জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
আরবীতে যাকে ‘নাফসে মুতমাইন্না’ বলা হয় তাকে বাংলায় প্রশান্ত আত্মা নামে অভিহিত করা হয়েছে। প্রশান্ত আত্মা বলতে এমন মানুষকে বুঝানো হয়েছে যে, কোন প্রকার সন্দেহ সংশয় ছাড়াই পূর্ণ নিশ্চিন্ততা সহকারে ঠাণ্ডা মাথায় এক ও লা-শরীক আল্লাহকে নিজের রব এবং নবীগণ যে সত্য দীন এনেছিলেন তাকে নিজের দীন ও জীবন বিদান হিসেবে গণ্য করেছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছ থেকে যে বিশ্বাস ও বিধানই পাওয়া গেছে তাকে সে পুরোপুরি সত্য বলে মেনে নিয়েছে। আল্লাহর দীন যে জিনিসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে তাকে সে অনিচ্ছা সত্বেও নয় বরং এই বিশ্বাস সহকাওে বর্জন করেছে যে, সত্যিই তা খারাপ। সত্য প্রীতির পথে যে কোন ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে সে নির্দ্ধিধায় তা করেছে। এই পথে যেসব সংকট, সমস্যা, কষ্ট ও বিপদেও মুখোমুখি হতে হয়েছে হাসি মুখে সেগুলো বরদাশত করেছে।
অন্যায় পথে চলে লোকদের দুনিয়ায় নানান ধরনের স্বার্থ,ঐশ্বর্য ও সুখ-সম্ভার লাভ করার যেসব দৃশ্য সে দেখেছে তা থেকে বঞ্চিত থাকার জন্য তার নিজের মধ্যে কোন ক্ষোভ বা আক্ষেপ জাগেনি। বরং সত্য দীন অনুসরণ করার ফলে সে যে এই সমস্ত আবর্জনা থেকে মুক্ত থেকেছে, এ জন্য সে নিজের মধ্যে পূর্ণ নিশ্চিন্ততা অনুভব করেছে। আল কুরআনের অন্যত্র এটিকে ‘শরহে সদর” বা উন্মুক্ত বক্ষদেশ’ বলা হয়েছে।
আরবী ‘শরহে সদর’ মানে উন্মুক্ত বক্ষ বা খোলা মন। ইসলামী পরিভাষায় পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনাবলীর দ্বারা শিক্ষা গ্রহণ এবং ইসলামকে অতকাট্য ও নির্ভূল সত্য বলে মেনে নেয়ার যোগ্যতাকে উন্মুক্ত বক্ষ বলে। এটি সম্পুর্ণভাবে আল্লাহর এক বিশেষ দান। কোন ব্যাপারে মানুষের বক্ষ উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া মূলত এমন একটি মানসিক অবস্থার নাম, যখন তার মনে উক্ত বিষয় সম্পর্কে কোন দুশ্চিন্তা বা দ্বিধা-দ্বন্ব কিংবা সংশয় থাকে না এবং কোন বিপদের আভাস বা কোন ক্ষতির আশংকাও তাকে ঐ বিষয় গ্রহণ করতে বাধা দিতে পারে না। বরং সে পূর্ণ মানসিক তৃপ্তির সাথে এ সিদ্ধান্ত করে যে, এ জিনিসটি ন্যায় ও সত্য। তাই যাই ঘটুক না কেন আমাকে এর ওপরই চলতে হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন ব্যক্তি যখন ইসলামের পথ অবলম্বন করে তখন আল্লাহ ও রাসুলের পক্ষ থেকে যে নির্দেশই আসে তা সে অনিচ্ছায় নয় বরং খুশি ও আগ্রহের সাথে মেনে নেয়। কিতাব ও সুন্নাহ থেকে যে আকাঈদ ও ধ্যান ধারণা এবং যে নীতিমালা ও নিয়ম কানুন তার সামনে আসে তা সে এমনভাবে গ্রহণ যেন সেটাই হৃদয়ের প্রতিধ্বনি।
কোন অবৈধ সুবিধা পরিত্যাগ করতে তার কোন অনুশোচনা হয় না। সে মনে করে ঐগুলো তার জন্য কল্যাণকর কিছু ছিল না। বরং তা ছিল একটি ক্ষতি যা থেকে আল্লাহর অনুগ্রহ রক্ষা পেয়েছে। অনুরূপ ন্যায় ও সত্যের ওপর কায়েম থাকার কারণে তার যদি কোন ক্ষতি হয় তাহলে সে সেই জন্য আফসোস করে না, ঠাণ্ডা মাথায় বরদাশত করে এবং আল্লাহর পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পরিবর্তে তার কাছে ঐ ক্ষতি হালকা মনে হয়। বিপদাপদ আসলে তার এ একই অবস্থা হয়। সে মনে করে আমার দ্বিতীয় কোন পথই নেই- এ বিপদ থেকে বাঁচার জন্য, যে পথ দিয়ে আমি বেরিয়ে যেতে পারি। আল্লাহর সোজা পথ একটিই। আমাকে সর্বাবস্থায় ঐ পথেই চলতে হবে। বিপদ আসলে আসুক।
এই নিয়ামত সকলকেই আল্লাহ দান করেন না। হযরত মুসা আ: কে যখন ফিরাউনের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তিনি আল্লাহর কাছে ‘উন্মুক্ত বক্ষ’ এর জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,“রাব্বিসরাহলি ছদরি” হে আমার রব! আমার বুককে প্রশস্ত করে দাও বা খুলে দাও।”(সুরা ত্বহা:২৫) অর্থাৎ আমার মনে এ মহান দায়িত্বভার বহন করার মতো হিম্মত সৃষ্টি করে দাও। আমার উৎসাহ-উদ্দীপনা বাড়িয়ে দাও। যেহেতু হযরত মুসা আ: কে একটি বড় কাজের দায়িত্ব সোপর্দ করা হচ্ছিল যা করার জন্য দুরন্ত সাহসের প্রয়োজন তাই তিনি দু’আ করেন, আমাকে এমন ধৈর্য, দৃঢ়তা, সংযম, সহনশীলতা, নির্ভিকতা ও দুর্জয় সংকল্প দান করো যা এ কাজের জন্য প্রয়োজন। সুতরাং প্রতিটি মুসলিমদেরকে শরহে সদর বা উন্মুক্ত বক্ষের জন্য দু’আ করতে হবে। যদি আল্লাহ দয়া করে কাউকে একটি উন্মুক্ত বক্ষ বা খোলা মন দান করেন, তাহলে সেই ব্যক্তি দীনের পথে চলার জন্য তার মন কখনো সংকীর্ণ হবে না। হাজারো বিপদ জেনেও সে সেই পথ থেকে বিরত হবে না।
সত্যিকার অর্থে আল্লাহ যার ভালো চান ইসলামের আলোকিত সোজা পথটি তার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। অর্থাৎ তাঁর মন-মানসিকতা বা বক্ষদেশকে ইসলামের জন্য খুলে দেন। ফলে সে ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে হৃদয়ে পূর্ণ নিসংশয়তা ও নিশ্চয়তা লাভ করে এবং সকল প্রকার সন্দেহ, সংশয় ও দোদুল্যমানতা দূরীভূত হয়। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ যাকে সত্যপথ দেখাবার সংকল্প করেন তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে তিনি গোমরাহীতে নিক্ষেপ করার সংকল্প করেন তার বক্ষদেশ সংকীর্ণ করে দেন এবং এমনভাবে তাকে সংকুচিত করতে থাকেন যে, (ইসলামের কথা চিন্তা করতেই) তার মনে হতে থাকে যেন তার আত্মা আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে। এভাবে আল্লাহ (সত্য থেকে দূরে পলায়ন ও সত্যের প্রতি ঘৃণার) আবিলতা ও অপবিত্রতা বেঈমানদের ওপর চাপিয়ে দেন।”(সুরা আনআম:১২৫)
সালেহ বা সৎকর্মশীল বলতে এমন ব্যক্তি বুঝায় যে তার নিজের চিন্তাধারা, আকীদা-বিশ্বাস, ইচ্ছা, সংকল্প, কথা ও কর্মের মাধ্যমে সত্য-সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং এই সংগে নিজের জীবনে সৎ ও সূনীতি অবলম্বন করে। দুনিয়ায় যারা এ ধরনের লোকদের সংগ লাভ করে এবং আখিরাতেও এদের সাথী হয় তারা বড়ই সৌভাগ্যবান।
অবশ্য কোন ব্যক্তির অনুভূতি মরে গেলে ভিন্ন কথা, নয়তো অসৎ ও দুশ্চরিত্র লোকদের সাথে দুনিয়ায় জীবন যাপন করা আসলে একটি ভয়াবহ শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। আর আখেরাতে তারা যে পরিণামের সস্মুখীন হবে সেই একই পরিণামের ভাগী হয়ে আখেরাতে তাদের সাথী হওয়ার শাস্তি তো তুলনা বিহীন। তাই তো আল্লাহর নেককার বান্দারা হামেশা এই আকাংখা পোষণ করে যে, তারা যেন নেক লোকদের সমাজে বসবাস করতে পারে। যারা দুনিয়ায় সৎ লোকদের সাথে বসবাস করবে অর্থাৎ সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহীনদের কার্যাবলী ধারণ করে তাদের সাথে পথ চলবে, তাদেরকে মৃত্যু থেকে হাশরের ময়দান এবং আল্লাহর আদালত পর্যন্ত সম্মানের সহিত ডাকা হবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“হে প্রশান্ত আত্মা! চলো তোমার রবের দিকে, এমন অবস্থায় যে তুমি সন্তুষ্ট। শামিল হয়ে যাও আমার বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।”(সুরা ফযর:২৭-৩০) এ কথা মৃত্যু কালেও বলা হবে, যখন কিয়ামতের দিন পুনরায় জীবিত হয়ে হাশরের ময়দানের দিকে যেতে থাকবে সে সময়ও বলা হবে এবং আল্লাহর আদালতে পেশ করার সময়ও তাকে একথা বলা হবে। প্রতটি পর্যায়ে তাকে এই মর্মে নিশ্চয়তা দান তরা হবে যে, সে আল্লাহর রহমতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আল্লাহ তা’আলা যে ব্যক্তির বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন এবং যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত আলোতে চলছে, সেকি (সে ব্যক্তির মত হতে পারে যে এসব কথা থেকে কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেনি?) ধ্বংস সে লোকদের জন্য যাদের অন্তর আল্লাহর উপদেশ বাণীতে আরো বেশী কঠোর হয়ে গিয়েছে। সে সুষ্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে ডুবে আছে।”(সুরা যুমার: ২২)
‘শরহে সদর’ মানে উন্মুক্ত বক্ষ বা খোলা মন এর বিপরীত শব্দ হলো, ‘দ্বীকে সদর’ মানে বক্ষ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া, মন সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া। এ অবস্থার মধ্যে মনের মধ্যে ন্যায় ও সত্য প্রবেশের কিছু না কিছু অবকাশ থাকে। কিন্তু আয়াতে উল্লেখিত ‘কাসওয়াতে ক্বালব’ উল্লেখ করা হয়েছে, যার অর্খ মন কঠিন হয়ে যায়। এ অবস্থায় মনের মধ্যে ন্যায় ও সত্য প্রবেশের কোন সুযোগই থাকে না। এ অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন: যে ব্যক্তি এ পর্যায়ে পেীঁছে গিয়েছে তার জন্য সর্বাত্মক ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নেই। এর অর্থ হচ্ছে, মনের সংকীর্ণতার সাথে হলেও কেউ যদি একবার ন্যায় ও সত্যকে কোনভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়ে যায় তাহলেও তার জন্য রক্ষা পাওয়ার কিছু না কিছু সম্ভবনা থাকে। আয়াতের বর্ণনা ভঙ্গি হতে এ বিষয়টি আপনা থেকেই প্রকাশ পায়। যারা রাসুলুল্লাহ সা: এর বিরোধীতায় জেদ ও হঠকারিতা করতে একপায়ে দাঁড়িয়ে ছিল এবং এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেছিল যে, কোনমতেই তাঁর কোন কথা মানবে না, আয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে সাবধান করা। তাদেরকে এ মর্মে সাবধান করা হয়েছে যে, তোমরা তোমাদের এ জিদ ও হঠকারিতাকে অত্যন্ত গর্বের বিষয় বলে মনে করে থাকো। কিন্তু আল্লাহর যিকির এবং তাঁর পক্ষ থেকে আসা উপদেশ বাণী শুনে বিনম্্র হওয়ার পরিবর্তে কেউ যদি আরো বেশী কঠোর হয়ে যায় তাহলে একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় অযোগ্যতা ও দুর্ভাগ্য আর কিছুই নেই।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“ হে নবী! আমি কি তোমার বক্ষদেশ তোমার জন্য উন্মুক্ত করে দেইনি?”(সুরা আলাম নাশরাহ:১) আল কুরআনের যেসব জায়গায় বক্ষদেশ উন্মুক্ত করে দেবার শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিলে সেগুলোর দু’টি অথ জানা যায়। এক, সুরা আন’আমের ১২৫ আয়াতে বলা হয়েছে,“ কাজেই যে ব্যক্তিকে আল্লাহ হেদায়াত দান করার সংকল্প করেন তার বক্ষদেশ উসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।” শুরুতে উল্লেখিত সুরা যুমারের ২২ আয়াত। এই উভয় আয়াতে মুফাসসিরগণ বক্ষদেশ উন্মুক্ত করার অর্থ বলেছেন, সব রকমের মানসিক অশান্তি ও সংশয় মুক্ত হয়ে এ কথার ওপর নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া যে, ইসলামের পথই একমাত্র সত্য এবং ইসলাম মানুষকে যে আকীদা-বিশ্বাস, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও নৈতিকতার যে মূলনীতি এবং হিদায়াত ও বিধিবিধান দান করেছে তা সম্পূর্ণ সঠিক ও নির্ভুল। রাসুলুল্লাহ সা: এর হাদীসখানিও এই একই অর্থ প্রকাশ করে, হুমাইদ ইবনে আব্দুর রহমান রহ: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মু’আবিয়া রা: কে বক্তৃতারত অবস্থায় বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা: কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন। আমি তো কেবল বিতরণকারী, আল্লাহই দানকারী। সর্বদাই এই উম্মত (সত্যিকারের মুসলিম) কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, বিরুদ্ধবাদীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না আল্লাহর হুকুম না আসা পর্যন্ত। (বুখারী:৭১, কিতাবুল ইলম, বাবু মাই ইউরিদিল্লাহ…)
Posted ৫:৫৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh