জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৪
খুলসিয়াত ইসলামের একটি বিশেষ পরিভাষা। ইবাদাত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত। খুলসিয়াত ও ইখলাস আরবী শব্দ যার শাব্দিক অর্থ হলো, একনিষ্ঠতা ও একাগ্রতা। শরী’আতের পরিভাষায় নিজের যোগ্যতা, চেষ্টা ও সাধনা সকল কিছু আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করার নাম খুলুছিয়াত। আরো স্পষ্ট ভাষায় বলতে নিজের দাসত্বকে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত করার নাম খুলুছিয়াত। তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক না করা। যেমন: আল্লাহ তা’আলা বলেন,“বলো, আমার সালাত, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য, যার কোন শরীক নেই।”(সুরা আন’আম:১৬২-১৬৩) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,“ দীনকে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করো, তাঁকে ডাকো, তোমাদের এ কাজ কাফেরদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন।”(সুরা মু’মিন:১৪) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “সাবধান! একনিষ্ঠ ইবাদাত কেবল আল্লাহরই প্রাপ্য।
যারা তাঁকে ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক বানিয়ে রেখেছে(আর নিজেদের এ কাজের কারণ হিসেবে বলে যে,) আমরা তো কেবল তাদের ইবাদাত করি শুধু এই কারণে যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে। আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই তাদের মধ্যকার সেসব বিষয়ের ফায়সালা করে দেবেন যা নিয়ে তারা মতভেদ করছিল।
আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন না, যে মিথ্যাবাদী ও সত্য অস্বীকারকারী।”(সুরা যুমার:৩)
দাসত্ব ও বন্দেগী পাওয়ার উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। নির্ভেজাল ও অবিমিশ্র আনুগত্য,দাসত্ব কেবলই আল্লাহর অধিকার। মানুষের সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থায় এমন কোন দিক বা বিভাগ নেই যে, এর কিয়দাংশ কিছু ব্যক্তি বা সত্তার জন্য নিবেদিত করবে আর কিছু অংশ আল্লাহর জন্য নিদিষ্ট করবে। জীবনের কোন অংশে অন্য কেউ কিছু পাওয়ার আদতেই কোন অধিকার নেই।
আল্লাহর সাথে তার হুকুম-আহকাম ও আইন-কানুনের আনুগত্য করার কোন প্রশ্নই উঠে না। কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো একনিষ্ঠ ও অবিমিশ্র দাসত্ব করে তাহলে সে ভ্রান্ত কাজ করে। অনুরূপভাবে সে যদি আল্লাহর দাসত্বের সাথে সাথে অন্য কারো দাসত্বের সংমিশ্রণ ঘটায় তাহলে সেটাও সরাসরি ন্যায় ও সত্যের পরিপন্থী এবং সরাসরি শিরকে লিপ্ত হলো। উদাহরণস্বরূপ: কেউ সুনাম কুড়ানোর জন্য দান-সদকা করে বা পার্থিব কোন সুযোগ-সুবিধা লাভের নিয়তে দান করলো, এ ধরনের দানকে আল্লাহর রাসুলুল্লাহ সা: শিরকে আসগর বলে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ দানের কথা প্রচার করো না এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির মতো ব্যর্থ করো না, যে নিজের ধন-সম্পদ কেবল লোক দেখানোর জন্যই ব্যয় করে।”(সুরা বাকার: ২৬৪)আবু মুসা রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক নবী সা: এর কাছে এসে বলল, কেউ যুদ্ধ করে মর্যাদার জন্য, কেউ বীরত্বের জন্য, কেউ লোক দেখানোর জন্য। এদের কার যুদ্ধটা আল্লাহর পথে হচ্ছে? নবী সা: বললেন: যে লোক আল্লাহর বাণীকে উর্দ্ধে তুলে ধরার জন্য যুদ্ধ করে সেটাই আল্লাহর পথে।(বুখারী:৭৪৫৮, কিতাবুত তাওহীদ,বাবু কাউলি আ’আলা অলা কাদ,,,,,,, ইফা:৬৯৫০, আধু প্রকা:৬৯৪০)
আল্লাহ তা’আলা বলেন, ”তবে তোমরা কি কিতাবের একটি অংশ বিশ্বাস কর এবং অন্য অংশ অবিশ্বাস কর? জেনে রাখ, তোমাদের মধ্যে যাদেরই এ রূপ আচরণ হবে, তাদের এতদ্ব্যতীত আর কি শাস্তি হতে পারে যে, তারা পার্থিব জীবনে অপমানিত এবং লাঞ্ছিত হতে থাকবে এবং পরকালে তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা যা কিছু করছ,তা আল্লাহ মোটেই অজ্ঞাত নন।”(সুরা আল-বাকারা-৮৫) বর্তমান বিশ্বের মুসলমানদের অবস্থা এ আয়াতের বর্র্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায়।
প্রকৃতপক্ষেই আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আল কুরআনের সহজ ও সরল হুকুম গুলো ঘটা করে পালন করে যাচ্ছি, কিন্তু জীবনের অধিকাংশ সমস্যার সমাধানের জন্য দ্বারস্থ হচ্ছি মানব রচিত মতবাদের কাছে। যার ফলে পার্থিব জীবনে আমরা বিশ্বময় অপমানিত ও লাঞ্জিত হচ্ছি। কুরআনের সাথে কি ধরনের আচরণ করা হচ্ছে সে সম্পর্কে অবশ্যই আল্লাহ তা’আলা জিজ্ঞাস করবেন,”যারা কুরআনকে টুকরো টুকরো করেছে। সুতরাং তোমার মালিকের শফথ, ওদের সবার কাছে আমি অবশ্যই প্রশ্ন করবো। সে সব বিষয়ে, যা কিছু আচরণ তারা (কুরআনের সাথে) করতো। (সুরা হিজর-৯১-৯৩) এখানে মূলতঃ ইয়াহুদীদের কথা বলা হয়েছে।
তারা দ্বীনকে ভাগ ভাগ করে ফেলেছিল। তারা কোন কোন কথা মেনেছিল এবং কোন কোন কথা মানে নাই। ইহার কারনে ইয়াহুদীরা চরম দূর্দশার সম্মুখীন হয়েছিল। আমাদের অবস্থাও আজ সেখানেই গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় আমরা কুরআনের হুকুম অনুযায়ী নামায,রোযা, হজ্জ পালণ করছি কিন্তু আল কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছি না । এর মাধ্যমে আমরা ও ইয়াহুদীদের মত কুরআনকে টুকরো টুকরো করছি। এটি সম্পুর্ণভাবে খুলুছিয়াত বিরোধী কাজ। যার ফলে আমাদের জন্য পৃথিবীটা আজ ছোট হয়ে আসছে। এ করুন পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে দ্রুত আমাদেরকে সম্পুর্ণভাবে আল্লাহর কুরআনের কাছে ফিরে আসতে হবে এবং আল কুরআনের সমাজ কায়েমের সংগ্রামকে অবশ্যই জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বানাতে হবে এবং দীনকে একনিষ্টভাবে আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করতে হবে।
এটা একটা বাস্তবসম্মত ও সত্য ব্যাপার। মানুষের উচিত দীনকে কেবল আল্লাহর জন্য নিবেদিত করে তাঁর বন্দেগী ও দাসত্ব করা।
নির্ভেজাল ও অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহর অধিকার। কারণ ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। এখানে এমন কোন ব্যবস্থা নেই যে, কিছু অংশ দুনিয়ার অন্য কোন সত্তার নির্দেশে চলবে এবং কিছু অংশ আল্লাহর কুরআনের নির্দেশে চলবে। যেমনটি মক্কার কাফেররা বলতো, দুনিযার মুশরিকরাও এ কথাই বলে থাকে যে, আমরা স্রষ্টা মনে করে অন্যসব সত্তার ইবাদাত করি না। আমরা তো আল্লাহকেই প্রকৃত স্রষ্টা বলে মানি এবং সত্যিকার উপাস্য তাকেই মনে করি। যেহেতু তাঁর দরবার অনেক উঁচু। আমরা সেখানে কি করে পৌঁছতে পারি। তাই এসব বুযুর্গ সত্তাদেরকে আমরা মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করি যাতে তারা আমাদের প্রার্থনা ও আবেদন-নিবেদন আল্লাহর কাছে পৌছিয়ে দেন।
এটি সুস্পষ্ট শিরক। এই শিরকে ধরণ হলো কোন সত্তাকে আল্লাহর কাছে পৌঁছার মাধ্যম মনে করে। মুসলিমদের মাঝেও এ ধরনের শিরক কিছুটা পরিলক্ষিত। মুশরিকদের কাছে বিভিন্ন দেব-দেবতা, কারো কাছে চাঁদ, চন্দ্র, সূর্য, মঙ্গল ও বৃহস্পতি, কারো কাছে মৃত মহাপুরুষ, মুসলমানদের কাছে মৃত বা জীবিত কোন বুযুর্য মহাপুরুষ, অলী-আউলিয়া হলো আল্লাহর কাছে পৌঁছার মাধ্যম। এগুলো এমন আকীদা ও বিশ্বাস যা কেবল কুসংস্কার ও অন্ধভক্তি এবং পূরনো দিনের লোকদেরকে অযৌক্তিক এবং অন্ধ অনুসরণের কারণে মানুষের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“(সুতরাং হে প্রত্যাবর্তনকারীরা) দীনকে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে তাঁকে ডাকো, তোমাদের এ কাজ কাফেরদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন।”(সুরা মু’মিন:১৪) আল্লাহ তা’আলা বলেন,(হে মুহাম্মদ!) আমি তোমার কাছে হকসহ এ কিতাব নাযিল করেছি। তাই তুমি একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর ইবাদাত করো।”(সুরা যুমার:২) এ আয়াতটি অনুধাবনের জন্য দুটির বিষয় অনুধাবন করতে হবে। এক,এখানে আল্লাহর ইবাদাত করতে বলা হচ্ছে। দুই, ইবাদাত হবে এমন যা আনুগত্যকে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে করা হয়। আল্লাহর ইবাদাত করা অর্থ এই নয় যে, শুধু তাঁর বন্দেগীই করবে, বরং বিনাবাক্যে তাঁর আদেশ নিষেধ পালন করবে। তাঁর শরয়ী আইন-কানুন সন্তুষ্ট চিত্তে সাগ্রহে মেনে চলা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মনে’প্রাণে অনুসরণ করার দাবীও বুঝায়। দীন আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করার অর্থ হলো, আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থাই একমাত্র জীবন ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করা।
তার সাথে অন্য কোন জীবন ব্যবস্থার কোন একটি আদেশকে পালনীয় মনে না করা। দীনের বেশ অর্থ হয়। যেমন:
এক, আধিপত্য ও ক্ষমতা, মালিকানা ও প্রভুত্বমূলক মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও সার্বভৌম ক্ষমতা এবং অন্যদের ওপর সিদ্ধান্ত কার্যকারী করা । দুই, আনুগত্য, আদেশ পালন ও দাসত্ব। তৃতীয়: অভ্যাস ও পন্থা-পদ্ধতি মানুষ যা অনুসরণ করে। এই তিনটি অর্থের দিকে খেয়াল করলে দীন শব্দটি এমন কর্মপদ্ধতি ও আচার-আচরণকে বুঝায় যা মানুষ কারো শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার এবং কারো আনুগত্য গ্রহণ করার মাধ্যমে অবলম্বন করে।
আর দীনকে শুধু আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কওে তাঁর দাসত্ব করার অর্থ হলো আল্লাহর দাসত্বের সাথে মানুষ আর কাউকে শামিল করবে না বরং শুধু তাঁরই বন্দেগী করবে তাঁরই অনুৃসরণ এবং তাঁরই হুকুম আহকাম ও আদেশ পালন করবে। দীনকে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করার হুকুম সারা কুরআনে বিস্তৃত। সুরানুর:৩৯,সুরা নাহল ৯৭, সুরা কাহাফ:১১০, সুরা হাশর: ৭ সুরা যুমার:৬৫ এবং হাদীসে মুসলিম:২৩৯৩ ও ৪৫৯০ বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।
Posted ১:৪৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh