জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪
মাতৃভূমি, জন্মভূমি,স্বদেশের প্রতি মানুষের ভালবাসা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। দেশপ্রেম বা জন্মভূমির ভালবাসাশিরোনামে অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ বের হয়েছে। শিেেরানাম ভিন্নতা থাকলেও মূলকথা একটিই তাহলো, জন্মভুমির ভালবাসা। একান্তই বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে কেউ এ ভালবাসাকে অস্বীকার করতে পারে না। মাতৃভূমির প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ও মমতাবোধ ইসলামী মূল্যবোধ থেকেই নির্গত। ইসলাম প্রাকৃতিক জীবন ব্যবস্থা। প্রকৃতি আল্লাহর সৃষ্টি, মাতৃভূমিও আল্লাহর সৃষ্টি। মুহাম্মদ সা: মক্কাকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। মক্কার দীর্ঘ মেয়াদী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও অন্যান্য সামাজিক অনাচারগুলো তাকে খুববেশী পীড়া দিতো। তাই নিজের সমাজের লোকদের মারামারি, রাহাজানি ও সামাজিক অন্যান্য অনাচারগুলো নিরসনের জন্য তিনি রাতদিন চিন্তা করতেন। সমাজের তুলনামূলক ভালো লোকদের নিয়ে সেগুলোর প্রতিরোধ করার চেষ্টা সাধনা করতেন। এভাবে তাঁর অভিব্যক্তিতে দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশ পেতো।
তিনি তাঁর জন্মভুমি মক্কাকে কি পরিমাণ ভালোবাসতেন তা নিম্নের হাদীস থেকে প্রকাশ পেয়েছে। ইবনে আব্বাস রা: হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: মক্কা ভূমিকে উদ্দেশ্য করে বলেন: কতই না পবিত্র ও উত্তম শহর তুমি এবং আমার নিকট তুমি কতই না প্রিয়। আমার স্বজাতি যদি তোমার হতে আমাকে বিতাড়িত না করতো তবে আমি তোমাকে ব্যতীত অন্য কোথাও বসবাস করতাম না।”(তিরমিযি:৩৯২৬, কিতাবুল মানাকিব আন রাসুলিল্লাহ সা: বাব বা পরিচ্ছদ: মক্কা মুয়াজ্জামার মর্যাদা, মিশকাত:২৭২৪) নিজের মাতৃভুমি মক্কার মায়া ত্যাগ করে দুর মদিনায় চলে যেতে তাঁর মন বেদনায় ভরে উঠেছিল।
বিশেষ করে সাওর পর্বত থেকে যখন মদীনা অভিমূখে রওয়ানা করেন, মক্কা থেকে ১৮০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে জুহফা অতিক্রম করছিল যেখান থেকে কাফেলা উত্তর দিকে চলতে শুরু চলতে শুরু করবে। তখন তাঁর নাড়ির টান বেশী করে অনুভূত হয়েছিল। জীবনের ৫৩টি বৎসর মক্কার আলো-বাতাসে হেসে খেলে কাটিয়েছেন। এখানকার অনু-পরমাণুতে মিশে আছে তাঁর শৈশব-কৈশোর-যৌবনের নানা স্মৃতি। উটের পিঠে চড়ে বারবার পবিত্র কাবা ওমক্কার দিকে ফিরে তাকাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, “কতই না পবিত্র ও উত্তম শহর তুমি এবং আমার নিকট তুমি কতই না প্রিয়। আল্লাহর কসম, তোমার থেকে আমাকে উচ্ছেদ করা না হলে আমি কখনো চলে যেতাম না।”(সুনানে নাসাঈ:৩১০৮) তাঁর সেই হাহাকার মহান আল্লাহ শুনেছেন, তাই তিনি তাঁর প্রিয় হাবিবকে শান্তনার বাণী শুনিয়ে দেন এবং অত্যন্ত শান-শওকত ও দীন ইসলামের বিজয়সহ নিজের মাতৃভুমি তোমার করতলগত হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,হে নবী! নিশ্চিত জেনো, যিনি এ কুরআন তোমার পের ন্যস্ত করেছেন তিনি তোমাকে একটি উত্তম পরিণতিতে পৌঁছিয়ে দিবেন।”(সুরা কাসাস:৮৫) ইবনে আব্বাস রা: বলেন,‘হিজরতের আট বছর পর আল্লাহর উক্ত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছিল।(বুখারী:৪৪১১)
আয়াতটির ব্যাখায় কোন কোন মুফস্সির এ অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, এটি নবী সা: মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় পথে নাযিল হয়েছিল। তাঁদের মতে এতে আল্লাহ তাঁর নবীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি আবার তাঁকে মক্কায় ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু প্রসিদ্ধ তাফসীরকারকদের অনেকের মতে “মাআদ” কে মক্কা অর্থে গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই। পূর্বাপর সম্পর্কের আলোকে “মাআদ” মানে বড়ই মহিমান্বিত ও মর্যাদার স্থান। এর প্রতিশ্রুতি হচ্ছে বিরাট শান-শওকত এবং মাহাত্ম ও শ্রেষ্টত্ব দান করার প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক বিজয়, আল কুরআন প্রতিষ্ঠার বিজয়, সমগ্র আরব ভুখণ্ডে নিরংকুশ কর্তৃত্ব দান, দীন ইসলাম ছাড়া অন্যান্য সকল দীনের বিলুপ্তি এবং নিরংকুশভাবে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিই হচ্ছে ”মাআদ” এর প্রকৃত অর্থ। মদীনায় হিজরতের পরও বার বার নিজের মাতৃভূমির টানে ফিরে পেতে চেয়েছেন।
কাবাকে তাওয়াফ করতে চেয়েছেন। তারই অংশ হিসাবে মক্কার কাফিরদের সাথে ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধি স্থাপিত হয়েছিল। আল্লাহর রাসুল সা: এর জন্য হুদাইবিয়ার সন্ধি ছিল মূলত: বিজয়ী বেশে মক্কা ফিরেআসার একটি দুরদর্শী কৌশল। অসম ও বৈষম্যপূর্ণ সন্ধির ফলে একদিন দিন তিনি বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। ইতিহাসে যাকে মক্কা বিজয় বলে। সেই বিজয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এত বড় একটি বিজয়ে এক ফোঁটা সেখানে রক্ত ঝড়েনি। আর মাতৃভূমির মানুষগুলোকে তিনি এতটাই ভালবাসতেন যে, যারা সম্মিলিতভাবে তাঁকে মাতৃভূমি থেকে বহিস্কার করেছিল। এরাই শয়তানের প্ররোচনায় প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবককে রাতের আঁধারে সম্মিলিতভাবে রাসুল সা: কে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর ঘর ঘেরাও করেছিল। তাদের একজন একাধিকবার রাসুল সা: কে হত্যার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রাসুল সা: সেদিন বলেছিলেন যে, “আমার ভাই ইউসুফ আ: তাঁর জালিম ভাইদের সাথে যেই ধরনের ব্যবহার করেছিলেন, আমিও আজ তোমাদের সাথে সেই একই আচরণ করবো। অর্থাৎ তোমাদের সকলকেই মাফ করে দিলাম।”
হযরত ইবরাহিম আ: যখন তাঁর বিবি মা হাজেরা ও কলিজার টুকরা হযরত ইসমাইল আ: কে মক্কায় পুনর্বাসিত করেন এবং তিনি নিজে মক্কার স্থায়ী বাসিন্দা হন। তখন তিনি কাবাঘর পুননির্মাণ করেন,ওয়াদিল মুকাদ্দিস পবিত্র উপত্যকা মক্কানগরীর মহান রবের কাছে দু’আ করেন। সেই দু’আয় স্বদেশের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা ফুটে উঠেছে। “আর এও স্মরণ করো যে ইবরাহিম দু’আ করেছিল:“হে আমার রব! এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আর এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে মানবে তাদেরকে সব রকমের ফলের আহার্য দান করো।” জবাবে তার রব বললেন: “আর যে মানবে না, দুনিয়ার গুটিকয় দিনের জীবন সামগ্রী আমি তাকেও দেবো। কিন্তু সব শেষে তাকে জাহান্নামের আযাবের মধ্যেনিক্ষেপ করবো এবং সেটি নিকৃষ্টতম আবাস।”(সুরা বাকারা:১২৬)
যুগে যুগে যত নবী রাসুল পৃথিবীতে আগমন করেছেন তারা প্রত্যেকেই দেশ প্রেমিক ছিলেন। আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁরা দেশ, জাতি ও মানুষদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। হযরত মুসা আ: ফেরাউনের ভয়ে দেশ ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু দেশ ও জাতির টানে আবার তিনি মাতৃভ’মিতে ফিরে আসেন এবং দেশের মানুষদেরকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেন এবং তাঁদের চরিত্র সংশোধনের কাজ করেন। প্রায় সকল নবীকেই দেশ প্রেমের কারণেই একদল দুষ্কৃতিকারীরা তাঁদেরকে দেশান্তর করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দেশ ও দেশের লোকদের প্রতি ভালবাসা, মমত্ববোধ ও দায়বদ্ধতার কারণে সকল নির্যাতনকে তাঁরা সহ্য করেছেন। সুতরাং দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসা নবী রাসুলদের আদর্শ। নবী সা: যখন তায়েফবাসীর দ্বারা অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হন এবং ফেরেশতা এসে দু পাহাড়ের চাপায় পিষে দেয়ার অনুমতি চাইলেন, তখন রাসুল সা: নিষেধ করেন এবং মহান আল্লাহর তাদের রহমতের জন্য দু’আ করেন। এটি তাদের প্রতি ভালবাসার অনন্য নিদর্শন। এ জন্যই রাসুলুল্লাহ সা: কে বলা হয়েছে “রাহমাতালিল আলামীন।” তাছাড়া নিম্নের হাদীসগুলোতে জন্মভূমির প্রতি রাসুলুল্লাহ সা: এর দেশপ্রেমের অনুভূমি জেগে উঠেছে।
প্রথম যখন অহী নাযিল হয় এবং রাসুল সা: ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় বাড়ী ফিরেন। খাদীজা রা: তাঁকে নিয়ে ওরাকা বিন নাওফেলের কাছে যান। তখন তিনি বলেছিলেন, তোমার জাতির লোকেরা তোমাকে দেশ থেকে বহিস্কার করবে। তখন তিনি বেদাহত হয়ে বলেছিলেন,“তারা সত্যি কি আমাকে বহিস্কার করবে?” (বুখারী: ৩) আবদুল্লাহ ইবনে আদি ইবনে হামরা রা: বলেন, আমি দেখেছি নবী সা: তাঁর উটনীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় আল জাজওয়ারা নামক স্থানে বলেন,‘আল্লাহর কসম তুমি (মক্কা) আল্লাহর গোটা জমিনের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং দৃনিয়ার সকল ভৃখণ্ডের মধ্যে তুমি আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম, তোমার থেকে আমাকে তাড়িয়ে না দিলে আমি চলে যেতাম না।(ইবনে মাযাহ:৩১০৮, কিতাবুল মানাসিক, বাবু ফযিলাতুল মক্কাহ) বিদায় হজ্জের সময় ছোট্র ওসামা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি প্রশ্ন করলেন,“হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি মক্কায় আপনার বাড়িতে অবস্থান করবেন? তিনি বললেন, আকিল কি আমাদের জন্য কোন চার দেয়াল কিংবা কোনো ঘর-বাড়ি অবশিষ্ট রেখেছে? (মুসলিম:৩১৮৫. কিতাবুল হজ্জ , ইফা:৩১৬০, ই,সে.৩১৫৭)
স্বদেশ বা মাতুভুমি মূলত: আল্লাহই নির্বাচন করেন। তিনি আমাকে আপনাকে যে দেশে প্রেরণের জন্য নির্বাচন করেন, সেই ভুখণ্ডের অধিবাসী এক মায়ের গর্ভে আমাকে প্রেরণ করেন। তাঁর অপার রহমতে আমি সে ভুখণ্ডেই মায়ের গর্ভে লালিত-পালিত হয়ে জন্মেছি। তাঁর পবিত্র মুখ থেকে প্রথম ভাষার শব্দাবলী শিখেছি। তাঁরই কোলে লালিত পালিত হয়ে অস্ফুট স্বরে একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ডাক ‘মা’ ডাক শুনে মায়ের সকল দু:খ-বেদনা, কষ্ট ও জ্বালাতনের সকল গ্লানি মুছে গিয়েছিল। পৃথিবীর সকল মা প্রতিটি সন্তানের মুখে মা ডাক শুনে তাঁদের মন-প্রাণ প্রশান্তিতে ভরে উঠে। তাই যে ভুখণ্ডের ভাষায় সে মধুর ডাক শুনে, সেটির নাম মাতৃভূমি। যারা জনম দু:খিনী মাকে ভালবাসেন তারা মাতৃভূমিকেও ভালবাসেন। কারণ মায়ের কোল আর আমার এলাকার ভুখন্ড, মায়ের কোলের নরম বিছানা আর সবুজ ঘাসের পরশ এবং সেখানকার আলো-বাতাসে আমার শিশুকাল ও যৌবন কেটেছে। মায়ের বুকের দুধ আর প্রকৃতির আলো-বাতাসই আমাকে অসহায়ত্ব শিশুকাল থেকে যৌবনে পৌঁছে দিয়েছে।
Posted ১:১৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh