বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

কল্যাণকামী জাতি সৃষ্টিতে রমযানুল কারীম

জাফর আহমাদ :   |   বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ ২০২৫

কল্যাণকামী জাতি সৃষ্টিতে রমযানুল কারীম

আল্লাহ রাহমানুর রাহিম। তাই তিনি দয়ার্দ মানুষকে ভালবাসেন। আল্লাহর অবারিত রহমত ও কল্যাণের বারতা নিয়ে প্রতি বছরই রমযান আমাদের কাছে আসে। এ জন্য আরব দেশ সমূহে রমাযানকে রমযানুল কারীম নামে অবহিত করা হয়। যারা আল্লাহর কিতাবের জ্ঞানের অধিকারী, প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অবহিত, যারা আল্লাহর এই রহমতকে চেতনায় পোষণ করেন, তারা মানবতার প্রতি এ মাসে আরো বেশী করে দায়িত্বশীলতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তারা ভুল কর্মনীতি পরিহার করে সঠিক কর্মনীতি অবলম্বনের কারণে রমযান থেকে আল্লাহর রহমতের বারিধারায় নিজেদের সিক্ত করতে সক্ষম হন এবং নিজেদেরকে মানবতার উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করেন।”

তোমরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ট জাতি, মানবতার কল্যাণের জন্য তোমাদের প্রেরণ করা হয়েছে।”(আলে ইমরান:১১০) অর্থাৎ নৈতিক চরিত্র ও কার্যকলাপের দিক দিয়ে এখন তোমরাই দুনিয়ার সর্বোত্তম মানব গোষ্ঠী। তোমাদেও মধ্যে ন্যায় ও সৎবৃত্তির প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় ও অসৎবৃত্তির মুলোৎপাটন করার মনোভাব ও কর্মস্পৃহা সৃষ্টি হয়ে গেছে। কাজেই মানবতার কল্যাণের দায়ভার তোমাদের মাথায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তোমরা পৃথিবীতে যা-ই করবে তাতে মানুষের কল্যাণের দিকটি সর্বপ্রথম বিবেচনায় আনতে হবে। এমন কোন আচরণ এমন কোন কাজ করা যাবে না যার দ্বারা মানুষের জীবন দূর্বিসহ হয়ে উঠে। এটি ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রযোজ্য। প্রত্যেকে যার তার আঙিনা থেকে অবশ্যই মানুষের কল্যাণের নিমিত্তে কাজ করতে হবে। এ দায়ভার এড়াবার সুযোগ কারো নেই।

আল্লাহর রহমত, বরকত অর্জনের সহজতম পথ হলো মানুষের প্রতি কল্যাণ ও সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। সকল জাগতিক প্রয়োজনে সাহায্য করা, মানুষের পারস্পরিক গোলমাল বা অশান্তি হলে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা, অসুস্থকে সেবা করা, দুর্গতকে উদ্ধার করা, মাযলুমকে সাহায্য করা। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনেক হাদীস রয়েছে। ‘যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য কোন মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবে ততক্ষণ আল্লাহ তার কল্যাণে রত থাকবেন। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বান্দা যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় নেক আমল কোন মুসলিমের হৃদয়ে আনন্দ প্রবেশ করান অথবা তার বিপদ,কষ্ট বা উৎকন্ঠা দূর করা অথবা তার ঋণ আদায় করে দেয়া অথবা তার ক্ষুধা দূর করা। আমার কোন ভাইয়ের সাথে একটু হেঁটে যাওয়া আমার নিকট মসজিদে একমাস ই’তেকাফ করার চেয়েও বেশী প্রিয়। যে ব্যক্তি তার কোন ভাইয়ের সাথে যেয়ে তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে কিয়ামতের কঠিণ দিনে যেদিন সকলের পা পিছলে যাবে সেদিন আল্লাহ তার পা সুদৃঢ় রাখবেন। কল্যাণ কামনা গুণীদের ভাষায় মানুষের মৌলিক চরিত্রের অন্তর্ভূক্ত।

‘কল্যাণ কামনা’ মু’মিনের এমন এক মহত ও দূর্লভ গুণ, এটি যার চরিত্রে বিরাজ করে তার চারিত্রিক সৌন্দর্য ফুলে-ফলে সুশোভিত হয় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তার মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। যিনি অন্যের কল্যাণ কামনা করেন তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে কতগুলো অসৎ গুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন। যেমন, যিনি অন্যের কল্যাণ কামনা করেন তিনি সাধারণত নির্লোভী, নিরহংকারী ও নি:স্বার্থবাদী স্বভাবের হন, কারণ লোভী, অহংকারী ও স্বার্থবাদী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ কখনো অন্যের কল্যাণ কামনা করতে পারে না। অন্য ভাইয়ের কল্যাণ কামনা মানে অন্যকে ভালবাসা। অন্যকে ভালবাসা কোন ছেলে খেলা নয়, অবশ্যই এটি একটি কঠিণ বিষয়। কিন্তু কল্যাণকামী মু’মিনের জন্য এটি খুবই সহজ একটি বিষয়। কারণ তাদের ওপর আল্লাহর অবারিত রহমত বর্ষিত হতে থাকে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার স্ত্রীলোকেরাই প্রকৃতপক্ষে পরস্পর পরস্পরের দায়িত্বশীল বা সাহায্যকারী বন্ধু। এদের পরিচয় এবং বৈশিষ্ট্য এই যে, এরা নেক কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, নামায কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও রাসুলের বিধান মেনে চলে। প্রকৃতপক্ষে এদের প্রতিই আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন।” (তাওবা-৭১)

পক্ষান্তরে হৃদয়কে সকল প্রকার বিদ্বেষ, হিংসা ও অন্যের অমঙ্গল কামনা থেকে অবশ্যই মুক্ত রাখতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন. এটি এমন একটি কর্ম যা মানুষকে অতিরিক্ত নফল ইবাদাত ও যিকির আযকার ছাড়াই জান্নাতের অধিকারী করে তুলে। হযরত আনাস রা: বলেন, একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে বসেছিলাম, এমতাবস্থায় তিনি বললেন, এখন তোমাদের এখানে একজন জান্নাতী মানুষ প্রবেশ করবেন। তখন একজন আনসারী প্রবেশ করলেন, যাঁর দাঁড়ি থেকে ওযুর পানি পড়ছিল এবং তাঁর বাম হাতে জুতাজোড়া ছিল। পরের দিনও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একই কথা বললেন এবং একই ব্যক্তি প্রবেশ করলেন।

তৃতীয় দিনেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম দিনে মতোই আবারো বললেন এবং আবারো একই ব্যক্তি প্রবেশ করলেন। তৃতীয় দিনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজলিস ভেঙ্গে চলে গেলে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা: উক্ত আনসারী ব্যক্তির পিছে পিছে যেয়ে বলেন, আমি আমার পিতার সাথে মন কষাকষি করেছি এবং তিনদিন বাড়িতে যাবো না বলে কসম করেছি। এ কয় রাত আপনার কাছে থাকতে দিবেন কি? তিনি রাজি হলেন। তিনি তিন রাত তাঁর সাথে থাকেন, কিন্তু তাঁকে রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করতে বা বিশেষ কোন নফল ইবাদাত পালন করতে দেখেন না। তবে দিনের মধ্যে তাঁকে শুধুমাত্র ভাল কথা ছাড়া কারো বিরুদ্ধে কোন খারাপ কথা বলতে শোনিনি। আব্দুল্লাহ বলেন. আমার কাছে তাঁর আমল খুবই নগন্য মনে হতে লাগল। আমি বললাম, দেখুন আমার সাথে আমার পিতার কোন মনোমালিন্য হয়নি। তবে আমি পরপর তিন দিন রাসুলুল্লাহ সা: কে বলতে শুনলাম এখন একজন জান্নাতী মানুষ আসবে এবং তিনবারই আপনি আসলেন। এজন্য আমি আপনার আমল দেখে সেইমতো আমল করার উদ্দেশ্যে আপনার কাছে তিন রাত কাটিয়েছি, কিন্তু আমি আপনাকে বিশেষ কোন আমল করতে দেখলাম না। তাহলে কি কর্মের ফলে আপনাকে রাসুলুল্লাহ সা: জান্নাতী বললেন? তিনি বললেন, তুমি যা দেখেছো এর বেশী কোন আমল আমার নেই, তবে আমি আমার অন্তরের মধ্যে কোন মুসলমানের জন্য অমঙ্গল ইচ্ছা রাখি না এবং আমি কোন কিছুর জন্য কাউকে হিংসা করি না। তখন আব্দুল্লাহ বলেনম এই কর্মের জন্যই আপনি এই মর্যাদায় পৌঁছাতে পেরেছেন।”(মুসনাদে আহমাদ, নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা)

আবু হুরাইরা রা: বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন,“প্রতি সপ্তাহে দুবার-সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দাদের কর্ম পেশ করা হয়। তখন সকল মু’মিন বান্দাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়, শুধুমাত্র সে ব্যক্তি বাদে যার ও তার ভাইয়ের মধ্যে বিদ্বেষ ও শত্রুতা আছে। এদের বিষয়ে বলা হয়, এদেরকে বর্জন করো অথবা অবকাশ দাও যতক্ষণ না এরা মিমাংসার প্রতি ফিরে আসে।”(মুসলিম:৬৪৪১. কিতাবুল বিরর, বাব নাহি আনিস শাহনায়ে)
প্রকৃত পক্ষে আমরা মুত্তাকী হতে পারছি না বিধায় ইহুদী-খ্রীষ্টানদের ন্যায় বিকল্প পথে মর্যাদার সন্ধান করে ফিরছি। আর এজন্য আমরাও বংশ, বর্ণ, ভাষা, দেশ এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে মর্যাদার বৃত্ত গড়ে তুলেছি। এ নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যেই আমাদের সামজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। এ নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে আমাদের চিন্তা-চেতনাকে নিয়ে যেতে পারছি না বিধায় উন্নয়নের বাঁধাগুলোও টপকানো আমাদের জন্য দুস্কর হয়েছে। ফলে সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা ইহুদী- খ্রীষ্টানদের আজ্ঞাবহ সাজতে বাধ্য হচ্ছি। অথচ তাকওয়ার মত মানবীয় উন্নতর গুণের অধিকারীদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যাণের ভান্ডার সংরক্ষিত রয়েছে বলে আল কুরআনে উল্লেখ রয়েছে।

সত্যিই মুসলিম দেশসমুহের ভৌগলিক ও কৌশলগত অবস্থান অধিকতর এমন উত্তম স্থানে রয়েছে যে, প্রতিটি মুসলিম দেশের মাটির নিচে আল্লাহ তা’আলা অফুরন্ত নিয়ামতের ভান্ডার মজুত করে রেখেছেন। আমাদের গোলামী ও পরাজিত মানসিকতার কারনে আল্লাহ দান করছেন না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের বর্তমান মুসলিম দেশসমুহের সরকার প্রধানগণ আল্লাহর ভয়ের চেয়ে সাম্রাজ্যবাদী ইহুদী-খ্রীষ্টানগোষ্ঠীকেই বেশী ভয় করেন। এজন্যই আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “লোকালয়ের মানুষগুলো যদি ঈমান আনতো ও তাক্ওয়া বা ভয় করতো তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান জমিনের যাবতীয় বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম, কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। সুতরাং তাদের কর্মকান্ডের জন্য আমি তাদের পাকড়াও করলাম।” (সুরা আরাফ-৯৬)

তাকওয়া এমন একটা শক্তি, এমন একটা গুণ, যার উপর ভিত্তি করে মানুষ হক ও বাতিল, ভুল ও সঠিক, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। যিনি শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে সেটিকেই সত্য হিসেবে মেনে নেন যা তিনি নাযিল করেছেন। তিনি সেটিকেই সঠিক মনে করেন, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। যে কাজ বা প্রথা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আরো অসংখ্য ক্ষতির সৃষ্টি করে, যে সকল কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, সেটিই মানুষের জন্য ক্ষতিকারক। এ ধরণের ক্ষতিকর কাজ থেকে আত্মরক্ষা করা খুবই জরুরী। আত্মরক্ষার জন্য আত্মাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আত্মাকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য দরকার বাস্তব ট্রেনিং। পুরো রমাদানে আমাদেরকে সেই বাস্তব ট্রেনিংই দিয়ে থাকে। রমাদানের সিয়াম একমাস জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে আমাদেরকে মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

মনে রাখতে হবে, তাকওয়ার গুণ সম্পন্ন মর্যাদাশীল জনগোষ্টি নিয়ে যে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, সেটিই হবে আল-কুরআনের সমাজ, ইসলামী সমাজ ও আল্লাহর পছন্দের সমাজ। এ সমাজের প্রতিটি লোক ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হবেন। দেশের সকল সেক্টরে উন্নয়নের ফল্গুধারা প্রবলবেগে প্রবাহিত হবে। দেশ উন্নত হবে। দেশ সম্মানিত হবে।

Posted ১:১১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ ২০২৫

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.