বাংলাদেশ প্রতিবেদন : | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি
নিউইয়র্ক সিটির অধিকাংশ কমিউনিটি রেস্টুরেন্টে গ্রাহক সেবা বা কাষ্টমার সার্ভিসের বেহাল দশা। বিশেষ করে কুইন্স, ব্রুকলীন ও ব্রঙ্কসের বাংলাদেশী মালিকানাধীন অনেক রেস্টুরেন্টে গ্রাহক সেবা অত্যন্ত নিম্নমানের। ফলে প্রায়শই গ্রাহক সেবা ও খাবারের মান নিয়ে অনেক রেস্টুরেন্ট কর্মী ও গ্রাহকদের মাঝে ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা।
ম্যানহাটানে বাংলাদেশী মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টগুলো পেশাদারিত্ব বজায় রেখে ব্যবসা করছে স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু কুইন্স, ব্রুকলীন ও ব্রঙ্কসের অনেক বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই গ্রাহকদের। ধারণা করা হয় নিউইয়র্ক সিটিতে ব্যবসা করছে তিন শতাধিক বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট।
এসব রেস্টুরেন্টের অবস্থান মূলত বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ওজনপার্ক, এস্টোরিয়া, ব্রুকলীন ও ব্রঙ্কস এলাকায়। বাংলাদেশী বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট অত্যন্ত সুনামের সাথে ব্যবসা করে আসছে নিউইয়র্ক সিটিতে। এসব রেস্টুরেন্টের রেটিং ও সেবার মান উন্নত। তবে সম্প্রতি কমিউনিটিতে অনেক নতুন রেস্টুরেন্ট যেমন আসছে, তেমনি হাতবদল হচ্ছে অতি দ্রুত। উন্নতমানের খাবার ও গ্রাহক সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেস্টুরেন্টগুলোর যাত্রা শুরু হলেও ব্যর্থ হচ্ছে কাংখিত সেবা ও খাবারের মান ধরে রাখতে। ফলে সাফল্যের মুখ দেখছে না এসব রেস্টুরেন্ট।
বিশ্বের অন্যতম সেরা রেস্টুরেন্ট ও খাবারের শহর হলো নিউইয়র্ক। এখানে রেস্তোরাঁ রয়েছে প্রায় ২৩ হাজারের মতো। ১৭০টি দেশের বিখ্যাত সব স্ট্রিট ফুড থেকে শুরু করে মিশেলিন-তারকাযুক্ত দামি এসব রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায় হাজারো স্বাদের খাবার। ম্যানহাটনে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৬ হাজার ৪শ টি রেস্তোরাঁ রয়েছে। এছাড়া ব্রুকলিনে ৪, ৯শ টি, কুইন্সে প্রায় ৩ হাজার ৫শ, ব্রঙ্কসে ২ হাজার ১শ, ও স্টেটেন আইল্যান্ডে চালু আছে ৮৮৪টি টি খাবারের দোকান। কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস এলাকায় পাওয়া যায় জনপ্রিয় হালাল ও ঐতিহ্যবাহী স্বাদের বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় খাবার। আমেরিকায় রেস্টুরেন্টে গ্রাহক সেবার মূল বৈশিষ্ট্য হলো অত্যন্ত আন্তরিক, দ্রুত ও পেশাদার প্রকৃতির।
রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করার সাথে সাথে একজন কর্মী এখানে হাসিমুখে স্বাগত জান্রাবেন এবং বসার জন্য টেবিল দেখিয়ে দেবেন গ্রাহকদের। বসার কিছুক্ষণ পর সার্ভার বা ওয়েটার এসে গ্রাহককে নিজের নাম বলবেন এবং অর্ডার নেবেন পানীয় বা খাবারের। মাঝপথে খাবার কেমন লাগছে তা জানতে চাবেন।
‘সেবাই আদর্শ’ এমন বাণী উচ্চারণ করে কমিউনিটিতে যাত্রা শুরু করেছে, এমন অনেক রেস্টুরেন্টে মিলছে না নূন্যতম গ্রাহক সেবা। নিউইয়র্ক সিটির মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় দেশী স্টাইলে চালিয়ে যাচ্ছে গ্রাহক সেবা। এসব রেস্টুরেন্টে নতুন ও তরুণ কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানো হয় তাদেরকে। গ্রাহক সেবা সম্পর্কে নূন্যতম ধারণাহীন এসব কর্মীরা বিপাকে পড়ে যান কাজ শুরু করে। সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে উঠে আসা এসব তরুণ-তরুণী খাপ খাওয়াতে পারেন না ভিন্ন প্রতিবেশে।
রেস্টরেন্টে আগত গ্রাহককে হাসিমুখে স্বাগত জানিয়ে টেবিলে বসানোর রীতি শেখানো হয় না তাদেরকে। গ্রাহকরা নিজে থেকেই টেবিলে বসে যান। গলা ফাটিয়ে ডাকতে থাকেন ওয়েটার বা কর্মীদের। খাবার অর্ডার করলে কোন খাবারটা আগে গ্রাহকের সামনে দিতে হবে, সে রকম ধারণাও থাকে না অনেক কর্মীর। এমনকি কেউ স্ন্যাকস এবং চায়ের অর্ডার করলে দেখা যায় ওয়েটার আগে চা দিয়ে পড়ে স্ন্যাকস নিয়ে আসছেন। অধিকাংশ রেস্টুরেন্টে দেয়া হয় অত্যন্ত নিম্নমানের প্লাস্টিক কাপ, চামচ, কাগজের প্লেট, বাটি ও ন্যাপকিন। চারজন গ্রাহকের টেবিলে তিনটি ন্যাপকিন দেন এমন ঘটনাও ঘটছে। অনেক খাবারের দোকানের কার্পণ্যতা এতটাই প্রকট যে কাগজের প্লেটে সিঙ্গারার সাথে সস দেয়ার পর প্লেট ভিজে ফুটো হয়ে টেবিলের সাথে মিশে গেছে। খুব কমক্ষেত্রেই রেস্টুরেন্ট কর্মীরা টেবিলে গিয়ে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন।
উল্টো গ্রাহককে দমে দমে ডাকতে হয় ওয়েটারকে। খাবারের মান নিয়েও বাকবিতন্ডা হয় অনেক রেস্টুরেন্টে। এভাবেই মানহীন গ্রাহক সেবা দিয়ে চলছে কমিউনিটির অনেক রেস্টুরেন্ট। মালিক পক্ষের কোন উদ্যোগ আয়োজন নেই উন্নত সেবা প্রদানের।
গ্রাহক সেবা হলো এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রি করার আগে ও পরে ক্রেতাদের সাহায্য করে। সহজ কথায়, এটি গ্রাহককে খুশি রাখার এবং তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি করার কাজ। রেস্টুরেন্ট ব্যবসা সফল করতে এবং টিকিয়ে রাখতে গ্রাহক সেবা বা কাস্টমার সার্ভিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত গ্রাহকের সন্তুষ্টি অর্জন, খাবারের সুনাম বৃদ্ধি এবং পুনরায় ব্যবসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে কোম্পানির ভিত্তি মজবুত করে। গ্রাহক সেবার মূল সুবিধা ও গুরুত্ব হলো গ্রাহক ধরে রাখা। ভালো সেবা পেলে গ্রাহক বারবার ফিরে আসে। যা নতুন ক্রেতা খোঁজার চেয়ে সহজ ও লাভজনক। সন্তুষ্ট গ্রাহক অন্যের কাছে রেস্টুরেন্টের সুনাম করে ভালো দিকগুলো তুলে ধরে, যা নতুন ক্রেতা টানে।
গ্রাহকের প্রশ্ন বা অভিযোগ ধৈর্য ধরে শোনা এবং গ্রাহক সেবা উন্নত করতে কর্মীদের দিতে হবে ভালো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ। যাতে কর্মীরা হাসিমুখে সেবা দিতে পারেন। সেবা শেষে গ্রাহকের মূল্যায়ন বা মতামত নেওয়া। উন্নত গ্রাহক সেবা এবং মান সম্মত খাবার রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সাফল্যের চাবিকাঠি। বিশেষ করে বাথরুম সহ পরিচ্ছন্ন প্রতিবেশ। অনেক রেস্টুরেন্ট মালিক আমলে নেন না এ বিষয়টি। নিউইয়র্ক শহরে রেস্টুরেন্টের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত তদারকি করে। রেস্টুরেন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ বা জরিমানা করা হয়। খাবার সংরক্ষণে সঠিক তাপমাত্রায় কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা বাধ্যতামূলক। পেশাগতস্বাস্থ্য আইন না মানলে সুরক্ষায় শেফ ও কর্মীদের হাত ধোয়ার নিয়ম এবং পরিষ্কার পোশাক পরা জরুরি।
অপর দিকে গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নে বড় একটি ভূমিকা রয়েছে গ্রাহকদেরও। অনেক গ্রাহক ভালো আচরণ করেন না রেস্টুরেন্ট কর্মীদের সাথে। শুধুমাত্র চা-সিঙ্গারার অর্ডার করে মেতে উঠেন আড্ডায়। টেবিল দখল করে সাবাড় করে দেন ঘন্টার পর ঘন্টা। খাবার টেবিল নোংরা করা এবং উচ্চস্বরে কথা বলে বাজারের মত পরিবেশ সৃষ্টি করেন প্রায়শই। আমেরিকার রেস্টুরেন্টগুলোতে বখশিশ বা টিপস দেওয়া সেবার মানের একটি বড় অংশ। অথচ ওয়েটারদেরকে টিপ্্স বা বখশিশ প্রদানে কার্পণ্য করেন অনেক গ্রাহক।
Posted ৪:১০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh