জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
আল কুরআনের চারটি পরিভাষা যথা: উলুহিয়াত, রুবুবিয়াত, উবুদিয়াত ও দীনিয়াত। এই চারটি পরিভাষা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। এগুলো একচ্ছত্র অধিকার কেবলই মহান আল্লাহর। এর কোনটিই অন্যের সাথে সংশ্লিষ্ট করলে শিরক হবে। এই চারটি পরিভাষার একটি হলো ‘উবুদিয়াত’ যার অর্থ আল্লাহর গোলামী করা।
এই উবুদিয়াত বাকি তিনটি পরিভাষাকেও তার মধ্যে শামিল করে। উবুদিয়াত দ্বারা শুধুমাত্র সালাত, সাওম বা এ ধরণের অন্যান্য ইবাদাত অর্থে ব্যবহৃত হয় না। কেউ ইবাদাতকে এই অর্থে ব্যবহার করতে পারে না যে জিন ও মানুষকে শুধু সালাত ও সওম এবং তাসবীহ তাহলীল করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। সুরা যারিয়াতের ৫৬ নং বলা হয়েছে “জিন ও মানুষকে আমি শুধু এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার দাসত্ব করবে।” এ অর্থটিও এর শামিল আছে বটে, তবে এটা তার পূর্ণাঙ্গ অর্থ নয়। বরং এর পূর্ণাঙ্গ অর্থ হচ্ছে, জিন ও মানুষকে আল্লাহ ছাড়া অন্যের আনুগত্য, আদেশ পালন ও বিনীত প্রার্থনার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি।
অন্য কারো সামনে নত হওয়া, অন্য কারো নির্দেশ পালন করা, অন্য কাউকে ভয় করা, অন্য কারো রচিত দীন বা জীবন ব্যবস্থার অনুসরণ করা, অন্য কাউকে নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রা মনে করা এবং অন্য কোন সত্তার কাছে প্রার্থনার জন্য হাত প্রসারিত করা তাদের কাজ নয়। অর্থাৎ ইবাদাত কেবল উপাসনা ও আরাধনার নাম নয়। বরং প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা আল্লাহর জন্য নিয়ন্ত্রণ করা, মন যা চায় তাই না করার নামও ইবাদাত। আল্লাহর সার্বভৌম স্বীকৃতি ও কার্যত মানার নামও ইবাদাত।
সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলার সার্বভৌমত্ব সমুন্নত করা ইবাদাত। আল্লাহকে ভয় করা, আল্লাহ যেসব কাজ করতে আদেশ দিয়েছেন তার ওপর আমল করা যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ কাছে জবাবদিহির কথা মনে রেখে দুনিয়াতে কাজ করা ইবাদাত। আল্লাহর আনুগত্য করা যেমন ইবাদাত তেমনি তাগুতকে পরিহার করাও ইবাদাত।
যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“প্রত্যেক জাতির মধ্যে আমি একজন রাসুল পাঠিয়েছি এবং তার মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি যে, “আল্লাহর দাসত্ব করো এবং তাগুতের দাসত্ব পরিহার করো।”(সুরা নাহল:৩৬) আল্লাহ তা’আলা বলেন,“বলে দাও! আমি আনুগত্যসহ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দাসত্ব করবো।”(সুরা যুমার:১৪)
“শামিল হয়ে যাও আমার গোলামদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।”(সুরা ফজর:২৯-৩০) আল্লাহ ও মানুষের মৌলিক সম্পর্ক মালিক ও গোলাম। সাইয়্যেদুল ইসতিগফারে আমরা বলে থাকি, “আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা।” অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি আমার রব, তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছো, আমি তোমার বান্দা বা গোলাম।’ সত্যিকারার্থে আল্লাহ খালিক ও মালিক। তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর দাসত্ব করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“জিন ও মানুষকে আমি শুধু এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার দাসত্ব করবে।”(সুরা জারিয়াত:৫৬)
আল্লাহ তা’আলা মানুষকে অন্য কারো দাসত্ব করার জন্য সৃষ্টি করেননি। জিন ও মানবজাতি আল্লাহর দাসত্ব করবে, তিনি তাদেরকে জান্নাত দিবেন। মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করে তাদেরকে অবাধ স্বাধীনতা দান করেছেন। কিন্তু অন্যান্য সকল সৃষ্টি ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় আল্লাহর অনুগত। কেবল মানুষ ও জিন ক্ষমতা ও ইখতিয়ারের গণ্ডির মধ্যে আল্লাহ তা’আলার দাসত্ব করতে চাইলে কিংবা তাঁর দাসত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইলে নেবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যদের দাসত্ব করতে চাইলেও করতে পারে। যারা নিজের স্বাধীন বিবেককে আল্লাহর আনুগত্যে নিয়োজিত করবে কেবল তারাই আল্লাহর বান্দা এবং তারাই জান্নাতের অনাবিল সুখের অধিকারী হবে। পক্ষান্তরে যারা স্বাধীন বিবেককে তাগুতের আনুগত্যের দিকে নিয়ে যাবে তারা তাগুতে গোলাম হিসাবে চিহ্নিত হবে এবং নিকৃষ্ট জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
আল্লাহর অনুগত নেক বান্দাদের মধ্যে প্রবেশ করো এবং পুরস্কার স্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ করো। সেই নেককার বান্দা কারা তাদের বর্ণনা আগের আয়াতে আল্লাহ তা’আলা দিয়েছেন।
তারা এমন মানুষ যারা কোন প্রকার সন্দেহ সংশয় ছাড়াই পূর্ণ নিশ্চিন্ততা সহকারে ঠাণ্ডা মাথায় এক ও লা শরীক আল্লাহকে নিজের রব এবং নবীগণ যে সত্য দীন এনেছিলেন তাকে নিজেদের দীন ও জীবন বিধান হিসাবে গণ্য করেছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছ থেকে যে বিশ্বাস ও বিধানই পাওয়া গেছে তাকে তারা পুরোপুরি সত্য বলে মেনে নিয়েছে। আল্লাহর দীন যে জিনিসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে তাকে তারা অনিচ্ছা সত্বেও নয় বরং এই বিশ্বাস সহকারে বর্জন করেছে যে, সত্যিই তা খারাপ। সত্য প্রীতির পথে যে কোন ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তারা নির্দ্ধিধায় তা করেছে। এই পথে যেসব সংকট, সমস্যা, কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে হাসিমুখে সেগুলো সহ্য করেছে। অন্যায় পথে চলে লোকদের দুনিয়ায় নানান ধরনের স্বার্থ, ঐশর্য ও সুখ-সম্ভার লাভ করার যেসব দৃশ্য সে দেখছে তা থেকে বঞ্চিত থাকার জন্য তার নিজের মধ্যে কোন ক্ষোভ বা আক্ষেপ জাগেনি। বরং সত্য দীন অনুসরণ করার ফলে সে যে এই সমস্ত আবর্জনা থেকে মুক্ত থেকেছে, এ জন্য সে নিজের মধ্যে পূর্ণ নিশ্চিন্ততা অনুভব করেছে। আল কুরআন এখানে এদেরকে ‘প্রশান্ত আত্মা’এর অধিকারী বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। সুৃরা আন’আম-১২৫ নং আয়াতে ‘শারহে সদর” বলা হয়েছে।
পক্ষান্তরে যারা কামনা-বাসনার দাস হয়েছে অর্থাৎ প্রবৃত্তির কামনা-বাসনাকে খোদা বানিয়েছে, নিজের ইচ্ছা আকাংখার দাস বনে যায়। তার মন যা চায় তাই সে করে বসে যদিও আল্লাহ তা হারাম করেছেন এবং তার মন যা চায় না তা সে করে না যদিও আল্লাহ তা ফরয করে দিয়েছেন। ব্যক্তি যখন এভাবে কারো আনুগত্য করতে থাকে তখন তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, তার উপাস্য আল্লাহ নয় বরং সে এভাবে যার আনুগত্য করছে সে-ই তার উপাস্য। সে মুখে তাকে ইলাহ এবং উপাস্য বলুক বা না বলুক কিংবা মূর্তি তৈরী করে তার পূজা করুক বা না করুক তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ দ্বিধাহীন আনুগত্যই তার উপাস্য হওয়ার জন্য যতেষ্ট। এভাবে কার্যত শিরক করার পর কোন ব্যক্তি শুধু এই কারণে শিরকের অপরাধ থেকে মুক্ত হতে পারে না যে, সে যার আনুগত্য করছে মুখে তাকে উপাস্য বলেনি এবং সিজদাও করেনি। সমস্ত মুফাসসিরিন এই ব্যাখ্যাই করেছেন। ইবনে জারীর এর অর্থ বর্ণনা করেছেন এইভাবে যে, সে তার কামনা-বাসনাকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে। প্রবৃত্তি যা কামনা করেছে সে তাই করে বসেছে। না সে আল্লাহর হারামকৃত বস্তুকে কারাম বলে মনে করেছে, না তার হালালকৃত বস্তÍকে হালাল বলে গণ্য করেছে। আবু বকর জাসসাস এর অর্থ বণনা করেছেন,“কেউ যদি যেমনভাবে আল্লাহর আনুগত্য করে সে ঠিক তেমনিভাবে প্রবৃত্তির আকাংখার আনুগত্য করে।” যামখশারী এর ব্যখ্যা করেছেন এভাবে “সে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার প্রতি অত্যন্ত অনুগত। তার প্রবৃত্তি তাকে যেদিকে আহবান জানায় সে দিকেই চলে যায়। সে এমনভাবে তার দাসত্ব করে যেমন কেউ আল্লাহর দাসত্ব করে।” আল্লাহ তা’আলা বলেন,“কখনো কি তুমি সেই ব্যক্তির অবস্থা ভেবে দেখেছো, যে তার নিজের প্রবৃত্তির কামনাকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করেছে? তুমি ্এহেন ব্যক্তিকে সঠিক পথে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিতে পার।”(আল ফুরকান:৪৩) আসলে প্রবৃত্তি হচ্ছে একটি লাগামহীন ঘোড়ার মত। তাই যারা প্রবৃত্তির দাস হয়েছে, প্রবৃত্তি তাদেরকে নাকে লাগাম লাগিয়ে যেদিকে মন চায় সেেিদক নিয়ে যায়। আর সে ভ্রান্ত পথহারা হয়ে দিক-বেদিক দৌড়াতে থাকে। তার মনে ন্যায়-অন্যায় এবং হক ও বাতিলের মধ্যে ফারাক করার এবং একটিকে ত্যাগ করে অন্যটিকে গ্রহণ করার কোন চিন্তা আদৌ সক্রিয় থাকে না। তাহলে কে তাকে বুঝিয়ে সঠিক পথে আনতে পারে। সাময়িক কেউ তাকে সঠিক পথে নিয়ে এলেও পুনরায় সে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার পথে চলে যাবে। তাগুতের কথা মত চলা মানে তাগুতের দাসত্ব করা, তেমনিভাবে প্রবৃত্তির কামনা বাসনা চরিতার্থ করা মানে প্রবৃত্তির দাসত্ব করা। সুতরাং ইবাদাত শব্দটি যদিও কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত, তথাপি যারা প্রবৃত্তি ও তাগুতের অনুসরণ করে তারা মূলত: প্রবৃত্তি ও তাগুতের ইবাদাত করে।
আরবী ভাষায় কারো “ফরমানের অনুগত” হওয়া এবং “তার ইবাদাতগুজার” হওয়া প্রায় একই অর্থে ব্যবহার হয়। যে ব্যক্তি কারোর বন্দেগী-দাসত্ব ও আনুগত্য করে সে যেন তার ইবাদাত করে। সুতরাং যে ব্যক্তি অন্যের রুবুবিয়াত, উলুহিয়াত ও দীনিয়াত স্বীকার করে সে মূলত: তার ইবাদাত করে। ‘ইবাদাত’ শব্দটির অর্থেও ওপর এবং একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করার ও তাঁর ছাড়া বাকি সবার ইবাদাত পরিত্যাগ করার যে আদেশ নবীগণ তাদেও দাওয়াতের মধ্যে দিতেন তার পূর্ণ অর্থ কি ছিল তার ওপর বড়ই গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত হয়। তাঁদের কাছে ‘ইবাদাত” নিছক “আচার অনুষ্ঠান” ছিল না যে, তোমরা ইবাদাত অনুষ্ঠান পরিচালনা করো বরং তাঁদের দাওয়াত ছিল যে তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো এবং একই সংগে তাঁর ফরমানের অনুগত হও। আর এ উভয় অর্থের দৃষ্টিতে অন্য কারো ইবাদাত করাকে পথভ্রষ্ট গণ্য করতেন। অর্থাৎ আল্লাহর আনুষ্ঠানিক ইবাদাতের বাইরে আল্লাহর সকল বিধান ও তাঁর নির্দেশাবলী পালন করাও ইবাদাত।
আল্লাহর বিধান ও তাঁর নির্দেশাবলী অমান্য করে অন্য কারো বিধান ও নেতৃত্ব মেনে চলা আসলে তাকে মুখে আল্লাহর শরীক বলে ঘোষণা না দিলেও আল্লাহর সার্বভৌম কতৃত্বে শরীক করারই শামিল। ভিন্ন সত্তাদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করেও যদি আল্লাহর হুকুমের মোকাবিলায় তাদের হুকুম মেনে চলা হয় তাহলেও মানুষ শিরকের অপরাধে অভিযুক্ত হবে। যেমন কোন ব্যক্তি কাজ করে শয়তানের, তথাপি যদি তাকে শয়তান বলা হয় তাতে সে রাগান্বিত হয়।
কিন্তু আল কুরআনের দৃষ্টিতে সে শিরকের অপরাধে অভিযুক্ত হবে। এটি বিশ্বাসগত শিরক না হলেও কর্মগত শিরক অবশ্যই বলা হবে। বিশ্বাসগত দিক দিয়ে শয়তানকে কেউ আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে শরীক করে না, কেউ তার আরাধনা ও বন্দেগী করে না। সবাই তাকে অভিশাপ দেয়। তবে তার আনুগত্য ও দাসত্ব এবং চোখ বুজে বা খুলে তার পদ্ধতির অনুসরণ অবিশ্য করা হচ্ছে। এটিকেকে কর্মগত শিরক বলে।
ইবাদাত মানুষের সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থাকে শামিল করে। ইবাদাতে প্রবেশ করো মানে সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থা কেবলমাত্র আল্লাহ তা’আলার জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে। এ ধরণের ইবাদাতকারীকে বলা হচ্ছে আমার ইবাদাতকারী বান্দাদের মধ্যে প্রবেশ করো এবং জান্নাতে প্রবেশ করো।
Posted ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh