জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৫
আল্লাহতা’আলা বলেন,“অবশেষে প্রত্যেক ব্যক্তিকে মরতে হবে এবং তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন নিজেদের পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে। একমাত্র সেই ব্যক্তিই সফলকাম হবে, সেখানে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাবে এবং যাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর এ দুনিয়াটা তো নিছক একটা বাহ্যিক প্রতারণার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।”(সুরা আলে ইমরান: ১৮৫) এই পৃথিবীর জীবনে বিভিন্ন কাজের যে ফলাফল দেখা যায় তাকেই যদি কোন ব্যক্তি আসল ও চুড়ান্ত ফলাফল বলে মনে করে এবং তারই ভিত্তিতে সত্য-মিথ্যা ও কল্যাণ-অকল্যাণের সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকে তাহলে সেই ব্যক্তি আসলে মারাত্মক প্রতারণার শিকার।
এখানে কেহ ধন-দৌলতের অটেল সম্পত্তির মালিক হতে দেখে এ কথা প্রমাণ হয় না যে, সে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে এবং আল্লাহতা’আলা তার প্রতি অনুগ্রহশীল। অনুরূপভাবে এখানে কোন ব্যক্তির ওপর বিপদ নেমে এলে এবং সে মহাসংকটে দিনাতিপাত করলে তা থেকে অনিবার্যভাবে ধারণা করা যাবেনা যে, সে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং আল্লাহর দরবারে সে একজন প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সকল ফলাফল আখিরাতের চিরন্তন জীবনের ফলাফল থেকে সম্পুর্ণ ভিন্নতর হয়। আর সেই ফলাফলই নির্ভরযোগ্য।
দুনিয়া এক অস্থায়ী ঠিকানা। দাদা-দাদী, মা-বাবা, পাড়া-প্রতিবেশী, দুর্দণ্ড প্রতাপশালী রাজা-বাদশা এমনকি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আম্বিয়ায়ে কেরামগণকেও চলে যেতে হয়েছে। আল্লাহতা’আলা বলেন,“আর হে নবী! দুনিয়ার জীবনের তাৎপর্য তাদেরকে এ উপমার মাধ্যমে বুঝাও যে, আজ আমি আকাশ থেকে পানিবর্ষণ করলাম, ফলে ভু-পৃষ্ঠের উদ্ভিদ খুব ঘন হয়ে গেলো আবার কাল এ উদ্ভিদগুলোই ভূষিতে পরিণত হলো, যাকে বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সব জিনিসের ওপর শক্তিশালী।” (সুরা কাহাফ:৪৫) অর্থাৎ তিনি জীবনও দান করেন আবার মুত্যু।
তিনি উত্থান ঘটান আবার পতনও ঘটান। তাঁর নির্দেশে বসন্ত আসে এবং তাঁরই নির্দেশে পাতাঝরার মওসুমও আসে। আজ যদি তুমি সচ্ছল ও আয়েশ আরামের জীবনযাপন করে থাকো তাহলে এ অহংকারে মত্ত হয়ে থেকোনা যে, এ অবস্থার পরিবর্তন নেই। অবশ্যই সবকিছু ফেলে তোমাকে চলে যেতে হবে।
যে আল্লাহর হুকুমে তুমি এসব লাভ করেছো তাঁরই হুকুমে এসব কিছু তোমার কাছ থেকে ছিনিয়েও নিয়ে যেতে পারে। আল্লাহতা’আলা বলেন,“এ ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের একটি সাময়িক সৌন্দর্য শোভা মাত্র। আসলে তো স্থায়িত্ব লাভকারী সৎকাজগুলো তোমার রবের কাছে ফলাফলের দিক দিয়ে উত্তম এবং এগুলোই উত্তম আশা-আকাঙ্খা সফল হবার মাধ্যম।”(সুরা কাহাফ:৪৬) আল্লাহতা’আলা বলেন,“আর এ দুনিয়া একটি খেলা ও মন ভুলানোর সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই না।’ (সুরা আন কাবুত:৬৪)
এ দুনিয়ার বাস্তবতা শুধুমাত্র এতটুকুই যেমন ছোট ছেলেরা কিছুক্ষণের জন্য নেচে গেয়ে আনন্দ-উৎসব করে এবং তারপর যার যার ঝরে চলে যায়।
এখানে যে রাজা হয়ে গেছে সে আসলে রাজা হয়ে যায়নি বরং শুধুমাত্র রাজার অভিনয় করছে। এক সময় তার এ খেলা শেষ হয়ে যায়। তখন সে ঠিক তেমনি দীনহীন অবস্থার রাজ সিংহাসন থেকে বিদায় নেয় যেভাবে এ দুনিয়ার বুকে এসেছিল। অনুরূপভাবে জীবনের কোন একটি আকৃতিও এখানে স্থায়ী ও চিরন্তন নয়। যে যে অবস্থায়ই আছে সাময়িকভাবে একটি সীমিত সময়কালের জন্য আছে।
মাত্র কয়েকদিনের জীবনের সাফল্যের জন্য যারা প্রাণপাত করে এবং এ জন্য বিবেক ও ঈমান বিকিয়ে দিয়ে সামান্য কিছু আয়েশ আরামের উপকরণ ও শক্তি-প্রতিপত্তির জৌলুস করায়ত্ত করে নেয় তাদের এ সমস্ত কাজ মনভুলানো ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব খেলনার সাহায্যে তারা যদি দশ, বিশ বা ষাট-সত্তর বছর মন ভুলানোর কাজ করে থাকে এবং তারপর শুন্য হাতে মৃত্যুর দরজা অতিক্রম করে ভ্রমন জগতে পৌঁছে যায় সেখানকার স্থায়ী ও চিরন্তন জীবনে তাদের এ খেলা এক প্রতিপত্তিহীন রোগে পরিণত হয়, তাহলে এ ছেলে ভুলানোর লাভ কি?
বানূ যিহরের ভাই মুসতাওরিদ হতে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সা: বলেন: আল্লাহর শপথ! ইহকাল-পরকালের তুলনায় অতটুকুই, যেমন তোমাদের কেউ তার এ আঙ্গুলটি সমুদ্রের পানিতে ভিজিযে দেখলো যে, কতটুক ুপানি এতে লেগেছে। বর্ণনাকারী ইয়াহিয়া এ সময় শাহাদাত আঙ্গুলের দ্বারা ইঙ্গিত করেছেন। (মুসলিম:৭০৮৯, আন্ত, নাম্বার: ২৮৫৮ কিতাবুল জান্নাত…., বাবুফানায়েদ দুনিয়া……,ইফা:৬৯৩৩, ই.সে.৬৯৯১)
জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা: থেকে বর্ণিত। একদিন রাসুল সা: আলিয়া অঞ্চল থেকে মদনিায় আসার পথে এক বাজার দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় রাসুলুল্লাহ সা: এর উভয়পাশে বেশ লোকজন ছিল। যেতে যেতে তিনি ক্ষুদ্র কানবিশিষ্ট একটি মৃত বকরীর বাচ্চার পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে তার কান ধরে বললেন: তোমাদের কেউ কি এক দিরহাম দিয়ে এটা ক্রয় করতে আগ্রহী। তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন, কোনকিছুর বদৌলতে আমরা এটা নিতে আগ্রহী নই এবং এটি নিয়ে আমরা কি করব? তখন রাসুলুল্লাহ সা: বললেন: বিনা পয়সায় তোমরা কি সেটা নিতে আগ্রহী? তারা বললেন, এ যদি জীবিত হত তবুও তো এটা দোষী। কেননা এর কান হচ্ছে ছোট ছোট। আর এখন তো সেটা মৃত, আমরা কিভাবে তা গ্রহণ করবো? অত:পর তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! এটি তোমাদের কাছে যতটা নগণ্য, আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর তুলনায় আরও বেশী নগণ্য। (মুসলিম:৭৩০৮, আন্ত: নাম্বার ২৯৫৭, কিতাবুল যুহদে ওয়াররিকাক, ইফা: ৭১৫০, ই,সে.৭২০২)
আল্লাহতা’আলা বলেন,“তাদের কেবলো: দুনিয়ার জীবনও সম্পদ অতি সামান্য এবং একজন আল্লাহর ভয়ে ভীত মানুষের জন্য আখেরাতই উত্তম।”(সুরা নিসা:৭৭) আল্লাহতা’আলা আরো বলেন,‘হে নবী! দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে আল্লাহর নাফরমান লোকদের চলাফেরা যেন তোমাকে ধোঁকায় ফেলে না দেয়। এটা নিছক কয়েকদুনিয়ার জীবনের সামান্য আনন্দ ফূর্তিমাত্র। তারপর এরা সবই জাহান্নামে চওে যাবে, যা সবচেয়ে খারাপ স্থান। বিপরীত পক্ষে যারা নিজেদের রবকে ভয় করে জীবনযাপন করে তাদের জন্য এমন সব বাগান রয়েছে, যার নীচে ঝরণা ধারা বয়ে চলছে। সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। এ হচ্ছে তাদের জন্য মেহমানদারীর সরঞ্জাম। আর য াকিছু আল্লাহর কাছে আছে, নেক লোকদের জন্য তাই ভালো।”(সুরা আলে ইমরান:১৯৬-১৯৮)
পাকিস্তানের একটি গানের পঙতি হলো, “জীবন এক কেরায়া কা ঘর হ্যায়, একদিন না একদিন বদলনা পড়েগা, যব মওত তোজে আওয়াজ দেগি, ঘরছে নিকালনা পড়েগা।” অর্থাৎ “জীবন একটা ভাড়া বাড়ী, একদিন না একদিন বদল করতেই হবে। মৃত্যু যখন তোমাকে আওয়াজ দেবে, তখন ঘর থেকে বের হতেই হবে।” চাকচিক্যময় পৃথিবী ছেড়ে সকলকেই চলে যেতে হবে।
সুতরাং রঙিন জীবনের মায়াজালে জড়িয়ে অনন্ত অসীম জীবনকে ধ্বংস করবেন না। দুনিয়া উপার্জনের জন্য হালাল-হারামকে একাকার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। হারাম-হালালকে একাকার করে অবৈধ সম্পদের যে পাহাড় গড়া হচ্ছে, তার সামান্য কিছু কারো সাথে নিয়ে যেতে পারবো না।
‘কাফনের যেই কাপড়টা পরিয়ে আপনাকে অনন্তযাত্রা পথে ছেড়ে আসা হবে, জীবিতরা লক্ষ করুন, সে কাপড়ের কোন পকেট থাকে না। অর্থাৎ রিক্ত হস্তে জানালা-দরজাহীন একটি অন্ধকার রেলওয়ের ষ্টেশনে রেখে আসা হবে। সুদীর্ঘ যাত্রাপথে আরো অনেকগুলো ষ্টেশন আপনাকে পাড়ি দিতে হবে। সেই সুদীর্ঘ অভিযাত্রায় নিত্য প্রয়োজনীয় তাকওয়ার সামগ্রী সাথে নিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় ষ্টেশনগুলোতে বিশাল ঝামেলা সৃষ্টি হবে এবং সেগুলো থেকে ছাড় পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে।
Posted ১:৪৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh