জাফর আহমাদ | বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০২৪
আরবী গাফেল মানে উদাসীন। গাফলতি মানে উদাসীনতা। গাফলতি কাফের ও মুনাফিকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এই গাফলতির কারণে তারা জাহান্নামের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়াকে অবধারিত করে ফেলেছে। কোন মুসলমান কখনো গাফেল বা উদাসীন হতে পারে না। যখন উদাসীনতা কোন ব্যক্তিকে পেয়ে বসে তখন সে ইচ্ছাকৃত কল্যাণকর জ্ঞান ও কর্ম থেকে বিরত থাকে। শুধুমাত্রনিজের ধারণা ও খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে এবং শয়তান তার মনোবৃত্তিকে সুশোভিত করে দেয়। ফলে তার চিত্ত নানা কৃপ্রবৃত্তিকে ধারণ করতে থাকে। একজন মুসলিমের উদাসীনতা হলো, সৎ কর্ম থেকে উদাসীন হওয়া এবং গোনাহের শাস্তি সম্পর্কে উদাসীন হওয়া। ফলে সে-ও ধ্বংস ডেকে আনে এবং তার কল্যাণের পথগুলো রুদ্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “ আল্লাহ তাদের হৃদয়ে ও কানে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর আবরণ পড়ে গেছে। তারা কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।”(সুরা বাকারা:৭) অর্থাৎ বাস্তব সত্য তাদের সামনে উপস্থাপিত হওয়ার পরও তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করতে থাকে। যার ফলে কোন সত্য তার বোধগম্য হয় না। সত্যিকার অর্থে সত্য শোনার ব্যাপারে তার কান হয়ে যায় বধির। তখন সুস্পষ্টভাবে অনুভ’ত হয় যে, সত্যিই তার হৃদয়ের দুয়ারে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। উদাসীনতার দরুন তারা আর সোজা পথ দেখতে পায় না এবং তাদের কল্যাণের সকল পথও রুদ্ধ হয়ে যায়।
এদের সম্পর্কে কুরআন আরো বলছে যে,“আর এটি একটি অকাট্য সত্য যে, বহু জিন ও মানুষ এমন আছে যাদেরকে আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না। তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা পশুর মত বরং তাদের চাইতেও অধম। তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে।”(সুরা আরাফ:১৭৯) এর অর্থ এটা নয় যে, আমি তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্যই সৃষ্টি করেছিলাম এবং তাদেরকে সৃষ্টি করার সময় এ সংকল্প করেছিলাম যে, তাদেরকে জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত করবো। বরং এর সঠিক অর্থ হচ্ছে, আমি তো তাদেরকে হৃদয়, মস্তিস্ক, কান, চোখ সবকিছুসহ সৃষ্টি করেছিলাম। কিন্তু এ বেকুফরা এগুলোকে যথাযথভাবে ব্যবহার করেনি বরং তারা পশুদের চেয়েও নিম্নতর জীবন যাপন করে। পশুদের জ্ঞান-বুদ্ধি নাই কিন্তু তারা উদাসীন নয় বরং নিজস্ব পরিবেশে তারা সচেতন। কিন্তু মানুষ জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেকসম্পন্ন হওয়ার পরও যখন উদাসীন হয় তখন তাদের অবস্থান পশুদের থেকেও নিম্নতর পর্যায়ে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত তারা জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়।
মনে রাখতে হবে, বিচার-বুদ্ধি-বিবেচনা যেহেতু দেয়া হয়েছে, তাই জ্ঞান ও বিজ্ঞতার অপরিহার্য দাবী হচ্ছে, তাকে তার কাজের জন্য দায়ীও করা হবে। যেই ক্ষমতা ও ইখতিয়ার তাকে দান করা হয়েছে, সেই ক্ষমতা ও ইখতিয়ার সে কিভাবে ব্যবহার করেছে তার হিসাবও তার কাছ থেকে নিতে হবে। তাকে টাকা-পয়সা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি দেয়া হয়েছে, সেই টাকা-পয়সা ও প্রভাব প্রতিপত্তি কিভাবে ব্যবহার করেছে, তার হিসাব দিতে হবে। যাকে নিজ দায়িত্বে সৎ ও অসৎ কাজ করার ক্ষমতা দেয়া হবে তাকে তার সৎকাজের জন্য পুরস্কার ও অসৎকাজের জন্য শাস্তিও দিতে হবে। এসব সত্য প্রত্যকের কাছে দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট। সুতরাং এ কথা সুস্পষ্ট হবার পরও যারা অন্ধত্ব বরণ করে তারা মূলত: এই কর্মজগতের পরে আর কোন কর্মফল জগত নেই, তার পেছনে এই নির্বোধ ধারনাই কাজ করছে। এ বিভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন ধারনাই তাকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে দিয়েছে। তার কর্মফলের চিন্তা তাকে ভীত করে না এবং দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তিকে সে অস্বীকার করে বিধায় তার নৈতিক আচরণ তাকে দায়িত্বহীন বানিয়ে দিয়েছে। তাই দুনিয়াটাকেই সে সব কিছু মনে করে।
যারা উদাসীন তারা নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরন করে। কুরআন ও হাদীসে খেয়াল-খুশির অনুসরণের কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। আল কুরআনে রাসুল সা: সম্পর্কে বলা হয়েছে,“তোমার বন্ধু পথভ্রষ্ট হয়নি বা বিপথগামীও হয়নি। সি নিজের খেয়াল-খুশীমত কথা বলে না যা তার কাছে নাযিল হয় তা অহী ছাড়া আর কিছুই নয়।”(সুরা আন নজম:২-৪) আয়াতে খেয়াল-খুশীমত কথা বলাকে পক্ষান্তরে পথভ্রষ্টতা ও বিপদগামী বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ যারা গাফের বা উদাসীন তারাই পথভ্রষ্ট ও বিপদগামী এবং তারাই কেবল নিজের খেয়াল-খুশীমত চলে। এ ব্যাপারে আল কুরআনে অনেকগুলো আয়াত বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা করা হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি আয়াত আপনাদের সামনে পেশ করা হলো।আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তারপর হে মুহম্মাদ! তোমাদের প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছি, যা সত্য নিয়ে এসেছে এবং আল কিতাবের মধ্য থেকে তার সামনে যা কিছু বর্তমানে আছে তার সত্যতা প্রমাণকারী ও তার সংরক্ষক। কাজেই তুমি আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী লোকদের বিভিন্ন বিষয়ের ফায়সালা করো এবং যে সত্য তোমার কাছে এসেছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি শরী’আত ও একটি কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে রেখেছি।”(সুরা মায়েদা:৪৮) আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে ঈমানদারগণ! ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও, তোমাদের ইনসাফ ও সাক্ষ্য তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে গেলেও অথবা তোমাদের বাপ-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে গেলেও। উভয় পক্ষ ধনী বা অভাবী যাই হোক না কেন আল্লাহ তাদের চাইতে কল্যাণকামী। কাজেই ইনসাফ করতে গিয়ে নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।”(সুরা নিসা:১৩৫) আল্লাহ তা’আলা বলেন, “বলে দাও, হে আহলি কিতাব! নিজেদের দীনের ব্যাপারে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না এবং তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করো না যারা তোমাদের পূর্বে নিজেরাই পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং আরো অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে আর সাওয়া-উস-সাবীলা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।”(সুরা মায়েদা:৭৭)
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এমন লোকের আনুগত্য করো না যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির কামনা বাসনার (খেয়াল-খুশির) অনুসরণ করেছে এবং যার কর্মপদ্ধতি কখনো উগ্র, কখনো উদাসীন।”(সুরা কাহাফ:২৮)আল্লাহ তা’আলা বলেন, “এবং যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলেছে, যারা আখেরাত অস্বীকারকারী এবং অন্যদেরকে নিজেদের রবের সমকক্ষ দাঁড় করায় কখনো তাদের খেয়াল খুশীর অনুযায়ী চলো না।”(সুরা আন’আম:১৫০) আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এমন কি কখনো হয়, যে ব্যক্তি তার রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট হিদায়াতের ওপর আছে সে ঐ নব লোকের মত হবে যাদের মন্দ কাজকর্মকে সুদৃশ্য বানিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তারা নিজেদের প্রবৃত্তি (খেয়াল-খুশির) অনুসারী হয়ে গিয়েছে?” (সুরা মুহাম্মাদ:১৪) আল্লাহ তা’আলা বলেন,“যেহেতু এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাই হে মুহাম্মদ এখন তুমি সেই দীনের দিকেই আহবান জানাও এবং যেভাবে তুমি আদিষ্ট হয়েছো। সেভাবে দৃঢ়তার সাথে তা আঁকড়ে ধরো এবং এসব লোকের ইচ্ছা আকাংখার বা খেয়ালখুশির অনুসরণ করো না। এদের বলে দাও, আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন আমি তার ওপর ঈমান এনেছি। আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যেন তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করি। আল্লাহই আমাদেরও রব এবং তোমাদেরও রব তিনিই।”(সুরা শুরা:১৫)আল্লাহ তা’আলা বলেন, (আমি তাকে বললাম) “হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, কাজেই তুমি জনগণের মধ্যে সত্য সহকারে শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনা করো এবং প্রবৃত্তির কামনার বা খেযাল-খুশির অনুসরণ করো না, কারণ তা তোমাকে আল্লাহর পথ বিপদগামী করবে। যারা আল্লাহর পথ পথ থেকে বিপদগামী হয় অবশ্যই তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি, যেহেতু তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে।”(সুরা ছোয়াদ:২৬) আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে মুহাম্মদ! তাদেরকে বলে দাও, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য যাদেরকে ডাকো তাদের বন্দেগী করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। বলো, আমি তোমাদের ইচ্ছা-বাসনার বা খেয়াল-খুশির অসুসরণ করবো না। এমনটি করলে আমি বিপদগামী হবো এবং সরল-সত্য পথ লাভকারীদের অন্তরভুক্ত থাকবো না।”(সুরা আন’আম:৫৬)
উপর্যুক্ত একটি আয়াতে বলা হয়েছে “তোমরা ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও, তোমাদের ইনসাফ ও সাক্ষ্য তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে গেলেও অথবা তোমাদের বাপ-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে গেলেও। উভয় পক্ষ ধনী বা অভাবী যাই হোক না কেন আল্লাহ তাদের চাইতে কল্যাণকামী। কাজেই ইনসাফ করতে গিয়ে নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।” অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা কেবল এতটুকু বলে ক্ষান্ত হননি যে, তোমরাই ইনসাফের দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করো এবং ইনসাফের পথে চলো বরং বলেছেন, তোমরা ইনসাফের পতাকাবাহী হয়ে যাও।
কেবল ইনসাফ করাই তোমাদের কাজ হবে না বরং ইনসাফের ঝাণ্ডা নিয়ে এগিয়ে চলাই হবে তোমাদের কাজ। জুলুম খতম করে তার জায়গায় আদল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করতে তোমাদের দৃঢ় সংকল্প হতে হবে। আদল ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সহায়ক শক্তির প্রয়োজন মু’মিন হিসাবে তোমাদের যোগান দিতে হবে। আদল ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি নিজেদের খেযালখুশির বিরুদ্ধেওযেতে যেতে হয়, এমনি কি নিজেদের বাপ-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধেও যেতে হয়, তবু তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা উদাসীন হয় তারা আল্লাহর হুকুম বাদ দিয়ে কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে। ফলে তাদের কল্যাণের সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। সে আর কল্যানের পথ দেখতে পায় না।
Posted ১২:৪৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh