জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০১ আগস্ট ২০২৪
হিংসুকের হিংসা যে কত মারাত্মক হতে পারে, তা শুধুমাত্র যারা হিংসুকের হিংসায় নিপতিত হয়েছে তারাই জানে। হিংসার আগুনে জ¦লে কত মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। কত পরিবার দুর্বিসহ জীবনের শিকার হয়েছে তার হিসাব আল্লাহই ভালো জানেন। আর আল্লাহ তা’আলা ভালো জানেন বলেই এ ধরনের হিংসুক থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেছেন। আল কুরঅনের অত্যন্ত পরিচিত একটি সুরা হচ্ছে, সুরা ফালাক। মোট পাঁচটি আয়াত দিয়ে গঠিত সুরাটিতে প্রথমে বলা হয়েছে,“বলো! আশ্রয় চাচ্ছি আমি প্রভাতের রবের।” (আয়াত:১) এভাবে ২,৩ ও ৪ নং আয়াতে কয়েকটি বিষয়ের আশ্রয় চাওয়ার পর সর্বশেষ আয়াতে বলা হয়েছে,“এবং (আমি মহান রবরের আশ্রয় চাই) হিংসুকের অনিষ্টকারিতা থেকে যখন সে হিংসা করে।”(আয়াত:৫) অর্থাৎ হিংসুকের হিংসার অনিষ্ট বা ক্ষতি থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই। হিংসা মানব চরিত্রের যেসব খারাপ অভ্যাস আছে তার মধ্যে হিংসা অত্যন্ত ক্ষতিকারক। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, ঈর্ষাকাতরতা, দ্বন্ধ ও কলহ-বিবাদ শান্তিপূর্ণ জীবনকে বিষময় ও দুর্বসহ করে তুলে।
তাফসীরকারকগণ হিংসার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, হিংসার মানে হচ্ছে, কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ যে অনুগ্রহ, শ্রেষ্টত্ব বা গুলাবলী দান করেছেন তা দেখে কোন ব্যক্তি নিজের মধ্যে জ¦ালা অনুভব করে এবং তার থেকে এগুলো ছিনিয়ে নিয়ে এ দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দেয়া হোক অথবা কমপক্ষে তার থেকে সেগুলো অবশ্যিই ছিনিয়ে নেয়া হোক এ আশা করতে থাকে। তবে কোন ব্যক্তি যদি আশা করে, অন্যের প্রতি যে অনুগ্রহ করা হয়েছে তার প্রতিও তাই করা হোক, তাহলে এটাকে হিংসার সংজ্ঞায় ফেলা যায় না।
আয়াতে হিংসুক যখন হিংসা করে অর্থাৎ তার মনের আগুন নিভানোর জন্য নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে কোন পদক্ষেপ নেয়, সেই অবস্থায় তার অনিষ্টকারিতা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কারণ, যতক্ষণ সে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না ততক্ষণ তারা জ¦ালা-পোড়া তার নিজের জন্য খারাপ হলেও যার প্রতি হিংসা করা হচ্ছে তার জন্য এমন কোন অনিষ্টকারিতায় পরিণত হচ্ছে না, যার জন্য আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়া যেতে পারে। তারপর যখন কোন হিংসুক থেকে এমন ধরনের অনিষ্টকারিতার প্রকাশ ঘটে তখন তার হাত থেকে বাঁচার প্রধান কৌশল হিসেবে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
আর এই সাথে হিংসুকের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আরো কয়েকটি জিনিসও সহায়ক হয়। এক, মানুষ আল্লাহর ওপর তায়াক্কুল করবে এবং আল্লাহ চাইলে কেউ তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, এ কথা দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করবে। দুই, হিংসুকের কথা শুনে সবর করবে। বেসবর হয়ে এমন কোন কথা বলবে না বা কাজ করবে না, যার ফলে সে নিজেও নৈতিকভাবে হিংসুকের সাথে একই সমতলে বা কাতারে এসে দাঁড়িয়ে যাবে। তিন, হিংসুক আল্লাহভীতি বিসর্জন দিয়ে বা চরম নির্লজ্জতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে যতই অন্যায়-অশালীন আচরণ করতে থাকুক না কেন, যার প্রতি হিংসা করা হচ্ছে সে যেন সবসময় তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্টিত থাকে। চার, তার চিন্তা যেন কোন প্রকারে মনে ঠাঁই না দেয় এবং তাকে এমনভাবে উপেক্ষা করবে যেন সে নেই। কারণ, তার চিন্তায় মগ্ন হয়ে যাওয়াই হিংসুকের হাতে পরাজয় বরণের পূর্ব লক্ষণ। পাঁচ, হিংসুকের সাথে অসদ্ব্যবহার করা তো দুরের কথা, কখনো যদি এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায় যে, যার প্রতি হিংসা করা হচ্ছে যে হিংসাকারীর সাথে সদ্ব্যবহার ও তার উপকার করতে পারে, তাহলে তার অবশ্যিই তা করা উচিত। হিংসুকের মনে যে জ¦ালাপোড়া চলছে, প্রতিপক্ষের এ সদ্ব্যবহার তা কতটুকু প্রশমিত হচ্ছে সে তাওহীদের আকীদা সঠিকভাবে উপলব্ধি করে তার ওপর অবিচল থাকবে। কারণ, যে হৃদয়ে তাওহীদের আকীদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানে আল্লাহর ভয়ের সাথে অপর ভয় স্থান লাভ করতে পারে না।
সুতরাং সৃষ্টিলোকের অনিষ্টকারিতা থেকে পানাহ লাভ করার জন্য সবচেযে সংগত ও প্রভাবশালী আশ্রয় চাওয়ার ব্যাপার যদি কিছু হতে পারে, তা হচ্ছে তাদের স্রষ্টার কাছে আশ্রয় চাওয়া। কারণ, তিনি সব অবস্থায় নিজের সৃষ্টির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছেন। তিনি তাদের এমন অনিষ্টকারিতা সম্পর্কে জানেন যেগুলো আমরা জানি, আবার আমরা জানি না এমনসব অনিষ্টকারিতা সম্পর্কেও তিনি জানেন। কাজেই তাঁর কাছে আশ্রয় হবে, যেন এমন সর্বশ্রেষ্ট শাসকের কাছে আশ্রয় যার মোকাবেলা করার ক্ষমতা কোন সৃষ্টির নেই। তাঁর কাছে আশ্রয় চেয়ে আমরা দুনিয়ার প্রত্যেকটি সৃষ্টির জানা অজানা নিষ্টকারিতা থেকে আত্মরক্ষা করতে পারি। তাছাড়া কেবল দুনিয়ারই নয়, আখিরাতের সকল অনিষ্টকারিতা থেকেও পানাহ চাওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অনিষ্টকারিতা শব্দটি ক্ষতি, কষ্ট, ব্যথা ও যন্ত্রণার জন্যও ব্যবহার করা হয়। আবার যে কারণে ক্ষতি, কষ্ট, ব্যথা ও যন্ত্রণা সৃষ্টি হয় সে জন্যও ব্যবহার করা হয় যেমন রোগ, অনাহার, কোন যুদ্ধ বা ঘটনায় আহত হওয়া, আগুনে পুড়ে যাওয়া, সাপ বিচ্ছু ইত্যাদি দ্বারা দংশিত হওয়া, সন্তানের মৃত্যু শোকে কাতর হওয়া এবং এ ধরনের আরো অন্যান্য অনিষ্টকারিতা। কারণ, এগুলো যথার্থ কষ্ট ও যন্ত্রণা। এই সমস্ত অনিষ্টকারিতা থেকে আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাওয়াই মু’মিনের বৈশিষ্ট্য ও তার তাওহীদের দাবী।
আল্লাহই প্রকৃত আশ্রƒয়দাতা। আল্লাহর আশ্রয়স্থল ছাড়া কোন আশ্রয়স্থল নাই। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আশ্রয় প্রার্থনা না করাটাই তাওহীদী বিশ^াসের অপরিহার্য অংগ। মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সত্তা যেমন জিন,দেব-দেবীর কাছে এ ধরণের আশ্রয় চাইতো এবং আজো চায়। বন্তুবাদীরা এ জন্য বস্তুগত উপায়-উপকরণের দিকে মুখ ফিরায়। কারণ, তারা কোন অতি প্রাকৃতিক শক্তিতে বিশ^াসী নয়। কিন্তু মু’মিন যেসব আপদ-বিপদ ও বালা মুসবিতের মোকাবেলা করার ব্যাপারে নিজেকে অক্ষম মনে করে, সেগুলোর ব্যাপারে সে একমাত্র আল্লাহর দিকে মুখ ফিরায় এবং একমাত্র তাঁরই সঙ্গে আশ্রয় প্রার্থনা করে।
উদাহরণ স্বরূপ মুশরিকদের ব্যাপারে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে: “ আর ব্যাপার হচ্ছে এই যে, মানব জাতির অন্তর্ভুক্ত কিছু লোক জিনজাতির অন্তর্ভুক্ত কিছু লোকের কাছে আশ্রয় চাইতো।”(সুরা জিন:৬)ফিরাউন সম্পর্কে কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে: “নিজের শক্তি সামর্থের ওপর নির্ভর করে সে সদর্পে নিজের ঘাড় ঘুরিয়ে থাকলো।”(সুরা যারিয়াত:৩৯) কিন্তু কুরআন আল্লাহ বিশ^াসীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মনীতি বর্ণনা প্রসংগে বলা হয়েছে: বস্তুগত, নৈতিক বা আধ্যাত্মিক যে কোন জিনিসের ভীতি অনুভব করলে তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করে। কাজেই হযরত মারয়াম সম্পর্কে বলা হয়েছে: যখন অকস্মাৎ নির্জনে আল্লাহর ফেরেশতা মানুষের বেশ ধরে তাঁর কাছে এলেন তখন তিনি বললেন:“ যদি তোমার আল্লাহর ভয় থাকে, তাহলে আমি দয়াময় আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।”(সুরা মারয়াম:১৮) হযরত নুহ আ: যখন আল্লাহর কাছে অবাস্তব দু’আ করলেন এবং জবাবে আল্লাহ তাঁকে শাসালেন তখন তিনি সংগে সংগেই আবেদন জানালেন: “হে আমার রব! যে জিনিস সম্পর্কে আমার জ্ঞান নেই তেমন কোন জিনিস তোমার কাছে চাওয়া থেকে আমি পানাহ চাই।”(সুরা হুদ:৪৭) মুসা আ: বনি ইসরাঈলদের গাভী যবেহ করার হুকুম দিলেন এবং তারা বললো, আপনি কি আমাদের সাথে ঠাট্রা করছেন। তখন তিনি তাদের জবাবে বললেন: “আমি মূর্খ-অজ্ঞদের মতো কথা বলা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।”(সুরা বাকারাহ:৬৭)
রাসুলুল্লাহ সা: অনেক কিছুর অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। যেমন: আনাস ইবনে মালিক রা: সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন,আমি নবী সা: এর খিদমাত করতাম। আমি তাঁকে অধিকাংশ সময় বলতে শুনেছি: “হে আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা, দু:খ-বেদনা, ঋণের বোঝা এবং মানুষের নির্যাতন হতে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।”(সুনানে আবু দাউদ: ১৫৪১, কিতাবুস সালাত, বাবু ফিল ইসতেআযাতি, বুখারী:২৮৯৩, অধ্যায়:জিহাদ, তিরমিযি:৩৪৮৪, অধ্যায়: দাওয়াত, নাসায়ী:৫৪৬৬, অধ্যায় আশ্রয় প্রার্থনা করা)
আয়েশা রা: এর সূত্রে নবী সা: হতে বর্ণিত। তিনি তাঁর দু’আয় বলতেন, “আল্লাহুম্মাইন্নী আউযুবিকা মিন্ শাররি মা আমিলতু ওয়া মিন্ শাররি মা লাম আ’মালু” অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই সেসব কর্মের খারাপী হতে, যা আমি করেছি এবং যা আমি করিনি তা থেকেও।”(মুসলিম:৬৭৯১,হাদিস একাডেমী: আন্ত:২৭১৬,কিতাবুয যিকরে,বাবু তাউযু মিন মা আমিলা …….., ইফা: ৬৬৫০, ই.সে.৬৭০৩)
হিংসুকের পরিণতি: হিংসা হচ্ছে শয়তানের স্বভাব। কারণ পৃথিবীতে সে-ই প্রথম আদম আ: এর সাথে হিংসা ও অহংকার করেছে। সে নিজেকে আদম আ: থেকে শ্রেষ্টতর গণ্য করেছে, ফলে সে হিংসায় নিপতিত হয়েছে এবং আল্লাহর হুকুম মানতে অবাধ্য হয়েছে। মূলত: অহংকার থেকেই হিংসার জন্ম। আর অহংকারীরা ধ্বংসশীল। যেমন শয়তান ধ্বংসশীলদের অন্তর্ভৃক্ত হয়েছে। এ জন্য হিংসা করা হারাম।যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ অথবা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন সে জন্য কি তারা তাদের হিংসা করে?”(সুরা নিসা: ৫৪) হিংসায় নেক আমল ধ্বংস হয়। ঈমান ও হিংসা কখনো কারো ভেতর পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে না। অর্থাৎ কারো হিংসা থাকবে কিন্ত ঈমান থাকবে না অথবা ঈমান থাকবে কিন্তু হিংসা থাকতে পারবে না। আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। নবী সা: বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেন, কোন মু’মিন বান্দার পেটে আল্লাহর রাস্তার ধূলো এবং জাহান্নামের অগ্নীশিখা একত্রে জমা হতে পারে না এবং কোন বান্দার পেটে ঈমান ও হিংসা একত্রে জমা হতে পারে না।”(সুনানে নাসায়ী: ২১৮৯, পর্ব: নিষিদ্ধ কার্যাবলী, পরিচ্ছেদ: কারো হিংসা করা হারাম, হাদীসের মান সহীহ, আহমাদ, ইবনে হিব্বান, বাইহাকীর শু’আবুল ঈমান নাসাঈ ৩১০৯, সহীহুল জামে-৭৬২০)
Posted ৩:৫৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ আগস্ট ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh