নিউইয়র্ক : | বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
বক্তব্য রাখছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো অস্থির। আমাদের রাজনীতি আমরা ঠিক করি না। বাংলাদেশের রাজনীতি ঠিক করেন অন্যরা। আমরা নিয়ন্ত্রিত হই। আগামীতে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ আছে বাংলাদেশের সামনে। নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বর্তমান নতুন সরকার। কারণ রাজনীতি ঠিক হয়নি এখনো। অন্যের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হতে না পারলে বাংলাদেশ সঠিক পথে যাবে না। আমরাও সঠিক বাংলাদেশ পাব না, বলে এ মন্তব্য করেন দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী ।

ফিফা বিশ্বকাপের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র সফররত মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস ঠিক নেই। সরকার বদলায়, বদলে যায় ইতিহাস। এটা হতে পারে না। ইতিহাস ঠিক করতে হলে আমাদেরও ঠিক হতে হবে। ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না। তিনি বলেন, আমরা প্রাপ্তির কাছে নিজেদের সমর্পণ করছি। আমাদের সর্বনাশের মূল এই প্রাপ্তি। ১৪ জুলাই, মঙ্গলবার রাতে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে একটি রেস্টুরেন্ট মিলনায়তনে নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ মন্তব্য করেন মতিউর রহমান চৌধুরী। মতবিনিময় সভায় আলোচনা হয় বাংলাদেশের বর্তমান গণমাধ্যম পরিস্থিতি, প্রবাসে বাংলা সাংবাদিকতার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ, ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তন, সাংবাদিকতার পেশাগত মান এবং ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে বৈশ্বিক গণমাধ্যমের প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে।

মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, একজন সাংবাদিকের আসল পরিচয় তিনি সাংবাদিক। কিন্তু অনেকে রাজনৈতিক দলের পরিচয় দিচ্ছেন সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে। এটা কাম্য নয়। সভায় সাংবাদিককের জেলে রাখা প্রসঙ্গ উঠলে, মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এর বিরুদ্ধে আমিই প্রথম বলেছি- বিচার করতে হয় বিচার করেন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে- আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ঠেলে দিয়েছি এই অবস্থার দিকে। একজন সাংবাদিককে আগে সাংবাদিক এবং পরে রাজনীতির পরিচয় তুলে ধরার পরামর্শ দেন মতিউর রহমান চৌধুরী।
সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মানবজমিন প্রধান সম্পাদক বলেন, আমাদের মধ্যে কোনো ঐক্য নেই। রাজনীতিবিদরা যেমন তিন-চার ভাগে বিভাজিত, আমরাও বিভক্ত। রাজনীতি আমাদের পেটের মধ্যে। আগে আমরা রাজনীতির পরিচয় দেই অমুক দলের লোক বলে। এই পরিস্থিতি পাল্টাতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিকল্প কোনো পথ নেই। কারো পেশা যদি হয় সাংবাদিকতা, তাহলে বাদ দিতে হবে রাজনীতি তিনি প্রশ্ন রাখেন, আজকে আমরা কোথায় যাচ্ছি, দেশটা কোথায় যাচ্ছে? আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? আমরা কী কিছু রেখে যাচ্ছি?
মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আমরা শুধু পেছনে দেখি।
টানাটানি করি অতীত নিয়ে। তিনি বলেন, যার যা প্রাপ্য, তা তাকে দিতে হবে। আজ না হোক, কাল না হোক, পরশু দিতে হবে। এটা না দিলে বার বার ওলট-পালট হবে ইতিহাস। তিনি বলেন, ৫৫ বছরের বাংলাদেশ। এই সময়ে পৃথিবীতে স্বাধীন হয়েছে অন্তত ৩৭টি দেশ। তারা পেছনে নেই। আমরা পেছনে যাচ্ছি। আমরা একে অপরকে পেছন থেকে টানছি যেন উপরে উঠতে না পারে।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ উন্মাদনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নেই, নিজেরাও খেলছে না। তারপরও অন্য দেশকে সমর্থন করতে গিয়ে বিরোধে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের। তিনি বলেন, যেদিন নিজের খেলা খেলতে পারবো, সেদিন বাংলাদেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবো। নিউইয়র্কের সংবাদমাধ্যম ‘ঠিকানা’র সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা ও স্মৃতিচারণ করে মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, একসময় বছরের পর বছর ঠিকানায় লিড নিউজ লিখেছি। তিনি ইতিহাস লেখার পরামর্শ দেন প্রবাসের সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন দৈনিক মানবজমিন ও বাংলাবাজার পত্রিকার সাবেক সাংবাদিকসহ নিউইয়র্কে কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট, টেলিভিশন, অনলাইন ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন, মানবজমিন সম্পাদক মাহবুবা চৌধুরী, ঠিকানা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য এম. এম. শাহীন, প্রবীণ সাংবাদিক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু, মঈনুদ্দীন নাসের, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান, বাংলা পত্রিকা সম্পাদক ও টাইম টিভির সিইও আবু তাহের, আজকাল সম্পাদক ও বিশিষ্ট ব্যবাসায়ী শাহ নেওয়াজ, প্রবীণ সাংবাদিক মুহম্মদ ফজলুর রহমান, সাপ্তাহিক প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন, সিনিয়র সাংবাদিক আকবর হায়দার কিরণ, অধ্যাপিকা হুসনে আরা, ঠিকানার বার্তা সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, এনটিভি উত্তর আমেরিকা ব্যুরো প্রধান ফরিদ আলম, সিনিয়র সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী নিহার সিদ্দিকী, দৈনিক আজকের পত্রিকার সাবেক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম লুতু, সিনিয়র সাংবাদিক দর্পণ কবীর, শওকত ওসমান রচি, মুজাহিদ আনসারী, ঠিকানার সিনিয়র সাংবাদিক নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখিকা মনিজা রহমান, প্রথম আলোর নিউইয়র্ক প্রতিনিধি তোফাজ্জল লিটন, ঠিকানা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার আপেল মাহমুদ, সাংবাদিক সাখাওয়াত হোসেন সেলিম, এনওয়াই কাগজের সম্পাদক আফরোজা ইসলাম, মানবজমিনের যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি সিদ্দিকুর রহমান সুমন, মূলধারার রাজনীতিক মেরি জোবাইদা, নাসিমা আক্তার শাহানা, আজকালের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক রানো নেওয়াজ, সিটি এডিটর অনিক রাজ, সিনিয়র সাংবাদিক হাসান মাহমুদ, সায়েম আহমেদ, ব্যবস্থাপক আবু বকর সিদ্দিক প্রমুখ।
অন্যান্যরা তাদের বক্তব্যে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, দেশে সংবাদপত্রগুলোতে যখন সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব শেষ হয়ে গেছে, তখন মতিউর রহমান চৌধুরী তা টিকিয়ে রেখেছেন পেশার প্রতি তার প্রতিশ্রুতির স্থান থেকে। স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তিনি প্রতিটি সরকারের হুমকির মুখে পড়েছেন, তাকে দেশ ছেড়ে বাইরে কাটাতে হয়েছে, সহকর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করতে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। তারা আরও বলেন, মতিউর রহমান চৌধুরী নবীনদের উৎসাহিত করেছেন সাংবাদিকতায় আসতে, তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। তার ভক্ত-অনুরক্ত সাংবাদিকরা আজ শুধু দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেই নয়, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। তারা তার সুস্থ ও কর্মময় দীর্ঘজীবন কামনা করেন।
মতবিনিময় সভা যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন- আজকালের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর মনোয়ারুল ইসলাম এবং মানবজমিনের সাবেক মহাব্যবস্থাপক আশরাফুল হোসেন নওশাদ। অনুষ্ঠানটি নিউইয়র্কে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, পেশাগত সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেন উপস্থিত সাংবাদিকরা।
মতবিনিময় সভায় মতিউর রহমান চৌধুরী ও মাহবুবা চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। উল্লেখ্য, মতিউর রহমান চৌধুরী দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি দেশের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনাবলি নিয়ে সংবাদ ও বিশ্লেষণ করেছেন। বর্তমানে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক হিসেবে।তাঁর সহধর্মিনী মাহবুবা চৌধুরী মানবজমিনের সম্পাদক এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংবাদ উপস্থাপক। তিনি একজন বিশিষ্ট ছড়াকারও।
Posted ২:১৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh