জাফর আহমাদ | বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৪
জুলুম, জালেম ও মাজলুম শব্দগুলোর আশরাফুল মাখলুখাত নামে খ্যাত মনুষ্য সমাজেরই পরিভাষা। পশু সমাজে জুলুম, জালিম ও মাজলুমের অস্তিত্ব খোঁজে পাওয়া যাবে না। শুধুমাত্র পেটের ক্ষুধা নিবারনের জন্য এক পশু অন্য পশুকে হামলা করে বটে। কিন্তু তাদের কেউ নিজের জেদ,ও ক্ষমতা দখলের জন্য কিংবা নিজেদের জিঘাংসা চরিতার্থ করার জন্য এক পশু অন্য পশুদের ওপর কখনো হামলে পড়ে না। তারা আল্লাহর বেঁধে দেয়া নিয়ম মেনে যার তার নির্ধারিত এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে। ব্যতিক্রম শুধু মানুষ। তাদের মধ্যেই জেদ, হিংসা. বিদ্বেষ, জিঘাংসা বিদ্যমান। এ জন্য আল কুরআনে বলা হয়েছে ‘এরা পশুর চেয়ে অধম’।যে গায়ের জোরে বা পেশী শক্তি বলে নিজের বৈধ সীমা রেখা অতিক্রম করে অন্যায়ভাবে অন্যের অধিকারের সীমায় প্রবেশ করে সে জালেম। আর যার সীমায় অন্যায় প্রবেশ করেছে সে মাজলুম।
জুলুম অন্যায়ভাবে নিপীড়ন, নির্যাতন, অত্যাচার, দুর্ব্যবহার, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও বলপুর্ব্ক অধিকার হরণকে জুলুম বলা হয়। তাছাড়া ব্যাপক দৃষ্টিতে নীতি বিবর্জিত কাজ করা, আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লংঘন করাও জুলুম। মানুষ ও আল্লাহর যথাযথ সম্মান ও অধিকার প্রদান না করা জুলুম। যেমন; আল্লাহ এক ও একক, তাঁর সাথে কোন অংশীদার নেই। তাই যারা আল্লাহর এই অধিকারকে হরণ করে তাঁর সাথে অন্যান্য সত্তাকে অংশীদার নিয়োগ করে; তা সুস্পষ্টভাবে জুলুম। যে ব্যক্তি ও শাসক গোষ্ঠী এই কাজগুলো করে তাদেরকে জালিম বলা হয়। মনে রাখতে হবে জুলুম ব্যক্তি ব্যক্তিতে, ব্যক্তি ও তার স্রষ্টায় অর্খাৎ স্রষ্টার হুকুমের প্রতি এমনকি জালিম তার নিজের প্রতিও হতে পারে।
জুলুমের পরিণতি শুধুই ধ্বংস আর ধ্বংস। একটি বিষয় স্বতস্দ্ধি যে, জুলুমের বিচার আল্লাহ দুনিয়াতেই করে থাকেন। আর আখিরাতে তো আছেই। মহান আল্লাহ সবকিছু বিচক্ষণতার সহিত সব প্রত্যক্ষ করেন তিনি সব জানেন ও শুনেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“জালেমদের কর্মকান্ড সম্পর্কে আল্লাহকে উদাসীন মনে করো না। আল্লাহ তাদের শুধু একটি নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফারিত হবে, তারা মাথা নিচু করে উঠি পড়ি করে দৌঁড়াতে থাকবে, তাদের নিজেদের দিকে ফিরবে না, এবং তাদের হৃদয়সমূহ দিশেহারা হয়ে যাবে। মানুষকে আযাব সমাগত হওয়ার দিন সম্পর্কে সাবধান করে দাও। সেদিন জুলুমবাজরা বলবেঃ হে আমাদের প্রভু ! অল্প কিছু দিন আমাদেরকে সময় দিন, তাহলে আমরা আপনার দাওয়াত কবুল করবো এবং রাসূলদের অনূসরণ করবো। তোমরা কি ইতপূর্বে কসম খেয়ে খেয়ে বলতে না যে তোমাদের পতন নেই! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তোমরা তোমাদের বাসস্থানেই বসবাস করছো এবং সেই সব জালিমদের সাথে আমি কি আচরণ করেছি, তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। উপরন্তু আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ দিয়েছি।” (সুরা ইবরাহিমঃ ৪১-৪৫) আল্লাহ তা’আলা বলেন,“শুধু তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে থাকে। জুলুমবাজরা তাদের অত্যাচারের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে।”(সুরাশুরাঃ ২২৭)
“কত জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি। তাদের ওপর আমার আযাব অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিল রাতের বেলায় অথবা দিনের বেলা যখন তারা বিশ্রামরত ছিল। আর যখন আমার আযাব তাদের ওপর আপতিত হয়েছিল তখন তাদের মুখে এ ছাড়া আর কোন কথাই ছিলনা যে, ‘সত্যিই আমরা জালেম ছিলাম’।”(সুরা আল আরাফ ৪-৫) আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ “পুর্ববর্তী ইবরাহিমের জাতি এবং আদ, সামুদ ও নুহের জাতি সমুহ এবং মাদায়েনবাসী ও মুতাফিকাতধারীদের ইতিহাস কি তারা জানেনা ? তাদের কাছে নবীরা সুস্পষ্ট নির্দেশমালা নিয়ে এসেছিলেন। আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল। পক্ষান্তরে ঈমানদার নারী-পুরুষেরা পরস্পরের মিত্র ও সহযোগী। তারা ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে।”(তাওবা ঃ ৭০-৭১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা’আলা জালিমকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেনঃ তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি জুলুমরত জনপদ সমুহকে পাকড়াও করেন। তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রনাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য।” (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,“কেউ যদি তার কোন ভাই-এর সম্মানহানি কিংবা কোন জিনিসের ক্ষতি করে থাকে, তবে আজই তার কাছ থেকে তা বৈধ করে নেয়া উচিত এবং সেই ভয়াবহ দিন আসার আগেই এটা করা উচিত, যে দিন টাকাকড়ি দিয়ে কোন প্রতিকার করা যাবে না, বরংতার কাছে কোন নেক আমল থাকলে তার জুলুমের পরিমাণ হিসাবে মজলুমকে সেই নেক আমল দিয়ে দেয়া হবে এবং অসৎ কাজনা থাকলেও উক্ত মজলুমের অসৎ কাজ তার ওপর বর্তাবে।” (বুখারী ও তিরমিযি) একটি হাদিসে কুদসীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,“আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,“হে আমার বান্দারা ! আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পরের ওপর জুলুম করোনা।”(মুসলিম, তিরমিযি)
যেই অসহায় মানবতার প্রতি জুলুম করা হলো, সেই মযলুম মানবতা আর জালেমের রক্ত-মাংস একই উপাদানে তৈরী। কারণ একজন মানুষ থেকে সমস্ত মানুষের উৎপত্তি এবং রক্তমাংস ও শারীরিক উপাদানের দিক থেকে তারা প্রত্যেকে প্রত্যেকের অংশ। প্রথমে এক ব্যক্তি থেকে মানবজাতির সৃষ্টি করা হয়। তাঁর থেকেই এ দুনিয়ার মানব বংশ বিস্তার লাভ করেছে। সুতরাং মানুষ মানুষের ওপর কখনো জুলুম করতে পারেনা। চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম। জনৈক আরব কবি বলেছেন,‘ক্ষমতা থাকলেই জুলুম করোনা, জুলুমের পরিণাম অনুশোচনা ছাড়া আর কিছু নয়। জুলুম করার পর তুমি তো সুখে নিদ্রা যাও, কিন্তু মযলুমের চোখে ঘুম আসে না। সে সারারাত তোমার জন্য বদ দোওয়া করে, এবং আল্লাহ তা শোনেন। কেননা তিনিও ঘুমান না।”
কথিত আছে, ‘ক্ষমতা হারানোর পর রাজা খালেদ বিন বারমাক ও তার ছেলে কারাবন্দী হলে তার ছেলে বললো: আব্বা, এত সম্মান ও মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকার পর এখন আমরা কারাগারে? খালেদ বললেন: হ্যাঁ, বাবা! প্রজাদের ওপর জুলুম চালিয়ে আমরা যে রজনীতে তৃপ্তির সাথে নিদ্রা গিয়ে ছিলাম, আল্লাহ তখন জাগ্রত ছিলেন এবং মজলুমদের দোয়া কবুল করে ছিলেন। জুলুম ভয়াবহতা সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে আরো অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন নিত্যদিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এ দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে জুলুম ও মাজলুম উভয় থেকে আশ্রয় দাও।
জুলুম সাধারণত দেশের শাসক গোষ্ঠী থেকে উদগত হয়। বিশেষত: যারা স্বৈরচারের ভুমিকায় অবর্থণ হয় তারাই রাষ্ট্রের সকল স্তরে বিভিন্ন ধরনের বিকৃতি, স্বেচ্ছাচারিতা, অশান্তি ও অস্থিরতা ছড়িয়ে দেয়। ফলে সমাজের সকল স্তরে বিদ্বেষ, পেশীশক্তি, সংকীর্ণ গোত্র বা বংশ মর্যাদা এবং কুৎসীত ঘরোয়া প্রতিদ্বন্ধীতা ও সংঘর্ষ দানা বেধেঁ উঠে। স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ চরমভাবে অসহায়, মানবিক অধিকার বঞ্চিত দাসানুদাসে পরিণত হতে থাকে। এক নায়কতন্ত্র শাসনের ফলে জনগণের ওপর মর্মস্পশী স্বৈরচারী শাসন পরিচালনা হতে থাকে এবং আলাহর বিধি-বিধানকে বিভিন্নভাবে অবহেলিত হতে থাকে। রাষ্ট্রের সহায়তায় মদ ও বারের আসন জমজমাট হতে থাকে। যেসব প্রতিষ্ঠানে আল্লাহর নাম উচ্চরিত হয়, সেগুলো গুরুত্বহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালানো হয়। রাষ্ট্রশক্তি একটি স্বৈরাতন্ত্রে পরিণত হয়ে চরম অহংকারী ও সীমালংঘনকারীতে নিমজ্জিত হয়।
যা চিন্তা করা হতো, তার যুক্তিকতা সকলকেই মেনে নিতে থাকে। যখন বলে দিয়েছে, তখন আর সে বিষয়ে জনগণের কিছু বলবার সুযোগ থাকে না। তার কথাই হবে আইন, জনগণ তা অকুণ্ঠিত মনে ও নির্বাক চিত্তে মেনে নিতে হবে। তার শাসনের যাঁতাকলে জনগণ নির্বোধ বনে যায়। কেউ তার স্বাধীন বিমুক্ত চিন্তা-বিবেচনা শক্তিও প্রয়োগ করতে পারে না। ফলে জনগণ শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে কেউ স্বৈরশাসকের গতিরোধ করতে গিয়ে নিজের জীবনটা অকাতরে খোয়াতে হয়। অত্যাচার ব্যাপক অর্থবোধক। জালিমেেদর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, সামাজিক শৃংখলা নষ্টকারী, মানুষের শান্তি হরণকারী, আল্লাহর নাফরমাণকারী, অবাধ্য-সীমালংঘনকারী, নিজের প্রতি ও মানুষের প্রতি অন্যায়-অবিচারকারী, উৎপীড়ক, নিপীড়ক, দুব্যবহারকারী এবং যে কোন সৃষ্টির প্রতি জুলুমকারী। তাছাড়া এরা সাধরাণত আত্ম অবিচারকারী, গাফেল বা খেয়াল-খুশির অনুসারী,মুশরিক, মনগড়া বিধান ও বিচার-ফয়সালাকারী, মিথ্যুক হয়ে থাকে।
Posted ১:৩৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh