| বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট ২০২৫
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বিডিআর বিদ্রোহের নামে ৫৭ জন সেনা অফিসারসহ ৭৪ জনকে হত্যা করে। ১৬ বছরের শাসনামলে পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে তোলে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে এবং নির্বাচন কমিশনকে বশংবদ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। একই সাথে ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এভাবেই বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশেকে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে। ফ্যাসিবাদী ও বৈষম্যমূলক শাসনের প্রতিবাদে দেশের ছাত্র-জনতা সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলে।
গতবছরের ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই সর্বজনীন আন্দোলনের মাধ্যমে একটি সফল গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে। সহস্রাধিক মানুষ এই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হন। ২০ হাজারের অধিক মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন। আন্দোলনের মুখে টিকতে না পেরে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রী পরিষদ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতিসহ আপীল বিভাগের বিচারপতিগণও পদত্যাগে বাধ্য হন। দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
অভ্যুথান পরবর্তী সময়ে (৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত) দেশে কোন সরকার বিদ্যমান না থাকায় সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়। জনগণের অভিপ্রায়ই সরকারের বৈধতার স্বীকৃত উৎস। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ফ্যাসিবাদী অবকাঠামোর বিলোপ ও রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদী শাসনকালীন সময়ে সংঘটিত সকল ঘৃণ্য ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অন্তবর্তী সরকার গত ৫ আগস্ট জাতির সামনে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছে। সংস্কার কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত প্রস্তাবনাসমূহ সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক গৃহীত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
যেসব প্রস্তাবনা ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক গৃহীত হবে সেসব প্রস্তাবনার উপর ভিত্তি করেই জুলাই সনদ প্রণয়ন হতে যাচ্ছে। জুলাই সনদ কার্যকরের বাস্তবসম্মত পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোন সুযোগ নেই। জুলাই সনদকে সংবিধানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল অস্থায়ী সরকারের পঠিত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক জীবন্ত দলিল, যা বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান। ইতিহাসে যে কয়টি প্রক্লেমেশন সবচেয়ে আলোচিত এর মধ্যে ১৮৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অব্রোহাম লিঙ্কন এর ঘোষিত ‘ইমানসিপেশন প্রক্লেমেশন’ অন্যতম। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দলিল। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কনফেডারেট রাজ্যগুলোতে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়, য্য নাগরিক অধিকার এবং মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এছাড়াও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আরেকটি কার্যকরী পদ্ধতি হতে পারে গণভোট জুলাই সনদের কোন বিধানের সাথে বিদ্যমান সংবিধানের কোন অংশ সাংঘর্ষিক হলে জুলাই সনদ প্রাধান্য পাবে। স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পূর্বাপর সময়ে বিভিন্ন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আইনগত ভিত্তি ছিল ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ১৯৭০’। ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে আইয়ুব খানের পতনের পর ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারি করেন। ১৯৬২ সালের সংবিধান স্থগিত হয়ে যায়। একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার আইনি ভিত্তি হিসেবে এলএফও জারি করা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলে গঠিত ‘অস্থায়ী সরকার’ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন। ১৯৮১ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান শহাদাত বরণ করলে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন।
১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সংসদ ভেঙে দিয়ে সংবিধান স্থগিত করেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে জাতীয় ঐকমত্যের আলোকে এরশাদ তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। পূর্বের শাসকগণ সামরিক আইন জারির মাধ্যমে সংবিধানের উল্লেখযোগ্য বিধানাবলি স্থগিত করেছেন। প্রয়োজনীয়তার নীতির (Doctrine of ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করেছেন। ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
এটি ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী ও গোত্র নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান। অন্তবর্তীকালীন সরকারের গঠন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে জনগণের অভিব্যক্তির প্রতিফলনরূপে। সংবিধানের ৬ অনুচ্ছেদের অধীন সুপ্রিম কোর্ট যে মতামত প্রদান করেছে এর কার্যকারিতা নেই। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার সরাসরি প্রতিফলনই জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি। রাষ্ট্রপতির ঘোষণাপত্র বা গণভোট জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রদানের স্বীকৃত ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।
Posted ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh