জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
দর্প, দম্ভ ও অহংকার শয়তানের বৈশিষ্ট্য। কোন মুসলমান কখনো দম্ভ বা অহংকার প্রদর্শন করতে পারে না। পৃথিবীর আদিকাল থেকেই বড় বড় ক্ষমতাদর্পী ও ধন-সম্পদের দম্ভ প্রদর্শনকারীদের ইতিহাস আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এবং তাদের করুন পরিণতির কথাও বর্ণিত হয়েছে। ধন-সম্পদের দম্ভ ও অহংকার করেছিল কারূণ আর ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করেছিল ফেরাউন। দু’জনই হযরত মুসা আ: এর যুগের দুই সীমালংঘনকারী। আল্লাহ তা’আলা একজনের ধন-সম্পদকে মাটিতে দাবিয়ে দিয়েছেন এবং অপরজনকে তার সৈন্য-সামন্তসহ পানিতে ডুবিয়ে দিয়ে দম্ভচুর্ণ করে দিয়েছেন।
কারুনের ছিল অঢেল সম্পদের পাহাড়। কিন্তু এই বিপুল সম্পদ তাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এ কথা সত্য, কারূণ ছিল মুসার সম্প্রদায়ের লোক, তারপর সে নিজের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। আর আমি তাকে এতটা ধনরত্ন দিয়ে রেখেছিলাম যে, তাদের চাবিগুলো বলমান লোকদের একটি দল বড় কষ্টে বহন করতে পারতো। একবার যখন এ সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে বললো,“অহংকার করো না, আল্লাহ অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না।”(সুরা কাসাস:৭৬)
কারূনের সমসাময়িক ক্ষমতাদর্পী শাসক ছিল ফেরাউন। ক্ষমতার বলে সে নিজেকে প্রভু বলে দাবী করেছিল। মহান আল্লাহ হযরত মুসা আ: ও তাঁর ভাই হারুন আ: কে তার কাছে প্রেরণ করেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“যাও, তোমরা দু’জন ফেরাউনের কাছে, সে বিদ্রোহী হয়ে গেছে।”(সুরা ত্বহা:৪৩) সে তাঁদের দাওয়াত কবুল করেনি। বরং সে বললো,“আন রাব্বুকুমুল আ’লা” অর্থাৎ আমিই তোমাদের সবচেয়ে বড় রব”। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“সে (ফেরাউন) এবং সৈন্যরা পৃথিবীতে কোন সত্য ছাড়াই নিজেদের শ্রেষ্টত্বের অহংকার করলো এবং মনে করলো তাদের কখনো আমার কাছে ফিরে আসতে হবে না।
শেষে আমি তাকে ও তার সৈন্যদেরকে পাকড়াও করলাম এবং সাগরে নিক্ষেপ করলাম। এমন এ জালেমদের পরিণাম কি হয় দেখে নাও।”(সুরা কাসাস:৩৯-৪০) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,“আমি মুসাকে আমার নিদর্শনসমূহ এবং সুস্পষ্ট যুক্তি সহকারে ফেরাউন, হামান ও কারূনের কাছে পাঠালাম। কিন্তু তারা বলল, এ একজন যাদুকর ডাহা মিথ্যুক।”(আল মুমিন:২৩-২৪) কারূন ধন-সম্পদের বদৌলতে দম্ভ বা অহংকারী হয়েছিল, ফলে সেও হযরত মুসা আ: এর বিরুদ্ধাচরণ করেছিল এবং বনী ইসরাঈলকে শিকড় শুদ্ধ উপড়ে ফেলার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তাই তার এ জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতার বদৌলতে ফেরাউনের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছিল। আর হামান ছিল ফেরাউনের মন্ত্রী।
“পৃথিবীতে দম্ভভরে চলো না। তুমি না যমীনকে চিরে ফেলতে পারবে, না পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারবে।”(সুরা বনী ইরাঈল:৩৭) এর অর্থ হলো, ক্ষমতাগর্বী ও অহংকারীদের মতো আচরণ করো না। এ নির্দেশটি ব্যক্তিগত কর্মপদ্ধতি ও জাতীয় আচরণ উভয়ের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য। এ নির্দেশের বদৌলতেই এ ঘোষনাপত্রের ভিত্তিতে মদীনা তাইয়্যেবায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় তার শাসকবৃন্দ, গভর্ণর ও সিপাহসালারদের জীবনে ক্ষমতারগর্ব ও অহংকারের ছিঁটেফোটাও ছিল না। এমনকি যুদ্ধরত অবস্থায়ও কখনো তাদেরমুখ থেকে দম্ভ ও অহংকারের কোন কথাই বের হতো না।
তাদের ওঠা বসা, চাল চলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘর-বাড়ী, সওয়ারী ও সাধারণ আচার-আচরণেনম্রতা ও কোমলতা এবং সাদাসিধে জীবনের ছাপ স্পষ্ট দেখা যেতো। যখন তারা বিজয়ীর বেশে কোন এলাকায় প্রবেশ করতেন তখনও দর্প ও অহংকার সহকারে নিজেদের ভীতি মানুষের মনে বসিয়ে দেবার চেষ্টা করতেন না।
পৃথিবীতে মানুষের মতো এত দূর্বল কাঠামোর প্রাণী আর কোনটিই নেই। তবে সে অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী বলে অন্যান্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র। এই বুদ্ধির জোরে সে সকল সৃষ্টির ওপর প্রভাব খাটিয়ে রাজত্ব করে যায়। কিন্তু দম্ভ বা দাম্ভিকতা প্রকাশ করার কোন অবকাশ তাকে দেয়া হয়নি। আল্লাহ দাম্ভিক, পাপাচারীকে কখনো পছন্দ করেন না। কোন মানুষযখন দাম্ভিকতার চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, আল্লাহ দুনিয়াতেই তার দম্ভচুর্ণ করে দেন। পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা থেকে এর অনেক উদাহরণ বিদ্যমান রয়েছে। যারাই দম্ভ প্রকাশ করে মাটিতে পা রাখেনি, নিজেকে খোদা দাবী করেছে, মানুষকে দাসানুদাসে পরিণত করেছে,সাধারণ জনগণের উপর নির্যাতনের ষ্টীম রোলার চালিয়েছে, সমাজে নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করেছে। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, মদ ও জুয়ার ছয়লাভ বইয়ে দিয়েছে। মহান আল্লাহ হয় তাদেরকে মাটিতে দাবিয়ে দিয়েছেন অথবা ঝড়-তোফান, জুলোচ্ছাস ও বিভিন্ন মহামারী দিয়ে এমনভাবে ধ্বংস করে দিয়েছেন যে, মনে হবে সেখানে গতকালও কেউ বাস করেনি।
উপড়ে আমরা আল কুরআন থেকে দু’জনপ্রসিদ্ধ ক্ষমতাদর্পী ও ধন-দৌলতের অহংকারীর করুণ পরিণতির ইতিহাস জানতে পেরেছি। এদের পরও আরো অসংখ্য ক্ষমতাদর্পী ও আল্লাহ বিদ্রোহীর উদাহরণ আমরা দুরের ও কাছের ইতিহাস থেকে জানতে পারি। কিন্তু দু:খের বিষয় হলো, এ সমস্ত নির্বোধ ক্ষমতাদর্পীরা ইতিহাস থেকে কখনো শিক্ষা গ্রহণ করে না। আমাদের দেশের একজন নিজেকে অপ্রতিদ্বন্ধী ক্ষমতাদর্পী মনে করেছিল। মহান আল্লাহ তা’আলা তার দম্ভ চুর্ণ করে দেন। একেবারেই অধুনা, নিজেদেরকে পৃথিবীর সুপার পাওয়ার হিসাবে গণ্য করে। যারা পৃথিরীর সর্বত্রই নাগ গলায়। তাদের কথায় পৃথিবীর দেশে দেশে বিদ্যমান শাসকরা উঠবস করতে হয়। অর্থাৎ তারাই এখন বিশ্ব মোড়ল হিসাবে চিহ্নিত। কিন্তু আল্লাহর দেয়া সাধারণ আগুনের কাছে তাদের সকল আধুনিক প্রযুক্তি অসহায়। মাইলের পর মাইল, শহরের পর শহর সর্বত্র আগুন সবকিছু গ্রাস করে নিচ্ছে কিন্তু তারা কিছুই করতে পারছে না। দম্ভচুর্ণ করে আল্লাহ তাদেরকে পথে বসিয়েছে। কিন্তু দু:খের বিষয় হলো, ইতিহাস থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে না।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“কত জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি। তাদের ওপর আমার আযাব অকস্মাত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাতের বেলায় অথবা দিনের বেলা যখন তারা বিশ্রামরত ছিল। আর যখন আমার আযাব তাদের ওপর আপতিত হয়েছিল তখন তাদের মুখে এ ছাড়া আর কোন কথাই ছিল না যে, ‘সত্যিই আমরা জালেম ছিলাম’।”(সুরা আল আরাফ ৪-৫) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেছেনঃ “পুর্ববর্তী ইবরাহিমের জাতি এবং আদ, সামুদ ও নুহের জাতি সমুহ এবং মাদায়েনবাসী ও মুতাফিকাতধারীদের ইতিহাস কি তারা জানে না? তাদের কাছে নবীরা সুস্পষ্ট নির্দেশমালা নিয়ে এসেছিলো। আল্লাহ তাদের ওপর জুলুম করেননি বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল। পক্ষান্তরে ঈমানদার নারী-পুরুষেরা পরস্পরের মিত্র ও সহযোগী। তারা ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে।”(তাওবা ঃ ৭০-৭১)
অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনকভাবে তারা বলছে, মরুভ’মি থেকে আসা এক ধরনের শান্তাআনা বাতাস এই আগুনকে উসকে দিচ্ছে। তবু তারা মহাশক্তিধর আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে না।
শান্তাআনা বাতাস মানে শয়তানের বাতাস। আল কুরআনের আলোকে বাতাস আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। আল কুরআনের আলোকেই বাতাস দুই প্রকারের হয়ে থাকে। এক প্রকার বাতাস রয়েছে যা আল্লাহর ফযল ও করম বয়ে নিয়ে আসে যাকে আমরা রহমতের বাতাস বলে অভিহিত করি। দ্বিতীয় প্রকারের বাতাস আল্লাহর আযাব বয়ে নিয়ে আসে যাকে আমরা গযবের বাতাস বলে থাকি। গযবের বাতাস যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তাছাড়া তোমাদের জন্য নিদর্শন আছে) আদ জাতির মধ্যে যখন আমি তাদের ওপর এমন অশুভ বাতাস পাঠালাম যে, তা যে জিনিসের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলো তাকেই জরাজীর্ণ করে ফেললো।”(সুরা যারিয়াত:৪১) এ বাতাসের জন্য ‘আকিম’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যা বন্ধা নারীদের বুঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অভিধানে এর প্রকৃত অর্থ ‘ইয়াবিস’ বা শুস্ক ।
যদি শব্দটিকে আভিধানিক অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে এর অর্থ হবে, তা ছিল এমন প্রচণ্ড গরম ও শুস্ক বাতাস যে, তা যে জিনিসের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে তাকে শুস্ক করে ফেলেছে। আর যদি শব্দটিকে পারিভার্ষিক অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে তার অর্থ হবে তা ছিল বন্ধা নারীর মত এমন হওয়া যার মধ্যে কোন কল্যাণ ছিল না। তা না ছিল আরামদায়ক, না চিল বৃষ্টির বাহক। না ছিল বৃক্ষরাজীর ফলবানকারী, না এমন কোন কল্যাণ তার মধ্যে ছিল যে জন্য বাতাস প্রবাহিত হওয়া কামনা করা হয়। অন্য স্থানসমূহে বলা হয়েছে এ বাতাস শুধু কল্যাণহীন ও শুস্কই ছিল না বরং তা প্রচণ্ড ঝড়ের আকারে এসেছিল যা মানুষকে শূণ্যে তুলে তুলে সজোরে আছড়িয়ে ফেলেছে এবং অবস্থা একাদিক্রমে আটদিন ও সাত রাত পর্যন্ত চলেছে। এভাবে আদ জাতির গোটা এলাকা তছনছ করে ফেলেছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আর আদকে কঠিন ঝঞ্ঝাবাত্যা দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। যা তিন সাত ও আট দিন ধরে বিরামহীনভাবে তাদের ওপর চাপিয়ে রেখেছিলেন। (তুমি সেখানে থাকলে) দেখতে পেতে তারা ভূলন্ঠিত হয়ে পড়ে আছে যেন খেজুরের পুরানো কাণ্ড।”(সুরা হাক্কাহ:৬-৭) সুতরাং এটি শান্তাআনা বাতাস নয় বরং আল্লাহর পাঠানো বাতাস।
Posted ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh