বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

বিদেশে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংগ্রাম : এক যুগে দেশে গেছে সাড়ে ৪২ হাজার প্রবাসীর লাশ

বাংলাদেশ রিপোর্ট :   |   বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬

বিদেশে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংগ্রাম : এক যুগে দেশে গেছে সাড়ে ৪২ হাজার প্রবাসীর লাশ

ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বের দেশে দেশে কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশির অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বলে দাবি করা হলেও তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলারের পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি বিষাদময় গল্প। ভাগ্য বদলানোর এক বুক আশা নিয়ে প্রতিবছর কয়েক লাখ বাংলাদেশি পাড়ি জমান ভিনদেশে।

গতবছরের হিসেবে তারা বাংলাদেশে প্রেরণ করেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা, যা দেশের আমদানি ব্যয় পরিশোধসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখে। এ আয় বাংলাদেশের মোট জিডিপির ৭ শতাংশের বেশি। কিন্তু যারা কঠোর পরিশ্রমে এই বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রেরণ করেন, তারা যে স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান, তাদের সেই স্বপ্নের গন্তব্য অনেকের জীবনের শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায়। গত এক দশকের পরিসংখ্যান এক ভয়াবহ ও করুণ চিত্র তুলে ধরেছে এক যুগেই ৪২ হাজার ৩২৭ জন প্রবাসী শ্রমিকের নিথর দেহ ফিরেছে মাতৃভূমিতে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, গত এক দশকে লাশের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।

২০২৪ সালেই ৪ হাজার ৮১৩ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি মরদেহ দেশে আসে। গত ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যা ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন প্রবাসী লাশ হয়ে ফিরছেন।

কেন মরছে তরুণেরা? মৃত্যুর নেপথ্য কারণ : সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মৃতদের মধ্যে একটি বড় অংশই তরুণ এবং মধ্যবয়সি। বিমানবন্দরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো হলো: মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ : মৃত প্রবাসীদের প্রায় ৫৬ শতাংশই মারা যান ব্রেন স্ট্রোকে। তরুণ বা মধ্যবয়সি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এটি এক অস্বাভাবিক বিষয়। হৃদরোগ : ২০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরম থেকে হঠাৎ এসির ঠান্ডায় আসা বা দীর্ঘ সময় পানিশূন্যতায় থাকা হার্টের ওপর প্রচ- চাপ সৃষ্টি করে। প্রতিকূল পরিবেশ ও
অমানুষিক পরিশ্রম : মধ্যপ্রাচ্যের মরু আবহাওয়ায় প্রচ- গরমে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় অনেক অদক্ষ শ্রমিককে। এই অতিরিক্ত শারীরিক চাপ শরীর সহ্য করতে পারে না। মানসিক চাপ ও নিঃসঙ্গতা : জমি বিক্রি বা ঋণ করে বিদেশে যাওয়ায় কিস্তি শোধের চিন্তা, পরিবারের থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা এবং প্রবাস জীবনের একাকিত্ব থেকে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ স্ট্রোকের অন্যতম বড় কারণ। অস্বাস্থ্যকর আবাসন : একটি ছোট ঘওে গাদাগাদি করে ১০-১২ জন থাকা এবং পুষ্টিকর খাবারের অভাব তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

প্রবাসে জীবন বাঁচাতে করণীয় কি : প্রবাসে কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি দিলে চলবে না, নিজের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। হাসিবের মতো সফল হতে এবং সুস্থ শরীরে দেশে ফিরতে নিচের বিষয়গুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা প্রয়োজন।

পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের ভারসাম্য : টাকা উপার্জনের নেশায় ওভারটাইম করা প্রবাসীদের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু টানা ১২-১৮ ঘণ্টা কাজ করা শরীরের জন্য আত্মঘাতী। শরীরকে রিকভারি করার সময় দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৬-৭ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম মস্তিষ্ক ও হৃৎযন্ত্রকে সচল রাখে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি ৫০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।

তীব্র গরম ও পানিশূন্যতা থেকে সাবধান : মরু অঞ্চলের প্রচ- গরমে কাজ করার সময় শরীর থেকে প্রচুর লবণ ও পানি বেরিয়ে যায়। একে ‘হিট স্ট্রোক’ বা ডিহাইড্রেশন বলে। কাজের ফাঁকে প্রচুর পানি পান করতে হবে। সম্ভব হলে ওরস্যালাইন বা লেবুর শরবত পান করা উচিত যাতে শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় থাকে।

তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন এড়িয়ে চলা : বাইরে যখন তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তখন হঠাৎ করে তীব্র এসি রুমে ঢুকে পড়া বা ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা হার্টের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বাইরে থেকে এসে কিছুক্ষণ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় বিশ্রাম নিয়ে শরীর ঠান্ডা হওয়ার পর এসি চালানো বা গোসল করা উচিত।

খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা : অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এবং রেড মিট (গরু বা খাসির মাংস) এড়িয়ে চলতে হবে। নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানো জরুরি। উচ্চ রক্তচাপের সামান্য লক্ষণ দেখা দিলে স্থানীয় ক্লিনিকে পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখবেন, প্রবাসে চিকিৎসা ব্যয়বহুল হলেও এটি আপনার জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন ও যোগাযোগ : ঋণের বোঝা বা পারিবারিক সমস্যার চাপে প্রবাসীরা অধিকাংশ সময় বিষণ্নতায় ভোগেন। এই মানসিক চাপ একা সহ্য না করে নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা এবং বিশ্বস্ত বন্ধুদের সঙ্গে মনের কথা শেয়ার করা উচিত। কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা মানসিক প্রশান্তি দেয়।

রাষ্ট্রীয় ও দূতাবাস পর্যায়ের পদক্ষেপ : প্রবাসীদের অকাল মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় গবেষণার পাশাপাশি প্রতিটি দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতে নিয়মিত ‘হেলথ ক্যাম্প’ ও ‘মানসিক কাউন্সেলিং’ চালু করা এখন সময়ের দাবি।

এ ছাড়াও বিমা সুবিধা নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা জরুরি। রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখা প্রবাসীরা আমাদের দেশের গর্ব। কিন্তু কফিনের এই দীর্ঘ মিছিল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা আজও অবহেলিত। সচেতনতা এবং সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই পারে এই অকাল মৃত্যুর মিছিল থামাতে। আপনার পরিবার আপনার পাঠানো টাকার চেয়ে আপনার সুস্থ শরীরের ফেরার অপেক্ষায় বেশি উন্মুখ। তাই আগে জীবন, তারপর জীবিকা।

দিনে যাচ্ছে ১৪ শ্রমিকের লাশ : দেশের ইতিহাসে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা এক মাসে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন গত মার্চে। রেকর্ড রেমিট্যান্স পাঠিয়েও শ্রমিকরা কিন্তু ভালো নেই। বিশাল অঙ্কের রেমিট্যান্সের ভারে উল্টো চাপা পড়েছে তাঁদের কান্না। অর্থনীতির প্রাণশক্তি রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বরাবরই বাংলাদেশে অবহেলিত। এই শ্রমিকদের দেখার এবং তাঁদের কথা শোনার যেন কেউ নেই। বিদেশ যাওয়ার সোনার হরিণের পেছনে ছুটে দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন শ্রমিক। অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার পথে মাঝসমুদ্রেই করুণ মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। কেউ কেউ অস্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করছেন।

নারী শ্রমিকরা প্রায়ই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় দেশে ফিরছেন। এ অবস্থায় আজ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মহান মে দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক কর্মঠ হাত, আসবে এবার নবপ্রভাত’। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সাল থেকে বিশ্ব শ্রমবাজারে অংশ নিচ্ছে। দীর্ঘ এই সময়ে বাংলাদেশের দক্ষ শ্রমবাজারে বড় পরিসরে প্রবেশের কথা থাকলেও তা হয়নি। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশের বাইরে যে পরিমাণ শ্রমিক গিয়েছেন সে পরিমাণ শ্রমিকের সেবা দিতে সরকার জনবল যুক্ত করেনি। শ্রমিকের অধিকার আদায়ে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার কাজটিও হয়নি। উল্টো ইন্স্যুরেন্সের নামে শ্রমিকদের থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার বাংলাদেশি কাজ না পেয়ে এখন রাস্তায় ঘুরছেন।

বাংলাদেশে শ্রমিকদের অভিবাসন খরচ অনেক বেশি। অন্য দেশের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থ খরচে শ্রমিকদের বিদেশে যেতে হয়। আবার শ্রমিকদের স্বার্থে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে কম সুদে টাকা ঋণ নেওয়ার কথা, কিন্তু সেখানে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। এ টাকা পেতেও আবার তাঁদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

দিনে যাচ্ছে ১৪ শ্রমিকের লাশ : ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যে, গত বছর দেশ ৪ হাজার ৯৭২ জন প্রবাসীর লাশ দেশে আসে। এ হিসেবে মাসে গড়ে ৪১৫ এবং দিনে ১৪ প্রবাসীর লাশ দেশে যায়। মার্চের শেষে লিবিয়া থেকে সাগরপথে রাবারের নৌকায় গ্রিসে যাওয়ার সময় মানবিক বিপর্যয়ে ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর নির্মম মৃত্যু হয়। নৌকাটি মাঝসমুদ্রে প্রতিকূল আবহাওয়ায় দিক হারিয়ে ফেলে। খাবার ও পানির অভাবে তাঁদের মৃত্যু হয়। এ ২২ জনের ২০ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। এর আগে ১৮ এপ্রিল কুয়েত থেকে ৩০ বাংলাদেশি প্রবাসীর লাশ দেশে ফেরে। একই দিন মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকে আরও কয়েকজন প্রবাসীর লাশ আসে। প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক সূত্রে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বেশ কয়েকবার ফ্লাইট বাতিল হয়। এ লাশগুলো সে সময় আসতে না পারায় পরে চার্টার ফ্লাইটে দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

৩১ শতাংশের অস্বাভাবিক মৃত্যু : অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) গবেষণা বলছে, বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে প্রবাসে যাঁদের মৃত্যু হয়, তাঁদের ৩১ শতাংশের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ১৬ শতাংশের মৃত্যু হয় দুর্ঘটনায়। ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করেন। আর ২৮ শতাংশের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। বাকিরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

অমানবিক নির্যাতন নারী শ্রমিকদের : জনশক্তি, কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যে, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি নারী বিদেশে কাজ করেন। আর ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন। বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ঠিকমতো বেতন ও খাবার পান না। নির্ধারিত সময়ের চেয়েও তাঁদের বেশি কাজ করতে হয়। আবার কাজ করতে যাওয়া দেশের ভাষা না জানায় নারী কর্মীরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়েন।

বরিশালের এক নারী গৃহকর্মী সৌদি আরব থেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফেরেন। চারবার হাতবদলের পর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া সেই নারী সৌদিতে কাজ করতে গিয়ে কোনো বেতন পাননি, খেতে পাননি। ২০২৪ সালে এক দালালের মাধ্যমে সৌদিতে যান। সেখানে প্রথমে একটি অফিসে রাখা হয়, পরে একের পর এক বাড়িতে কাজে পাঠানো হয়।

দালালের খপ্পরে সর্বস্বান্ত : বিদেশে যাওয়ার সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে শ্রমিকরা দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে বা ভিসাবাণিজ্যের কারণে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। ভুয়া কাগজপত্রের কারণে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন থেকেই অনেকে ফেরত আসছেন। আবার বিদেশে গিয়ে মাসের পর মাস কাজ না পেয়ে নিদারুণ কষ্টে আছেন অনেকে। কেউ কেউ খালি হাতে দেশে ফিরছেন। কিছু অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি ও অসৎ দালালরা বিদেশে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রামের সহজসরল তরুণদের ফাঁদে ফেলে বিপুল অর্থ লুটে নিচ্ছেন।

দালালরা জাল ভিসা বানিয়ে এই যুবকদের টোপে ফেলছেন। রামরুর নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘রাষ্ট্রকে নিপীড়নের শিকার শ্রমিকদের কাছে দায়বদ্ধ হতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন অদক্ষ শ্রমবাজারে বিচরণ করছি। সব মন্ত্রণলায় একত্র হয়ে সমন্বিতভাবে দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার উদ্যোগ না নেওয়ায় দক্ষ শ্রমবাজার তৈরি হয়নি। এ কারণে শ্রমিকদের শোষণ করার হারও কমছে না। অসাধু একটি চক্র রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে যাঁরা সিদ্ধান্ত নেন এবং এ খাতে বেসরকারিভাবে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের সঙ্গে জড়িত। এ চক্র নিম্নমানের ওয়ার্ক ভিসা নিয়ে এসে তার মাধ্যমে লোক পাঠায়। এর ফলে সরকার যে খবরদারি করবে তা হয় না।

কারণ সরকারের মধ্যে থাকা একটি অংশ অসাধু চক্রের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শ্রমিকদের শোষণের কথা শোনা যায়নি। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে এ চক্র, যারা সিন্ডিকেট করতে চায়, তারা বিভিন্ন দুর্নীতির মাধ্যমে তাদের অবৈধ কাজ চালু রাখতে চাইবে। এজন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরো ঘুরিয়ে দক্ষ অভিবাসনব্যবস্থা চালু করতে হবে। অবৈধ চক্রটিকেও নিষিদ্ধ করতে হবে। এ মুহূর্তে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কাজ শুরু করলে আগামী বছর থেকে এ খাতে ইতিবাচক ফল মিলবে। আর এক দশকে এটি দক্ষ খাত হিসেবে গড়ে উঠবে।’

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, ‘বিদেশে কাজের খোঁজে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫ শতাংশ কমে গেছে। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে। যুদ্ধের জন্য প্রবাসী শ্রমিকের যাঁর কাছে যে অর্থ ছিল দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন কমেনি। ভিসার নামে কিছু এজেন্সি এই শ্রমিকদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে তার হিসাব রাখা হচ্ছে না। শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার জন্য সরকারি সেবা দেওয়ার মান শূন্য। শ্রমিকের রেমিট্যান্স, ইন্স্যুরেন্স ও ফিঙ্গার প্রিন্টের নামে প্রচুর টাকা ব্যাংকে রাখা হচ্ছে। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন চলছে না। এজন্য সরকারকে শ্রমিক যে দেশে যাচ্ছেন সে দেশের সরকারকে দায়বদ্ধ করে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে।’

প্রবাসে অভিবাসীর সংগ্রাম

প্রবাস জীবনের প্রতিটি ধাপে থাকে স্বপ্ন আর সংগ্রামের এক অম্লমধুর আখ্যান। দেশ ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানো একজন সাধারণ তরুণের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প এটি। আশরাফুল ইসলাম হাসিবের জীবন আজ লন্ডনের ব্যস্ততার সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু কয়েক বছর আগে যখন তিনি ঢাকা থেকে হিথ্রো বিমানবন্দরে নেমেছিলেন, তখন চারপাশটা ছিল একদম অচেনা, কুয়াশায় ঢাকা আর ভীষণ কনকনে ঠান্ডা। সেই হাসিবের চোখ দিয়ে আজ আমরা দেখবÑ বিদেশের মাটিতে পা রেখে একজন প্রবাসী কীভাবে প্রতিকূলতা জয় করে নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করেন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন লন্ডন প্রবাসী আশরাফুল ইসলাম হাসিব

নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া : লন্ডনে নামার পর প্রথম যে ধাক্কাটা হাসিব খেয়েছিলেন, সেটা হলো আকাশ-পাতাল সাংস্কৃতিক তফাত। হাসিব বলেন, ‘প্রথমেই বুঝলাম, আমার দেশি চালচলন বা কথা বলার ধরন এখানে চলবে না। এখানকার আবহাওয়া যেমন অনিশ্চিত, মানুষের জীবনযাত্রাও তেমনি ঘড়ি ধরে চলে। আমি শুরুতে পথ হারিয়ে ফেলতাম, ট্রেনের ম্যাপ বুঝতাম না। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। প্রতিদিন নতুন নতুন রাস্তা চিনেছি, মানুষের হাঁটাচলা পর্যবেক্ষণ করেছি। এই অভিযোজন ক্ষমতাটাই একজন প্রবাসীকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে।’

ভাষাগত দেয়াল ও যোগাযোগের সাহস : বইয়ের ইংরেজি আর নেটিভ ব্রিটিশদের বলার ভঙ্গি একদম আলাদা। হাসিবের ভাষায়, ‘শুরুতে যখন কেউ কথা বলত, আমি শুধু তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু আমি বুঝলাম, টিকে থাকতে হলে লজ্জা ঝেড়ে ফেলতে হবে। আমি ভুল ইংরেজিতেই সাহস করে কথা বলা শুরু করলাম। বাসে, সুপারশপে বা কর্মক্ষেত্রেÑ যোগাযোগটাই ছিল আমার প্রথম ‘সারভাইভাল স্কিল’। আজ আমি অনর্গল কথা বলতে পারি, কিন্তু তার পেছনে ছিল হাজারো ভুল করার সেই দিনগুলো।’

ঋণের বোঝা ও ত্যাগের দিনলিপি : বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাওয়ার পেছনে প্রায় প্রতিটি মানুষের থাকে বড় অঙ্কের ঋণের গল্প। হাসিবের ক্ষেত্রেও তাই ছিল। ‘জমি বন্ধক রাখা আর স্বজনদের থেকে নেওয়া ধারের সেই বোঝাটা পাহাড়ের মতো ভারী লাগত। প্রথম দুই-তিন বছর আমার কোনো শখ ছিল না, রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়ার আয়েশ ছিল না। আমার প্রতিটি দিনের লক্ষ্য ছিল একটাই- কঠোর পরিশ্রম করে আগে দেনামুক্ত হওয়া। প্রবাসে প্রথম কয়েক বছর আসলে নিজের জন্য নয়, দেনা শোধ আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই লড়তে হয়।’

একাকিত্ব ও মানসিক লড়াই : পরিবার ছেড়ে হাজার মাইল দূরে থাকার কষ্টটা কেবল একজন প্রবাসই অনুভব করতে পারেন। হাসিব বলেন, ‘শুরুতে যখন ভিডিও কলে আম্মা-আব্বাকে দেখতাম, বুকটা ফেটে যেত। বিশেষ করে ঈদের দিনগুলোতে যখন দেখতাম সবাই নতুন জামা পরে একসঙ্গে খাচ্ছে আর আমি এখানে কিচেনে বা শপে একলা ডিউটি করছি, তখন মনে হতো সব ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু আমি নিজেকে বুঝিয়েছিÑ আমি এখানে এসেছি সবার স্বপ্ন পূরণ করতে। এই মানসিক লড়াইটা জেতা খুব জরুরি।’

‘কমিউনিটি’ই যখন নতুন পরিবার : একাকিত্ব দূর করতে হাসিব খুঁজে নিলেন নিজের দেশের মানুষদের। ‘এখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটি, স্থানীয় মসজিদ আর বাঙালি পরিচিতরাই আমার নতুন পরিবার হয়ে উঠল। কারো অসুখে পাশে দাঁড়ানো বা ছুটির দিনে একটু আড্ডা দিয়ে দেশি খাবার খাওয়া- এগুলোই আমাকে প্রবাসে মানসিকভাবে সুস্থ রেখেছিল। প্রবাসীদের জন্য একে অপরের পাশে দাঁড়ানোটা বেঁচে থাকার রসদ।’

দক্ষতা অর্জন : শূন্য থেকে শিখর : হাসিবের প্রবাস জীবনের মূল দর্শন হলো- “বিদেশে আপনার ডিগ্রির চেয়ে আপনার ‘স্কিল’ বা হাতেনাতে কাজ জানাটা বেশি দামি। আমি দেশ থেকে মাস্টার্স করে এলেও লন্ডনে এসে ড্রাইভিং শিখেছি, রান্নার কাজ রপ্ত করেছি, এমনকি ইলেকট্রিক কাজের ছোটখাটো কোর্সও করেছি। কোনো কাজকেই আমি ছোট মনে করিনি। আজ আমি যে ভালো পজিশনে আছি, তার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল সেই শুরুর দিকের কাজগুলোই।”

খরচের লাগাম ও রেমিট্যান্সের গুরুত্ব : অনেকেই প্রথম কয়েক মাসের বেতন পেয়েই দামি ফোন বা গ্যাজেট কেনেন। হাসিবের পরামর্শÑ ‘প্রথম তিন বছর আপনার খরচ হওয়া উচিত একদম হিসাব করে। কারণ এই সময়টা আপনার ভিত্তি গড়ার সময়। মনে রাখবেন, আপনার পাঠানো একেকটা টাকা দেশে আপনার পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করছে। আমি সবসময় বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছি, যা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি আমাকেও আইনিভাবে নিরাপদ রেখেছে।’

বৈধতা ও ব্রিটিশ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা : বিদেশে আপনার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হলো আপনার ‘কাগজ’ বা লিগ্যাল স্ট্যাটাস। হাসিবের মতে, ‘অনেকে বেশি আয়ের আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে ইলিগ্যাল হয়ে যান। এটি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

আমি সবসময় নিয়ম মেনেছি, সময়মতো ট্যাক্স দিয়েছি এবং ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের সব কাজ ঠিক রেখেছি। আজকের এই স্থায়ী বসবাসের সুযোগ (Permanent Residency) আমার সেই নিরবচ্ছিন্ন আইনি স্বচ্ছতারই পুরস্কার।’

প্রবাস মানেই সফলতার হাতছানি : আশরাফুল ইসলাম হাসিবের এই গল্প আসলে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসীর প্রতিচ্ছবি। শুরু সেই কনকনে ঠান্ডা আর একাকিত্ব জয় করে হাসিব আজ একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ। তার মতে: ‘বিদেশের মাটি যেমন পাথরের মতো কঠিন, তেমনি এখানে শ্রম দিলে তা সোনার মতো উর্বর। যদি আপনি ধৈর্য, সততা আর পরিশ্রমের বীজ বপন করতে পারেন, তবে সফলতার ফসল আপনি ঘরে তুলবেনই।’

পরামর্শ : স্বপ্ন দেখুন বিশাল, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তবেই প্রবাসে পা দিন। মনে রাখবেন, বিদেশের রাস্তাগুলো সবসময় মসৃণ নয়, কিন্তু আপনার জেদ থাকলে গন্তব্যটা অবশ্যই সুন্দর হবে। নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের দেশের সম্মান রক্ষা করুন। ধৈর্য ধরুন, পরিশ্রম করুন; এই প্রবাস আপনাকে কখনো খালি হাতে ফেরাবে না।

Posted ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.