জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“যে সম্মান চায় তার জানা উচিত সমস্ত সম্মান একমাত্র আল্লাহরই। তাঁর কাছে শুধুমাত্র পবিত্র কথাই ওপরের দিকে আরোহণ করে এবং সৎকাজ তাকে ওপরে ওঠায়। আর যারা অনর্থক চালবাজী করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি এবং তাদের চালবাজী নিজেই ধ্বংস হবে।”(সুরা ফাতির:১০)এ আয়াতে ইজ্জত-সম্মান ও মর্যাদা লাভ করার আসল উপায় বলে দেয়া হয়েছে। অথচ মানুষ ইজ্জত-সম্মানের জন্য কতকিছুই না করে। মানুষের মধ্যে কৃত্রিম উপায়ে সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতা দেখা যায়। আমাদের কেউ কেউ অবৈধ সম্পদ আহরণ করে তা দিয়ে মসজিদ-মাদরাসা, স্কুল, কলেজ ও সামাজিক দাতা সংস্থা গড়ে তুলে সম্মান অর্জন করতে চায়। আবার অনেকে চালবাজি ও কুট কথা ও চিন্তা চেতনার মাধ্যমে সম্মান উপার্জন করতে চায়।
অথচ আল্লাহর কাছে মিথ্যা, কুলষিত ও ক্ষতিকারক কথা কখনো উচ্চ মর্যাদা লাভ করে না। তাঁর কাছে একমাত্র এমন কথা উচ্চ মর্যাদা লাভ করে যা সত্য, পবিত্র-পরিচ্ছন্ন, বাস্তব ভিত্তিক, যার মধ্যে সদিচ্ছা সহকারে একটি ন্যায়নিষ্ঠ আকিদা-বিশ্বাস ও সঠিক চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে। তারপর একটি পবিত্র কথাকে যে জিনিসটি উচ্চ মর্যাদার দিকে নিয়ে যায় সেটি হচ্ছে কথা অনুযায়ী কাজ। যেখানে কথা খুবই পবিত্র কিন্তু কাজ তার বিপরীত সেখানে কথার পরিত্রতা নিস্তেজ ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। কেবলমাত্র মুখে কথার খই ফুটালে কোন কথা উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত হয় না বরং এ জন্য সৎকাজের শক্তিমত্তার প্রয়োজন হয় না।
এখানে একথাও অনুধাবন করতে হবে যে, কুরআন মাজীদ ভালো কথা ও ভালো কাজকে পরস্পরের অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য বিষয় হিসাবে পেশ করে। কোন কাজ নিছক ভালো হতে পারে না যতক্ষণ না তার পেছনে থাকে ভালো আকীদা- বিশ্বাস। আর কোন ভালো আকীদা-বিশ্বাস এমন অবস্থায় মোটেই নির্ভরযোগ্য হতে পারে না যতক্ষণ না মানুষের কাজ তার প্রতি সমর্থন যোগায় এবং তার সত্যতা প্রমাণ করে। কোন ব্যক্তি যদি মুখে বলতে থাকে, আমি এক ও লা-শরীক আল্লাহকে মাবুদ বলে মানি কিন্তু কার্যত সে গাইরুল্লাহর ইবাদাত করে, গাইরুল্লাহর দল করে, গাইরুল্লাহর আইন-আদালত, বিচার-ফয়সালা মেনে চলে, গাইরুল্লাহর সমাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতিতে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে এ কাজ তার কথাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে। কোন ব্যক্তি যদি মুখে মদ হারাম বলতে থাকে এবং কার্যত মদ পান করে চলে, তাহলে শুধুমাত্র তার কথা মানুষের দৃষ্টিতেও গৃহীত পারে না, আর আল্লাহর কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এরাই এক সময় বাতিলপন্থী হিসেবে বিবেচিত হয়। এরাই বাতিল ও ক্ষতিকর কথা নিয়ে এগিয়ে আসে তারপর শঠতা, প্রতারণা ও মনোমুগ্ধকর যুক্তির মাধ্যমে তাকে সামনের দিকে এগিয়ে দেবার চেষ্টা করে এবং তার মোকাবেলায় সত্য ও হক কথাকে ব্যর্থ করার জন্য সবচেয়ে খারাপ ব্যবস্থ অবলম্বন করতেও পিছপা হয় না।
মনে রাখতে হবে, এটি সেই সময়কার আয়াত যখন কুরাইশ সরদাররা নবী সা:কে মোকাবেলায় যা কিছু করছিল সবই ছিল তাদের নিজেদের ইজ্জত ও মর্যাদার খাতিরে। তাদেও ধারণা ছিল, যদি মুহাম্মদ সা: এর কথা গৃহীত হয়ে যায় তাহলে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব তামাম আরব মুল্লুকে আমাদের যে মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত আছে তা মাটিতে মিশে যাবে। এরি প্রেক্ষিতে বলা হচ্ছে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও কুফরী করে তোমরা নিজেদের যে মর্যাদা তৈরি করে রেখেছো এ তো একটি মিথ্যা ও ঠুনকো মর্যাদা। মাটিতে মিশে যাওয়াই এর ভাগ্যের লিখন। আসল ও চিরস্থায়ী মর্যাদা দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত যা কখাে হীনতা ও লাঞ্জনার শিকার হতে পারে না, তা কেবলমাত্র আল্লাহর বন্দেগীর মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। তুমি যদি তার হয়ে যাও, তাহলে তাকে পেয়ে যাবে এবং যদি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে অপমানিত ও লাঞ্জিত হবে।
আল্লাহ তা’আল বলেন,“বলো: হে আল্লাহ! বিশ্ব-জাহানের মালিক! তুমি যাকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা দান করো এবং যার থেকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নাও। যাকে চাও মর্যাদা-ইজ্জত দান করো এবং যাকে চাও লাঞ্জিত-হেয় করো। কল্যাণ তোমার হাতেই নিহিত। নি:সন্দেহে তুমি সবকিছুর ওপর শক্তিশালী।”(সুরা আলে ইমরান:২৬) ইজ্জত, মান, মর্যাদার একচ্ছত্র মলিক মহান আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা ইজ্জত দান করেন যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। সুতরাং দুনিয়ার মানুষ সম্মান-ইজ্জতের জন্য যেই মানদন্ড নির্ধারণ করেন, তা মূল্যহীন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক সম্মানিত, তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী ভয় করে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সবকিছু জানেন ও খবর রাখেন।” (আল হুজরাত-১৩) অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশী মুত্তাকী তিনিই সবচেয়ে বেশী সম্মানিত ও মর্যাদাবান। সুতরাং মর্যাদার মাপকাঠি হলো,“তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়”।
পৃথিবীর অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীর ন্যায় মুসলমানগণ যেদিন থেকে তাকওয়াকে বাদ দিয়ে অন্যান্য বিষয়ের উপর ভিত্তি করে মানুষের মর্যাদা দিতে শুরু করেছে, সেদিন থেকে তাদের কপাল পুড়তে শুরু করেছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়া ‘বুনিয়ানুম মারচুচ’ ‘সুদৃঢ় প্রাচীর’-এর ফাটল বা ভাঙন সেখান থেকেই শুরু হয়েছে। বিজাতীয়দের ন্যায় মুসলমানদের মধ্যে আজ খান্দান, গোত্র ও গোষ্ঠীগত বিভেদের পাহাড় পরিলক্ষিত হয়। আর এরই ফলশ্রুতিতে তাদের মধ্যেও অহংকার, ঘৃণা, তাচ্ছিল্য, বিদ্বেষ ও অবমাননা এবং জুলুম ও নির্যাতন দানা বেধে উঠেছে। অথচ এটি ছিল ইহুদী-খ্রীষ্টান ও পৌত্তলিকদের চরিত্র। জাতীয়তার ভিত্তিতে ইহুদীরা মনে করেছে তারাই আল্লাহর মনোনীত সৃষ্টি। এজন্য পৃথিবীর সকল অইসরাঈলীরা অধিকার ও মর্যাদার দিক থেকে নিম্ন পর্যায়ের। পক্ষান্তরে খ্রীষ্টানেরা বলেছে ঈশা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ), সুতরাং তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ট জাতি। হিন্দু জাতি পৃথিবীর অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী থেকে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠতর মনে করা ছাড়াও খোদ নিজেদের মধ্যেই অসংখ্য কঠিন ভেদনীতি চালু করে রেখেছে। তারা বর্ণাশ্রমের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং শুদ্রদের লাঞ্ছনার গভীর খাদে নিক্ষেপ করেছে। তাদের ঘরে অন্য ধর্মের কেউ ঢুকে পড়লে সেটিকে ধুয়ে-মুছে পবিত্র করে থাকে। এরাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদার গণতন্ত্র ও কট্রর সমাজনীতি শ্রেণী সংগ্রামের আগুন জ্বালিয়েছে, সাদা-কালো বর্ণবাদনীতি অসংখ্য বণী আদমের রক্ত ঝড়িয়েছে, আদিবাসী-অ-আদিবাসীর উচ্ছেদের সংগ্রাম তো চলছেই।
আমাদের ভালো করে মনে রাখা প্রয়োজন, খান্দান, বংশ, গোত্র ও গোষ্ঠী, বর্ণ, ভাষা, দেশ ও জাতীয়তা এগুলো অহংকারেরও হোতা। আরও মনে রাখা প্রয়োজন, পৃথিবীর সর্বপ্রথম যে গুনাহের খাতায় নাম লিখিয়েছিল সে হলো, শয়তান এবং প্রথম যে গুনাহটি আল্লাহর হুকুমকে মানতে অবাধ্য করেছিল সেটি হলো অহংকার। আর অহংকার সৃষ্টি হয়েছিল জন্মগত শেষ্ঠত্বকে ভর করে। সুরা বাকারায় আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “আমি ফিরিশতাদেরকে বলেছিলাম ঃ আদমকে সেজদা কর। সকলেই সেজদা করলো। কেবল ইবলিশ করলো না। সে অস্বীকার ও অহংকার করলো। সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” অন্যত্র বলা হয়েছে ঃ সে বললো, আমি আগুনের তৈরী আর আদম মাটির তৈরী। অর্থাৎ তার মধ্যে বর্ণবাদের অহংকার ও বিদ্বেষ দানা বেঁধে উঠেছিল। ফলে সে-ই পৃথিবীর প্রথম নিকৃষ্ট কীট, যে আল্লাহর আদেশকে অমান্য করলো এবং তাঁর লানত নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত তাকে বেঁচে থাকতে হবে।
কিন্তু ইসলাম এসব নীতিকে কখনোই সমর্থন করে না। মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বুনিয়াদ হলো, ‘তাকওয়া’। জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান। কেননা তাদের মুল উৎস এক। একমাত্র পুরুষ এবং একমাত্র নারী থেকে গোটা জাতি অস্তিত্ব লাভ করেছে। তাদের সকলের সৃষ্টিকর্তা এক, তাদের সৃষ্টির উপাদান ও নিয়ম-পদ্ধতি এক এবং তাদের সবার বংশধারা একই পিতামাতা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। সুতরাং মানুষ যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন সেটি দেখার বিষয় নয়। বরং যে মুল জিনিসের ভিত্তিতে একজন অপর জনের ওপর মর্যাদা লাভ করতে পারে তা হচ্ছে এই যে, সে অন্য সবার তুলনায় অধিক আল্লাহ ভীরু, মন্দ ও অকল্যাণ থেকে দূরে অবস্থানকারী এবং নেকী ও পবিত্রতার পথ অনুগমনকারী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয়ের সময় কা’বা তাওয়াফের পর বক্তৃতা করেছিলেন তাতে তিনি বলেন ঃ “সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তোমাদের থেকে জাহিলিয়াতের দোষ-ত্রুটি ও অহংকার দূর করে দিয়েছেন। হে লোকেরা! সমস্ত মানুষ দু-ভাগে বিভক্ত। এক, নেক আমলদার ও পরহেযগার-যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে মর্যাদার অধিকারী। দুই, পাপী ও দুরাচার যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে নিকৃষ্ট। অন্যথায় সমস্ত মানুষই আদমের সন্তান। আর আদম মাটির সৃষ্টি।” (তিরমিযি) অন্য এক হাদীসে উল্লেখ আছেঃ “আল্লাহ তা’আলা তোমাদের চেহারা-আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কাজ-কর্ম দেখেন।” (মুসলিম, ইবনে মাযাহ)
দুনিয়ার জীবনে উচ্চ-নীচের যে মানদণ্ড তৈরী করা হয়েছে এগুলো আল্লাহর কাছে গুরুত্বহীন। আমরা দুনিয়াতে যাকে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন সাব্যস্ত করেছি, আল্লাহর কাছে সে একেবারেই মূল্যহীন পক্ষান্তরে দুনিয়াতে যাকে আমরা নীচ, উচ্ছিষ্ট্য ও হেয় প্রতিপন্ন করে রেখেছি কিন্তু আল্লাহর কাছে সে সম্মানীত ও মর্যাদাসম্পন্ন বান্দা হিসাবে গণ্য হবেন। তাকওয়ার ভিত্তিতে চরিত্র সংশোধনকারীই মূলত: মর্যাদাশীল ব্যক্তি। কারণ তাকওয়া এমন একটা শক্তি, এমন একটা গুণ, যার উপর ভিত্তি করে মানুষ হক ও বাতিল, ভুল ও সঠিক, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য রেখা টানতে পারে। যিনি শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে সেটিকেই সত্য হিসেবে মেনে নেন যা তিনি নাযিল করেছেন। তিনি সেটিকেই সঠিক মনে করেন, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। যে কাজ বা প্রথা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আরো অসংখ্য ক্ষতির সৃষ্টি করে, যে সকল কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, সেটিই মানুষের জন্য ক্ষতিকারক। এ ধরণের ক্ষতিকর কাজ থেকে আত্মরক্ষাকারীই মুলত: মর্যাদশীল ব্যক্তি।
Posted ১১:৫৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh