বাংলাদেশ রিপোর্ট : | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে এক নজিরবিহীন এবং কঠোর পরিবর্তন করতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নীতি অনুযায়ী পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই এসাইলাম আবেদনকারীদের প্রাথমিক সাক্ষাৎকার ছাড়াই অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারবে। অভিবাসন নীতিতে এই পরিবর্তনের ফলে কয়েক হাজার বাংলাদেশিসহ প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার এসাইলাম আবেদনকারী বহিস্কার বা ডিপোর্টেশনের ঝুঁকিতে পড়েছেন।
মানবাধিকারকর্মী, অভিবাসন আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম কঠোর অভিবাসন নীতি হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, এই নীতি কেবল মানবিক সংকটই তৈরি করবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের লালিত গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের মূল্যবোধকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। নতুন আশ্রয় নীতি অভিবাসনে বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন আশ্রয় ব্যবস্থায় একটি পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে, যা লাখ লাখ এসাইলাম প্রার্থীকেই তাদের মামলার পক্ষে প্রাথমিক সাক্ষাৎকারের সুযোগ না দিয়েই বহিষ্কার কার্যক্রমে পাঠাতে পারে। নতুন নীতি গত ২৭ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। দক্ষ এসাইলাম অফিসারদের দ্বারা ওইসব আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়েছে, যারা এমনকি বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে অথবা যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়নি।
এখন, ইউএস. সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস, যে সংস্থাটি আশ্রয় দাবির একটি বড় অংশ তদারকি করে, তারা এসব মামলা সরাসরি বহিষ্কার কার্যক্রমের জন্য অভিবাসন আদালতে পাঠাতে পারে, যা বহিষ্কারের আদেশের সংখ্যা বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। দিনটি আরও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে শুরু করুন। প্রতিদিন সকালে আপনার ইনবক্সে আপনার প্রয়োজনীয় সব খবর পান।
একটি যৌথ বিবৃতিতে, ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং টঝঈওঝ বলেছে যে নতুন নিয়মটি আশ্রয় ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য মামলার জট কমানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে, যেখানে আনুমানিক ১.৪ মিলিয়ন মামলা বিচারাধীন রয়েছে। গত জুন মাসের ২৫ তারিখে মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে মেক্সিকোর মেক্সিকালিতে সীমান্ত পারাপারের দিকে গাড়িগুলো এগিয়ে যাচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে রায় দিয়ে ফেডারেল সরকারের সেই ক্ষমতাকে সমর্থন করেছে, যার মাধ্যমে কর্মকর্তারা যখন মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত পারাপার অতিরিক্ত আশ্রয় দাবিগুলো সামলানোর জন্য অত্যধিক চাপের মধ্যে রয়েছে, তখন আশ্রয়প্রার্থীদের ফিরিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞরা নতুন নিয়মটির সমালোচনা করে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় থাকা অবস্থায় অভিবাসীদের ইতোমধ্যেই সীমিত সুরক্ষা কেড়ে নিয়ে প্রশাসনের বহিষ্কার কর্মসূচিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নিয়মের ফলে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের কাছে বিচারাধীন প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার অ্যাসাইলামের আবেদন সরাসরি বিচার বিভাগের ইমিগ্রেশন কোর্টে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগে নিয়ম ছিল, যারা বৈধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন বা যাদের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নেই-তারা একজন বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত আশ্রয় কর্মকর্তার (অ্যাসাইলাম অফিসার) সামনে নিজেদের আবেদন উপস্থাপন করার সুযোগ পেতেন।
যদি কোনো কারণে সেই কর্মকর্তার কাছে আবেদনটি গ্রহণযোগ্য না হতো, তবে অ্যাসাইলাম অফিসার আবেদনকারীকে বহিষ্কার-প্রক্রিয়ার জন্য ইমিগ্রেশন আদালতে পাঠাতে পারতেন, অথবা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তাদের আবেদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারতেন। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক আবেদনকারী শেষ পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকত্ব অর্জনের পথেও অগ্রসর হতে পারতেন।
কিন্তু নতুন নিয়মের অধীনে ট্রাম্প প্রশাসন ইমিগ্রেশন বিচারকদের এমন ক্ষমতা প্রদান করেছে-যার মাধ্যমে তারা কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শুনানি ছাড়াই নির্দিষ্ট কিছু মামলা সরাসরি খারিজ করে দিতে পারবেন। এর অর্থ হলো, যেসব মানুষ নিজেদের জীবন বাঁচাতে, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পেতে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা নিজেদের স্বপক্ষে কোনো যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ পাওয়ার আগেই নিজ দেশে নির্বাসিত হতে পারেন। সার্বিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের এ নতুন নিয়ম এবং ধারাবাহিক অভিযানগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে। বৈধ আশ্রয়ের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তি থেকে শুরু করে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া প্রযুক্তিকর্মী- সবাই এখন সমানভাবে বহিষ্কারের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
এয়ারপোর্টে বাড়ছে আইস এর অভিযান : যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসন আইন প্রয়োগে নতুন ধারা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট আইস এর অভিযান জোরদার করেছে। একই সময়ে অ্যাসাইলাম আবেদন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সংস্থা (ইউএসসিআইএস)। অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, এই দুটি পরিবর্তনের ফলে যাদের অ্যাসাইলাম, স্ট্যাটাস পরিবর্তন, গ্রিন কার্ড বা অন্য কোনো ইমিগ্রেশন আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, তাদের জন্য বিমান ভ্রমণ আগের তুলনায় বেশি স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। রয়টার্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সান ফ্রান্সিসকো, লস অ্যাঞ্জেলেস, লাস ভেগাস, ডেনভার, ন্যাশভিলসহ বিভিন্ন বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন-সংক্রান্ত কারণে যাত্রীদের আটক করার ঘটনা বেড়েছে। এসব অভিযানে শুধু চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই নন, কিছু ক্ষেত্রে বিচারাধীন ইমিগ্রেশন আবেদন বা ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতায় থাকা ব্যক্তিদেরও আটক করা হয়েছে।
এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে ঘটে যাওয়া একটি বহুল আলোচিত ঘটনা। গত সপ্তাহে বাল্টিমোর ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (বিডব্লিউআই) অভ্যন্তরীণ একটি ফ্লাইটে ওঠার সময় জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষক ফাতিমা আমেকাকে আইস আটক করে। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে তাকে মুক্তি দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) জানায়, তিনি ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন এবং সে কারণেই অভিবাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী, গবেষক ও কয়েকজন আইনপ্রণেতা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিমানবন্দরে অভিযানের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিএসএ) ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩১ হাজারের বেশি যাত্রীর তথ্য আইস এর কাছে পাঠায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ৮০০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়। ডিএইচএস বলছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের স্বার্থে সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান প্রদান আইনসম্মত। তবে অভিবাসন অধিকারকর্মীরা বলছেন, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের জন্য তৈরি যাত্রী তথ্যব্যবস্থা এখন বেসামরিক অভিবাসন আইন প্রয়োগেও ব্যবহৃত হওয়ায় অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
এদিকে অ্যাসাইলাম আবেদনকারীদের জন্যও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। ইউএসসিআইএস সম্প্রতি একটি অন্তর্বর্তীকালীন চূড়ান্ত বিধি কার্যকর করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে অ্যাসাইলাম কর্মকর্তা আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার না নিয়েই আবেদনটি সরাসরি ইমিগ্রেশন কোর্টে পাঠাতে পারবেন। সরকারের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের মামলার জট কমানো এবং দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিবাসন আইন কর্মকর্তাদের একাংশের আশঙ্কা, সাক্ষাৎকারের সুযোগ কমে গেলে অনেক আবেদনকারী তাদের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বা আশ্রয় চাওয়ার কারণ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারাতে পারেন। যদিও কোনো আবেদন সরাসরি ইমিগ্রেশন কোর্টে পাঠানো মানেই সেটি বাতিল নয়। সে ক্ষেত্রে আবেদনকারী একজন ইমিগ্রেশন বিচারকের সামনে পূর্ণাঙ্গ শুনানির সুযোগ পাবেন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে অভিবাসন আইনজীবীরাও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, যাদের অ্যাসাইলাম মামলা, স্ট্যাটাস পরিবর্তনের আবেদন, গ্রিন কার্ড বা ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন এখনো বিচারাধীন, তারা অপ্রয়োজনীয় বিমান ভ্রমণের আগে অবশ্যই নিজেদের আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
একই সঙ্গে ভ্রমণের সময় বৈধ পরিচয়পত্র, ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত নথিপত্র এবং প্রয়োজনে আইনজীবীর যোগাযোগের তথ্য সঙ্গে রাখার পরামর্শও দিচ্ছেন তারা। ইমিগ্রেশন আইনজীবীরা আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বিচারাধীন আবেদন থাকা মানেই সবাইকে আটক করা হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। প্রতিটি মামলার আইনি অবস্থা, নথিপত্র এবং ব্যক্তির অভিবাসন ইতিহাস আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর না করে, ডিএচএস, ইউএসসিআইএস এবং অভিজ্ঞ ইমিগ্রেশন আইনজীবীর পরামর্শ অনুসরণ করাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
Posted ৪:২০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh