জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৫
জালিমের সাহায্যকারীও জালিম। আপনি কোনদিন কারো ওপর জুলুম নির্যাতন করেননি। আপনি জুলুম থেকে মুক্ত একজন ভদ্রলোক। অথচ হাশরের দিন আপনাকে জালিমদের সাথে উত্থিত করা হবে। কারণ দুনিয়াতে আপনি জুলুম-নির্যাতন করেননি বটে, কিন্তু জালিমকে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। এমনকি একটি শব্দ দ্বারাও যদি সহযোগীতা করা হয়, তবে সেটি জুলুম হিসেবে বিবেচিত হবে। আপনি বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন, মানুষকে জুলুমের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন, জুলুমকে উসকে দিয়েছেন, আপনি সত্যিকারের একজন জালিম। অথচ রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন তার উল্টোটা। আনাস ইবনে মালিক রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সা: বলেছেন, তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক অথবা মাজলুম।(অর্থাৎ জালিম ভাইকে জুলুম থেকে বিরত রাখবে এবং মাজলুম ভাইকে জালিমের হাত হতে রক্ষা করবে।) (বুখারী:২৪৪৩, ২৪৪৪, ৬৯৫২, কিবতাবুল মাজালিম, বাবু আয়িন আখাকা জালিমান আও মাজলুমান, আ:প্র:২২৬৪, ইফা:২২৮১)
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এ জালেমদের দিকে ঝুঁকবে না, অন্যথায় জাহান্নামের গ্রাসে পরিণত হবে এবং তোমরা এমন কোন পৃষ্ঠপোষক পাবে না যে আল্লাহর হাত থেকে তোমাদের রক্ষা করতে পারে আর রক্ষা করতে পারে আর কোথাও থেকে তোমাদের কাছে কোন সাহায্য পৌঁছবে না।”(সুরা হুদ:১১৩) আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: যে ব্যক্তি একজন মু’মিনকে হত্যার ব্যাপারে সামান্য একটু কথার দ্বারাও সহায়তা করবে, সে মহান আল্লাহর সাথে এমতাবস্থায় সাক্ষাত করবে যে, তার দু’ চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে:“আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত”।(ইবনে মাযাহ:২৬২০, কিতাবুল দিয়াত, বাবু তাগলিযি ফি ক্বাতলিল মুসলিমে জুলমান)
একদিন এক কারারক্ষী ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলকে আহবান জানান। তিনি এলেন, কারারক্ষী প্রশ্ন করেন, আমি আপনার কাছে রাসুলুল্লাহ সা: এর একটি হাদীস যা জালিম ও তার সহযোগীদের সম্পর্কে রয়েছে তা কি সহীহ? তিনি বললেন, জালিমদের সম্পর্কে তো অগণিত হাদীস রয়েছে। এই সম্পর্কে একটি সহীহ হাদীস হলো, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা: থেকে বর্ণিত,্ তিনি বলেন,একদা নবী সা: কা’ব বিন উজরাহকে বললেন, আল্লাহ নির্বোধের শাসনকাল থেকে রক্ষা করুন। কা’ব বললেন নির্বোধের শাননকাল কি? তিনি বললেন: এক শ্রেনীর শাসক যার আমার পরবর্তিতে আসবে, যারা আমার আদর্শে আদর্শবান হবে না, আমার পথও অনুসরন করবে না।
সুতরাং তার মিথ্যাবাদী জানা সত্বেও যারা তাদের সত্যায়ন করবে এবং তাদের জুলুম সত্বেও তাদের সঙ্গ দিবে। তারা আমার দলভুক্ত নয় এবং আমিও তাদের দলভুক্ত নই। তারা আমার হাউজের কাছেও ঘেষতে পারবে না।” কারারক্ষী বললো, হে ইমাম!‘আমি কি জালিমের সহযোগী’? না, তুমি জালিমের সহযোগী নও। জালিমের সহযোগী হলো তারা, যারা তার চুল আচরে দেয়, যারা তাদের কাপড় ধুয়ে দেয়,খাবার পরিবেশন করে। জালিমের সহযোগী হলো তারা, যারা তাদের জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগীতা করে। হে কারারক্ষী তুমি তো জালিমের সহযোগী নও, বরং তুমি নিজেই জালিমদের একজন।’ ঘটনাটির সুত্র অজানা থাকলেও হাদীসটি সহীহ এবং সংক্ষিপ্ত ও শাব্দিক অনুবাদ হুবহু নয়। কা’ব ইবনে উজরা রা: হতে বর্ণিত তিরমিযির হাদীস নং৬১৪, কিতাবুল জুম’আ, বাবু মা জুকিরা ফি ফাদলিস সলাতি।
হাদীসটির হুবহু বর্ণনা হচ্ছে নিম্নরূপ: কা’ব ইবনে উজরা রা: হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: আমাকে বললেন: হে কা’ব ইবনে উজরা! আমার পরে যেসব নেতার উদয় হবে আমি তাদের (খারাপী) থেকে তোমার জন্য আল্লাহ তা’আলার সহায়তা প্রার্থনা করি। যে ব্যক্তি তাদের দ্বারস্থ হলো(সান্নিধ্য লাভ করলো) তাদের মিথ্যাকে সত্য বললো এবং তাদের স্বৈরাচার ও জুলুম-নির্যাতনে সহায়তা করলো, আমার সাথে এ ব্যক্তির কোন সম্পর্ক নেই এবং এ ব্যক্তির সাথে আমারো কোন সংস্রব নেই। এ ব্যক্তি কাওসার নামক হাউজের ধারে আমার নিকট আসতে পারবে না।
অপরদিকে যে ব্যক্তি তাদের দ্বারস্থ হলো, কিন্তু তাদের মিথ্যাকে সত্য বলে মানল না এবং তাদের স্বৈরাচার ও জুলুম-নির্যাতনে সহায়তা করলো না, আমার সাথে এ ব্যক্তির সম্পর্ক রয়েছে এবং এ ব্যক্তির সাথে আমারও সম্পর্ক রয়েছে। শীঘ্রই সে কাওসার নামক হাউজের কাছে আমার সাথে দেখা করবে। হে কা’ব ইবনে উজরা! সালাত হলো(মুক্তির) সনদ, সাওম হলো, মজবুত ঢাল এবং সাদাকা গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। হে কা’ব ইবনে উজরা! হারাম দ্বারা সৃষ্ট ও পরিপুষ্ট মাংস-এর জন্য আগুনই উপযুক্ত।” সহীহ।
কুরআন ও হাদীসে জুলুম-নির্যাতনের শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। ইসলামে জুলুম-নির্যাতন, অবিচার, বৈষম্য ও অন্যায়ের কোন স্থান নেই। বরং এগুলো দূর করে একটি সুষম ও ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে মুসলিমগণ! আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় আমানত তার হকদারদের হাতে ফেরতের নির্দেশ দিচ্ছেন।
আর লোকদের মধ্যে ফায়সালা করার সময় “আদল” ও ন্যায়নীতি সহকারে ফায়সালা করো। আল্লাহ তোমাদের বড়ই উৎকৃষ্ট উপদেশ দান করেন। আর অবশ্যি আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও দেখেন।”(সুরা নিসা:৫৮) বনী ইসরাঈলগণ তাদের পতনের যুগে আমানতসমূহ অর্থাৎ দায়িত্বপূর্ণ পদ, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও জাতীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহ তাদের মধ্যে অযোগ্য, সংকীর্ণমনা, দুশ্চরিত্র, দুর্নীতিপরায়ণ,খেয়ানতকারী ও ব্যাভিচারীদের হাতে ন্যস্ত করায় সমগ্র জাতি অনাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে মুসলমানদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে, তোমরা বনী ইসরাঈলদের মতো অযোগ্য অসৎ ও জালিম লোকদের পরিবর্তে যোগ্য ও সৎ নেতৃত্বের হাতে নেতৃত্ব অর্পণ করো।
জুলুমের শাস্তি অত্যন্ত মারাত্মক। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এখন এ জালেম যা করছে আল্লাহকে তোমরা তা থেকে গাফেল মনে করো না। আল্লাহ তো তাদেরকে সময় দিচ্ছেন সেদিন পর্যন্ত যখন তাদের চক্ষু বিস্ফরিত হয়ে যাবে। তারা মাথা তুলে পালাতে থাকবে, দৃষ্টি ওপরের দিকে স্থির হয়ে থাকবেএবং মন উড়তে থাকবে। হে মুহাম্মদ! সেইদিন সম্পর্কে সতর্ক করো, যে দিন আযাব এসে এদেরকে ধরবে। সে সময় এ জালেমরা বলবে, “হে আমাদের রব! আমাদের একটুখানি অবকাশ দাও, আমরা তোমার ডাকে সাড়া দেবো এবং রাসুলদের অনুসরণ করবো।” (কিন্তু তাদেরকে পরিস্কার ভাষায় জবাব দেয়া হবে:) তোমরা কি তারা নও যারা ইতিপূর্বে কসম খেয়ে খেয়ে বলতে, আমাদের কখনো পতন হবে না।”(সুরা ইবরাহিম:৪২-৪৪)আল্লাহ তা’আলা বলেন,“শুধু তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে থাকে। জুলুমবাজরা তাদের অত্যাচারের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে।”(সুরা শুরাঃ ২২৭)
“কত জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি। তাদের ওপর আমার আযাব অকস্মাত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাতের বেলায় অথবা দিনের বেলা যখন তারা বিশ্রামরত ছিল। আর যখন আমার আযাব তাদের ওপর আপতিত হয়েছিল তখন তাদের মুখে এ ছাড়া আর কোন কথাই ছিল না যে, ‘সত্যিই আমরা জালেম ছিলাম’।”(সুরা আল আরাফ ৪-৫) আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ “পুর্ববর্তী ইবরাহিমের জাতি এবং আদ,সামুদ ও নুহের জাতি সমুহ এবং মাদায়েনবাসী ও মুতাফিকাতধারীদের ইতিহাস কি তারা জানে না? তাদের কাছে নবীরা সুস্পষ্ট নির্দেশমালা নিয়ে এসেছিলেন। আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল। পক্ষান্তরে ঈমানদার নারী-পুরুষেরা পরস্পরের মিত্র ও সহযোগী। তারা ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে।”(তাওবা ঃ ৭০-৭১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা’আলা জালিমকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেননা।
তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেনঃ তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি জুলুমরত জনপদ সমুহকে পাকড়াও করেন। তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রনাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য।”(বুখারী:কিতাবুল মাজালিম,মুসলিম,তিরমিযি) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,“কেউ যদি তার কোন ভাই-এর সম্মান হানি কিংবা কোন জিনিসের ক্ষতি করে থাকে, তবে আজই তার কাছ থেকে তা বৈধ করে নেয়া উচিত এবং সেই ভয়াবহ দিন আসার আগেই এটা করা উচিত, যেদিন টাকা কড়ি দিয়ে কোন প্রতিকার করা যাবে না, বরং তার কাছে কোন নেক আমল থাকলে তার জুলুমের পরিমাণ হিসাবে মজলুমকে সেই নেক আমল দিয়ে দেয়া হবে এবং অসৎ কাজ না থাকলেও উক্ত মজলুমের অসৎ কাজ তার ওপর বর্তাবে।”(বুখারী:কিতাবুল মাজালিম ও তিরমিযি)
Posted ১২:২৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh