বেরিয়েছেন। নিজ বাড়ী, খেত-খামার, পশু ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবই তো ছিল। কিন্তু এ গুলোর প্রতি লোভাতুর হননি। তাওহীদের পতাকা উড্ডীন করার দুর্বার স্পৃহা তাঁকে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরিয়েছে। আমাদেরকেও নিজ বাড়ী, খেত-খামার, পশু ও ব্যবসা-বাণিজ্যের লোভকে সংবরণ করে তাওহীদের পতাকা উড্ডীন করার নিমিত্তে দাঁড়াতে হবে।
কাবার পথের যাত্রীরা! কোথায় হাজিরা দিতে যাচ্ছেন আর হাজিরা দিতে গিয়ে কি বলছেন তা অবশ্যই গভীর মনোযোগের সাথে চিন্তা করতে হবে। হজ্বের প্রতিটি অনুষ্ঠান পালন করার সময় কি করা হচ্ছে এবং কি বলা হচ্ছে তা অনুধাবন করবেন। প্রকৃতপক্ষেই কি আমরা আমাদের বাস্তব জীবনকে এর আলোকে গঠণ করতে পেরেছি এবং আল্লাহর কাছে নিজেকে পুর্ণাঙ্গ মুসলিম হিসাবে পেশ করতে পেরেছি?
আত্মজিজ্ঞাসার জবাব যদি নাবোধক হয়। তবে আমরা লাব্বায়িক বলে এ বিশ্বসম্মেলন কেন্দ্রে হাজিরা দিব ঠিকই কিন্তু আল্লাহর হাজিরা খাতায় অনুপস্থিতই লেখা হবে। যেমন প্রানহীন নামায মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতে পরছেনা, প্রানহীন রোযা তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি করতে পারছেনা ও যাকাত আমাদেরকে পবিত্র করতে পারছে না। তেমনিভাবে প্রানহীন হজ্ব আল্লাহর হাজিরা খাতায় অনুপস্থিতিই লেখা হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে হজ্জের সামগ্রীক শিক্ষা গ্রহণ করার এবং নিজেদেরকে গঠণ করার তাওফীক দিন।
Posted ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh