বাংলাদেশ অনলাইন : | বৃহস্পতিবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৫
ছবি : সংগৃহীত
১৯৯৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট তখন বরিস ইয়েলৎসিন। এদিন আকস্মিক এক ঘোষণা দিলেন। দেশবাসীকে বললেন- তিনি পদত্যাগ করছেন। তার পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট পদে আসছেন তার প্রধানমন্ত্রী। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। তার ফলে সাধারণ রাশিয়ানদের মধ্যে যে বেদনা সে কথা স্বীকার করে তিনি বলেন- যখন এমন একজন শক্তিশালী নেতা দেশে আছেন, যিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, তখন কেন আরও ৬টি মাস ক্ষমতা ধরে রাখবো? তিনি এমন একজন মানুষ, যার ওপর প্রায় সব রাশিয়ান তাদের ভবিষ্যতের আশা রাখতে পারেন। তাহলে কেন তার পথে দাঁড়িয়ে থাকবো?
ওই শক্তিশালী নেতা রাজনীতিতে ছিলেন অপরিচিত। তিনি সাবেক গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি’র কর্মকর্তা। তার নাম ভ্লাদিমির পুতিন। নতুন বছরে পুতিন যখন রাশিয়ানদের সামনে ভাষণ রাখছেন, তাদের উদ্দেশ্যে কথা বলছেন, তখন তিনি ক্ষমতার কোয়ার্টার- সেঞ্চুরি বা ২৫ বছর পূর্ণ করছেন। তিনি চার বছরের অন্তর্বর্তী একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন সহ একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে এমন রেকর্ড প্রথম স্থাপন করলেন তার দেশে। ২০২৪ সাল সবেমাত্র কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কিন্তু এ সময়ে দৃশ্যত পুতিন তার ক্ষমতাকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি নিরাপদ করেছেন।
ইউক্রেনে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার সেনারা ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ডনবাস অঞ্চলে অগ্রসর হয়েছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে সবচেয়ে সুপরিচিত বিরোধীদলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনির মৃত্যুর মধ্যদিয়ে তিনি নিজের পথ পরিষ্কার করেছেন। আর্কটিক সার্কেলের একটি প্রত্যন্ত কারাগারে মারা যান নাভালনি। তার এক মাস পরে পুতিন নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এর মধ্যদিয়ে তিনি নিজের ম্যান্ডেটকে সুস্পষ্ট করেন। তবে নির্বাচনে কোনো নিরপেক্ষতা ছিল না- একথা চোখ বন্ধ করে বলা যায়।
জয়ের ব্যাপারে পুতিনকে হয়তো আত্মবিশ্বাসী দেখা যেতে পারে। কিন্তু তাকে ঘিরে আছে অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্রে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। এক্ষেত্রে ট্রাম্প চেয়েছেন- দ্রুত সেটা ঘটতে হবে। অ্যারিজোনায় এক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি ট্রাম্প এই যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে বলেছেন- আমি এটা করতে চাই এবং দ্রুত করতে চাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছেন পুতিন। আমরা সেটার জন্য অপেক্ষায় আছি। কিন্তু এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।
ট্রাম্প পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর মস্কোতে কোনো আনন্দ হয়নি। বিষয়টি কমই বিস্ময়ের। ইউক্রেন যুদ্ধে সব কিছুতে বাজি ধরেছেন পুতিন। তিনি যুদ্ধের মধ্যে তার দেশের অর্থনীতি ঠিক রাখতে চেয়েছেন। যুদ্ধ যেন সচল থাকে এ জন্য তিনি উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের সঙ্গে জোট ঘনিষ্ঠ করেছেন। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) ওয়ান্টেল তালিকায় তার নাম উঠেছে।
তবে নিশ্চিত করে একটি কথা বলা যায়, ট্রাম্প এবং পুতিনের মধ্যে কিছু অভিন্ন বিষয় আছে। ২০১৮ সালে হেলসিংকিতে সামিটে এই দুই নেতাকে দেখা যায়। তাতে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের আচরিত পররাষ্ট্রনীতির আদর্শকে ছিন্নভিন্ন করতে ইচ্ছুক ট্রাম্প, একই অবস্থানে পুতিনও। পুতিন যে শক্ত মনের একটি ক্যারেকটার, তার প্রতি ট্রাম্পের ছিল সফট কর্নার। এতে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষকরা তাদের দেশে কর্তৃত্ববাদের প্রবণতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু ট্রাম্পের বিদেশনীতির অর্থ হতে পারে ক্রেমলিনকে অপ্রত্যাশিত সমঝোতার জন্য প্রস্তুত করা।
ট্রাম্পের আসন্ন প্রশাসনের রাশিয়া ও ইউক্রেন বিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্ব পাচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিথ কেলোগ। তিনি এই যুদ্ধকে একটি ‘কেজ ফাইট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে রেফারি হতে পারেন ট্রাম্প। ফক্স বিজনেসকে কিথ কেলোগ বলেছেন, দুই পক্ষ যুদ্ধ করছে। উভয়েই চাইছে। তারা চাইছেন আপনাকে। তাদেরকে আলাদা করার জন্য একজন রেফারি প্রয়োজন হবে। আমি মনে করি নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড জে. ট্রাম্প সেটা করতে পারেন। আমি মনে করি তিনিই উভয় পক্ষকে প্রকৃতপক্ষে একত্রিত করতে পারেন। আলোচনায় বসাতে পারেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি তার সুর নরম করেছেন। স্বীকার করেছেন রাশিয়ার কাছে যেসব ভূখণ্ড হারিয়েছেন তিনি তার সবটা ফিরিয়ে আনার মতো শক্তি তার নেই। বিদায়ী বছরের শেষের দিকে পুতিনও প্রশ্নোত্তর-পর্বে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি সমঝোতায় প্রস্তুত। তিনি বলেছেন- রাজনীতি হলো সমঝোতার আর্ট। আমরা সবসময় বলেছি যে, আমরা আলোচনা ও সমঝোতার জন্য প্রস্তুত। এনবিসি’র কিয়ের সিমোন্স পেছনের প্রশ্ন সামনে এনে পুতিনের কাছে জানতে চান- তিনি যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়েছিলেন, তাতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতন হয়েছে।
এটা তার জন্য বিব্রতকর কিনা এবং এর অর্থ এটাই কিনা যে, সমঝোতা প্রচেষ্টায় পুতিনের অবস্থান দুর্বল হবে। এ প্রশ্নের জবাবে পুতিন বলেছেন, সন্ত্রাসীদের আস্তানা সৃষ্টি করা প্রতিরোধ করার জন্য ১০ বছর আগে আমরা সিরিয়ায় গিয়েছি। আফগানিস্তানের মতো এটাকে একই রকম একটি দেশ হিসেবে দেখেছি আমরা। সেখানে আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতন হলেও মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার এখনো কিছু কূটনৈতিক সুবিধা আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজের ইউরেশিয়া প্রোগ্রাম পরিচালক হান্না নোটে বলেন, সিরিয়া এখনো রাশিয়ার জন্য দরকষাকষির বিষয় হয়ে আছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তারা একজন স্থায়ী সদস্য। সেখানে তারা যেকোনো সিদ্ধান্তে ভোট বা ভেটো দিতে পারে। তাদের একটি ভেটোতে আটকে যেতে পারে যেকোনো প্রস্তাব।
Posted ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০২ জানুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh