নিউইয়র্ক : | বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
‘রক্তনদী পিলখানা থেকে রক্তাক্ত জমিন জুলাই/৩৬’ শিরোনামে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ‘পিলখানা গণহত্যা দিবস-২০০৯’ স্মরণে বিশেষ আলোচনা ও স্মরণ সভা এবং সেমিনার হয়েছে। প্যাট্রিয়টস অব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ফোরাম যুক্তরাষ্ট্র গত ১ মার্চ বিকেলে সিটির জ্যাকসন হাইটসের কাবাব কিং রেষ্টুরেন্টের মিলনায়তনে এই সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে আয়োজকরা জানান গভীর শোক, বেদনা ও দায়বদ্ধতা থেকে আয়োজিত সভায় ‘আমরা ইতিহাস ভুলতে আসিনি- আমরা সত্য প্রতিষ্ঠা করতে একত্র হয়েছি।’
বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি ন্যায়বিচার ও সত্য প্রতিষ্ঠার এক দৃঢ় অঙ্গীকারের সভায় রূপ নেয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এক সাথে ৫৭জন আর্মী অফিসারকে হত্যার ঘটনা নেই। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। এই হত্যাকান্ডের সাথে দেশ-বিদেশী ষড়যন্ত্র জড়িত। বক্তারা বলেন, ‘পিলখানা গণহত্যার প্রকৃত সত্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত প্রবাস থেকেও ন্যায়বিচারের দাবী অব্যাহত থাকবে’।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে ‘পিলখানা গণহত্যা’য় নিহতদের প্রতি জানানো হয় গভীর শ্রদ্ধা। শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করা হয় তাদের পরিবারের প্রতি। সভায় কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন আলিম উদ্দিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ফোরামের সমন্বয়কারী এমদাদ দীপু। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক তাসের মাহমুদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. ইমরান আনসারী ও সাংবাদিক রিমন ইসলাম।
আলোচনায় অংশ নেন মানবাধিকার কর্মী জ্যাকব মিল্টন, বাংলাদেশ জেএসএফ-এর হাজী আনোয়ার হোসেন লিটন, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট এএস এম রহমানতুল্লাহ, লিটন মজুমদার, আলিম উদ্দিন, দীপন গাজী, মোহাম্মদ মেজবাহুল হক, শামীম চৌধুরী, বিলাল হোসেন ও সাংবাদিক এনামুল হক তালুকদার। যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন প্যাট্রিয়টস অব বাংলাদেশ-এর সমন্বয়কারী আব্দুল কাদের ও লিটন মজুমদার।
অনুষ্ঠানে ‘শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ বিচার ও ন্যায়বিচার কি সম্পূর্ণ হয়েছে? শহীদ পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক তদন্ত কেন আইসিজে-তে নেওয়া হয়নি? প্রকৃত ষড়যন্ত্র ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিতকরণ, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্মূল্যায়ন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক সত্য সংরক্ষণ’ প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় অংশ নেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে তাসের মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের যেকোন জাতীয় দূর্যোগে আমাদের সেনাবাহিনী সবসময় বন্ধুর মতো ভূমিকা রেখেছে। সেই সেনাবাহিনীকে দূর্বল করতেই পিলখানা হত্যাকান্ড। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সকল অশান্তির পিছনে রয়েছে ভারতের আধিপত্যবাদী বিষফোঁড়া। পিলখানা হত্যা শেখ হাসিনা সরকারের একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। দেশের সামরিক বাহিনীকে দূর্বল করতেই এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছে। তিি বলেন, পিলখানা হত্যাকান্ডের বিচার হয়েছে অভিযুক্তদের, কিন্তু পরিকল্পনাকারীদের নয়। বলেন, প্রকৃত সত্য প্রকাশ ছাড়া ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, দেশের স্বাধীনতা-সার্বোভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে ভারত-কে প্রত্যাহার করতে হবে। তিনি বলেন নির্বাচনে কোন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা দেশের জন্য ভালো না, এমন সরকার কল্যাণকর সরকার নয়, তারা স্বৈচার হয়ে উঠে।
ভারর্চ্যুয়ারী যোগ দিয়ে ড. ইমরান আনসারী বলেন, পিলখানা হত্যা ঘটনাটি সাধারণ বিদ্রোহের সীমা ছাড়িয়েছে। এর গভীরে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ইঙ্গিত রয়েছে, যা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবী রাখে। তিনি বলেন, দেশ প্রেমিক সকল বাংলাদেশীকে পিলখানা হত্যাকান্ডের গভীরতা ভাবতে হবে।
রিমন ইসলাম বলেন, পিলখানা হত্যাকান্ড ছিলো বাংলাদেশের প্রতি ভারতের একটি টেষ্ট কেস। ভারতের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল মাত্র। সেই সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দূর্বল করা। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে সত্য জানাতে না পারলে ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হবে। তিনি বলেন, দেশ ও জাতির স্বার্থেই প্রকৃত তদন্তের মাধ্যমে আসল সত্য প্রকাশ করা জরুরী। জ্যাকব মিল্টন বলেন, ন্যায়বিচার শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, মানবাধিকারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে সত্য উদঘাটন জরুরি। ইতিহাসের দায় এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ থাকবে না।
হাজী আনোয়ার হোসেন লিটন বলেন, পিলখানা হত্যার ঘটনায় জড়িত মাস্টারমাইন্ডদের শনাক্ত না করা পর্যন্ত এই বিচার সম্পূর্ণ হবে না। এএস এম রহমতুল্লাহ বলেন, শহীদদের বিচার শুধু আদালতের রায়ে শেষ নয়, প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের মুখোশ উন্মোচন না হলে জাতি ন্যায়বিচার পাবে না। লিটন মজুমদার বলেন, আমরা ইতিহাসকে স্মরণ করছি শুধুই শোকের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সত্য জানা অপরিহার্য বলে।
আলিম উদ্দিন বলেন, পিলখানা হত্যার বিচার ঈমানের অংশ, শহীদদের মর্যাদা রক্ষা করা জাতির দায়িত্ব। দীপন গাজী বলেন, পিলখানা হত্যার ঘটনায় কারা লাভবান হয়েছে- এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। নতুন করে তদন্তের মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। তিনি বলেন, শুধু শেখ হাসিনার সরকারের সময় নয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিব সরকারের সময়ও পিলখানায় হত্যাকান্ড ঘটেছিলো। সেই হত্যাকান্ডে ২৫ জন অফিসার নিহত হয়েছিলেন। তার কোন তদন্ত হয়নি। আবরার-হাদী হত্যা সহ দেশে কোন হত্যাকান্ডের-ই ন্যায় বিচার হয়নি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা চলছে। নতুন সরকারের ৫ বছরে আওয়ামী লীগ ভয়ংকর রূপে ফিরে আসবে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন। মোহাম্মদ মেজবাহুল হক বলেন, সামরিক মর্যাদা রক্ষা মানেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা।
রুকসানা পারভিন অভিযোগ করে বলেন, পিলখানা হত্যার ঘটনায় শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এখনো অসম্পূর্ণ। শামীম চৌধুরী বলেন, বিলম্বিত বিচার ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিলাল হোসেন বলেন, পিলখানা একটি চলমান জাতীয় বেদনা।
এই বেদনা ভুলার নয়। দেশের জনগণ আজীবন এই বেদনা বহন করবে। এনামুল হক তালুকদার বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব ইতিহাসের পূর্ণ সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরা। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ওভি ইসলাম, মানিশ, লিটন খান, আপ বাংলাদেশ সংগঠনের প্রধান মুখ্য সংগঠক, ইনকিলাব মঞ্চের বুরহান প্রমুখ। সবশেষে বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট মীর মাসুম আলী। দোয়া মুনাজাতে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের মাগফিরাত, বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা কামনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য এমদাদ দীপু বলেন, শেখ হাসিনার মাফিয়া সরকার থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। আমাদের প্রত্যাশা দেশ গুম-খুন-হত্যাকান্ডের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, পিলখানা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি ছিল রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভাঙার চেষ্টা। সেই ঘটনার আংশিক বিচার হয়েছে, কিন্তু সত্য এখনো সম্পূর্ণ প্রকাশ পায়নি। তিনি বলেন, আগামীর বাংলাদেশে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘দালালমুক্ত বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা, জনগণের দেশ প্রতিষ্ঠা। অনুষ্ঠানটি সফল করায় তিনি আয়োজকদের পক্ষ থেকে সংশ্লিস্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
Posted ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh
(3053 বার পঠিত)
(2341 বার পঠিত)