জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
মহান আল্লাহ মানুষদেরকে দু’টো পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। এবং সাথে সাথে উভয় পথের পরিনাম ও পরিণতিও বলে দিয়েছেন। কোন রাস্তা ধরে পথ হাটলে সোজা জান্নাতে গিয়ে যাত্রা শেষ হবে আবার কোন রাস্তা ধরে হাটলে সোজা জাহান্নমের অতল গহ্বরে নিপতিত হতে হবে।দু’টো পথই মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“আমি কি তাকে দু’টি সুস্পষ্ট পথ দেখাইনি? কিন্তু সে দূর্গম গিরি পথ অতিক্রম করার সাহস করেনি।তুমি কি জানো সেই দুর্গম গিরিপথটি কি? কোন গলাকে দাসত্বমুক্ত করা অথবা অনাহারের দিন কোন নিকটবর্তী এতিম বা ধূলি মলিন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো। তারপর তাদের মধ্যে শামিল হওয়া যারা ঈমান এনেছে এবং যারা পরস্পরকে সবর ও রহম করার উপদেশ দেয়।”(সুরা বালাদ: ১০-১৭)
মহান আল্লাহ মানুষকে শুধুমাত্র জ্ঞান-বুদ্ধি ও চিন্তার শক্তি দান করে তাকে নিজের পথ নিজে খুঁজে সেবার জন্য ছেড়ে দেননি বরং তাকে ভালো-মন্দ ও, জান্নাত-জাহান্নামের পথও দেখিয়ে দিয়েছেন। এটিও মহন আল্লাহ করুণাময়ের এক বিশেষ দান। তার সামনে ভালো ও মন্দ করে তার মধ্য থেকে নিজ দায়িত্বে যে পথটি ইচ্ছা সে গ্রহণ করতে পারে। সুরা দাহরেও এই একই কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে:“আমি মানুষের একটি মিশ্রিত বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তার পরীক্ষা নেয়া যায় এবং এ উদ্দেশ্যে আমি তাকে শ্রবন শক্তি ও দৃষ্টিশক্তির অধিকারী করেছি।
আমি তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছি. চাইলে সে শোকরকারী হতে পারে বা কুফরকারী।”(আয়াত ২-৩) প্রত্যেক মানুষকে জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধিও যোগ্যতা দেয়ার সাথে সাথে তাকে একটি নৈতিক বোধ ও অনুভূতি দেয়া হয়েছে যার সাহায্যে সে প্রকৃতিগতভাবেই ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করে, কিছু কাজ-কর্ম ও বৈশিষ্ট্যকে খারাপ বলে জানে যদিও সে নিজেই তাতে লিপ্ত। আবার কিছু কাজ-কর্ম ও গুণাবলীকে ভাল বলে মনে করে যদিও সে নিজে তা থেকে দূরে অবস্থান করে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আল্লাহ তা’আলা বিবেক (তিরস্কারকারী নফস) বলে একটি জিনিস রেখে দিয়েছেন। যখন সে কোন মন্দ কাজ করতে উদ্যত হয় অথবা করতে থাকে অথা করে ফেলে তখন এ বিবেকই তাকে দংশন করে।
দু’টি পথের পরিচয় হলো, একটি পথ উপড়ের দিকে চলে গেছে আর অন্যটি নীচের দিকে।
প্রথমটি পথটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য পথ। যাকে আল্লাহ তা’আলা পর্বতশৃংগের দুর্গমগিরি পথ বলে উল্লেখ করেছেন। নিজেকে কোন কঠিন ও পরিশ্রম সাধ্য কাজে নিযুক্ত করা। আর পর্বতশৃংগে যারার জন্য পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যে দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হয় তাকে বলা হয় আকাবাহ। অর্থৎ এখানে বলা হচ্ছে, দুটি পথ আমি তাকে দেখিয়েছি। একটি গেছে ওপরের দিকে। কিন্তু সেখানে যেতে হলে খুব কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হয়। সে পথটি বড়ই দুর্গম। সে পথে যেতে হলে মনুষকে নিজের প্রবৃত্তি ও তার আখাংকা এবং শয়তানের প্ররোচনার সাথে লড়াই করে এগিয়ে যেতে হয়।
দ্বিতীয় পথটি বড়ই সহজ। এটি খাদের মধ্যে নেমে গেছে। এই পথ দিয়ে নেমে যাবার জন্য কোন পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় না। বরং এ জণ্য শুধুমাত্র নিজের প্রবৃত্তির বাঁধনটা একটু আলগা করে দেয়াই যতেষ্ট। তারপর মানুষ আপনা আপনি গড়িয়ে যেতে থাকবে। এখন যে ব্যক্তি দু’টি পথই দেখিয়ে দেয়ার পরও নীচের দিকে নেমে যাওয়ার পথটি গ্রহণ করে নিয়েছে এবং ওপরের দিকের পথটি পরিত্যাগ করেছে সে সোজা গিয়ে জাহান্নামে নিপতিত হবে।
উপরের দিকে চলে যাওয়া পথটির পরিচয় দু/তিনটি সংক্ষিপ্ত আয়াতে বর্ণনা করেছেন কিন্তু এর উপলব্ধির গভীরতা অত্যন্ত ব্যাপক। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তুমি কি জানো সেই দুর্গম গিরিপথটি কি? কোন গলাকে দাসত্বমুক্ত করা অথবা অনাহারের দিন কোন নিকটবর্তী এতিম বা ধূলি মলিন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো। তারপর তাদের মধ্যে শামিল হওয়া যারা ঈমান এনেছে এবং যারা পরস্পরকে সবর ও রহম করার উপদেশ দেয়। তারপর (এই সংগে) তাদের মধ্যে শামিল হওয়া যারা ঈমান এনেছে এবং যারা পরস্পরকে সবর ও রহম করার উপদেশ দেয়।”(সুরাবালাদ:১২-১৭)
সুরা বালাদের প্রথম দিকের আয়াতে অমিতব্যয়িতার কথা বলা হয়েছে। নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রদর্শনী ও অহংকার প্রকাশ করার জন্য সে অর্থের অপচয় করতো। তাই এখানে তার মোকাবেলায় এমন ব্যয় ও ব্যয়ক্ষেত্রের কথা বলা হয়েছে যা মানুষের নৈতিক অধপতন রোধ করে তাকে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এতে প্রবৃত্তির কোন সুখানুভব নেই। বরং এ জন্য মানুষকে প্রবৃত্তির ওপর জোর খাটিয়ে ত্যাগের মহড়া দিতে হয়। নিজেই কোন দাসকে দাসমুক্ত করে সেই ব্যয়ের দৃষ্টান্ত পেশ করা যায়। অথবা তাকে আর্থিক সাহায্য করা যেতে পারে। তার ফলে সে নিজের মুক্তিপণ আদায় করে মুক্ত হতে পারে। অথবা অর্থ সাহায্য করে কোন গরীবের গলাকে ঋণমুক্ত করা যেতে পারে। অথবা কোন অসচ্ছল ব্যক্তি যদি কোন অর্থদণ্ডের বোঝার তলায় চাপা পড়ে গিয়ে থাকে তাহলে তাকে তা থেকে উদ্ধার করা যেতে পারে। অনুরূপভাবে কেন নিকটবর্তী এতম এবং কোন ধরনের অভাবীকে আহার করিয়ে এই অর্থ ব্যয় করা যায়। নৈতিক উন্নতির পথটি এই দুর্গম গিরিমপথটি অতিক্রম করেই এগিয়ে গেছে।
এই আয়াতগুলোতে যেসব সৎকাজের উল্লেখ করা হয়েছে রাসুলুল্লাহ সা: তাঁর বিভিন্ন বাণীর মাধ্যমে সেগুলোর বিপুল মর্যাদা ও সওয়াবের কথ ঘোষনা করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সা: বলেন: যে ব্যক্তি একজন মুমিন গোলামকে আযাদ করে আল্লাহ ঐ গোলামের প্রতিটি অংগের বদলে আযাদকারীর প্রতিটি অংগকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাবেন। হাতের বদলে হাত, পায়ের বদলে পা এবং লজ্জাস্থানের বদলে লজ্জাস্থান।(বুখারী: ২৫১৭, ৬৭১৫, কিতাবুল ইতক, বাবু ফি ইতকে ওয়া ফাদলিহি, মুসলিম, তিরিমিযি, নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদ ইফা:২৩৫১, আ প্র:২৩৩৪) হযরত আবু হুরাইরা রা বলেন, এ ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সা: এর কাছে অভিযোগ করেন, আমার মন বড় কঠিন। রাসুলুল্লাহ সা: জবাবে বললেন, এতিমের মাথায় হাত বুলাও এবং মিসকিনকে আহার করাও।(মুসনাদে আহমাদ)
উপরে উল্লেখিত গুণাবলী অর্জনের সাথে সাথে তার জন্য মু’মিন হওয়াও জরুরী। কারণ ঈমান ছাড়া কোন কাজ সৎকাজ হিসেবে চিহ্নিত হতে এবং আল্লাহর কাছে গৃহীত হতে পারে না। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ঈমান সহকারে যে সৎকাজ করা হয় একমাত্র সেটিই নেকী ও মুক্তির উপায় হিসেবে গৃহীত হয়। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,“পুরুষ বা নারী যে ব্যক্তিই সৎকাজ করবে সে যদি মু’মিন হয়, তাহলে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”(সুরা নিসা: ১২৪) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,“পুরুষ বা নারী যে ব্যক্তিই সৎকাজ করবে সে যদি মু’মিন হয়, তাহলে আমি তাকে পবিত্র জীবন যাপন করাবো এবং এই ধরনের লোকদেরকে তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুযায়ী প্রতিদান দেবো।”( সুরা নাহল:৯৭) যে কোন ব্যক্তিই কুরআন মাজীদ অধ্যায়ন করলে দেখতে পাওয়া যায় এ কিতাবের যেখানেই সৎকাজ ও তার উত্তম প্রতিদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানেই অবশ্যই তার সাথে ঈমানের শর্ত লাগানো হয়েছে। ঈমান বিহীন আমল আল্লাহর কাছে কোথাও গ্রহণযোগ্য হয়নি। কোথাও এ ধরনের কাজের বিনিময়ে কোন প্রতিদানের আশ্বাস দেয়া হয়নি।
সৎ পথের অনুসারীর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে দু’টি ছোট ছোট বাক্যে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই সমাজের সদস্যরা পরস্পরকে সবর করার উপদেশ দেবে এবং দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা পরস্পরকে রহম ও পরস্পরের প্রতি স্নেহার্দ্র ব্যবহারের উপদেশ দান করবে। একজন মু’মিনের সমগ্র জীবনই সবরের জীবন বলা যায়। ঈমানের পথে পা রাখার সাথে সাথেই মানুষের সবরের পরীক্ষা শুরা হয়ে যায়। প্রথমত নফসের সাথে দ্বন্ধ শুরু হয়, তখন তার নিজেকে প্রতিরক্ষার প্রধান অস্ত্র হলো সবর। আল্লাহর প্রতিটি বিধান সম্পাদনের ক্ষেত্রে সবরের প্রয়োজন হয়। আল্লাহ যেসব জিনিস হারাম করেছেন সবরের সাহায্য ছাড়া সেগুলোর হাত থেকে রেহাই পাওয়াও কঠিন। নৈতিক অসৎবৃত্তি পরিহার করা ও সৎবৃত্তি অবলম্বন করার জন্য সবরের প্রয়োজন। প্রতি পদে পদে গোনাহ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। তার মোকাবেলা করা সবর ছাড়া সম্ভব নয়। জীবনের এমন সময় বহু সময় আসে যখন আল্লাহর আইনের আনুগত্য করলে বিপদ-অপদ, কষ্ট, ক্ষতি ও বঞ্চনার সম্মুখীন হতে হয়। আবার এর বিপরীত পক্ষে নাফরমানির পথ অবলম্বন করলে লাভ, ফায়দা, আনন্দ ও ভোগের পেয়ালা উপচে পড়তে দেখা যায়। সবর ছাড়া কোন মু’মিন এ পর্যায়গুলো নির্বিঘ্নে অতিক্রম করতে পারে না। ঈমানের পথ অবলম্বন করতেই মানুষ বিরোধীতার সম্মুখীন হয়। নিজের কাছের লোকজন বিরোধীতায় লিপ্ত হয়। আল্লাহর পথে হিজরত ও জিহাদও করতে হয়। এসব অবস্থায় একমাত্র সবরের গুণই মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল রাখতে পারে।
আর রহমের ব্যপারে বলা যায়, ঈমানদারদের সমাজের বৈশিষ্ট্যউ হচ্ছে এই যে, এটা কোন জালেম,নির্দয়, বেরহম, পাষাণ হৃদয় ও হৃদয়হীনদের সমাজ হয় না। বরং সমগ্র মানবতার জন্য এটি হয় একটি স্নেহশীল, করুণাপ্রবণ এবং নিজেদের পরস্পরের জন্য সহানুভূতিশীল ও পরস্পরকে দু:খে- শোকে-বেদনা অনুভবকারী একটি সংবেদনশীল সমাজ। ব্যক্তি হিসাবেও একজন মু’মিন হয় করুণা মূর্ত প্রতিক। দলগতভাবে ও মুমিনদের দল আল্লাহর এমন এক নবীর প্রতিণিধি যার প্রশংসায় বলা হয়েছে: “বিশ্ববাসীর জন্য রহমত ও করুণা হিসাবেই তোমাকে পাঠিয়েছি।”(সুরা আম্বিয়া:১০৭)
Posted ৪:১১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh