আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : | বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
স্বাধীন হোসেন
মাত্র সতেরো বছর বয়সী কিশোর স্বাধীন হোসেন বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ থেকে অজানার পথে বের হয়ে এসেছিল নতুন এক গন্তব্যে। সেই গন্তব্য ছিল পৃথিবীর বাণিজ্যিক রাজধানী যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল মহানগরী নিউইয়র্কে।
অচেনা বিশাল এই নগরীতে তাঁর শুরুটা ছিল টিকে থাকার প্রাণান্ত এক সংগ্রাম। সে সংগ্রামে তিনি টিকে গেছেন এবং নিজের স্থান করে নিয়েছেন। তার পুঁজি ছিল শিল্পকর্মে তার সীমাহীন আগ্রহ। নিজেকে থিতু করে নিউইয়র্কে ব্যস্ততম এবং বিশ্বের কোটি মানুষের আকর্ষণের স্থান ম্যানহাটানের থার্ড এভিনিউয়ে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন একটি আর্ট গ্যালারি ‘গ্যালেরিয়া অন থার্ড’। বিখ্যাত শিল্পীদের শিল্পকর্মের কপি ফ্রেমে বাঁধাই করে বিক্রয় করা ছাড়াও উঠতি শিল্পীদের শিল্পকর্মের আদর্শ স্থানে পরিণত করেন তার প্রতিষ্ঠানকে।

আড়াই দশক পর তিনি তার গ্যালারি থার্ড এভিনিউ থেকে স্থানান্তর করেছেন পরিবর্তন করে ম্যানহাটানের সেকেণ্ড এভিনিউয়ের ৪৮ ষ্ট্রিটে। তার গ্যালারি যেহেতু ‘গ্যালেরিয়া অন থার্ড’ নামে ব্র্যান্ডেড, সেজন্য সেকেন্ড এভিনিউয়ে এসেও তিনি তার প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করেননি। নতুন লোকেশনে তার পুরোনো গুণগ্রাহীরা ছাড়াও আসছেন নতুন নতুন গ্রাহক ও শিল্পবোদ্ধারা।

জাতিসংঘ সদর দফতর থেকে হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে যখন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদান করতে সারাবিশ্বের দেশগুলো থেকে আগত উচ্চ পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিরা নিউইয়র্কে আসেন, তখন ম্যানহাটানে উপচে উঠে বিভিন্ন জাতিধর্ম ও বৈশিষ্টের লোকজন। তারা ম্যানহাটান চষে বেড়ান। তারা স্বাধীন হোসেনের ‘গ্যালেরিয়া অন থার্ড’ এ আসেন শিল্প বৈচিত্র্য ও ছবির ফ্রেমিং এর কারুকার্য দেখে।

তারা বিস্ময়াভিভূত হয়ে দেখে একটি শিল্পকর্ম কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফ্রেমের কারণে মনোরম হয়ে উঠে। পৃথক এক সৌন্দর্যমন্ডিত ও অর্থপূর্ণ অতুলনীয় শৈল্পিক রূপ ধারণ করে। যিনি শিল্পীও তিনিও নান্দনিক বাঁধাইয়ে মুগ্ধ হন, ক্রেতা ও দর্শকরাও মোহিত হন। সামগ্রিকভাবে স্বাধীন হোসেনের ব্যতিক্রমী কারিগরি দক্ষতা, সুলভ মূল্যে ছবি বাঁধাই ও অসাধারণ বন্ধুসুলভ গ্রাহকসেবার গুণে তার গ্যালারিতে আগতরা তার বন্ধুতে পরিণত হন। যারা একবার তার গ্যালারিতে আসেন, তারা বার বার আসেন এবং পরিচিতদের সুপারিশ করেন সেখানে যেতে।
প্রতিভাবান স্বাধীন হোসেন তার শিল্পগুণকে কাজে লাগিয়েছেন বিশেষ করে থ্রি-ডাইমেনশনাল বা ৩-ডি কৌশলে। এই মাধ্যমে তিনি মূলত নিউইয়র্ককে তুলে ধরেছেন। তার গ্যালারিতে তারই উদ্ভাবিত সারি সারি ৩-ডি চিত্রগুলোর ওপর চোখ ফেললে মনে হবে পুরো নিউইয়র্ক সিটি, এবং বিশেষ করে ম্যানহাটান স্থান করে নিয়েছে তার আর্ট গ্যালারিতে। তিনি কেবল শিল্পকর্ম ও চিত্রকর্মের জাদুঘর মানের কাস্টম ফ্রেমিংয়ের কাজের মাধ্যমে নিজেকে খ্যাত করেছেন তাই নয়, তার গ্যালারিকে শিল্পগন্তব্যে রূপান্তরিত করেছেন স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শিল্পপ্রেমী ও সংগ্রাহকদের জন্য একটি আন্তরিক ও স্বাগত জানানোর পরিবেশ সৃষ্টি করে। সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতার প্রমাণ রাখছেন ‘চ্যারিটি এক্সিবিশন’ আয়োজন করে মানবসেবায় নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সহায়তা করার মাধ্যমে।
করোনাকালেও তার প্রতিষ্ঠান মাস্ক বিতরণসহ সেবামূলক কাজে নিয়োজিত ছিল। প্রতিশ্রুতিশীল উদীয়মান শিল্পীদের পরামর্শ দেওয়া এবং পরিবেশ সংগঠনগুলোকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তার সহায়তার হাত বিস্তৃত হয়েছে মসজিদ, মন্দিরের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে। পথচারিদের মাঝে তিনি বিতরণ করেন সুপেয় পানি।
পরিশ্রমী ও অধ্যাবসায়ী উদ্যোক্তা স্বাধীন হোসেন বলেন, “আমরা সব ধরনের, সব আকারের ফ্রেমের সমৃদ্ধ সংগ্রহ থেকে শিল্পবোদ্ধাদের ফ্রেম ও মাউন্টিং বেছে নিতে সহায়তা করি। কেউ যখন নতুন বাড়িতে উঠেন, আমরা তার বাড়ি সাজানোর কিছু চাপ আমাদের ওপর নিয়ে নিই। অনেকের পারিবারিক ছবি, প্রিয় পোস্টার এবং চিত্রকর্ম জাদুঘর-মানের কাস্টম ফ্রেমিং করে দেই তাদের বাজেটের মধ্যে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, ফটোগ্রাফার, ফ্যাশন জগতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বড় কোম্পানি এবং ছোট ব্যবসার সঙ্গেও কাজ করে যাচ্ছি। শুধু ফ্রেমিং নয়, আমরা সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের মূল শিল্পকর্মও বিক্রয় করি এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থের একটি অংশ মানবিক সাহায্য সংস্থা ‘স্মাইল ট্রেন’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন’ এ দান করি। আমরা শিল্পকর্মকে সমাজসেবার স্থানে নিতে পেরেছি, এজন্য আমরা আত্মতৃপ্তি অনুভব করি।” তিনি নিউইয়র্কবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির মাঝেও তার সেবামূলক কাজ সম্প্রসারিত করতে চান। আগ্রহীরা ‘গ্যালেরিয়া অন থার্ড’ এর অনলাইন পোর্টাল galleriaonthird.com, shadin.org ভিজিট করে আরও বিস্তারিত জানতে পারেন।
Posted ৫:২৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh
(3063 বার পঠিত)
(2440 বার পঠিত)