বাংলাদেশ ডেস্ক : | বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
নিউইয়র্কে মেডিকেইডভিত্তিক হোম কেয়ার ও সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে কেয়ার সেবার নামে প্রায় ৬৮ মিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগে জাকিয়া খান ও আহসান ইজাজ নামের দুই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আমেরিকানের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে মামলা হয়েছে। ফেডারেল তদন্তকারীদের অভিযোগ, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় সাত বছর ধরে সংঘবদ্ধভাবে ভুয়া বিল, কাগুজে সেবা ও কিকব্যাকের মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিন বরোর দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত কনি আইল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রস্নান ও বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে গড়ে ওঠা এই এলাকায় প্রতিদিনই পর্যটকদের ভিড় থাকে। তবে আলোঝলমলের আড়ালে এখানে বসবাস করেন বিপুলসংখ্যক অভিবাসী পরিবার, প্রবীণ নাগরিক এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে জীবনযাপন করা মানুষ। এই বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই এলাকায় মেডিকেইডভিত্তিক ডে কেয়ার ও হোম কেয়ার সেবার বিস্তার ঘটে।
ফেডারেল আদালতের নথি অনুযায়ী, অভিযুক্ত জাকিয়া খান ও তার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগী আহসান ইজাজ ব্রুকলিনের কনি আইল্যান্ড এলাকায় দুটি সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে কেয়ার সেন্টারের মালিক ও পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো হ্যাপি ফ্যামিলি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার ইনক. এবং ফ্যামিলি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার ইনক.। পাশাপাশি তারা একটি হোম কেয়ার–সংক্রান্ত আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান রেসপনসিবল কেয়ার স্টাফিং ইনক. পরিচালনা করতেন।আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, এই জালিয়াতির সূচনা হয় ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে এবং তা চলে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত। প্রায় সাত বছর ধরে একই কৌশলে মেডিকেইড থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ তোলা হয়েছে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে তথাকথিত ‘মার্কেটারদের’ মাধ্যমে মেডিকেইডভুক্ত প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের সংগ্রহ করা হতো। কনি আইল্যান্ড, বাথ বিচসহ আশপাশের এলাকায় গিয়ে এসব মার্কেটার নগদ অর্থ, উপহার কিংবা বিনা খরচে যাতায়াতের প্রলোভন দেখিয়ে ডে কেয়ার সেন্টারে নাম লেখাতে উৎসাহিত করতেন। এরপর সেই নাম ব্যবহার করে মেডিকেইডে নিয়মিত বিল জমা দেওয়া হতো।
অভিযোগ অনুযায়ী, বহু ক্ষেত্রেই যে সেবার জন্য বিল করা হয়েছে, বাস্তবে সেই সেবা দেওয়া হয়নি। কোথাও সেবাই ছিল না, আবার কোথাও ঘুষ ও কিকব্যাকের বিনিময়ে কেবল কাগজে উপস্থিতি দেখানো হয়েছে।এই জালিয়াতির ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের মেডিকেইড কর্মসূচি কনজিউমার ডিরেক্টেড পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (সিডিপিএপি)। এই কর্মসূচির আওতায় মেডিকেইডভুক্ত ব্যক্তি নিজের পরিচর্যাকারী নিজেই বেছে নিতে পারেন, যা অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যও হয়ে থাকেন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মসূচিটি ইতিবাচক হলেও দুর্বল তদারকির কারণে এর মধ্যেই বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়।
ফেডারেল অভিযোগে বলা হয়, সিডিপিএপি কর্মসূচির আওতায় থাকা তথাকথিত ফিসকাল ইন্টারমিডিয়ারি কাঠামোকেই কাজে লাগিয়েছে রেসপনসিবল কেয়ার স্টাফিং ইনক.। কাগজে সেবা দেখিয়ে বিল তোলা হতো, আর আড়ালে চলত নিয়মিত কিকব্যাক ও ঘুষের লেনদেন। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, জালিয়াতির অর্থ আড়াল করতে একাধিক ব্যবসায়িক সত্তা ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে জাকিয়া খানের মালিকানাধীন টানউই সার্ভিসেস ইনকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জালিয়াতির অর্থ গ্রহণ ও নগদে রূপান্তর করা হতো।
ফেডারেল তদন্তকারীরা জানান, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, শেল কোম্পানি ও ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে নগদ অর্থ তৈরি করা হতো, যা দিয়ে নিয়মিত কিকব্যাক ও ঘুষ দেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের মেডিকেইড প্রশাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা দপ্তরের (এইচএইচএস) ইনস্পেক্টর জেনারেল অফিসের নিয়মিত অডিট ও আর্থিক বিশ্লেষণে প্রথম এই অনিয়ম ধরা পড়ে। বিলিং তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, একই ধরনের ডে কেয়ার সেবার জন্য অস্বাভাবিকভাবে বিপুল অঙ্কের বিল জমা দেওয়া হচ্ছে।একাধিক ঘটনায় একই সুবিধাভোগীর নাম বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে যেসব দিনে সেবা দেওয়ার কথা দেখানো হয়েছে, সেই দিনগুলোতে সংশ্লিষ্ট মেডিকেইড সুবিধাভোগীরা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবস্থান করছিলেন।
এসব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করেই তদন্তকারীদের সন্দেহ ঘনীভূত হয়। এরপর বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ ফেডারেল অপরাধ তদন্তে রূপ নেয়। গত ৯ অক্টোবর ভোরে নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন স্থানে একযোগে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই), স্বাস্থ্য ও মানবসেবা দপ্তরের ইনস্পেক্টর জেনারেল অফিস (এইচএইচএস-ওআইজি) এবং নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) যৌথ দল। অভিযুক্তদের বাসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে জাকিয়া খান ও আহসান ইজাজকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে হাজির করা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। বহু বছরের গোপন জালিয়াতির অভিযোগ আদালতে ওঠার পর বিষয়টি দ্রুতই নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার গণমাধ্যমে আলোচিত হয়। এই ঘটনায় নিউইয়র্কের বাংলাদেশিসহ অন্যান্য অভিবাসী কমিউনিটিতে বিস্ময় ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যেসব ডে কেয়ার সেন্টারকে অনেক পরিবার প্রবীণ সদস্যদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করেছিল, সেগুলোর নাম ফেডারেল অভিযোগে উঠে আসায় অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। অনেক প্রবীণ ও তাদের স্বজনদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তাদের নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য কোনোভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে কি না।
Posted ১:০২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh
(3054 বার পঠিত)
(2344 বার পঠিত)