শাহানাজ শিউলী : | বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
বৈশাখের রৌদ্রদগ্ধ এক পড়ন্ত বিকেল। শুষ্ক আকাশ, নেই মেঘের কোনো ভেলা। চারদিকে ধূসর বালুকণা আর তপ্ত হাওয়া। ছোট্ট একটি সবুজ ও মায়ায় ঘেরা গ্রাম। তার দুকূল বেয়ে একসময় কুলকুল করে বয়ে চলত বুড়িগঙ্গা নদী; এখন সেখানে তাকালে চারদিকে কেবল খাঁ খাঁ রোদ্দুর। যে গ্রামটি ছিল মমতার আঁচল বিছানো ছবির মতো, যেখানে দুচোখে জড়ানো থাকত কিশোর-কিশোরীদের শুভ্র স্বপ্নের জাল—সেখানেই তানিয়ার বেড়ে ওঠা।
তানিয়ার দিন কাটত এক আনন্দমুখর পরিবেশে। মায়ের আদর আর বাবার স্নেহের মায়ার বাঁধনে তার মন সদা প্রফুল্ল থাকত। তানিয়া কখনো বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া দেখেনি। তার কিশোরী মনের ক্যানভাসে বাবা-মায়ের এই মধুর সম্পর্ককে সে রঙের তুলিতে ফুটিয়ে তুলত। একটি সুখী পরিবারের দৃশ্য এঁকে সে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখত আর নিচে বড় বড় অক্ষরে লিখে রাখত— “We are a happy family. I am so proud of my Mom and Daddz.”
সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী তানিয়া খুব মেধাবী এবং চিত্রাঙ্কনে পারদর্শী। বড় হয়ে সে একজন চিত্রশিল্পী হতে চায়। মনের মাধুরী মিশিয়ে সে প্রায়ই ছবি আঁকত—একপাশে বাবা, অন্যপাশে মা এবং মাঝখানে দুজনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট তানিয়া। বাবা-মা খুশিতে তাকে জড়িয়ে ধরে বলতেন, “তুই একদিন অনেক বড় শিল্পী হবি মা।” তানিয়ার বয়স তখন বারো। তাদের সুখের সংসারে হঠাৎ এক কালবৈশাখীর ঝাপটা এসে সবকিছু তছনছ করে দিল।
তানিয়ার চারপাশটা যেন দিনে দিনে অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল। জানালার পাশে বসে সে এখন শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে ভোরের শিশিরের মতো তার চোখের পাতা বেদনায় ভিজে ওঠে। মনে কোনো হাসি নেই, চোখে কেবলই হাহাকার।
কিছুদিন আগেও তো সবকিছু ঠিকঠাক ছিল! এই তো সেদিনের কথা—বাবা অফিস থেকে না আসা পর্যন্ত মা দানা-পানি মুখে কাটতেন না। বাবা ফিরলে মা হাসিমুখে সব গুছিয়ে দিতেন; তারপর দুজন একসাথে খেতে বসতেন। কত হাসাহাসি, কত গল্প! প্রতিদিন তানিয়ার জন্য কিছু না কিছু হাতে করে নিয়ে আসতেন বাবা। তানিয়া আহ্লাদে বাবার কপালে চুমু দিয়ে দৌড় দিত। এ ছিল এক স্বর্গীয় সুখের অনুভূতি।
অথচ আজ আর কেউ তানিয়াকে ওভাবে খেয়াল করে না। মায়ের চোখেমুখে এখন বিষণ্ণতার কালো মেঘ। কী সেই অসুখ যা তানিয়ার সাজানো সংসারকে কুরে কুরে খাচ্ছে? কেন বাবা-মায়ের দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে? তানিয়া ভাবতে থাকে, তাকে জানতেই হবে কী ঘটেছে।
এক রাতে বাবা-মায়ের উচ্চকণ্ঠের তর্কে তানিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। সে ঘুমের ভান করে পড়ে রইল, কিন্তু মায়ের গোঙানি শুনে স্থির থাকতে পারল না। দরজার আড়াল থেকে দেখল—তার বাবা মায়ের গলা চেপে ধরেছেন। তানিয়া নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই কি তার সেই প্রিয় বাবা? বাবার চিৎকার করে বলা একটি কথা তানিয়ার কানে তীরের মতো বিঁধল— “হ্যাঁ, আমি ওকে (সোহানাকে) আনবই। বিয়ে যখন করেছি, সংসার করার জন্যই করেছি। তোমার ইচ্ছা না হলে তুমি চলে যেতে পারো।” মা শুধু বললেন, “যেতাম, শুধু মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে যেতে পারিনি।” বাবা তাচ্ছিল্য করে উত্তর দিলেন, “তবে নিজেই মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে দেখাও না, আমাকে কেন দরকার?”
তানিয়ার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। সে জানতে পারল তার বাবা সহকর্মী সোহানাকে বিয়ে করেছেন। সারা পৃথিবী তার কাছে অন্ধকার হয়ে এল। সেই রাত থেকে তানিয়ার বুকের ভেতর কষ্টের পাহাড় জমতে শুরু করল। সে বাবাকে আর ক্ষমা করতে পারল না। তার মনে হলো, মা এতদিন শুধু তার জন্যই সুখের অভিনয় করে গেছেন। মা শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও কেন এই অসম্মান সহ্য করবেন? তানিয়া সিদ্ধান্ত নিল সে মাকে বোঝাবে।
পরের দিন ভোরেই তানিয়াকে নিয়ে মা নানাবাড়ি চলে গেলেন। এখন মা-ই তানিয়ার একমাত্র আশ্রয়। বাবা আলাদা থাকতে লাগলেন নতুন স্ত্রীর সাথে। মাঝে মাঝে বাবা ফোন দিতেন, কিন্তু তানিয়া ধরত না। ঘৃণায় সে বাবার কাছ থেকে দূরে সরে গেল। পড়াশোনা, স্কুল—সবকিছু থেকেই সে বিচ্ছন্ন হয়ে পড়তে লাগল।
সামনে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। তানিয়া কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই সেখানে অংশ নিল। সবাই যখন নদী, পাহাড় বা সুখী পরিবারের ছবি আঁকছিল, তানিয়া তখন আঁকল অন্য কিছু। আর্ট পেপারের একপাশে বাবা, মাঝখানে একটি প্রমত্তা নদী যার ঢেউয়ে কূল ভেঙে যাচ্ছে, আর অন্য প্রান্তে মা। অনেক দূরে একটি বিধ্বস্ত মেয়ের ছবি—যার চোখে পুরুষশাসিত সমাজের প্রতি হাজারো প্রশ্ন। বিচারকমণ্ডলী সেই বিষণ্ণ ছবি দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তানিয়া প্রথম স্থান অধিকার করল, কিন্তু তার মনে কোনো আনন্দ ছিল না।
দিন কাটতে থাকে। তিন বছর পার হয়ে যায়। এদিকে তানিয়ার বাবা ধীরে ধীরে নিজের ভুল বুঝতে শুরু করেন। সোহানার সাথে তার প্রায়ই ঝগড়া হতো, সম্পর্কের সেই গভীরতা তিনি আর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অনুশোচনায় তার মন দগ্ধ হতে লাগল। তানিয়ার সেই নিষ্পাপ মুখটি তার চোখের সামনে ভেসে উঠত। অবশেষে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে তিনি তানিয়ার নানাবাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
তানিয়া তখন স্কুল থেকে ফিরছিল। বাড়িতে বাবাকে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। তানিয়ার বাবা হাতজোড় করে তার মায়ের কাছে ক্ষমা চাইলেন, “তুমি আমাকে ক্ষমা করো। চলো, আমরা আগের মতো আবার সংসার করি।” তানিয়ার মা কোনো কথা না বলে অন্য ঘরে চলে গেলেন।
তানিয়ার বাবা ঘরের টেবিলে একটি ডায়েরি দেখতে পেলেন। পাতা উল্টাতেই এক জায়গায় তার চোখ আটকে গেল। সেখানে একটি জলরঙের ছবি—বৈশাখের ঝড়ে তছনছ হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মলিন ধ্বংসস্তূপ। আর নদীর বুকে একটি ডিঙি নৌকায় একাকী বসে আছে এক কিশোরী। ছবির নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল:
“মা-বাবার সম্পর্ক ভাঙলে সবচেয়ে বেশি ভাঙে সন্তানের মন। কারণ বাবা-মা-ই সন্তানের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের জায়গা। তারা যখন বিচ্ছিন্ন হয়, সন্তান তখন জলে ভাসা পদ্মের মতো নিরাশ্রয় হয়ে পড়ে। পৃথিবীটা তখন এক অমাবস্যার আঁধার।”
পড়তে পড়তে তানিয়ার বাবার চোখ ভিজে এল। তিনি বুঝতে পারলেন তার একটি ভুল তানিয়ার শৈশবকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করেছে। তিনি তানিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমাকে ক্ষমা করিস মা। আমার মতো কোনো বাবা যেন এমন ভুল আর না করে।” বৈশাখী ঝড় সবকিছু তছনছ করে দিয়ে গেলেও, আজ যেন এক নতুন জীবনের বার্তা দিয়ে গেল।
Posted ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh