জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
ঈমানদার নরনারীদের প্রতিদান:মু’মিন নরনারী তাদের সৎ আকীদা-বিশ্বাস ও সৎ আমলের জন্য হাশরের ময়দানে পুরস্কৃত হবে। ঈমানের সততা এবং সৎচরিত্র ও কর্মের পবিত্রতাই সেদিন নূরে রূপান্তরিত হবে যার কারণে সৎ লোকদের ব্যক্তিত্ব ঝলমলিয়ে উঠবে। যার কর্ম যতটা উজ্জল হবে তার ব্যক্তিসত্তার আলোক রশ্মিও তত বেশী তীব্র হবে।
সে যখন হাশরের ময়দান থেকে জান্নাতের দিকে যাত্রা করবে তখন তার নূর বা আলো তা আগে আগে ছুটতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যেদিন তোমরা ঈমানদার নারী ও পুরুষদের দেখবে, তাদের ‘নূর’ তাদের সামনে ও ডান দিকে দৌঁড়াচ্ছে। (তাদেরকে বলা হবে) “আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ।” জান্নাতসমূহ থাকবে যার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারাসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। যেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
এটাই বড় সফলতা।(সুরা হাদীদ:১২) এর সর্বোত্তম ব্যখ্যা হচ্ছে কাতাদা বর্ণিত একটি মুরসাল হাদীস। উক্ত হাদীসে তিনি বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: “কারো কারো ‘নুর’ এত তীব্র হবে যে, মদীনা থেকে আদন এর সম পরিমাণ দুরত্ব পৌঁছতে থাকবে। তাছাড়া কারো ‘নূর’ পৌঁছবে মদীনা থেকে সানআ পর্যন্ত কারো তার চেয়েও কম এমনকি এমন মু’মিন থাকবে যার নূর তার পায়ের তলা থেকে সামনে যাবে না।”(ইবনে জারীর) অন্য কথায় যার মাধ্যমে পৃথিবীর যত বেশী কল্যাণ হবে তার নূর ততবেশী উজ্জল হবে এবং পৃথিবীর যেসব স্থানে তার কল্যাণ পৌঁছবে হাশরের ময়দানেও তার নূরের আলো ততটা দূরত্ব পর্যন্ত দৌঁড়াতে থাকবে।
এখানে একটি প্রশ্নের উত্তর মুফাস্সিরগণ দিয়েছেন, সেটি হলো, নূর বা আলোক রশ্মি আগে আগে দৌঁড়ানের ব্যাপারটি বোধগম্য হয়। কিন্তু শুধু ডান পাশে নূর দৌঁড়ানো অর্থ কি? তবে কি বাঁ দিকে অন্ধকার থাকবে। এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, কেউ যদি তার ডান হাতে আলো নিয়ে চলতে থাকে তার বাঁ দিকটাও কিন্তু আলোকিত হবে। অথচ বাস্তব ঘটনা এই যে, আলো আছে তার ডান হাতে । হযরত আবু যার ও আবু দরদা কর্তৃক বর্ণিত নবী সা: এর একটি হাদীস থেকে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নবী সা: বলেছেন:আমি সেখানে আমার উম্মতের নেককার লোকদের তাদের নূরের সাহায্যে চিনতে পারবো-যে নূও তাদের সামনে ডানে ও বাঁয়ে দৌঁড়ােিত থাকবে।”(হাকিম, ইবনে আবী হাতিম, ইবনে মারদুইয়া)
মুনাফিক নরনারীর প্রতিদান: আল্লাহ তা’আলা বলেন,“সেদিন মুনাফিক নারী পুরুষের অবস্থা হবে এই যে, তারা মু’মিনদের বলবে: আমাদেও প্রতি একটু লক্ষ করো যাতে তোমাদেও নূও থেকে আমরা কিছু উপকৃত হতে পারি। কিন্তু তাদের বলা হবে: পেছনে চলে যাও। অন্য কোথাও নিজেদের নূও তালাশ করো। অতপর একটি প্রাচীর দিয়ে তাদেও মাঝে আড়াল করে দেয়া হবে। তাতে একটি দরজা থাকবে। সে দরজার ভেতওে থাকবে রহমত আর বাইরে থাকবে আযাব।”(সুরা হাদীদ:১৩) দুনিয়ার জীবনে যেমন কাফের, মুনাফিক, ফাসেক ও ফুজুরেরা অন্ধকারে পথ হারিয়ে হাতড়িয়ে মরেছে, সেখানেও তেমনি অন্ধকারে হাতড়িয়ে মরতে থাকবে। যেখানে আলো যেটুকু হবে তা সৎ আকীদা-বিশ্বাস ও সৎ আমলের। ঈমানের সততা এবং সৎচরিত্র ও কর্মেও পবিত্রতাই নুরে রুপান্তরিত হবে যার কারণে সৎ লোকদের ব্যক্তিত্ব ঝলমলিয়ে উঠবে।
জান্নাতবাসী ও মুনাফিকদের মাঝে প্রাচীর নির্মাণ করা হবে। যার এক পাশে থাকবে আল্লাহর রহমত ও তাঁর নিয়ামতসমূহ অন্য পাশে থাকবে দোযখের আযাব। প্রাচীরে একটি দরজা থাকবে যে দরজা দিয়ে জান্নাকবাসীগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তারপর দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে।
যে সীমারেখার জান্নাত ও দোযখের মাঝে আড়াল হয়ে থাকবে মুনাফিকদের পক্ষে তা অতিক্রম করা সম্ভব হবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তারা(মুনাফিকরা) ঈমানদারদের ডেকে ডেকে বলবে আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? ঈমানদাররা জবাব দিবে হাঁ, তবে তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ফিতনার মধ্যে নিক্ষেপ করেছিলে, সুযোগের সন্ধানে ছিলে, সন্দেহে নিপতিত ছিলে এবং মিথ্যা আশা-আকাংখা তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিলো। শেষ পর্যন্ত ফায়সালা এসে হাজির হলো এবং শেষ পর্যন্ত সে বড় প্রতারক আল্লাহর ব্যাপারে প্রতারণা করে চললো।”(সুরা হাদীদ:১৪)
মুনাফিকরা বলতে চাচ্ছে,আমরা কি তেমাদের সাথে একই মুসলিম সমাজের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা কি কালেমায় বিশ্বাসী ছিলাম না। তেমাদের মত আমরাও কি সালাত পড়তাম না। সাওম রাখতাম না। হজ্জ ও যাকাত আদায় করতাম না। আমরা তোমাদের মজলিশে শরীক হতাম না। তোমাদের সাথে কি আমাদের বিয়ে শাদী ও অত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না। তাহলে আমাদের ও তোমাদের মাঝে আজ এ বিচ্ছিন্নতা আসলো কিভাবে।মুসলমানগণ এর জবাবে বলছে, মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তোমরা খাঁিটি মুসলিম হও নাই, বরং ঈমান ও কুফরের মাঝে দোদুল্যমান ছিলে, কুফরী ও কাফেরদের প্রতি তোমাদের আকর্ষণ কখনো ছিন্ন হয়নি এবং তোমরা নিজেদেরকে কখনো ইসলামের সাথে পূর্ণরূপে সম্পৃক্ত করনি। বরং তোমরা সুযোগের সন্ধানে ছিলে, এই ভেবে অপেক্ষা করছিলে যে, যেদিকে যাওয়া লাভজনক বলে মনে হবে সেদিকেই যাবে। কুফর ও ইলামের মধ্যকার সেই নাজুক মহুর্তে মুনাফিকরা এ ভূমিকাই গ্রহণ করেছিল। তারা খোলাখুলি কুফরের পক্ষেও অবলম্বন করছিল না।
আবার পূর্ণ তৃপ্তি ও প্রশান্তির সাথে নিজের শক্তিকে ইসলামের সাহায্য সহযোগিতার কাজে লাগাচ্ছিলো না। বরং যথারীতি বসে বসে দেখছিলো, এ শক্তি পরীক্ষায় কোন দিকের পাল্লা শেষ পর্যন্ত ভারী হয়। যাতে ইসলামের বিজয়ী হচ্ছে বলে মনে হলে সে ইসলামের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়তে পারে এবং মুসলমানদের সাথে কালেমায় বিশ্বাস করার যে সম্পর্ক আছে তা কাজে লাগে। আর যদি কুফরী শক্তি বিজয়ী হয় তাহলে তার সহযোগীদের সাথে যেয়ে শামিল হতে পাওে এবং তখন ইসলামের পক্ষ থেকে যুদ্ধে কোন প্রকার অংশ না করা তার জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হয়।
মুনাফিকরা এ ধরনের সন্দেহ ও সংশয়ে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এগুলোই মুনাফিকির মূল কারণ। সে আল্লাহর অস্তিত্বে সন্দেহ পোষণ করে। রাসুলের রিসালাতে সন্দেহ পোষণ করে, কুরআন যে আল্লাহর কিতাব তাতেও সন্দেহ পোষণ করে। আখিরাত, আখিরাতের জবাবদিহি এবং প্রতিদান ও শাস্তির ব্যাপারেও সন্দেহ পোষণ করে এবং তার মনে এরূপ সন্দেহও সৃষ্টি হয় যে, হক ও বাতিলের দ্বন্ধের সত্যিই কি কোন স্বার্থকতা আছে। না কি এসবই একটা ঢং। সত্য শুধু এতটুকুই যে, সুখে সাচ্ছন্দে থাকে। এটাই সত্যিকারের জীবন। যতক্ষণ না কেউ এ ধরনের সন্দেহ সংশয়ে নিমজ্জিত হবে ততক্ষণ সে মুনাফিক হতে পারে না। মুত্যু পর্যন্ত তারা এ প্রতারণার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।
মহান আল্লাহ সুরা বাকারার ৮ থেকে ২০ আয়াত পর্যন্ত এই মুনাফিকদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় প্রদান করেছেন। সুরা হাদীদে মূলত: আখিরাতে তাদের প্রতিদানের বর্ণনা বিবৃত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“এদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে,যেমন এক ব্যক্তি আগুন জ¦ালালো এবং যখনই সেই আগুন চারপাশ আলোকিত করলো তখন আল্লাহ তাদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিলেন এবং তাদের ছেড়ে দিলেন এমন অবস্থায় যখন অন্ধকারের মধ্যে তারা কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। তারা -বধির, বোবা ও অন্ধ। তারা আর ফিরে আসবে না।”(সুরা বাকারা:১৭-১৮)
Posted ১২:২৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh