বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

ইফতার মুলিম উম্মাহর ঐতিহ্য

জাফর আহমাদ :   |   বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ইফতার মুলিম উম্মাহর ঐতিহ্য

ইফতার শব্দেটি ফাতর বা ফুতুর মূল ধাতু থেকে উদ্গত। শাব্দিক অর্থ ছিড়ে ফেলা, খোলা, উন্মুক্ত করা, ভেঙ্গে ফেলা, প্রাত:রাশ (Breakfast) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ইসলামী পরিভাষাগত অর্থ হচ্ছে সূর্যাস্তের সাথে সাথেই খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে সিয়াম ভঙ্গ করা বা ছেড়ে দেয়া। ভোর থেকে সন্ধা পর্যন্ত সারাদিন সাওম পালন করার পর সায়িমগণ সূর্যাস্তের পর খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের মাধমে সওম ভঙ্গ করার নাম হলো, ‘ইফতার’। ইফতারের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন, আবু হুরাইরা রা: হতে বর্ণিত। সায়িমের জন্য রয়েছে দু’টি খুশি, যা তাকে খুশি করে। যখন সে ইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাত করবে, তখন সওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে।”(বুখারী:১৯০৪,১৮৯৪, কিতাবুস সাওম, বাবু হাল ইয়াকুলু ……মুসলিম:১১৫১,আহমাদ:৭৭৯৩, আ. প্রকা: ১৭৬৯ ইফা:১৭৮০) ইফতার সাধারণত একটি হালকা খাবার দিয়ে শুরু হয় যেমন: খেজুর বা পানি। এরপর প্রত্যেক এলাকার ঐতিহ্য অনুযায়ী বিশেষ মজাদার খাদ্য পরিবেশন করা হয়। তবে খেজুরের মাধ্যমে ইফতার রাসুলুল্লাহর সা: এর সুন্নাহ।

ইফতার রাসুলুল্লাহ সা: এর অতি গুরুত্বপুর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন একটি সুন্নাহ। রাসুলুল্লাহ সা: এর যুগ থেকেই এটি মুসলিম উম্মাহর বিশেষ কৃষ্টি-কালচারে পরিণত হয়েছে এবং এটি তাদের ঐতিহ্যও বটে। এ জন্য ইফতার খাওয়া এবং খাওয়ানো দু’টোই প্রতিটি মুসলিমকে বিশেষভাবে আনন্দ দেয়।

পৃথিবীর প্রতিটি দেশে দেশে মুসলিম এলাকায় বিভিন্ন ভাবে ও বিভিন্ন সাজে উৎসবমূখর পরিবেশে ইফতারীর আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় ভাব-গাম্ভির্য বজায় রেখে নানা আয়োজনে ইফতারীর এই কৃষ্টি কালচার চলে এসেছে সেই প্রাচীন কাল থেকে। আবহমানকালের এই চর্চা মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক সহনশীলতা, সহাবস্থান ও সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। তাই ইফতার করা ও করানোকে নিরুৎসাহিত করা মানে মুসলিম কৃষ্টি-কালচারে কুঠারাঘাত করা।

আগেই বলা হয়েছে, ইফতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী কালচার। এটি মুসলিমদের সারাদিনের সিয়াম ভাঙ্গার এবং এক সাথে খাওয়ার একটি উপলক্ষ। এটি আত্মত্যাগ, ধৈর্য এবং সহানুভূতির শিক্ষা দেয়। এটি মুসলিমদের সারাদিন সিয়াম পালন করার পরে পূনরুজ্জীবিত হতে সাহায্য করে।

এটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠান যা পরিবার এবং বন্ধুদের একত্রিত। ইউনেস্কো মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী ইফতারীর এই আচারকে ‘অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আওতাভৃক্ত করে। ইউনেস্কোর ভাষায়, ইফতার (ইফতারী কিংবা ইফতর হিসেবেও পরিচিত) রমযান মাসের সব ধরনের বিধি-বিধান মানার পর সূর্যাস্তের সময় মুসলিমদের পালনীয় রীতি। সংস্থাটি মনে করে, এই ধর্মীয় রীতি পরিবার ও সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং দান, সৌহার্দ্যরে মতো বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তখন এসব কাজ ত্যাগ করে রাত পর্যন্ত নিজের সাওম পূর্ণ করো।”(সুরা বাকারা:১৮৭) রাত পর্যন্ত রোযা পূর্ণ করার অর্থ হচ্ছে, যেখানে রাতের সীমানা শুরু হচ্ছে সেখানে সওমের সীমানা শেষ হয়ে যাচ্ছে। সবাই জানেন, রাতের সীমানা শুরু হয় সূর্যাস্ত থেকে। কাজেই সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করা উচিত। এ আয়াতের নির্দেশ অনুসারে মুসলিমরা রমযানের সওম ভাঙ্গে এবং ইফতার করে। নবী সা: খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করতেন। তারপর তিনি পানি পান করতেন এবং হালকা খাবার খেতেন। তাই ইফতার পালন বিশ্ব মুসলিমদের জন্য একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠান। এটি তাদের নৈতিক কর্তব্য পালনের পাশাপাশি সামাজিক বন্ধনকে আরোও দৃঢ় করে। তাই কোন অজুহাতেই কোন মুসলিম একে নিরুৎসাহিত করতে পারেন না।

সায়েমদেরকে ইফতার খাওয়ানো অনেক সওয়াবের কাজ। এর মাধ্যমে মানবতার প্রতি দায়িত্ব পালন করা হয়। একটি দরদী ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ বিনির্মানে এর প্রভাব অনস্বীকার্য। হৃদতা ও ভালোবাসা জান্নাতে প্রবেশের কারণ হতে পারে। যায়েদ ইবনে খালেদ আল জুহানী রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী সা: বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোন সায়িমকে ইফতার করাবে সে সায়িমের সম-পরিমাণ সওয়াব পাবে; সায়েমের সওয়াব থেকে একটুও কমানো হবে না।”(তিরমিযি: ৮০৭, ইবনে মাযাহ:১৭৪৬, আলবানী তাঁর সহিহ আল জামে-এ হাদীসটি ‘সহীহ’ বলেছেন। হযরত সালমান ফারসি রা: থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য কিংবা পানি দ্বারা কোন মুসলমানকে সিয়ামের ইফতার করালো, ফেরেশতাগণ মাহে রমযানের এ সময়ে তার জন্য ইস্তিগফার করেন আর হযরত জিবরাইল আ: শবে কদরে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।(তাবরানী আল মু’জমাউল কবীর: ৬১৬২)

ইফতারির খাদ্য দ্রব্য হবে খেজুর। হযরত সালমান ইবনে আমের রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ সিয়ামের ইফতার করে, সে যেন খেজুর কিংবা খোরমা দিয়ে ইফতার করে। কারণ, তা হচ্ছে, বরকত। আর তা না হলে পানি দিয়ে করবে, তা পবিত্রকারী।’(জামে আত তিরমিযি : ৬৯৫) আব্দুল্লাহ ইবনে আবু আওফা রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুল সা: এর সাথে রওয়ানা দিলাম এবং তিনি সওমরত ছিলেন। সুর্য অস্ত যেতেই তিনি বললেন: তুমি সওয়ারী হতে নেমে আমার জন্য ছাতু গুলে আন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আরেকটু সন্ধা হতে দিন। তুমি নেমে যাও আমার জন্য ছাতু গুলে আন। তিনি বললেন, এখনো তো আপনার সামনে দিন রয়েছে। তুমি নেমে যাও আমার জন্য ছাতু গুলে আন। অত:পর তিনি সওয়ারী থেকে নামলেন এবং ছাত গুলে আনলেন। এরপর আল্লাহর রাসুুল সা: আঙ্গুল দ্বারা পূর্বদিকে ইঙ্গিত করে বললেন, যখন তোমরা দেখবে যে, রাত এদিক হতে আসছে, তখনই সওম পালনকারীর ইফতারের সময় হয়ে গেল।”(বুখারী:১৯৫৬, কিতাবুস সওম, বাবু ইয়াফতারু বিমা …….., ইফা:১৮২৯, আ.প্র.১৮১৭)

ইফতারির সময় হয়ে গেলে অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য অনেকে ২/১ মিনিট পর ইফতার করেন। এমনটি করা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সা: পছন্দ করতেন না। এমনকি যারা এমনটি করবে তারা কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে। সাহল ইবনে সা’দ রা: হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসুল সা: বলেছেন: লোকেরা যতদিন সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে।”(বুখারী: ১৯৫৭, বাবু কিতাবুস সাওম, বাবু তা’জিলিল ইফতার, মুসলিম: ১০৯৮, আহমাদ: ২২৮২৮, ইফা:১৮৩০, আ.প্র:১৮১৮) উমার ইবনে খাত্তাব রা: হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সা: বলেছেন: যখন রাত্র সেদিক হতে ঘনিয়ে আসে ও দিন এদিক হতে চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখন সায়িম ইফতার করবে।”(বুখারী: ১৯৫৪, কিতাবুস সাওম, বাবু মাতা ইয়াহিল্লু……মুসলিম:১১০০, আহমাদ: ২৩১, আ. প্রকা: ১৮১৫ ইফা:১৮২৭)

সুতরাং কেউ যদি ইচ্ছাকৃত ইফতারিতে বিলম্ব করে তাহলে তিনি অবশ্যই রাসুল্লাহ সা: এর সুন্নাহ অনুযায়ী কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে এবং আল্লাহর নিকট অপ্রিয় হবে। আমাদের দেশে ইফতারের সময়সূচী প্রকাশ করা হয়-যেগুলোতে সূর্যাস্তের সাথে ১মিনিট বা ২ মিনিট বা ৫ মিনিট যোগ করে ইফতারের সময় বলে লেখা হয়। কিন্তু হাদীসে উল্লেখিত কল্যাণ লাভ করতে চাইলে সূর্যাস্তের সময় জেনে নিয়ে সাথে সাথেই ইফতার করতে হবে। সূর্যাস্ত হয়ে গেলেও ইফতার না করে বসে বসে অন্ধকার করা ইহুদী ও নাসারাদের কাজ। (সুনানে আব দাউদ:২২৫৩, ইবনে মাযাহ: ১৬৯৮) সুর্যাস্ত দেখতে না পাওয়া গেলে সুর্যাস্তের সময়সূচী সংশ্লিষ্ট দেশের আবহাওয়া অফিস থেকে সংগ্রহ করা যায়।

রেডিও টেলিভিশনে সূর্যাস্তের সময় ঘোষনা করা হয়, খবরের কাগজেও সূর্যাস্তের সময় লিখা হয়। তথাপি অতি সতর্কতার জন্য ইফতারী পিছানো কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়ার লক্ষণ। রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘সে পর্যন্ত দীন ইসলাম বিজযী থাকবে, যে পর্যন্ত মানুষ শিগগির ইফতার করবে।(মুসনাদে আহমাদ) হযরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন: মহান আল্লাহ বলেন,“আমার বান্দাদের মধ্যে সেই বেশি প্রিয় যে ইফতার তাড়াতাড়ি করে।”(তিরমিযি:৭০০)

Posted ১২:০৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.