জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
দীন মানে জীবন ব্যবস্থা। মানুষের দৈনন্দিন জীবন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। সেই ভোর রাতে ঘুম ভাঙ্গার পর থেকে শুরু করে প্রথম রাত অবদি ঘুম যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়। অসংখ্য পেশা ও কাজের সাথে মানুষ জড়িত। এর মধ্যে কিছু আছে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং কিছু আছে পারস্পরিক লেনদেনের সাথে জড়িত।এর মধ্যে কিছু বিষয় আছে পারস্পরিক আদান প্রদান হয় এবং কিছু বিষয় আছে পরিশ্রম ও কথার ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত। এভাবে মানুষের জীবন চক্র পরিচালিত হয়। মানুষের সামগ্রীক কাজ ও কথাকে দীন বলা হয়। এই জীবনের দু’টো ধারা রয়েছে। এক, বৈধ, হালাল ও নৈতিকতা সম্পন্ন। দুই, অবৈধ, হারাম ও নীতি বহির্ভুত। নীতি বহির্ভুত কাজ ও কথা বিভিন্ন মানুষের তৈরী জীবন ব্যবস্থার আলোকে পরিচালিত হয়। এখানে নীতি ও নৈতিকতা নাই, একটি বল্গাহীন জীবন ব্যবস্থা।
কিন্তু ইসলামী জীবন ব্যবস্থা আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থাকে বলে। ইসলাম ছাড়া অন্য কোন জীবন ব্যবস্থা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই নিজের জীবনকে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার আলোকে গড়ে তুলতে হবে। তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অন্য কোন ম তবা পথের অনুসরণ গ্রহণযোগ্য নয়। সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থাকে একমাত্র আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করতে হবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তাদেরকে তো এ ছাড়া আর কোন হুকুম দেয়া হয়নি যে, তারা নিজেদের দীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদাত করবে, সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে, এটিই যথার্থ সত্য ও সঠিক দীন।”(সুরা বাইয়্যেনা:৫) এটি ঐ দিন যা মুহাম্মদ সা: পেশ করেছেন। আহলি কিতাবদর কাছে যেসব কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছিল এবং তাদের কাছে যেসব নবী এসেছিলেন তারাও তাদেরকে সেই একই দীনের তালীম দিয়েছিলেন। যদিও তারা বাতিল-আকীদা-বিশ্বাস গ্রহণ করে বিকৃতি সাধন করেছিল এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কাজ-কর্মের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। যদিও আল্লাহ তার কোনটিরও হুকুম দেননি। সব সময় সত্য ও সঠিক দীন একটিই ছিল। আর সেটি হচ্ছে; একমাত্র আল্লাহর গোলামী করতে হবে। তাঁর গোলামীর সাথে আর কারো গোলামীর মিশ্রণ ঘটানো যাবে না।
সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে এনে একমাত্র আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর ফরমানের অনুগত হতে হবে। সালাত কায়েম করতে হবে। যাকাত দিতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে মুহাম্মদ! তাদেরকে বলে দাও আমার রব তো সততা ও ইনসাফের হুকুম দিয়েছেন। তাঁর হুকুম হচ্ছে, প্রত্যেক ইবাদাত নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখো এবং নিজের দীনকে একান্তভাবে তাঁর জন্য করে নিয়ে তাঁকেই ডাকো। যেভাবে তিনি এখন সৃষ্টি করেছেন ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের আবার সৃষ্টি করা হবেও।”(সুরা আরাফ:২৯) কাজেই কারো বানানো অর্থহীন রীতি-আনুষ্ঠানিকতার সাথে আল্লাহর দীনর কোন সম্পর্ক নেই। তিনি যে দীনের শিক্ষা দিয়েছেন তার মূলনীতি হচ্ছে:
এক, মানুষের নিজের জীবনকে সত্য,সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
দুই, ইবাদাতের ক্ষেত্রে সঠিক লক্ষ্যের ওপর অবিচল থাকতে হবে অর্থাৎ তার ইবাদাতে আল্লাহ ছাড়া আর কোন দিকে ফিরে তার অনুগত্য, দাসত্ব, হীনতা ও দীনতার সামান্যতম প্রকাশও ঘটতে পারবে না। তিন, পথনির্দেশনা, সাহায্য, সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা, হেফাজত ও সংরক্ষণের জন্যে একমাত্র আল্লাহরই কাছে দু’আ চাইতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, এসব বিষয়ের জন্যে দু’আ প্রার্থীকে পূর্বাহ্নেই নিজের দীন তথা সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থাকে একান্তভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে। জীবনের সমগ্র ব্যবস্থা কুফরী, শিরক, গোনাহ ও অন্যের গোলামীর ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। কিন্তু সাহায্য চাওয়া হবে আল্লাহর কাছে এ বলে, হে আল্লাহ! তোমার বিদ্রোহে আমাকে সাহায্য করো, এমনটি যেন না হয়। চার, এ মর্মে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, এ দনিয়ায় সে যেভাবে জন্ম নিয়েছে ঠিক তেমনিভাবে অন্য একটি জগতেও তার জনম হবে এবং সেখানে আল্লাহর কাছে তার সমস্ত কাজের হিসেব দিতে হবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে নবী! বলে দাও, হে লোকেরা! যদি তোমরা এখনো পর্যন্ত আমার দীনের ব্যাপারে কোন সন্দেহের মধ্যে থাকো তাহলে শুনে রাখো, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের গোলামী করো আমি তাদের গোলামী করি না বরং আমি কেবলমাত্র এমন আল্লাহর গোলামী করি যার করতলে রয়েছে তোমাদের মৃত্যু।”(সুরা ইউনুস:১০৪) ইয়াতাওয়াফ্ফকুম শব্দের অর্থ হচ্ছে যিনি তোমাদের মৃত্যু দান করেন। এর ভাবার্থ হচ্ছে, যার করতলে রয়েছে তোমাদের মৃত্যু। অর্থাৎ তোমাদের প্রাণ যে সত্তার করতলগত, যিনি তোমাদের ওপর এমনই পূর্ণাঙ্গ শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী যে, যতক্ষণ তিনি ইচ্ছা করেন ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা জীবনী শক্তি লাভ করতে পারো এবং তার ইশারা হবার সাথে সাথেই তোমাদের নিজেদের প্রাণ সেই প্রাণ স্রষ্টার হাতে সোপর্দ করে দিতে হয়, আমি কেবলমাত্র সেই সত্তারই উপাসনা, বন্দেগী ও দাসত্ব এবং আনুগত্য করার ও হুকুম মেনে চলার কথা বলি।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আমাকে মু’মিনদের অন্তরভুক্ত হবার জন্য হুকুম দেয়া হয়েছে। আর আমাকে বলা হয়েছে, তুমি একনিসঠ হয়ে নিজেকে ঠিকভাবে এ দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করো। এবং কখনো মুশরিকদেও অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”(সুরা ইউনুস:১০৫) এই দাবী যে আগের দাবী থেকে আরো জোরালো তা গভীরভাবে প্রণিধানযোগ্য।বক্তব্য এভাবে বললে বর্ণনাভঙ্গী ঢিলেঢালা হতো যে, তুমি এ দীন অবলম্বন করো অথবা এ দীনের পথে চলো।
কিংবা এ দীনের অনুগত ও অনুসারী হয়ে যাও। কিন্তু মহান আল্লাহ এ দীনকে অবিচল ও তেজোদীপ্ত অনুগত্যের শব্দাবলীর মাধ্যমে নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি আকিম ওয়াজহাকা শব্দ ব্যবহার করে বলেছেন, তোমার চেহেরাকে স্থিও কওে দাও। এর অর্থ তুমি একই দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকো। নড়াচড়া করো না এবং এদিক ওদিক ফিরো না। সামনে, পেছনে, ডাইনে, বাঁয়ে মুড়ে যেয়ো না। একেবারে নাক বরাবর সোজা পথে দৃষ্টি রেখে চলো, যে পথ তোমাকে দেখানো হয়েছে। এটি বড়ই শক্ত বাঁধন ছিল। কিন্তু এখানেই ক্ষান্ত থাকা হয়নি। এর ওপর আরো একটু বাড়তি বাঁধন দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘হানিফা’ অর্থাৎ সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শুধুমাত্র একদিকে মুখ করে থাকো।
কাজেই দাবী হচ্ছে, এ দীন বা জীবন ব্যবস্থা আল্লাহর বন্দেগীর এ পদ্ধতি এবং জীবন যাপন প্রণালীর ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উপাসনা, আরাধনা, ইবাদাত-বন্দেগী, দাসত্ব,আনুগত্য করতে ও হুকুম মেনে চলতে হবে। এমন একনিষ্ঠভাবে করতে হবে যে, অন্য কোন পদ্ধতির দিকে সামান্যতম সম্পর্কও ঝুঁকে পড়াও যাবে না। যেসব পথ তুমি ইতিপূর্বে পরিত্যাগ করে এসেছো এ পথে এসে সেই ভুল পথগুলোর সাথে সামান্যতম সম্পর্কও রাখবে না এবং দুনিয়ার মানুষ যেসব বাঁকা পথে চলেছে সেসব পথের দিকে একবার ভুল করেও তাকাবে না।
দীনকে আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করার আরো ব্যখ্যা এই যে, যারা আল্লাহর সত্তা, তাঁর গুণাবল, অধিকার ও ক্ষমতা-ইখতিয়ারে কোনভাবে অন্য কাউকে শরীক করে কখনো তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া যাবে না। এ অন্য কেউ তারা নিজেরাও হতে পারে অর্থাৎ খেয়াল-খুশির অনুসরণ করা যাবে না আবার অন্য কোন মানুষ, মানবগোষ্ঠী, কোন আত্মা, জিন, ফেরেশতা অথবা কোন বস্তুগত, কাল্পনিক বা আনুমানিক সত্তাও হতে পারে । কাজেই পূর্ণ অবিচলতা সহকারে নির্ভেজাল তাওহিদের পথ অনুসরণ করতে হবে।
ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয় অবস্থায় তাদের থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে যারা কোন না কোন প্রকারে শিরক করে থাকে। শুধু আকিদা বিশ্বসেই নয় কাজে কর্মে ও ব্যক্তি জীবন ধারায়ই নয় সামষ্টিক জবিন বিধানের ক্ষেত্রেও, ইবাদাতগাহ ও উপাসনালয়েই নয় শিক্ষায়তনেও, আদালত,গৃহে, আইন প্রণয়ন পরিষদে, রাজনৈতিক, মঞ্চে, অর্থনৈতিক বাজারে সর্বত্রই যারা নিজেদের চিন্তা ও কর্মের সমগ্র ব্যবস্থাই আল্লাহর আনুগত্য ও গায়রুল্লাহর আনুগত্যের মিশ্রনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। সব জায়গাই তাদের পদ্ধতি থেকে নিজেদের পদ্ধতি আলাদা করে নাও। তাওহীদের অনুসারীরা জীবনের কোন ক্ষেত্র ও বিভাগেও শিরকের অনুসারীদের অনুসৃত পথে পায়ের পথে পা মিলিয়ে চলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে তাদের শিরকের অনুসারীদের পেছনে চলার তো প্রশ্নই ওঠে না এবং এভাবে পেছনে চলার পরও তাদের তাওহীদবাদের দাবী ও চাহিদা নিশ্চিন্ত পূরণ হতে থাকবে এ কথা কল্পনাই করা যায় না।
তারপর শুধুমাত্র সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন শিরক (শিরকে জলী) থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়নি বরং অস্পষ্ট শিরক(শিরকে খফী) থেকেও পুরোপুরি ও কঠোরভাবে দূরে থাকারও আদেশ দেয়া হয়েছে। বরং অস্পষ্ট শিরক আরো বেশী বিপদজনক এবং তার ব্যাপারে সতর্ক থাকার প্রয়োজন আরো অনেক বেশী। কোন কোন অজ্ঞ ব্যক্তি অস্পষ্ট শিরককে হালকা শিরক মনে করে থাকেন। তারা ধারনা করেন, এ ধরনের শিরকের ব্যাপারটা সুস্পষ্ট শিরকের মত অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ অস্পষ্ট মানে হালকা নয় বরং গুপ্ত ও গোপনে লুকিয়ে থাকা। এখন চিন্তা করার ব্যাপার হচ্ছে, যে শত্রু দিন-দুপুরে চেহেরা উন্মুক্ত করে সামনে এসে যায় সেই বেশী বিপদজনক, না যে কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে বা বন্ধু ছদ্মাবরণে এসে ঘনিষ্টভাবে মেলামেশা করছে সে-ই বেশী বিপদজনক। যে রোগের আলামত একেবাওে পরিস্কার দেখা যায় সেটি বেশী ধ্বংসকারক, না যেটি দীর্ঘকাল সুস্থতার ছদ্মাবরণে ভেতরে ভেতরে স্বাস্থ্যকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে সে-ই বেশী ধ্বংসকর।
যে শিরককে প্রত্যেক ব্যক্তি এক নজর দেখেই বলে দেয় এটি শিরক তার সাথে তাওহীদী দীনের সংঘাত একেবারে মুখোমুখি। কিন্তু যে শিরককে বুঝতে হলে গভীর দৃষ্টি ও তাওহীদের দাবীসমূহের নিবিড় ও অতলস্পর্শী উপলব্ধি প্রয়োজন সে তার অদৃশ্য শিকড়গুলো দীনের ব্যবস্থার মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে দেয় যে, সাধারণ তাওহীদবাদীরা তা ঘুর্ণাক্ষরেও টের পায় না তারপর ধীরে ধীরে অবচেতন পদ্ধতিতে সে দীনের সার পদার্থসমূহ এমনভাবে খেয়ে ফেলে যে, কেথাও কোন বিপদ-ঘন্টা বাজাবার সুযোগই আসে না।
দীনকে আল্লাহর জন্য সুনির্দিষ্ট করার এ হুকুম সারা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা: বিভিন্ন দু’আতেও এ কথা বলেছেন। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুখলিসিনা লাহুদ দীন ওলাও কারিহাল কাফিরুন।”সহীহ হাদীসে বর্ণিতএকটি প্রসিদ্ধ দু’আ, রাসলুুল্লাহ সা: প্রতিটি ফরয সালাতের পর এ দু’আটি পড়তেন।
Posted ৩:৪১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh