বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

মিথ্যা সত্য ও সুন্দরকে কুলষিত করে

জাফর আহমাদ :   |   বৃহস্পতিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৫

মিথ্যা সত্য ও সুন্দরকে কুলষিত করে

মিথ্যা একটি সুষ্পষ্ট জুলুম। যেই ক্ষেত্রেই হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যা সত্য, সেটিই হক এবং সেটিই তার প্রকৃতি। মিথ্যা হককে খর্ব করে। মিথ্যার কারনে সত্য তার সুন্দর প্রকৃতি অনুযায়ী প্রস্ফুটিত হতে পারে না। সত্যের আলো থেকে সকলেই বঞ্চিত হয়। যেমন আল্লাহ এক ও একক। তিনি লা-শারীক, তার কোন শরীক নেই। “তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই”। এটি আল্লাহর ইজ্জত। এটি একটি সত্য ও স্বাভাবিক কথা এবং এটি প্রকৃতিরও দাবী। এটি আল্লাহর হক। এ হক থেকে বঞ্চিত করা জুলুম।

যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন শক্তিকে শরীক করে তারা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে। আর যে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে মুলতঃ এক মস্ত বড় জালেম। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “নিশ্চয় শিরক একটা বড় জুলুম।”(সুরা লোকমান) এমনিভাবে কুফুরীও একটি মিথ্যা। কুফরী মানে সত্যকে মিথ্যা দ্ধারা আড়াল করা।

যেমন: আরবীতে কৃষককে ভাবার্থে কাফের বলা হয়, কারণ কৃষক জমিতে বীজ বপনের পর মই-এর মাধ্যমে বীজকে মাটি দ্ধারা চাপা দেয় বা মাটিতে লোকায়। কাফের ব্যক্তিও আল্লাহকে অস্বীকারের মাধ্যমে একটি সত্যকে মিথ্যার মাধ্যমে আড়াল করে থাকে। তাই কুফুরীও একটি মিথ্যা। যারা কুফুরী ও শিরক করে তারা মিথ্যা ছাড়া কুফরী বা শিরক করতে পারে না।

মিথ্যা একটি শক্তিশালী আণবিক বা জীবাণু বোমার চেয়েও মারাত্বক। একটি আনবিক বোমা একটা নির্দিষ্ট সময় এবং একটা নির্দিষ্ট আওতাধীন সকলকিছুকে সমুলে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু মিথ্যা আরো অধিক কার্যকর ও আরো অধিক বিধ্বংসী। এটি এমন এক নীরব ঘাতক, যা দীর্ঘ সময় ধরে অধিকতর ব্যাপক স্থান জুড়ে সার্বিক ধ্বংসলীলা চালিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এটি আরো অসংখ্য নিত্য নতুন উপসর্গের জন্ম দেয়।

যার দরুন মিথ্যার একান্তই কোন ক্ষতি বা অপকারের কথা কেউ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারবে না। এমনকি মিথ্যুক নিজেও জানে না এর পরিধি কতটুকু। মিথ্যুক একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে মিথ্যার বেসাতি ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু মিথ্যাটি মিথ্যুকের কার্য বাস্তবায়ন ছাড়াও অসংখ্য নতুন নতুন অঘটন ঘটিয়েছে, যে গুলোর আশা মিথ্যুক নিজেও কখনো করেনি। স্রেফ একটি মিথ্যাকে কেন্দ্র করেই কত সুখের ঘর ভেঙ্গে গেছে, কত মানুষ জুলুমের শিকার হয়েছে, কত স্বাধীন সার্বভৌম দেশ মিথ্যার আগুনে ধ্বংস হয়েছে, কত অধিকার বিনষ্ট হয়েছে তার কি কোন ইয়ত্তা আছে? কতশত লোক নিহত হয়েছে। কত মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছে, কত শিশু এয়াতিম হয়েছে, তার হিসাব কে দেবে ? এখানেও মিথ্যা সঠিক পরিসংখ্যাণকে আড়াল করে রেখেছে।

মিথ্যা সত্য-সুন্দরকে কুলষিত ও বিকৃত করে। ন্যায়-ইনসাফকে উল্টে দেয়। নৈতিক মুল্যবোধ বিনষ্ট হয়। চারিত্রিক সৌন্দর্যকে করে কুলষিত। মানবতা ও মনুষত্ব বিপন্ন হয়। নিয়ম ও শৃংখলার ক্ষেত্রে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শিত হয়। গণতন্ত্রের সদর দরজাকে বন্ধ করে দিয়ে মানুষের অধিকারকে হরণ করা হয়। সর্বত্র চালু হয় জুলুমতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র। সর্বক্ষেত্রে ভাঙ্গন আর ভাঙ্গনের রাজত্ব চালু হয়। প্রত্যেকটির জিনিসের অন্তরনিহিত সৌন্দর্যকে বিগড়ে দেয়। সুকুমার বৃত্তিগুলো অংকুরেই ধ্বংস হয়ে যায়। দূরাচার-দৃর্বৃত্ত সমাজ ও সভ্যতাকে গ্রাস করে। দেশের সম্মানিত মানুষগুলো অসম্মানিত হয়। ভালো কাজের অবমূল্যায়ণ হয়।

মিথ্যা বলা কবীরা গুণাহ এবং সুষ্পষ্ট জুলুম। রাসুল সঃ বলেছেনঃ“ আমি কি তোমাদেরকে সর্ববৃহৎ করীরা গুনাহ সম্পর্কে বলবো না ? তাঁরা বলেন, হাঁ। তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শিরক করা ও মা-বাপের নাফরমানী করা। তারপর তিনি ঠেঁস দিয়ে বসে বলেন, ওহো! মিথ্যা কথা। তিনি বার বার তা বলতে লাগলেন আর আমরা ইচ্ছা করেছিলাম যদি তিনি চুপ হতেন।”(বুখারী-মুসলিম) অথচ এ মিথ্যাই আজ মানুষের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। সমাজের নিম্নস্তর থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব মিথ্যা রোগে আক্রান্ত।

মৌখিক মিথ্যায় মন ভরে না, তাছাড়া এটি কষ্টকর বিধায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে মিডিয়া স্থাপন করে মিথ্যাকে আরো ব্যাপাকাকারে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। যুগ যুগ ধরে যে মিঠিয়া ছিল নীতি ও নৈতিকতার সূতিকাগার, সেখানে এখন অধিকতর মিথ্যুক ও হলুদ সাংবাদিকতায় যারা পটু তাদেরকেই নিয়োগ দেয়া হয়। এ সব মিডিয়ার মাধ্যমে সকলেরই জানা একটি জ্যান্ত মিথ্যাকে বার বার প্রচারের মাধ্যমে সত্যে পরিণত করে।

রাজনৈতিক ময়দান! সে তো এক তিক্ত জগৎ। এটিও উচ্চ পর্যায়ের নীতি ও নৈতিকতার জগৎ ছিল। কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীর আদর্শহীন ও চরিত্রহীন তথা মিথ্যুকেরা আজ সদলবলে এ স্থান দখল করে নিয়েছে। আল্লাহর ভয় বিন্দুমাত্র যাদের ভেতর নেই তারাই সমাজেন নেতৃত্ব দেয়। আর এরাই রাজনীতির পবিত্র স্থানকে কুলষিত করেছে।

এদের কারণেই আজ রাজনীতির প্রতি মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ভদ্র, সুশীল, সভ্য, সত্যবাদী ও সুশিক্ষিত ব্যক্তিরা এ মাঠ ছেড়ে দিয়েছে। তাদের স্থান এখন অশিক্ষিত, শঠ ও মিথ্যুকেরা দখল করে নিয়েছে।

এ অবস্থার কারণ হিসাবে কুরআনের শিক্ষা থেকে দুরে থাকাকেই উল্লেখ করা বাঞ্চনীয়। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “যারা আল্লাহর আয়াত ও নিদর্শনের উপর ঈমান আনে না তারাই মিথ্যা-প্রতারণা করে এবং তারাই মিথ্যাবাদী।”(সুরা নাহল ঃ ১০৫) মনে রাখা প্রয়োজন, যারা মিথ্যা চর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, আল্লাহ তাদেরকে কখনো হেদায়াতের আলো দান করেন না। আজীবন মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকেই মৃত্যু বরণ করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “যে ব্যক্তি অপচয়কারী ও মিথ্যুক, আল্লাহ তাকে হেদায়াত দান করেন না।” (আল-মোমেনঃ ২৮) মৃত্যুর পর আবার কঠিণ আযাবের স্বাদ ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “কেয়ামতের দিন আপনি তাদের চেহেরা কালো দেখতে পাবেন, যারা আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করেছে।”(সুরা যুমারঃ৬০) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সঃ বলেছেনঃ “তোমরা সত্যেবাদিতা অবলম্বন করো। সত্যবাদিতা নেকীর দিকে পথপ্রদর্শন করে এবং নেকী বেহেস্তের দিকে পথ দেখায়।

ব্যক্তি সত্য বলতে বলতে এবং সত্যের ওপর ঠিকে থাকার চেষ্টা করতে করতে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লিখিত হয়। তোমরা মিথ্যা থেকে বাঁচ। মিথ্যা গুনাহের পথ দেখায় এবং গুনাহ দোযখে নিয়ে যায়। বান্দাহ মিথ্যা বলতে এবং মিথ্যার ওপর টিকে থাকার চেষ্টা করতে থাকলে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিখিত হয়।”(বুখারী-মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি) রাসুল সঃ দীর্ঘ এক হাদীসের একস্থানে বলেছেনঃ“এক রাতে স্বপ্নে আমি দুব্যক্তিকে দেখলাম’ তারা আমার কাছে এসেছে।(তারা ফেরেস্তা) তারা আমাকে বলল, আপনি যে লোকটির গাল চিরে দেয়া হচ্ছে দেখেছেন, সে মিথ্যাবাদী। তারপর সে আবার মিথ্যা বলবে এবং সর্বত্র তা ছড়িয়ে পড়বে। তারপর আবার তার চোয়াল চিরে দেয়া হবে। এভাবে কেয়ামাত পর্যন্ত চলতে থাকবে।”(বুখারী)

মিথ্যাবাদী একজন পরিপূর্ণ মোনাফিকও বটে। কারণ মিথ্যুক তার উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য কপটতারই আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। আবু হোরায়রা রাঃ হবে বর্ণিত। রাসুল সঃ বলেছেনঃ “মোনাফেকের লক্ষণ তিনটি। সে যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে, সে যখন ওয়াদা করে, তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে আমানত রাখলে, তা খেয়ানত করে।”(বুখারী) মুসলিম শরীফে আরও একটু বেশী বর্ণিত আছে যে, ‘যদিও সে নামায, রোযা করে এবং নিজেকে মুসলমান মনে করে।’ আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত।

রাসুল সঃ এর কাছে মিথ্যার চাইতে অন্য কোন দোষ বেশী ঘৃণিত ছিল না।”(মুসনাদে আহমাদ) আবু হোরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত। রাসুল সঃ বলেছেন ঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলবেন না। তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেন না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। সে তিন ব্যক্তি হলোঃ বৃদ্ধ যেনাকারী, মিথ্যুক রাজা ও অহংকারী ফকির-মিসকিন।” (মুসলিম) হযরত আলী রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ “আল্লাহর নিকট মিথ্যা জিহবা সবচাইতে বড় গুনাহ এবং সর্বাধিক নিকৃষ্ট অপমান হচ্ছে কেয়ামতের দিনের অপমান।” রাসুলুল্লাহ সঃ বলেছেন ঃ “ মিথ্যা স¤পূর্ণরূপে ত্যাগ না করা পর্যন্ত কেউ পূর্ণ মুমেন হতে পারবে না।

এমন কি হাসি-ঠাট্রা ছলেও মিথ্যা বলা উচিৎ নয়।”(মুসনাদে আহমাদ)আবু হোরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ সঃ কে বলতে শুনেছি ঃ “মিথ্যা শপথের দ্ধারা পণ্য সামগ্রী বিক্রি হয়ে যায় বটে কিন্তু এতে বরকত বা কল্যাণ ধ্বংস হয়ে যায়।”(বুখারী)
কোন শাসক যদি মিথ্যা রোগে আক্রান্ত হয়, তবে তার শাসিত রাজ্যটি মিথ্যার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। চারদিকে চলে মিথ্যার বেসাতি। ফাসাদ বা বিপর্যয়ে দেশটি রসাতলে নিমজ্জিত হয়। পৃথিবীর দেশে দেশে যেখানেই এ ধরণের মিথ্যাবাদী শাসককে আমরা দেখেছি সেখানে মানবতা, মানুষের মৌলিক অধিকার ভুলুণ্ঠিত হতে দেখেছি। জুলুমতন্ত্র সমাজ ও সভ্যতাকে বিষিয়ে তুলে। মানুষ তখন আলাহর কাছে এ জালিম ও মিথ্যুক শাসক থেকে পরিত্রাণের ফরিয়াদ জানায়।

মুসলমানদের জীবন ব্যবস্থা সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই মুসলমান কখনো মিথ্যাকে আশ্রয় দিতে পারে না। কাফের ও মুশরিকের জীবন ব্যবস্থা মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তার দৃষ্টিতে মিথ্যা বলা অবৈধ নয়। কারণ তার বিশ্বাসই মিথ্যা। সুতরাং সে যত পারে মিথ্যা বলে বেড়াক। কিন্তু প্রতিটি মুসলমানকে সর্বক্ষেত্রে মিথ্যাকে পরিত্যাগ করে সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে এবং সত্যের মৌখিক ও বাস্তব সাক্ষ্যদাতা হিসাবে দুনিয়াবাসীর সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে।

Posted ১:১৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৫

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.