জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪
দুর্নীতি একটি নেতিবাচক শব্দ। সহজ ভাষায় বুঝি কু-নীতি, কু-রীতি। আরবীতে যাকে ফাসাদ বা আল ইফরাদ বলা হয়। ব্যাপক পরিসরে বলতে অসদাচরণ, দুর্র্নীত, রীতিনীতি ভাল নয় এমন, দুর্নীতিপরায়ণ, দুঃশীল, অশিষ্ট, দুষ্টনীতি, খারাপ নীতি ইত্যাদি অনেক কিছু বলা হয়। এ দৃষ্টিতে সকল প্রকার দুরাচার, দুর্বৃত্ত, পাপিষ্ঠ, কদাচারী, দুর্বচন, দূুর্বাক, দুরুক্তি, দুর্মূখ, দুরভিসন্ধি, দৃরবৃত্তায়ন, দুর্র্বির্নীত, দুর্বুদ্ধি, দুর্ব্যবহার, দুশ্চরিত্র. দুষ্কর্ম ও দুষ্কর্মা এ সকলেই দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজ। এর ইতিবাচক শব্দ হলো, নীতি। নীতির আগে উপসর্গ লাগিয়ে একে সুনীতি বলার প্রয়াজন নেই। কারন নীতি বলতে সুনীতি বা ভাল নীতিকেই বুঝায়। যেমন বলা হয়ে থাকে লোকটি নীতিবান। তার মানে লোকটি ভালো। বরং উপসর্গ ছাড়া নীতির নেতিবাচক কোন কিছু দাঁড় করা যায় না। তার মানে নীতির বিপরীত কোন কিছুর অস্তিত্বই থাকবে না। দুর্নীতি একটি ফিতনাও বটে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে,“ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও যতক্ষণ ফিতনা দুরীভূত হয়।” সুতরাং দুর্নীতি বা কুনীতির ‘দু’ ও ‘কু’ লাগিয়ে এর অস্তিত্বদানেরই প্রয়োজন নেই। কারন পৃথিবীতে শুধুমাত্র নীতিই বেঁচে থাকবে।
আমাদের দেশসহ সারা দুনিয়া জুড়ে যারা দুর্নীতি দমনে আন্তরিকতার পরকাষ্ঠা প্রদর্শন করছেন. তাঁরা শুধুমাত্র নেতিবাচক দিকটি নিয়ে সামনে এগোয়। ইতিবাচক দিক তথা ন্যায়নীতি বা সুনীতির প্রশ্নকে কখনো বিবেচনায় আনে না। ন্যায়নীতি কি ?সুনীতি কি ? দুর্নীতি কি ?;ইত্যাদি মৌলিক প্রশ্ন বাদ দিয়ে শুধু দুর্নীতি নিয়ে হইচই বাঁধালে সমাধানের পরিবর্তে অসংখ্য জঠিল সমস্যার আবর্তে পড়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হবে। আপাদমস্তক দুর্নীতির কঠিন রোগে আক্রান্ত ও দুর্দশাগ্রস্থ সমাজের কোন অংশে ঔষধ প্রয়োগ করা হলে তাতে কোন কাজ হবে বলে মনে হয় না। বরং আরো জঠিল রোগে পুনরায় আক্রান্ত হতে থাকবে। সুতরাং পা কে ধুলি-বালি বা কাদা মুক্ত রাখার জন্য পৃথিবীর মাটিকে না ঢেকে, নিজের পা ঢাকার ব্যবস্থা করার মত উত্তম ও অধিকতর সহজ কাজের দিকে মনযোগ দেয়াই ভালো। দুর্নীতি সমস্যার সফল সমাধানের জন্য আপাততঃ দুর্নীতির আগে ন্যায়নীতির প্রতি গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা প্রয়োজন। দুর্নীতিতে আকন্ঠ সমাজ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর নিমিত্তে সর্ব প্রথম ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার চিন্তা ও সর্বচেষ্টা নিয়োগ করতে হবে। এটিই ভালো পন্থা এবং এ পন্থায় দুর্নীতি দমন সম্ভব। রাসুলুল্লাহ সাঃ এর পবিত্রতম জীবন চরিত থেকে আমরা সে শিক্ষাই পাই।
মহানবী সাঃ তৎকালীন অধঃপতিত সমাজকে দুর্নীতির গভীর খাদ থেকে উদ্ধারের নিমিত্তে এর ইতিবাচক দিক তথা ন্যায়নীতি বিকাশের উপর অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এ জন্য সর্বপ্রথম তিনি মানুষের মন-মননে ‘আল্লাহ ও আখিরাতের ভয়’ জাগ্রত করার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। এ জন্য তিনি নেতিবাচক তথা উদ্যতভাব, খরগহস্ত ও কর্কষভাষী হননি। বরং তাঁর মনের সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে, একান্ত অকৃত্রিম হিতাকাংঙী সেজে ও অত্যন্ত কোমলভাবে মানুষকে বুঝিয়েছেন। যার স্বীকৃতি স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা এভাবে করেছেনঃ “আপনি যে, কোমল হৃদয় হতে পেরেছেন, সে আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহেরই ফল। কিন্তু আপনি যদি কঠিণ হৃদয় ও কর্কশভাষী হতেন তাহলে তারা সকলে আপনাকে ছেড়ে চলে যেত।”(সুরা ইমরানঃ১৬) আল্লাহর পক্ষ থেকেও এ কৌশলই অবলম্বন করা হয়েছিল। তাঁর প্রিয় রাসুল সাঃ এর ওপর অবতীর্ণ প্রথম প্রথম আসমানী ফরমানগুলোর অধিকাংশই ছিল ‘আল্লাহ ও আখিরাতের ভয়’ সম্বলিত। রাসুলসাঃ এর মক্কী জীবনের আয়াতগুলো তার বাস্তব প্রমাণ। এ সমস্ত ফরমানের আলোকে তিনি বিশ্ববাসীকে নৈতিকতা ও মানবতার চতুঃসীমার মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ“হে নবী, ভালো ও মন্দ কখনো সমান হতে পারে না। মন্দকে ভালো পন্থায় প্রতিরোধ করো। তখন দেখবে, তোমার সাথে যার শুত্রুতা, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। (সুরা হা-মীম আস সেজদা-১৮)
তিনি মানুষদেরকে তাওহীদ, রেসালাত, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং ইসলামী সমাজ কায়েমের আহবান জানাতেন। আল কুরআনে অঙ্কিত আখিরাতের ভয়াবহ দৃশ্য উপস্থাপণ করতেন। পাশাপাশি চুরি, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা. মিথ্যা বলা, রাহাজানি করা, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরানো প্রভৃতি কাজ থেকে বিরত রাখা ও তাদের মনে ঘৃণা জন্মানোর চেষ্টা করেন। তার লক্ষ্য ছিল আত্মার পবিত্রতা সাধন, মন মানসে মলিনতা, শোষণ এবং জৈবিক ও পাশবিক পংকিলতাসমুহ প্রক্ষালন করে মানুষের শ্রেষ্টত্বের মর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ অর্জনে প্রথমেই তিনি তরবারীর কাছে নয় বরং হেদায়াতের আলোর প্রয়োজনীয়তাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হাত, পা ও মাথাকে নত করার আগে মানুষের মনের ব্যকুলতার প্রয়োজনীয়তার অনুভব করেছেন। শারীরিক বশ্যতার আগে আত্মার আনুগত্যশীলতাকে উজ্জীবিত করেছেন। কারণ আল্লাহর ভয় যার মনকে বিচলিত করে না, মানুষের ভয় তাকে কিভাবে বিচলিত করবে?
মাধ্যমিক স্তরে একটি আরবী গল্প পড়েছিলাম, যার সারসংক্ষেপ ছিল এ রকম যে, “এক লোক প্রতি রাতে আলু চুরি করতো।মাঝে মধ্যে গৃহস্তের হাতে ধরা পড়ে উত্তম-মধ্যমসহ বিভিন্ন শাস্তির সম্মুখীনও হতো। তাই নতুন কৌশল হিসাবে চুরির পাহাড়া দেয়ার জন্য তার ছোট্ট ছেলেটিকে সাথে নিয়ে যেতো। প্রতি রাতে ছেলেটিকে দায়িত্ব দিয়ে বলা হতো ‘তুমি নযর রাখবে কেউ আমাদের দেখছে কি না।’ প্রথম প্রথম ছেলেটি তার এ দায়িত্বের হেতু বুঝতে পারে না। কিন্তু ঠিকই একদিন তার দায়িত্বের হেতু বুঝতে পেরে, চুুরির প্রাক্কালে পিতাকে ডেকে বলল হে আমার পিতা! আমাদেরকে একজন দেখছেন। ভীত সন্ত্রস্তবাবা হন্ত-দন্ত হয়ে ছেলেকে নিয়ে দৌঁড় দেয়ার উদ্যত হলো, ছেলেটি বলল, পিতা হে! দৌঁড় দেয়ার প্রয়োজন নেই। পিতা বলল, কেন ? কে, কোথায় আমাদেরকে দেখছে? ছেলেটি শাহাদাত অঙ্গুলি আকাশের দিকে নির্দেশ করে বলল, তিনি আমাদের দেখছেন। ছেলেটি আরো বলল, আব্বা! পৃথিবীর কোন জনমানব আমাদের না দেখলেও তিনি আমাদের সার্বক্ষণিক প্রত্যক্ষ করছেন। পিতার অন্তরের চক্ষু খুলে গেল, সে লজ্জিত হলো এবং চুরি ছেড়ে দিল।” এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় গৃহস্তের উত্তম-মধ্যম বা শারীরিক শাস্তি তাকে চুরি হতে বিরত রাখতে পারিনি। বরং একে ঠেকানোর জন্য আরেকটি সর্বনাশা কৌশল বেঁচে নিল যে, নিজের ছেলেটিকে চুরির কাজের সাথী বানালো। এর মাধ্যমে ছেলেটিও এ কাজে অভ্যস্ত হতে পারতো। আল্লাহর ভয় উভয়কে এ কুকাজ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
আপাততঃ সারা পৃথিবী দুর্নীতিকে বৈষয়িকতার সাথে জড়িয়ে ফেলেছে। কিন্তু নীতি বহির্ভুত সকল প্রকার কাজ-কর্ম, আচার-ব্যবহার ও কথা-বার্তা সবই এর আওতাভুক্ত। যেহেতু আয়-উপার্জন জীবনের বিশাল অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে তাই এ ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে বিশাল করে দেখা হয়। ইসলাম আয়-উপার্জনকে কখনো নিরুৎসাহিত করেনি। বরং রাসুল সাঃ এর অসংখ্য বাণীতে রুজি-রোজগারের ব্যাপারে উৎসাহ দানের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি আয়-উপার্জনের ব্যাপারে উৎসাহ দানের পাশাপাশি হালাল-হারামের সীমারেখাও জানিয়ে দিয়েছেন। অর্থ-সম্পদের প্রতি মোহ শ্বাসত। কিন্তু অতিরিক্ত মোহ মানুষকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়। তাই রাসুল সাঃ বলেছেন,ধনী হওয়া সম্পদের প্রাচুর্য়ের নাম নয় বরং প্রকৃত সম্পদশালী সেই, যার অন্তর সম্পদশালী। অবৈধভাবে আহরিত সম্পদ অপবিত্র।আবু হুরাইরা রা থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন, “আল্লাহ পবিত্র। পবিত্র জিনিস ব্যতীত তিনি অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।”
আর আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রেরিত রাসুলদের যে হুকুম দিয়েছেন মু’মিনদেরকেও সে হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র ও হালাল জিনিস আহার কর এবং ভাল কাজ কর। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে জ্ঞাত।-সুরা মু’মিনুন: ৫১, তিনি আরো বলেছেন,“তোমরা যারা ঈমান এনেছো শোন! আমি তোমাদের যে সব পবিত্র জিনিস রিযক হিসাবে দিয়েছি তা খাও-সুরা বাকার:১৭২। অতপর তিনি এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দূর-দুরান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সফর করে। ফলে সে ধুলি ধূসরিত রুক্ষ কেশধারী হয়ে পড়ে। অতপর সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, “হে আমার রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দু’আ তিনি কি করে কবুল করতে পারেন?”(সহীহ মুসলিম:২২৩৬, আন্ত. নাম্বার ১০১৫, কিতাবুয যাকাত, বাবু কবুলে সদাকাহ…ইফা:২২১৫, ই.সে.২২১৬)
সত্যিকারর্থে বৈধভাবে যতটুকু সম্পদ অর্জন করা হয়, ততটুকুতেই আল্লাহর অবারিত বরকত নিহিত থাকে।হারাম বা অবৈধভাবে আহরিত সম্পদে আল্লাহ বরকত দান করেন না। যার ফলে দুর্নীতিবাজ অঢেল সম্পত্তিতেও তৃপ্তি লাভ করতে পারে না। বরং তার লোভের জিহব্বাটি লম্বা হতেই থাকে। ফলে এক সময় সে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে চলে আসে। পৃথিবী জুড়ে তার অসংখ্য নজির আমরা দেখতে পাই। তার সামনে এ কথা সুস্পষ্ট হয় না যে এই অবৈধ সম্পদ রেখে তাকে খালি হাতে চলে যেতে হবে। এই সম্পদ আখিরাতে তার কোন কাজে তো আসবেই না বরং তাঁর আহরিত সামান্য নেক কাজগুলো দুনিয়ার নির্যাতিত নিষ্পেষিত মানবতাকে সেদিন দিয়ে দিতে হবে। একজন মানুষ সম্মানের সহিত বেঁচে থাকার জন্য কতটুকু সম্পদ প্রয়োজন? সেই সম্পদ বৈধভাবেই অর্জন করা যায়। দুর্নীতি করার প্রয়োজন হয় না।
দুর্নীতিকে সমুলে উচ্ছেদ করে মানুষকে দানশীল, উদার হৃদয়, সহানুভূতিশীল, মানব-দরদী ও পারস্পরিক কল্যাণকামী হিসাবে গড়ে তোলার জন্য রাসুল সাঃ এর শিক্ষাকেই গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য রাসুলের দেখানো ইতিবাচক পথ ধরেই আমাদের এগুতে হবে। এ জন্য তিনি আল্লাহর দেয়া প্রতিটি আনুষ্ঠানিক ইবাদাতের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কারণ ইসলামের প্রতিটি আনুষ্ঠানিক ইবাদাত দুর্নীতি দমনে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালায়। যে সমাজে এ গুলো প্রতিষ্ঠিত হবে সেখানে দুর্নীতির অস্তিত্ব থাকতেই পারে না।
তবে এ কর্মসুচিগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় দন্ড যাদের হাতে তাদের তথা সরকারের। আল্লাহ তা’আলা বলেন:-“যাদেরকে যদি আমি পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দান করি তাহলে তারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে, ভাল কাজের আদেশ করে এবং মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে।”(সুরা হজ্জ ঃ ৪১) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন:-“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিৎ যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে,সৎ কাজের আদেশ করবে আর অসৎ কাজের নিষেধ করবে। আর এরাই সফলকাম।”( সুরা আল ইমরান ঃ ১০৪) উল্লেখিত আয়াতে ‘নির্দেশ করার’ কথা বলা হয়েছে। নির্দেশ দেয়ার যোগ্যতা রাখে তারাই, যারা ক্ষমতার দন্ড হাতে নিয়ে বসে আছে। সুতরাং যারা রাসুলুল্লাহ সা: এর প্রদর্শিত পথে নিজেদের পরিচালিত করে, যারা আল্লাহ ভয়ে ভীত কাতর থাকে, যারা বিশ^স্ত আমানতদার, তাদের হাতে রাষ্ট্রীয় দন্ড প্রদান করা হলে, দেশ থেকে দুর্নীতি সমূলে উচ্ছেদ হতে বাধ্য।
Posted ১২:২৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh