| বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মাত্র দুই বছর সময় পার করেছে। এর অর্জন ও অপূর্ণতার দিকগুলো আমরা পর্যালোচনা করে দেখতে পারি। জুলাই অভ্যুত্থান দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছে। জনগণ তাদের হারানো ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছে। স্বৈরশাসনের সময় গুম, খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেভাবে সংকুচিত হয়েছিল জুলাই অভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটিয়েছে এবং সেগুলো দূর করার একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে। নানা ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা এবং অনেক ক্ষেত্রে যে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো এখন বাস্তবায়ন না হলেও রাজনৈতিক পরিসরে ভবিষ্যতের জন্য থেকে যাবে। এসব পরিবর্তন বা অর্জনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
এ ধরনের বড় মাত্রার রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থান বা পরিবর্তন মানুষের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি করে। সাধারণভাবে দেখলে পরিবর্তনের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তার অনেকটাই ফিকে হয়ে আসছে। মানুষের জীবন বদলায়নি, রাষ্ট্র বদলায়নি, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থমকে গেছে। সমাজে উগ্রবাদী শক্তির দাপট বেড়েছে, যা বৈষম্য মুক্তির আকাংখার বিপরীতে কাজ করছে। অনেক কিছু আগের ধারাবাহিকতাতেই চলছে। জুলাই একটি নির্বাচিত সরকার দিয়েছে, কিন্তু তাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সংস্কার হবে, এমন আশা অনেকেই আর ধরে রাখতে পারছেন না। এগুলো সবই বাস্তবতা।
বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সূত্রে। মানুষের মনে আশা তৈরি হয় যে সরকার পতনের পর তারা বৈষম্যের অবসান দেখবে। জাতি বা ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার যে আধিপত্য, তা থাকবে না, আমলাতন্ত্র জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে, দুর্নীতি করার সুযোগ থাকবে না, নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে, রাজনৈতিক দখলদারি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হবে, দলগুলো সংকীর্ণ স্বার্থ ও হানাহানি থেকে মুক্ত হবে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে এক নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাষ্ট্রের কাঠামো এতটাই জটিল যে তাকে বদলানো খুব কঠিন। অন্যদিকে রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা যে সংস্কৃতি, সেখানে সহজে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি এখন ক্ষমতায়। সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস যথেষ্ট সময় নয়। তবে রাষ্ট্র সংস্কারের জন-আকাঙ্ক্ষা বা ঐকমত্যে আসা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির অনাগ্রহ ও অনিচ্ছা কোনো লুকানো বিষয় নয়। অনেকে ধরেই নিয়েছেন যে বিএনপিকে দিয়ে আর সংস্কার হবে না। তবে বাংলাদেশের গত দুই বছরের এই বাস্তবতাকে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে সরকার একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান আর গণ-অভ্যুত্থান একটি বিশেষ রাজনৈতিক মুহূর্ত। স্বৈরতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদ থেকে গণতন্ত্রে যাওয়ার পথটি কখনো সরল হয় না। অস্থিরতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, বিভ্রান্তি ও হোঁচট খাওয়া—এসবের মধ্য দিয়েই এগোতে হয়। কিন্তু এ জন্য আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে থাকে বা ভুল করে থাকে সেই দায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নয়। আর বিএনপি যদি গণ-অভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে শেষ পর্যন্ত তুলে ধরতে না পারে, সেটাও এত প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া গণ-অভ্যুত্থানের উচ্চতাকে ম্লান করে না। তারা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। আমরা এই নতুন প্রজন্মকে এবং হাসিনার বর্বরতার শিকার চৌদ্দশ’র বেশি শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। যে ত্রিশ হাজারের বেশি চিরতরে অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে গেছে, তাদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাসহ সম্মানজনক পুনর্বাসনে সরকারকে আহ্বান জানাই। মনে রাখা দরকার, গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় আধিপত্যবাদেরও পতন হয়েছে। হাসিনার পতনকে ভারত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তার পতনের পর থেকেই সে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করে আসছে। এ প্রেক্ষিতে, দেশে সরকার ও বিরোধীদলের ঐক্যবদ্ধ থাকার বিকল্প নেই। গণঅভ্যুত্থানে দেশবাসী জীবন দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের পথ দেখিয়েছে, আমাদের সে পথে চলতে হবে।
Posted ৫:৫২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh