নিউইয়র্ক : | বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
আধ্যাত্মিকতা, আত্মঅন্বেষণ, নৈতিক বিকাশ এবং ঐশী প্রজ্ঞার সন্ধান নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে আহ্বান জানিয়েছেন লেখক ও গবেষক আহমেদ এইচ. খান। তাঁর গ্রন্থ ‘পারস্যুইট অব দ্য ডিভাইন ইনসাইট’ নিয়ে ২৮ জুন রোববার বিকালে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে ঠিকানা হাবে এক মননশীল আলোচনা অনুষ্ঠানের এ আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে বইটির মূল ভাবনা, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বর্তমান সময়ে আত্মিক চর্চা ও মুক্তচিন্তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন উপস্থিত বক্তারা। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল আধুনিক বিশ্বে মানুষ ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর, প্রতিযোগিতামুখী এবং বাহ্যিক সাফল্যের পেছনে ছুটছে। কিন্তু এই দৌড়ঝাঁপের ভেতরে মানুষ অনেক সময় নিজের অন্তর্জগত, আত্মপরিচয় ও নৈতিক বোধ থেকে দূরে সরে যায়। এমন বাস্তবতায় ‘পারস্যুইট অব দ্য ডিভাইন ইনসাইট’ পাঠককে থেমে ভাবতে, নিজের ভেতরে তাকাতে এবং জীবনের গভীর অর্থ অনুসন্ধানে উৎসাহিত করে।

বইটির অন্যতম মূল বক্তব্য হলো- ‘দ্য ডিভাইন হুইসপারস টু দোজ হু সিক উইথ অ্যান ওপেন মাইন্ড’, অর্থাৎ, যারা উন্মুক্ত মন নিয়ে সত্যের সন্ধান করেন, ঐশী সত্য তাদের কাছেই ধীরে ধীরে নিজেকে প্রকাশ করে। লেখকের মতে- সত্যের সন্ধান কোনো সংকীর্ণ চিন্তা, অহংকার বা পূর্বধারণার মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং, এর জন্য প্রয়োজন বিনয়, ধৈর্য, আত্মসমালোচনা এবং মুক্তচিন্তার সাহস।

আহমেদ এইচ. খান তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি কোনো হঠাৎ প্রাপ্ত বিষয় নয়। এটি দীর্ঘ আত্মঅন্বেষণের ফল। মানুষের জীবনে সাফল্য যেমন শিক্ষা দেয়, তেমনি ব্যর্থতা, বেদনা, একাকিত্ব ও সংগ্রামও মানুষকে গভীর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে সেই শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন অনুসন্ধিৎসু মন ও সংবেদনশীল হৃদয়।
লেখকের মতে- জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতার মধ্যেই একটি বার্তা থাকে। মানুষ যখন নিজের অভিজ্ঞতাকে কেবল সুখ-দুঃখের ঘটনা হিসেবে না দেখে শিক্ষা ও উপলব্ধির উৎস হিসেবে বিবেচনা করে, তখন তার ভেতরে আত্মিক পরিপক্কতা তৈরি হয়। এই পরিপক্কতাই মানুষকে সত্য, ন্যায়, ভালোবাসা ও মানবিকতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
অনুষ্ঠানে আলোচকরা বলেন, বইটিতে আধ্যাত্মিকতার ধারণাকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা সংস্কৃতির সীমার মধ্যে আবদ্ধ করা হয়নি। বরং আধ্যাত্মিকতাকে মানবজাতির সার্বজনীন অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সহমর্মিতা, সততা, বিনয়, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসাকে লেখক ঐশী সত্যের পথে গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন হিসেবে দেখিয়েছেন।
বইটিতে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তির অতিনির্ভরতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়েও চিন্তাশীল আলোচনা রয়েছে। লেখক মনে করেন, মানুষ আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিজের ভেতরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন। বাইরের শব্দ, প্রতিযোগিতা ও স্বীকৃতির আকাক্সক্ষা মানুষের নীরব আত্মকণ্ঠকে ঢেকে দেয়। অথচ সত্য অনেক সময় উচ্চকণ্ঠে নয়, নীরবতা ও গভীর মননের মধ্য দিয়েই মানুষের কাছে ধরা দেয়।
লেখক ও সাংবাদিক আকবর হায়দার কিরণের সভাপতিত্বে এবং সিমেন্স ডিজিটাল ইন্ডাস্ট্রিজ সফটওয়্যারের সিনিয়র ডিরেক্টর ড. আবু মাহমুদুল হাসানের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের পরিচালক এবং বার্মিংহাম ইসলামিক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. নাসিম উদ্দিন। প্রধান অতিথি ছিলেন জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের পরিচালক ও বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ইমাম শামসি আলী।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঠিকানার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম এম শাহীন, লেখক ও কলামিস্ট মাহমুদ রেজা চৌধুরী, বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সমাজসেবক সৈয়দ জাকি হোসেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কমোডর (অব.) ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ কালিম উল্লাহ এবং আল মামুর স্কুল বোর্ড অব ট্রাস্টিজের নির্বাহী পরিচালক সামি উর রব। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আল মামুর স্কুল বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. পাটোয়ারী, বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব এমাদ চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন, সাহিত্য অ্যাকাডেমির প্রধান নির্বাহী মোশাররফ হোসেন, লেখক ও সাংবাদিক মনিজা রহমান, সাংবাদিক জাবেদ খসরু, কবি রওশন হাসান, লেখক ড. রফিকুন ইসলাম, লেখক ম. আমিনুল হক চুন্নু, সাংবাদিক এমদাদ দিপু, কমিউনিটি লিডার জয়নাল আবেদিন, ডা. সৈয়দ আল আমীন রাসেল, জাহাঙ্গীর হোসেন, শাহীন আফজাল, এনায়েত হোসেন জালাল এবং আফজুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত পাঠক ও অতিথিরা বলেন, বর্তমান সময়ে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, সামাজিক বিভাজন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে আধ্যাত্মিক আলোচনা ও আত্মঅন্বেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আলোচনায় আরও উঠে আসে, মুক্তচিন্তা মানে ধর্মহীনতা বা মূল্যবোধহীনতা নয়; বরং মুক্তচিন্তা হলো সত্যকে জানার সাহস, প্রশ্ন করার মানসিকতা এবং সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর মানবিক উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়া। বক্তারা বলেন, আহমেদ এইচ. খানের বই পাঠককে এমন এক চিন্তার ভুবনে নিয়ে যায়, যেখানে বিশ্বাস, যুক্তি, অভিজ্ঞতা এবং মানবিকতা পরস্পরের সঙ্গে সংলাপে যুক্ত হয়। লেখক আহমেদ এইচ. খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, মানুষের ভেতরে সত্যের প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সত্যকে উপলব্ধি করতে হলে মনকে উন্মুক্ত রাখতে হয়। নিজের ভুল, দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করার মধ্য দিয়েই আত্মশুদ্ধির পথ শুরু হয়। তিনি বলেন, মানুষ যখন অহংকার ও সংকীর্ণতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে, তখন তার সামনে নতুন উপলব্ধির দুয়ার খুলে যায়।
ঠিকানা হাবে আয়োজিত এই আলোচনা অনুষ্ঠানটি প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজে চিন্তা, দর্শন, মানবিকতা এবং আত্মিক বিকাশ নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করে। উপস্থিত অতিথিরা এমন মননশীল বই ও আলোচনার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান এবং প্রবাসী সমাজে জ্ঞানচর্চা, সাহিত্যচর্চা ও মুক্ত আলোচনার ধারাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
লেখক আহমেদ এইচ. খান একজন ইসলামি জ্ঞানঅন্বেষী, গবেষক ও লেখক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একাধিক ইসলামি শিক্ষা ও দাওয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি সুইডেনে প্রকাশিত প্রথম সুইডিশ-বাংলা অভিধান-এর রচয়িতা।সম্প্রতি তিনি প্রকৌশল পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে ইসলামি শিক্ষা, গবেষণা ও লেখালেখিতে অধিক সময় ব্যয় করছেন। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং সুইডেনের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (KTH) থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি এরিকসন ইন্ক, টি-মোবাইল, ভেরাইজন, ওয়াশিংটন মিচ্যুয়েল এবং আপেলে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট ও উচ্চপ্রযুক্তি সফটওয়্যার শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।পেশাগত জীবনের পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান Anti-Islamite.com-এর প্রতিষ্ঠাতা। গঠনপ্রক্রিয়াধীন এ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ ও বৈষম্যের শিকার মুসলমানদের জন্য আইনি, সামাজিক ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
Posted ২:২৯ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh
(3076 বার পঠিত)
(2472 বার পঠিত)