জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সুখের আবাসস্থল হলো, মানুষের মনোজগতে। মন বা আত্মাকে বিশেষভাবে গড়ে তুলুন, সুখ পাবেন।জাগতিক কোন কিছুতেই আপনি সুখ খোঁজে পাবেন না। আপনি কি দেখেন না,সুখের সন্ধানে মানুষ কত কিছুই না করে, সুখ কি সে পেয়েছে? আরাম আয়াশে থাকার জন্য বা সুখ নামক সোনার হরিণটিকে ধরার জন্য মানুষ জীবনের ঝুঁকিনিয়ে সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে। মাঝ দরিয়ায় চীর জীবনের জন্য সুখের সলিল সমাধি ঘটে চলেছে। আর যারা তীরে পৌঁছে যায় তারাই বা কতটুকু সুখের নাগাল পেয়েছে?সুখের জন্য দুর্নীতিবাজরা লক্ষ লক্ষ মানুষের হক মেরে সঞ্চয় করে, চুরি-লুটপাট, ভাটপারি, চিনতাই, ঘুষ, কালো বাজারী, খাদ্যে ভেজাল মিশ্রিতকরণ, অবৈধ টাকা পাচারসহ আরো কতকিছুই না করে। সত্যিকারের সুখ কি সে পায়? সুখ নামক মিছে পাখিটিকে কেউ ধরতে পারে না। সে দেখে ঐ তো সুখ পাখি, গাছের মগ ডালে বসে আছে সে মগডালে আরোহন করে,নদীর ওপারে সুখের মরীচিকা ঝল ঝল করছে, সে নদীর ওপারেপাড়ি জমায়, আকাশ ছোঁয়া ভবনের উপরের তলায় সুখ ছিক ছিক করছে, সে ভবন গড়ে তুলে। কিন্তুস্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। পাগলের মতো তখন সে অন্য একটি পাখি বা ঠিকানা খোঁজে ফিরে। এমনিভাবে জাগতিক বস্তুর মধ্যে সুখের সন্ধানের জন্য টাকার পাহাড় গড়ে, দেশে বিদেশে স্বপ্নের ঠিকানা বানায়, তাতে সুখ তো পা-ইনি বরং উল্টো এই সব কিছু তার জন্য অশান্তির কারণ হযে দাঁড়ায়। তাঁর ঘুম কেড়ে নেয়,নিরাপত্তা হুমকীর সম্মুখীন হয়।
সুখের বিপরীত হলো অসুখ। এই অসুখ শারীরিক ও মানসিক উভয় হতে পারে। শারীরিক অসুখের জন্য চিকিৎসা করে অসুখ সারানো যায় কিন্তু মানসিক অসুখের শিকার হলে এর বিপর্যয়তা অত্যন্ত মারাত্মক আকার ধারণ করে।
মানসিক সুখ সারানোর জন্য ইসলাম সবচেয়ে সুন্দর ব্যবস্থাপত্র দান করেছে, তাহলো, প্রথমত: আল্লাহর উপর পূর্ণ নির্ভরশীলতা, দ্বিতীয়ত: আল্লাহ যাকে যা দান করেছেন তার উপরই সন্তুষ্ট থাকা। তৃতীয়ত: আরো ভালো অবস্থার জন্য সৎ উপায়ে নিজেন চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে যাওয়া। এগুলোতে সুখ আসতে পারে। আরেকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, কাজ-কর্ম ও চিন্তা ধারায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবন যাপন করলে জীবন সুখময় হতে পারে। এ জন্য দেখা যায় যে, বিশ্বাসী, আল্লাহ নির্ভরশীল, জ্ঞানী-গুণী, মর্যাদাবান, হৃদয়বান ও সৎ ব্যক্তিবর্গ সাধারণত সুখী হয়। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারী বা নির্ভরশীল ব্যক্তিবর্গরা বস্তু জগতে সবচেয়ে বেশী সুখি হয়। তারা তাদের মনোজগতে আল্লাহর অনুশাসনগুলোকে বেশী করে স্থান দেয়ার কারণে অত্যধিক সুখ লাভ করেন।
ধন-সম্পদ আহরণ করা খারাপ নয় কিন্তু অতিরিক্ত সম্পদের লোভ ও প্রভাব প্রতিপত্তির জন্য হালাল-হারামকে একাকার করে ধন-সম্পদ আহরণ করা ইসলাম সমর্থন করে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে মুহাম্মদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্যে যেসব সৌন্দর্য সামগ্রী সৃষ্টি করেছেন, সেগুলোহারাম করেছে কে? আর আল্লাহর দেয়া পবিত্র জিনিসগুলো কে নিষিদ্ধ করেছে? বলো, দুনিয়ার জীবনেও এ সমস্ত জিনিস ঈমানদারদের জন্যে, আর কিয়ামতের দিনে এগুলো তো একান্তভাবে তাদেরই জন্যে হবে। এভাবে যারা জ্ঞানের অধিকারী তাদের জন্যে আমার কথাগুলো আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করে থাকি।”(সুরা আরাফ:৩২)অর্থাৎ আল্লাহ তো তাঁর দুনিয়ার সমস্ত শোভা-সৌন্দর্য এবং সমস্ত পাক-পবিত্র জিনিস তাঁর বান্দাদের জন্যেই সৃষ্টি করেছেন।
কাজেই এগুলো বান্দাদের জন্যে হারাম করে দেয়া কখনো তার উদ্দেশ্য হতে পারে না। এখন যদি কোন ধর্ম বা নৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা এগুলোকে হারাম,ঘৃণ্য অথবা আত্মিক উন্নতির প্রতিবন্ধক গণ্য করে তাহলে তার এ কাজটিই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সেটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি। বাতিল ধর্মমতগুলোর বিরুদ্ধে কুরআন যেসব যুক্ত-প্রমাণ পেশ করেছে এটি তার মধ্যে একটি গুরুত্বপুর্ণ যুক্তি। বস্তুত কুরআনের যুক্তি উপস্থাপণ পদ্ধতি অনুধাবন করার জন্যে এ যুক্তিটি অনুধাবন করা একান্ত অপরিহার্য।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সৃষ্ট সমস্ত জিনিস দুনিয়ার জীবনেও ঈমানদারদের জন্যেই। কারণ তারাই আল্লাহর বিশ্বস্ত প্রজা। আর একমাত্র নিকহালালাল, বিশ্বস্ত ও অনুগত লোকেরাই অনুগ্রহলাভের অধিকারী হতে পারে। কিন্তু দুনিয়ার বর্তমান ব্যবস্থাপনা যেহেতু পরীক্ষা ও অবকাশদানের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত তাই এখানে অধিকাংশ সময় আল্লাহর অনুগ্রহগুলো নিমকহারাম ও অকৃতজ্ঞদের মধ্যেও বন্টিত হতে থাকে। আর অনেক সময় বিশ্বস্ত ও নিমক হালালের তুলনায় তাদের ওপরই বেশী অনুগ্রহ বর্ষণ করা হয়ে থাকে। তবে আখেরাত (যেখানকার সমস্ত বিশ্বস্ত ব্যবস্থাপনা হক, সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে) জীবনের আরাম আয়েশের সমস্ত উপকরণ এবং সমস্ত পবিত্র খাদ্য ও পানীয় একমাত্র অনুগত, কৃতজ্ঞ ও নিমকহালাল বান্দাদের জন্যেই নির্ধারিত থাকবে। কিন্তু নিমক হারাম বান্দা তাদের রবের দেয়া খাদ্য-পানীয়ে জীবন ধারণ করার পরও তারই বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উড়িয়েছে তারা এর থেকে কোন অংশই পাবে না।
যাদের মন ও মননে এই চেতনা সুদৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়েছে, তাদের দুনিয়ার সমস্ত সুখের মূল আবাসস্থল হলো, ’মনোজগতে’।
তাই নবী সা: মানুষের মন-মননের প্রতি বেশী মনযোগ দিয়েছেন এবং তিনি তাদের মন-মননে ‘আল্লাহ ও আখিরাতের ভয়’ জাগ্রত করার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। এ জন্য তিনি নেতিবাচক তথা উদ্যতভাব, খরগহস্ত ও কর্কষভাষী হননি। বরং তাঁর মনের সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে, একান্ত অকৃত্রিম হিতাকাংঙী সেজে ও অত্যন্ত কোমলভাবে মানুষকে বুঝিয়েছেন। যার স্বীকৃতি স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা এভাবে করেছেনঃ “আপনি যে, কোমল হৃদয় হতে পেরেছেন, সে আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহেরই ফল।
কিন্তু আপনি যদি কঠিণ হৃদয় ও কর্কশভাষী হতেন তাহলে তারা সকলে আপনাকে ছেড়ে চলে যেত।”(সুরা ইমরান ঃ ১৬) আল্লাহর পক্ষ থেকেও এ কৌশলই অবলম্বন করা হয়েছিল। তাঁর প্রিয় রাসুল সাঃ এর ওপর অবতীর্ণ প্রথম প্রথম আসমানী ফরমানগুলোর অধিকাংশই ছিল ‘আল্লাহ ও আখিরাতের ভয়’ সম্বলিত। রাসুল সাঃ এর মক্কী জীবনের আয়াতগুলো তার বাস্তব প্রমাণ। এ সমস্ত ফরমানের আলোকে তিনি বিশ্ববাসীকে নৈতিকতা ও মানবতার চতুঃসীমার মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।
তিনি মানুষদেরকে তাওহীদ, রেসালাত, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং ইসলামী সমাজ কায়েমের আহবান জানিয়েছেন। আল কুরআনে অঙ্কিত আখিরাতের ভয়াবহ দৃশ্য উপস্থাপণ করেছেন। পাশাপাশি অবৈধভাবে সম্পদ আহরণ, চুরি, ব্যভিচার,সন্তান হত্যা. মিথ্যা বলা, রাহাজানি করা, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরানো প্রভৃতি কাজ থেকে বিরত রাখা ও তাদের মনে ঘৃণা জন্মানোর চেষ্টা করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল আত্মার পবিত্রতা সাধন, মন মানসে মলিনতা, শোষণ এবং জৈবিক ও পাশবিক পংকিলতাসমুহ প্রক্ষালন করে মানুষের শ্রেষ্টত্বের মর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ অর্জনে প্রথমেই তিনি তরবারীর কাছে নয় বরং হেদায়াতের আলোর প্রয়োজনীয়তাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
হাত, পা ও মাথাকে নত করার আগে মানুষের মনের ব্যকুলতার প্রয়োজনীয়তার অনুভব করেছেন। শারীরিক বশ্যতার আগে আত্মার আনুগত্যশীলতাকে উজ্জীবিত করেছেন। কারণ আল্লাহর ভয় যার মনকে বিচলিত করে না, মানুষের ভয় তাকে কিভাবে বিচলিত করবে? আল্লাহর ভয়ে বিচলিত মন দুনিয়ার সুখের পরিবর্তে আখিরাতের সুখ সমৃদ্ধিকেই সারাক্ষণ খোঁজে ফিরে। তাই দুনিয়ার অঢেল সম্পদ আহরণের প্রতি তার তেমন আগ্রহ কাজ করে না। তার নৈতিক মানসিক সুখই তার পরম সুখে পরিণত হয়।
Posted ১:০৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh