বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬ | ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

বই সমালোচনা

অচিন পথে রাত্রি হাঁটে : বিপন্ন অস্তিত্ব ও মনপাখির হাহাকার

মাহিদুল ইসলাম :   |   শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

অচিন পথে রাত্রি হাঁটে : বিপন্ন অস্তিত্ব ও মনপাখির হাহাকার

যান্ত্রিক সভ্যতার ক্যানভাসে নিঃসঙ্গ পথিকের প্রতিকৃতি

কবি দেওয়ান নাসের রাজার কলমে ধরা পড়ে যান্ত্রিক সভ্যতার জঠরে আটকাপড়া সংবেদনশীল আত্মার আর্তনাদ। তাঁর অচিনপথে রাত্রি হাঁটে কাব্যটি আদতে দীর্ঘ যাত্রাপথ—যে পথ নিউইয়র্কের জ্যামাইকা সিটি থেকে শুরু হয়ে স্মৃতির সরণি বেয়ে মিশে গেছে সুরমার বাঁকে, টুকেরগাঁও বাজারে কিংবা শিমুলতলায়। এই কাব্যের প্রতিটি পঙক্তি একেকটি দীর্ঘশ্বাস হয়েপাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় নির্মম আয়নার সামনে।

কবি দেওয়ান নাসের রাজা একাধারে একজন প্রবাসী, একজন প্রেমিক, একজন সমাজপর্যবেক্ষক এবং একজন আধ্যাত্মতাপস। তিনি কোলাহলমুখর শহরের সুপরিকল্পিত ফ্ল্যাটে বা ১৭১ নম্বর স্ট্রিটে দাঁড়িয়েও অবিরাম খুঁজে ফেরেন ফেলে আসা মাটির গন্ধ। তাঁর কবিতা আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধের আখর। এখানে বৃষ্টির শব্দে আষাঢ়ের রোমান্টিসিজম নেই, আছে স্মৃতির দহন; আছে প্রেম, কিন্তু তা কাঁঠাল কাঠের মতো প্রাণহীন। দেওয়ান নাসের রাজার অচিনপথে রাত্রি হাঁটে মূলত শেকড় ছিঁড়ে যাওয়া মানুষের মর্মভেদী ক্রন্দন, যা প্রাচীন ইঞ্জিনের যান্ত্রিকতা ভেদ করে মর্মে ক্রন্দন হয়ে বাজে।

প্রবাস ও শেকড়হীনতার দহন :কংক্রিটের অরণ্যে সবুজের হাহাকার

দেওয়ান নাসের রাজার কবিতায় প্রবাস জীবন মরীচিকার মতো ধরা দেয়। জ্যামাইকা সিটির সুবিন্যস্ত দালানকোঠা, পরিষ্কার রাস্তাঘাট এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার আড়ালে যে ভয়াবহ শূন্যতা ও একাকীত্ব লুকিয়ে আছে, কবি তা নিপুণভাবে উন্মোচন করেছেন। তাঁর কবিতায় প্রবাস একটি অচিন পথ যেখানে মানুষ হাঁটে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনা। ‘আমাকে কেউ চিনল না’ কবিতাটিতে এই পরিচয় সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। কবি বলেন-

…স্ট্রিট পার হয়ে ফিফটি
সেভেন নাম্বারে এসে দাঁড়ালাম একা।কোথাও
পাইনি ওসমান খান তোমাকে এবার।…
পরিচিত কাউকে এখানে খোঁজে পেলামনা
এবং আমাকে কেউ চিনল না!

পঙক্তিগুলো হৃদয়ে হাড়হিম করা শূন্যতা ভর করে। এই না-চিনতে পারাটা নিজের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার আতঙ্ক। তিনি নিজের বোন-ভাগনি কিংবা পুরনো বন্ধু হাসানকে খোঁজেন, কিন্তু পান কেবল যান্ত্রিক সভ্যতা। জ্যামাইকা সিটির আকাশচুম্বী দালান আর ডানকিন ডোনাটসের কফি কিংবা পকেটের ডলার—কোনওকিছুই তার ভেতরের দানবীয় ক্ষুধা মেটাতে পারে না। প্রবাসের চাকচিক্য তাঁকে মুগ্ধ করার বদলে বিপন্ন করে তোলে। তিনি দেখেন, পরিবেশ সুন্দর হয়েছে, বৃক্ষরাজি এলাকাটিকে সবুজ করেছে, হাস্নাহেনার গন্ধও বাতাসে আছে; কিন্তু সেই গন্ধ তাকে শান্তি দেয় নাÑঠেলে দেয় বিস্মৃতির অতলে। কবির ভাষায়,

পরিবেশ ভালো হয়েছে অনেক
বৃক্ষে এলাকা হয়েছে সবুজ
হাস্নাহেনার গন্ধ বাতাসে
হয়তো আগেই এরকম ছিল
ভুলে যাই সব।

এই ভুলে যাওয়াটাই প্রবাসীর ট্র্যাজেডি। কবি নিজেকে প্রাচীন নাট্যমঞ্চের সেপাই বলে অভিহিত করেন, যেখানে সবাই মুখোশ পরে আছে।

‘মলিন আকাশ’ কবিতায় নিউইয়র্কের তুষারপাত কবির কাছে কোনও সৌন্দর্যের বার্তা নিয়ে আসে না—আসে বিষাদ নিয়ে। তুষারাবৃত ধূসর দুপুরে চড়ুই পাখি যখন আশ্রয় চায়, তখন কবির মনে পড়ে নিজের আশ্রহীনতার কথা।

নিসর্গ ও স্মৃতিকাতরতা: সুরমার জল আর হিজলবনের ডাক

দেওয়ান নাসের রাজা যান্ত্রিক নগরে বাস করলেও তাঁর আত্মা পড়ে থাকে বাংলার কাদামাটি আর জলজ নিসর্গে। তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে আষাঢ়ের বৃষ্টি, হাওড়-বিল, হিজলগাছ আর গন্ধরাজ ফুলের হাসি। এই নিসর্গ বর্ণনা তাঁর অস্তিত্বের শেকড়। তিনি নিউইয়র্কের রাস্তায় হাঁটলে তাঁর মানসপটে ভেসে ওঠে সুরমার এঁকেবেঁকে চলার দৃশ্য। ‘বৃষ্টি আসবে’ কবিতায়,
বৃষ্টি আসবে অঝোর ধারায়
ভাবনা ওড়ে মনের কোণে
কোন বিজনে
আষাঢ় তো নয়, আসবে তুমি
আমার বাড়ি চিনিয়ে দিতে।
এই বৃষ্টি কোনও সাধারণ প্রাকৃতিক ধারানয়। এটি স্মৃতির বৃষ্টি, যা কবিকে নিজসত্তার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। প্রবাসের যান্ত্রিকতায় যখন তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন, তখন এই কাল্পনিক বৃষ্টিই তাঁকে তৃপ্তি দেয়। রবিন পাখির গানও বিরহিণী সুরহয়ে তাঁকে সুরমা-তীরের দোয়েল-শালিকের কথা মনে করিয়ে দেয়।
‘গন্তব্য অচেনা ধূধূ’ কবিতায় কবির নস্টালজিয়া মহাকাব্যিক রূপ নেয়। তিনি লেখেন
সুরমার এঁকেবেঁকে উদাসীন একা বয়ে চলা

জীবন কী এরকম ছুটে চলা নিগূঢ় শূন্যতা

সুরমা নদী কবির জীবনের প্রতীক হিশেবে ধরা দেয়। নদী যেমন সাগরে মিশে হারিয়ে যায়, কবি তেমনই প্রবাসের জনস্রোতে হারিয়ে যাচ্ছেন। তবু হাওরের জলমগ্ন ধ্যানী বক কিংবা হিজলের ডালে ফোটা ফুল তাঁকে পিছু ডাকে। এই পিছুটানই কবির বেঁচে থাকার রসদ।

প্রেম-বিরহ: কাঁঠাল কাঠের মতো প্রাণহীন সম্পর্ক

নাসের রাজার কবিতায় প্রেম আসেবিষাদমাখা আখ্যান হয়ে। দাম্পত্য-জীবনের দীর্ঘ পথচলায় কীভাবে ভালোবাসা অভ্যাসে পরিণত হয় এবং শেষপর্যন্ত তা কাঁঠাল কাঠের মতো শক্ত ও প্রাণহীন হয়ে যায়, তার নির্মম-নিষ্ঠুর চিত্র তিনি এঁকেছেন। কবি দাম্পত্যের বিবর্তনের করুণ দৃশ্য তুলে ধরেন—
এখন কেন যে জড়সড়ো অবিকল কাঁঠাল
কাঠের মতো-প্রাণহীন। আমার কবিতাগুলো
পাহাড়ের ঢালু বেয়ে বৃষ্টির ধারায় ক্ষয় হয়,
তুমি বেখেয়াল একদম।

বালিশের মতো নরম সম্পর্কও হঠাৎশুকনো নদীর চর হয়। কাছের মানুষঅদ্ভুত দূরত্বে সরে যায়—আলোকবর্ষেরলাফে। সামনে কোনও দৃশ্যমান দেয়াল না-থাকলেও স্বচ্ছ প্রাচীর ভিন্ন দ্বীপে আটকেরাখে। তখন কবির প্রশ্ন জাগে—আমরা কি তবে পানিশূন্য মৃত এক নদী আজ?
এই প্রশ্ন কবির একার নয়, আধুনিক নাগরিকজীবন যাপন করা প্রত্যেকের।
‘স্খলিত বসনের মতো’ কবিতায় কবি প্রেমের পতনের চিত্র এঁকেছেন শিশিরবিন্দুর ঝরে পড়ার উপমায়। পাহাড়চূড়ায় ওঠার পর যেমন নামার পথশুরু হয়, তেমনই সম্পর্ক তার শীর্ষে পৌঁছে ধীরে ধীরে ঢালুপথে নেমে আসে।

‘যখন হল দেখা’ কবিতায় কবি প্রেয়সীর ব্যস্ততা আর নিজের আবেগঘন মুহূর্তের বৈপরীত্য তুলে ধরেন। প্রেয়সী যখন রান্নাঘরে বাসন-কোসন নিয়ে ব্যস্ত, তখন কবিহৃদয়ে বইতে থাকে প্রবল প্লাবন।দৈনন্দিনতার ছোটোখাটো ব্যস্ততা আর অন্তরের বৃহৎ আলোড়নের ব্যবধানই আধুনিক সম্পর্কের বেদনাময় দিক। বাইরে যা স্বাভাবিক, ভেতরে তা প্রলয়। এমন দ্বন্দ্বেই দাঁড়িয়ে থাকে বর্তমান সম্পর্ক।
এই বৈপরীত্যই স্পষ্ট করে—সম্পর্ক ঠিকে থাকে নিঃশব্দ ফাটলের পর জোড়া ধরে। কখনও অদৃশ্য দূরত্ব, কখনও নৈকট্যের ভেতর লুকানো অবহেলা, কখনও ব্যস্ততার আড়ালে চাপা পড়ে থাকা অপ্রকাশিত টান—সব মিলেই সম্পর্ক তার নিজস্ব দোলা হারায়।

নশ্বরতা ও আধ্যাত্মিকতা: পাথর ক্ষয়ের দর্শন ও অনন্তের তৃষ্ণা

মৃত্যুচিন্তা ও নশ্বরতা দেওয়ান নাসের রাজার কবিতার অবিচ্ছেদ্য সুর। এই পৃথিবীর সমস্ত আয়োজন ক্ষণস্থায়ী;পাথরও একদিন ক্ষয় হতে থাকে—এই ধ্রুব সত্যকে তিনি বারবার সামনে এনেছেন। ক্ষমতা, দম্ভ, যুদ্ধ—সবই একদিন কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে।
‘দমকা হাওয়ায় পাতা ঝরে যায়’কবিতায় তিনি জীবনকে নিঝুম দুপুরের সঙ্গে তুলনা করেন, যা আচমকা মৃত্যু এসে তছনছ করে দেয়। মৃত্যুর আকস্মিকতা কবিকে বিচলিত করে।
এভাবে আজ জীবন থমকে পড়ে
হঠাৎ কেন মৃত্যু ঝাপটে ধরে
নিঝুম দুপুর, আকাশ রৌদ্রময়
হৃদয়ে তবু ঘুম পাড়ানি গান।

কবি দেখেন, বাইরের পৃথিবী রৌদ্রকরোজ্জ্বল, কিন্তু অন্তরে বাজেবিদায়ের সুর। তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে শিউরে ওঠেন। যুদ্ধবিমান যখন শান্তির দেশে হানা দেয়, তখন তাঁর মনে হয় স্বয়ং যমদূতের চোখেও জল। মৃত্যুর পয়গাম তখন তাঁর কাছে অদ্ভুত মনে হয়। তিনি দেখেন, নার্গিস আর চেরি ফুলের মতো কোমল প্রাণগুলো আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে দাঁড়িয়ে কবি গভীর আধ্যাত্মিক শূন্যতা অনুভব করেন।
শেষ পর্যন্ত কবি আশ্রয় খোঁজেন অসীম করুণাময়ের কাছে। তাঁর প্রার্থনা বিনম্র ও কাতর। ‘শুধু রহমত আর রহমত’কবিতায় তিনি নিজের ভেতরের দানব বা রিপুকে নিয়ে শঙ্কিত.
আমি কি কখনও ক্ষমা পাব? শুধু
নিরাশার বৃষ্টি পড়ছিল চারদিকে
ভেতরের শয়তানকে হত্যা করও রহমান।
কবরের নিস্তব্ধতাই মানবের শেষ গন্তব্য। ‘প্রার্থনা করিয়ো’ কবিতায় কবি নিজেকে নগণ্য পথিক হিশেবে উপস্থাপন করেন এবং পুণ্যবানের কাছে প্রার্থনা চান। তিনি বিশ্বাস করেন, নদী যেমন সমুদ্রে মিশে যায়, তেমনই তিনি একদিন মহাকালের স্রোতে মিশে যাবেন। এই আধ্যাত্মিক সমর্পণ তাঁর কবিতাকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়।
বিষাদের নীলাঞ্জনা ও একাকীত্বের উদযাপন
অচিনপথে রাত্রি হাঁটে কাব্যের একটি বড়ো অংশজুড়ে আছে একাকীত্বের উদযাপন। কবি যেন নিজের ছায়ার সঙ্গেই কথা বলেন। ‘বিষণ্ণ একপলক’ কবিতায়,
…পৃথিবীর সব
ভালোবাসা বুকের নির্জনে নিয়ে
কার অপেক্ষায় বসে আছ একা?…
…কেন যে তাকিয়েছিলে বিষণ্ণ একপলক
তারপর থেকে আমার ভেতর ভাঙাগড়া
এই একাকীত্ব কবির সৃজনশীলতার উৎস। তিনি নির্ঘুম রাত কাটান, ফোনকলের অপেক্ষায় থাকেন, আবার কখনও নিজেই ফোন করতে গিয়ে থমকে যান।
‘কাউকে বলিনি’ কবিতায় তিনি নিজের অব্যক্ত বেদনার কথা তুলে ধরেন। মেঘের সঙ্গে, পাহাড়ের সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু মানুষের সঙ্গে তাঁর যোজন-যোজন দূরত্ব। বিড়ালছানা তাঁর পায়ের কাছে ঘোরে, যাকে তিনি নিজের মতোই বিষাদগ্রস্ত মনে করেন।
সমাজ-বাস্তবতা ও রাজনৈতিক চেতনা: ভাঙা ঘর ও শোষিতের দীর্ঘশ্বাস
নস্টালজিয়া ও প্রেমের বাইরেও কবির চোখে ধরা পড়ে সমাজের রূঢ় বাস্তবতা। ‘ভালো পাঞ্জাবি পরেনি’ কবিতাটিতে কবি প্রান্তিক মানুষের চিত্র এঁকেছেন, যে সমাজের তথাকথিত উন্নতির ছোঁয়া পায়নি। লোকটি নগ্ন পায়ে টুকেরগাঁও বাজারে যায়, কিন্তু ফলের দোকানে সাজানো আপেল বা ফজলি আম কেনার সামর্থ্য তার নেই। সে কাঙালের মতো চেয়ে থাকে,
লোকটা বানাতে পারেনি টিনের ঘর
বসতভিটা ক্রমশ ছোটো হচ্ছে…
মুড়ির বয়াম থেকে একমুঠো মুড়ি খেয়ে
নির্ঘুম থেকেছে সারারাত
কবি পুঁজিবাদী সমাজের বৈষম্যের দিকে আঙুল তোলেন। স্বার্থপর নেতাদের প্রতি কবির ক্ষোভ স্পষ্ট। তিনি দেখেন, রাজনীতির নামে সাধারণ মানুষ কীভাবে শোষিত হয়। একইভাবে ‘রহস্যাবৃত জ্বালামুখ’ বা ‘বৈরী বাতাস’ কবিতায় তিনি সমাজের অস্থিরতা, হানাহানি এবং মধ্যবিত্তের সংগ্রামের কথা বলেন। ‘হাত এবং পায়ের প্রবল সংগ্রাম চলছে’—এই পঙক্তিটি খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযুদ্ধের অনবদ্য রূপক। তিনি দেখেন, মুখোশের আড়ালে মানুষের হিংস্রতা কীভাবে সমাজকে কলুষিত করছে।
শব্দশৈলী ও অলংকার: প্রাচীন ইঞ্জিনের শব্দ ও মনপাখির গান
দেওয়ান নাসের রাজার কবিতার ভাষাভঙ্গি সহজ, কিন্তু তার আবেদন গভীর। তিনি অনায়াসে আধুনিক ও ধ্রুপদী শব্দের অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তাঁর কবিতায় সেলফোন, অফিস, ফ্ল্যাট, ডলার, ডানকিন ডোনাটসের মতো আধুনিক ও নাগরিক অনুষঙ্গ যেমন ব্যবহার হয়েছে, তেমনই মনপাখি, নীলাঞ্জনা, বিষুরেখা, হিজল, কাশবনের মতো রোমান্টিক ও গ্রামীণ শব্দের ব্যবহারও লক্ষণীয়।
যখন প্রাচীন কালের ইঞ্জিন এসে জানালায় কান পাতে, তখন যান্ত্রিকতাকে তিনি জীবন্ত সত্তা হিশেবে দাঁড় করান। আবার যখন লিখেন ‘চাঁদের আলোয় দেখা যায় না মুখাবয়ব’ কিংবা ‘নার্গিস-চেরি আগুনে ঝলসানো’ চিত্রকল্প পাঠকমনে গভীর বিষাদ ও দহনের জন্ম দেয়। তাঁর উপমাগুলোও চমকপ্রদ। মানুষের মনকে তিনি কখনও তুলনা করেন তালের শাঁসের নরম অংশের সঙ্গে, আবার কখনও ঝুনা নারকেলের সঙ্গে। প্রেমিকার উপেক্ষাকে তুলনা করেন ঈগলের নখের সাথে।
কবির ছন্দের ব্যবহারও বৈচিত্রময়। তাঁর কবিতায় সুরের ফল্গুধারা প্রবহমান, যা পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে। তিনি শব্দের মাধ্যমে এমন আবহ তৈরি করেন, যেখানে পাঠক বৃষ্টির শব্দ শুনতে পান, তুষারপাতের শীতলতা অনুভব করেন এবং যুদ্ধের বারুদগন্ধ পান।
বেদনাবিধুর সুরের অনন্ত রেশ
অচিনপথে রাত্রি হাঁটে কাব্যপাঠ শেষে মনে হয়, কবির সঙ্গে অনন্তযাত্রায় শামিল হয়েছি। যে পথের গন্তব্য হয়তো ধূধূ মরুময় প্রান্তর কিংবা তারার ঝলমলে আকাশ;কিন্তু যাত্রাপথটি বড়োই নিঃসঙ্গ ও বেদনাবিধুর। কবি তাঁর ব্যক্তিগত শোক, প্রবাসের কষ্ট, ব্যর্থতা এবং আধ্যাত্মিক তৃষ্ণাকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তাঁর কবিতাগুলো গহিনের মনপাখি হয়ে পাঠক হৃদয়ে আঁচড় কাটে।
জীবন আসলে একটি ভাঙা ঘর, যেখানে আমরা ক্ষণিকের অতিথি মাত্র। যতই দালানকোঠা গড়ি না-কেন, শেষপর্যন্ত ফিরতে হবে মাটির কাছে। কবির সেই অমোঘ পঙক্তিটি
আকাশ হবে জানি তারায় ঝলমল
বহুদিন পর,
তবু রয়ে যাবে সুর বেদনাবিধুর।
জীবনের সব কোলাহল থামলেও বেদনার সুরটি রয়ে যায়। আর এই বেদনাই হয়তো মানুষের বেঁচে থাকার, সৃষ্টি করার এবং ভালোবাসার বড়ো অনুপ্রেরণা। দেওয়ান নাসের রাজা সেই অনুপ্রেরণাকেই শব্দে রূপ দিয়েছেন। তাঁর কাব্যপাঠের পর পাঠক দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন ঠিকই, কিন্তু সেই দীর্ঘশ্বাসে মিশে থাকবে অদ্ভুত প্রশান্তি, যে প্রশান্তি সত্যকে উপলব্ধি করলেই পাওয়া যায়।

Posted ১০:৫৭ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

গল্প : দুই বোন

(9319 বার পঠিত)

ছিপ

(3639 বার পঠিত)

অমর জিয়া

(2690 বার পঠিত)

ঠ্যালা সামলা!

(2220 বার পঠিত)

আইসবার্গ থিওরী

(1991 বার পঠিত)

বন্ধন

(1562 বার পঠিত)

খড়কুটো

(1422 বার পঠিত)

বৃক্ষ, অতঃপর

(1318 বার পঠিত)

একটা বোবা ছেলে

(1271 বার পঠিত)

কেউ ভালো নেই

(1261 বার পঠিত)

কুহক ও কুহকী

(1228 বার পঠিত)

প্রত্যাশা

(1223 বার পঠিত)

গাঁয়ের বিল

(1203 বার পঠিত)

রম রোদ

(1152 বার পঠিত)

কষ্ট নিদারুণ

(1088 বার পঠিত)

কবিকে ভয় কেন

(1070 বার পঠিত)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: [email protected]

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.