বাংলাদেশ রিপোর্ট : | বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট ২০২১
করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্থ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায়তার উদ্দেশ্যে ফেডারেল সরকারের ৭৮০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৭৬.৩ বিলিয়ন ডলার অর্থ্যাৎ মোট বরাদ্দের ১৫ শতাংশই হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা। এসব ভূঁয়া ঋণগ্রহীতাকে খুঁজে বের করতে মাঠে নেমেছে ‘দ্য স্মল বিজনেস এডমিনিষ্ট্রেশনস অফিস অফ ইন্সপেক্টর জেনারেল’ এর অফিস এবং ইতোমধ্যে তারা বাংলাদেশীসহ পাঁচশতাধিক প্রতারককে গ্রেফতার করেছে ও ঋণ নেয়া অর্থ আদায় করছে।
পে-চেক প্রটেকশন প্রোগ্রাম বা পিপিপি ‘ইকনমিক ইনজুরি ডিজাষ্টার লোনস’ নামে এই কর্মসূচি প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের ক্ষমাযোগ্য ফেডারেল ঋণ, যে ঋণ পেতে আবেদনকারীর সিকিউরটি ডিপোজিট, কোলেটারেল এর প্রয়োজন পড়েনি, পরিশোধের মেয়াদ দীর্ঘ এবং সূদ হার নামেমাত্র। অর্থ্যাৎ কেউ এ ঋণ নিতে পারলে তা পরিশোধ করার গরজ না থাকলেও চলবে- এ ধারণার বশবর্তী হয়ে অসংখ্য লোক নামে মাত্র ব্যবসার নামে অথবা ব্যবসা সংক্রান্ত জাল দলিলপত্র তৈরি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে। এই ঋণ দেয়ার পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য ছিল সরকার এই ঋণ মওকুফ করবে, যদি ঋণগ্রহীতারা ঋণের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্মরত ব্যক্তিদের বেতনভাতা পরিশোধে ব্যয় করে।
পিপিপি লোন প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়েছেন অনেক বাংলাদেশীও। নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সিটিতে বসবাসকারী এসব প্রতারক এখন সময় কাটছে আতঙ্কে। গ্রেফতারের ভয়ে ইতোমধ্যে গাঁ ঢাকা দিয়েছেন অনেকে। ট্যাক্স ফাইলিংয়ের কাজ করেন এমন অনেকের সঙ্গে যোগসাজশে ভূঁয়া তথ্য দিয়ে আবেদন করে তারা হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অংকের অর্থ। প্রতারকদের অনেকেই বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন। চেষ্টা করছেন নতুন নতু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। কেউ কেউ দেশেও বিনিয়োগের ধান্ধা করছিলেন। কিন্তু জালিয়াতি ও প্রতারণার বিষয়টি ফাঁস হওয়ায় এখন তারা নির্ঘুম দিন কাটাচ্ছেন। গত ১৭ আগস্ট ‘সিএনএন বিজনেস’ এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ‘ফিনটেক’ এর আওতাভূক্ত ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আবেদনকারীদের দ্রুত ঋণ পাওয়ার সুবিধা করার মধ্য দিয়ে ব্যাপক প্রতারণা ও করদাতাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয়ের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তাদের শীর্ষ দশটি পিপিপি ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকের মধ্যে নয়টিই সন্দেহভাজন ঋণ বিতরণ করেছে বলে অস্টিনের ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসের ম্যাককম্বস স্কুল অফ বিজনেস এর গবেষকরা এক সমীক্ষায় নিশ্চিত করেছেন।
শুধু ঋণগ্রহীতারাই যে জরুরী কর্মসূচির অর্থ প্রতারণামূলকভাবে আদায় করেছে, তাই নয়, বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘ফিনটেক’ এর দশটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বড় তিনটি ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান- ক্রস রিভার, ক্যাপিট্যাল প্লাস ও হারভেস্ট আবেদন প্রক্রিয়া ও ঋণ বিতরণের জন্য প্রসেসিং ফি বাবদ আদায় করেছে ৯০০ মিলিয়ন ডলারের অধিক। গবেষকদের ধারণা, ফিনটেক এর প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য ঋণ গ্রহণের জন্য লোকজনকে উৎসাহিত করেছে এবং দলিলপত্র যাচাই করার ক্ষেত্রে অন্ধের ভূমিকা পালন করে সরকারি খাতের অর্থ অপচয়ে অসৎ ভূমিকা রেখেছে। ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে বরাদ্দকৃত পিপিপি কর্মসূচির অধীনে ইতোমধ্যে ১ কোটি ১৮ লাখআবেদনকারীর মধ্যে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু এ ঋণের ১৫ শতাংশই বিতরণ করা হয়েছে প্রতারণামূলক উপায়ে, অর্থ্যাৎ প্রায় ১৮ লাখ আবেদনই ছিল জাল। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত পিপিপি লোন দেয়া হয়েছে। ‘দ্য স্মল বিজনেস এডমিনিষ্ট্রেশনস অফিস অফ ইন্সপেক্টর জেনারেল’ সূত্রে বলা হয়েছে যে, জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সময়ে তাদের ১৩৯টি তদন্ত দল তদন্ত চালিয়ে ভূঁয়া পরিচয়ে ১০,২০০টি ঋণ গ্রহনের ঘটনা শনাক্ত করেছে। বিতরণ করা ঋণের মধ্য থেকে প্রতারণামূলকভাবে নেয়া ৬১১ মিলিয়ন ডলার তারা গত গত ১৫ জুলাই তারিখের মধ্যে ফেরত নিতে সক্ষম হয়েছে।
দ্য স্মল বিজনেস এডমিনিষ্ট্রেশনস অফিস অফ ইন্সপেক্টর জেনারেল এর অফিস আরো জানায় যে, ফেডারেল আইনজীবীরা বেশ কিছু সন্দেহভাজন ঋণ আবেদনকারী ও ইতোমধ্যে ঋণ গ্রহণকারীকে শনাক্ত করে প্রতারণার মাধ্যমে জরুরী কর্মসূচির অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। পিপিপি চালু জওয়ার পর থেকে গত জুলাই মাস পর্যন্ত একশ’ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ৭০টির বেশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট ৬৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ আদায় করেছে অভিযুক্তদের নিকট থেকে। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পিপিপি ঋণের অর্থে কেনা রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি ও বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে।
সিএনএন আরো জানিয়েছে যে ২২ জন পিপিপি ঋণ গ্রহণকারীর বিরুদ্ধে ১১ মিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে, যারা ঋণের অর্থে বিলাসবহুল গাড়ি, অলঙ্কার এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র ক্রয় করেছেন। ওয়াশিংটন এস্টেটে গত সপ্তাহে এক ব্যক্তিকে আদালত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে, যিনি জাল কাগজপত্র দিয়ে একাই নয়টি পিপিপি ঋণ আবেদন করেছিলেন ১.১ মিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়ার আশায়। তার আবেদনগুলোর মধ্যে ছয়টি আবেদন মঞ্জুর হয়েছিল। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোন কোন প্রতিষ্ঠান আবেদন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বেশ কঠোর ছিল এবং দেখা গেছে যে তারা ঋণ মঞ্জুর করার পরও সন্দেহজনক দলিলপত্র বা ভূঁয়া পরিচয় দিয়ে ঋণ আবেদন করা হয়েছে এমন প্রমাণিত হওয়ায় প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার আবেদন বাতিল করেছে।
ক্রিশ্চিয়ান ডি জনসন তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘মিলিয়ন ম্যান’, যেটি সমগ্র দেশজুড়ে কাজ করে- এমন দেখিয়ে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে ৩ লাখ ডলারের পিপিপি ঋণের আবেদন করেন। তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করে এমন ৫০ ব্যক্তির তালিকাও দেন এবং বেতন বাবদ তাকে মাসে ১ লাখ ২০ হাজার ডলার পরিশোধ করতে হয় বলে উল্লেখ করেন এবং কোয়ার্টারলি ফেডারেল ট্যাক্স রিটার্নের কাগজপত্র জমা দেন। একজন ব্যাংক কর্মচারির কাছে তিনি ইমেইল বার্তাও পাঠান যে, তিনি তার ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে কর্মচারিদের বেতন পরিশোধ করছে, যা এখন শেষ হওয়ার পর্যায়ে। ওকলাহোমা ব্যাংক কয়েক সপ্তাহ পর এই আবেদন অগ্রাহ্য করে। জনসন লেগে ছিলেন।
২০২০ এর এপ্রিল ও মে মাসের মধ্যে তিনি আরো ৫টি আবেদন করেন, এবং এক একটি আবেদনে ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণে ঋণ পাওয়ার আকাংখা ব্যক্ত করেন, যার মিলিত পরিমাণ ছিল ৩ মিলিয়ন বা ৩০ লাখ ডলার। কিন্তু ওকলাহোমা ব্যাংক তাদের নিজস্ব তদন্তে দেখতে পায় যে কথিত ‘মিলিয়ন ডলার’ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আদৌ কোন কর্মচারি নেই, যারা পিপিপি’র অর্থ পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারে। গত ফেব্রুয়ারী মাসে জনসনকে গ্রেফতার করা হয় এবং ওয়েষ্টার্ন ডিষ্ট্রিক্ট কোর্ট অফ নিউইয়র্কে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয়। ওয়েষ্টার্ন ডিষ্ট্রিক্টের ইউএস এটর্নি জেমস পি কেনেডি জুনিয়র বলেন, পিপিপি ঋণের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে আর্থিকভাবে চাঙ্গা রাখা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংনেসর হাত থেকে রক্ষা করা। সেজন্য যারা প্রতারণার মাধ্যমে এই অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বা নেয়ার চেষ্টা করেছে, ন্যায়বিচারের দাবী হলো তাদের বিচারের মুখোমুখি করে শাস্তি প্রদান করা এবং আমরা তাই করছি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ মানুষের কল্যাণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা থেকে বিরত থাকে।
Posted ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ আগস্ট ২০২১
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh