জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
কুরবানী মুসলিম মিল্লাতের ঐতিহাসিক ও অবিস্বরণীয় এক ইবাদাত। গোটা বিশ্বের মুসলমানগণ ঈদুল আজহা শেষে আল্লাহ নৈকট্য লাভের জন্য এই কুরবানীতে অবতীর্ণ হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, কুরবানীর ঐতিহাসিক চেতনাকে বিস্মৃত রেখে পালন করা হলে এ এক ব্যর্থ কসরত ছাড়া আর কিছু ফায়েদা বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। এ জন্য পশু কুরবানীতে অবতীর্ণ হওয়ার আগে অবশ্যই এর ঐতিহাসিক চেতনাকে সামনে নিয়ে পালন করতে হবে।
কুরবানকারীদের অনুরোধ করবো প্রবন্ধটি সামান্য সময়ের জন্য হলেও পড়ে নিবেন এবং আল্লাহর সামনে নিজেকে সমর্পণ করার এক দীপ্ত সফথ নিয়ে নিজেকে সেভাবে উদ্দীপ্ত করবেন। আমরা যে পশুর গলায় ছুরি চালিয়ে প্রতিবছর কুরবানী করি এটি মুলতঃ সবচেয়ে বড় কুরবানী।
কিন্তু ইতিহাসকে সামনে নিয়ে আসলে আমরা দেখতে পাই এর আগে আরো কতগুলো কুরবানী রয়ে গেছে। ঐ কুরবানীগুলো না দেয়া পর্যন্ত এ শেষ কুরবানী দেয়ার অধিকার কারো নেই। অবশ্য কুরবানী আমরা দিয়ে যেতে পারবো বটে এবং দিয়ে যাচ্ছিও বটে কিন্তু তা আমাদের জীবনকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পেরেছে তার বাস্তব ফলাফল তো আমাদের সামনেই আছে। কই কোথাও তো পরিবর্তনের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয় না। বরং এটি একটি ট্রেডিশনাল সংস্কৃতির রূপ ধারণ করে আমাদের মহৎ উদ্যোগ ও উদ্দেশ্যকে সমূলে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কুরবানীর সার্থকতা পেতে হলে আমাদেরকে প্রথমে কুরবানীর ঐতিহাসিক চেতনাকে উপলব্ধি করতে হবে এবং নিজেদেরকে সেই চেতনার আলোকে প্রস্তুত করে নিতে হবে।
হযরত ইব্রাহিম আঃ মুল কুরবানীতে অবতীর্ণ হওয়ার আগে নিজের মধ্যে কতগুলো পরিবর্তন এনে ছিলেন অর্থাৎ নিজের ভেতর লুকায়িত পশুবত কতগুলো জানোয়ারের গলায় তিনি আগে ছুরি চালিয়েছিলেন। যা প্রত্যেক কুরবানকারীদেরকে অবশ্যই পালন করতে হবে। সেই কুরবানগুলো কি তা অত্র প্রবন্ধের “মুল কুরবানীর আগে কতগুলো কুরবানী” নামক আলোচনায় জানা যাবে। পৃথিবীর প্রথম কুরবানী আমরা আল কুরআনে বিবৃত হযরত আদম আঃ এর দু-সন্তানের কুরবানী থেকে জানতে পারি। কিন্তু আমরা যে কুরবানী করি এটি মূলত হযরত ইবরাহিম আ: এর চেতনার প্রেক্ষিতে। অর্থাৎ এটি আমাদের পিতা ও নেতা হযরত ইবরাহিম আ: এর সুন্নাহ।
আল কুরআনে কুরবানী: আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ্ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। অতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও।” (সুরা হজ্জ:৩৪) “আর কুরবানীর উটগুলোকে তোমাদের জন্য নিদর্শনসমুহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে।
সুতরাং সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় কুরবানী করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। যখন কুরবানী করা উটগুলো মাটিতে পড়ে নিথর হয়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা খাও এবং যারা প্রয়োজনের কথা প্রকাশ করে এবং যারা প্রকাশ করে না তাদেরকেও খাওয়াও।”(সুরা হজ্জ:৩৬)
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর তাদেরকে আদমের দুই ছেলের সঠিক কাহিনীও শুনিয়ে দাও। যখন তারা উভয়েই কিছু কুরবানী করেছিল, তখন তাদের একজনের কুরবানী গৃহিত হয়েছিল এবং অপরজনের গৃহিত হয়নি। সে বলল: আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। সে বলল:আল্লাহ তো মোত্তাকীদের নাযরানা কবুল করে থাকেন। তুমি আমাকে মেরে ফেলার জন্য হাত উঠালেও, আমি তোমাকে,মেরে ফেলার জন্য হাত উঠাবো না। আমি বিশ্ব জাহানের প্রভু আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই আমার ও তোমার পাপের ভার তুমি একাই বহন করো। এবং তুমি জাহান্নামী হয়ে যাও। জালেমদের জুলুমের এটাই সঠিক প্রতিফল।”( সুরা মায়েদা:২৭-২৯)
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ইবরাহিম বললেন, আমি আমার প্রতিপালকের মুখাপেক্ষী হচ্ছি। তিনি আমাকে পথ প্রদর্শন করবেন। প্রভু আমাকে নেক সন্তান দান করুন। অত:পর আমি তাকে একটি ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম। পুত্রটি যখন কৈশোর বয়সে উপনীত হলো তখন ইবরাহিম তাকে বলল, হে আমার সন্তান! আমি স্বপ্নে তোমাকে কুরবানী করতে দেখেছি।
এ ব্যাপারে তোমার অভিমত কি?পুত্র বললেন, হে আমার পিতা! আপনাকে যা হুকুম করা হয়েছে তা পালন করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভূক্ত পাবেন। অবশেষে উভয়ই আনুগত্যের মস্তক অবনত করলেন এবং ইবরাহিম তার পুত্রকে উপুর করে শুয়ে দিলেন। এমনি সময় আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহিম তুমি সত্যিই স্বপ্নকে বাস্তব রূপদান করেছো। নিশ্চয় আমি নেককারদেরকে এভাবেই প্রতিদান প্রদান করি। নিসন্দেহে এটি একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা ছিল। অতপর একটি বিশাল একটি কুরবানীর পরিবর্তে তোমার পুত্রকে রক্ষা করলাম।”(সুরা সফফাত:৯৯-১০৭)
প্রথমত:ইবরাহিম আ: মুল কুরবানীতে অবতীর্ণ হয়োর আগে প্রথম যে ছুরি চালিয়েছিলেন সেটি হলো সকল প্রকার মিথ্যা প্রভু তথা তাগুতের গলায়। যেই তাগুত মানুষের জীবনের প্রতিটি বিভাগে প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্নভাবে প্রভু সেজে বসেছিল। আমাদের জীবনেও প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্নভাবে অসংখ্য মিথ্যা প্রভু বসে আছে, তাদের গলায় ছুরি চালাতে হবে।
দ্বিতীয়ত: হযরত ইবরাহিম আঃ যে পরিবার ও সমাজ এবং পরিবেশে আগমন করেছিলেন তার পুরোটাই শিরকের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমন কি রাষ্ট্রশক্তি পরিপূর্ণভাবে শিরকের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। তিনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহ দিকে মুখ ফিরিয়ে ছিলেন। ফলশ্রুতিতে তিনি একদিকে একা অপরদিকে গোটা দেশ ও জাতি তাঁর মোকাবেলায় এক সারিতে এসে দাড়ালো। কিন্তু এর পরও হতোদ্যম হননি, তার মুখ অবসন্ন হয়নি। তখন সিদ্ধান্ত হলো আগুনে পুড়িয়ে মারার। তাতেও তিনি বিরত হলেন না। বরং এ কাজের জন্য লেলিহান অগ্নিগর্ভে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে পছন্দ করলেন। এটা তাঁর দ্ধিতীয় কুরবাণী। সুতরাং প্রতিটি কুরবানকারীদেরকে যে কোন পরিবেশে শিরক উচ্ছেদ ও তাওহীদের দাওয়াত দানের জন্য দাঁড়াতে হবে। সকল প্রকার ভয়-ভীতি ও জানমালের ক্ষতির আশংকা থাকতে পারে। এ সমস্ত আশংকার গলায় ছুরি চালাতে হবে।
তৃতীয়ত: শিরকমুক্ত সমাজ কায়েমের আন্দোলনের জন্য নিজেদের সুখ-শান্তি,আরাম-আয়েশ ও লোভ-লালসার গলায় ছুরি চালাতে হবে। ইসলামের জন্য, আল্লাহর জন্য প্রয়োজনে নিজের মাতৃভুমির মায়া ত্যাগ করার মানসিকতা থাকতে হবে। যুগে যুগে, কালে কালে আল্লাহর প্রিয়জনদেরকে এ পথ অবলম্বন করার অসংখ্য নজির দেখতে পাওয়া যায়। মানবতার মহান বন্ধুকেও সঃ এ পথ অবলম্বন করতে দেখেছি। হযরত ইবরাহিম আঃ আগুন থেকে বাঁচার পর এ দেশে থাকা তাঁর আর সম্ভব হলো না। তাওহীদের জন্য তিনি বহিস্কৃত জীবনই পছন্দ করলেন।
শেষ ও চুড়ান্ত কুরবানী: দেশত্যাগ ও নির্বাসনের দুঃখ-কষ্ট ভোগ করার পর বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তাকে সন্তান দান করলেন হযরত ইসমাইল আ:। তিনি তাঁর জন্যও একই ধর্ম ও কর্তব্য ঠিক করলেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“সে পুত্র যখন তার সাথে কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছলো তখন (একদিন ইবরাহিম তাকে বললো) “হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তুমি বল তুমি কি মনে কর? সে বললো “ হে আব্বাজান! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে তা করে ফেলুন, আপনি আমাকে ইনশা’আল্লাহ সবরকারীই পাবেন।”(সুরা আস সাফ্ফাত:১০২)
সব কঠিন পরীক্ষায় পাশ করার পর চুড়ান্ত ও শেষ কঠিণ পরীক্ষা অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত হযরত ইবরাহিম আঃ সবকিছু অপেক্ষা রাব্বুল আলামীনকেই বেশী ভালবাসেন কিনা, তার ফয়সালা হতে পারত না। তাই বৃদ্ধ বয়সে একেবারে নিরাশ হয়ে যাওয়ার পর তার যেই পুত্র ইসমাইল আ: জন্ম লাভ হয়েছিল সে প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী করতে পারেন কি না তারই পরীক্ষা নেয়া হলো।
পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন। তখন চুড়ান্তরূপে ঘোষনা করা হলো যে, এখন তুমি প্রকৃত মুসলিম হওয়ার দাবীকে সত্য বলে প্রমান করেছ। এক্ষণে তোমাকে সারা পৃথিবীর ইমাম বা নেতা বানানো যায়। আল কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে এ কথাই বলা হয়েছে:-“এবং যখন ইবরাহীমকে তার রব কয়েকটি ব্যাপারে পরীক্ষা করলেন এবং সে সব পরিক্ষায় ঠিকভাবে উত্তীর্ণ হলেন তখন তাকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, আমি তোমাকে সমগ্র মানুষের ইমাম বা নেতা নিযুক্ত করছি। তিনি বললেন, আমার বংশধরদের সম্পর্কে কি হুকুম? আল্লাহ তায়ালা বললেন যালেমদের জন্য আমার ওয়াদা প্রযোজ্য নয়।”(সুরা বাকারা-১২৪)
এ আয়াতের আলোকে প্রশ্ন রাখতে চাই কারা আজ সারা পৃথিবীর নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে ? আর কেনই বা এমনটি হলো ? এর উত্তর খুব সহজ। তাহলো, আমরা প্রথম তিনটি কুরবানীর প্রতি ভ্রক্ষেপ না করে প্রতিবছর কুরবানী করে থাকি। এটি উল্লেখিত আয়াতের আলোকে নিজের ওপর এক মস্ত বড় জুলুম। আল্লাহর ওয়াদা কখনো জালিমের জন্য প্রযোজ্য নয়।
নিজেদের জুলুমের পরিণাম হিসাবে পৃথিবীর নেতৃত্ব আজ অন্যদের হাতে চলে গেছে। ইসলামের অন্যান্য ইবাদাতের মতই এটি একটি স্রেফ আনুষ্ঠানিক আনন্দ-ফুর্তির ব্যাপার হয়ে দাঁিড়য়েছে। হজ্ব ও কুরবানীর অন্তরনিহিত তাৎপর্য আজ নি¯প্রভ এক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়ে গেছে। এ সংকট উত্তরণের জন্য আমাদেরকে কাল বিলম্ব না করে এখনি প্রথম তিনটি কুরবাণীর দিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। নিজের সকল প্রকার চেষ্টা ও সাধনাকে সে দিকে কেন্দ্রিভূত করতে হবে। নিজেদেরকে হযরত ইবরাহিম আ: তদীয় পুত্র হযরত ইসমাইল আ: এর মতো খাঁটি মুসলমান হতে হবে। তাঁদের কুরবানী মতো নিজেদেরকে আল্লাহ সামনে পেশ করতে হবে।
Posted ১২:৪৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh