বাংলাদেশ অনলাইন : | বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাচকালে বিক্ষোভকারীদের হত্যা ও তাদের লাশ গুম করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পতিত স্বৈরাচার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) ‘হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন্স অ্যান্ড অ্যাবিউজেস রিলেটেড টু দ্য প্রটেস্টস অব জুলাই অ্যান্ড আগস্ট ২০২৪ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এতে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানের সময় গত ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে ‘কোর কমিটির’ একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মন্ত্রী বিজিবি কমান্ডারকে আরো সহজে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। “জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যাচ্ছে, পর দিন অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিক্ষোভকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেন এবং বিশেষভাবে বলেন, বিক্ষোভের নেতাদের, দাঙ্গাবাজদের ধরুন, হত্যা করুন এবং তাদের লাশ গুম করুন।”
আন্দোলনের সময় মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে ১৮ আগস্টের পরে পাওয়া নিহতের সংখ্যা তিনগুণ হয়ে যায় বলে ওএইচসিএইচআর জেনেছে। ১৮ জুলাই নিহতের সংখ্যা ১০০ জন জানা গেলেও—- পরেরদিন ১৯ জুলাই তা প্রায় ৩০০ জনে পৌঁছায়। ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদন বলছে, “সংগ্রহ করা তথ্যউপাত্ত স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর জানতে পেরেছে যে, সাবেক সরকারের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, আওয়ামী লীগের সহিংস গোষ্ঠীগুলো— পদ্ধতিগতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল, যার মধ্যে রয়েছে শত শত বিচার-বহির্ভুত হত্যা এবং অন্যান্যভাবে হিংস্র শক্তি প্রয়োগের ঘটনা– যার ফলে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত, গ্রেপ্তার, নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ব্যবহারের শিকার হন।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগ তৈরি করে, সুতরাং এগুলোর আরও তদন্ত হওয়া দরকার, যাতে করে এতে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও নির্যাতনের ঘটনা (আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের সংজ্ঞায়) কতোটা ঘটেছে- সেটির মাত্রা নির্ধারণ করা যায়। একইসঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব আইনেও গুরুতর এসব অপরাধের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
ক্ষমতা ধরে রাখতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন চালিয়েছিল বাংলাদেশের সাবেক সরকার : ভলকার তুর্ক
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, জনগণের বিরোধিতার মুখেও ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে বিক্ষোভ দমন করার কৌশল নিয়েছিল বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকার। এরই অংশ হিসেবে শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার গ্রেপ্তার-আটক ও নির্যাতন চালানো হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। তুর্কের বক্তব্য তুলে ধরা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় থাকার জন্য বাংলাদেশের সাবেক সরকার গত বছর ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের সময় ক্রমাগত সহিংস পথ ব্যবহার করে পদ্ধতিগতভাবে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করেছিল। আওয়ামী লীগের সহিংস কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পদ্ধতিগতভাবে সেসময় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত ছিল। মূলত জনবিরোধিতার মুখে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতেই একটি পরিকল্পিত এবং সুসমন্বিত কৌশল হিসেবে এমন নৃশংস পদক্ষেপ নিয়েছিল তারা। বিক্ষোভ দমন করার কৌশলের অংশ হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে, তাদের সমন্বয় ও নির্দেশনায় শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক এবং নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে।
ভলকার তুর্ক বলেন, আমরা যে সাক্ষ্য এবং প্রমাণ সংগ্রহ করেছি, তা ব্যাপক রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং নিশানা করে হত্যার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। যা সবচেয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যে পড়ে এবং যা আন্তর্জাতিক অপরাধের শামিল বলেও বিবেচিত হতে পারে। তাই এই জাতীয় ক্ষত সারাতে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাণহানির ঘটনাগুলো নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অনুরোধে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় গত সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিদল পাঠায়। ওই প্রতিনিধিদলে ছিলেন মানবাধিকারবিষয়ক তদন্তকারী, একজন ফরেনসিক চিকিৎসক এবং একজন অস্ত্র বিশেষজ্ঞ। অন্তর্বর্তী সরকার তদন্তকাজে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে। যেখানে যেখানে প্রবেশাধিকার চাওয়া হয়েছে, সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে এবং যথেষ্ট নথিপত্র সরবরাহ করেছে। সেসব তথ্যের ভিত্তিতে গত ১লা জুলাই থেকে ১৫ই আগস্টের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। যাদের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ ছিল শিশু। ৪৪ জন বাংলাদেশ পুলিশ কর্মকর্তা। এছাড়াও হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ছোড়া গুলিতে বিদ্ধ হয়েছেন।
আর যখন সাবেক সরকার দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছিল, তখন সংঘটিত প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড এবং আওয়ামী লীগ কর্মী ও সমর্থক, পুলিশ, গণমাধ্যম কর্মীদের লক্ষ্য করে অন্যান্য গুরুতর প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সেগুলোও এ প্রতিবেদনে নথিভুক্ত করা হয়েছে। হিন্দু, আহমদিয়া মুসলিম এবং চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর আদিবাসী জনগণও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। অনেক প্রতিশোধমূলক সহিংসতা এবং এসব গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের পরও অপরাধীরা এখনো দায়মুক্তি উপভোগ করছে।
Posted ১১:২৩ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh