শরমিলি শারমিন লাভলী : | বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট ২০২৫
টাঙ্গাইল শহরের মাঝখানে সাবালিয়া পাড়ায় আমাদের বাসা। বাসার সাথেই আমাদের বিশাল এক পুকুর ছিল। পুকুরে সারা বছর মাছ চাষ করা হতো। আম্মা যখন আব্বাকে বলতো, ভরতকে খবর দাও পুকুরে মাছ ধরতে হবে।কথাটা কানে গেলেই খুশিতে মন ভরে উঠতো। কারণ পুকুরে মাছ ধরা মানেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ। চাচাদের বাসা, চাচাতো বোনের শ্বশুরবাড়ি, আত্মীয়-স্বজন, আশে-পাশের বাসায় মাছ বিলি করা মানেই লাভলীকে প্রয়োজন।আর পুকুরে মাছ ধরার আনন্দ ঈদের আনন্দের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।
ভরত পুকুরে নানা রকম মাছের পোনা ছাড়তো -রুই, কাতল, মিরকা, শোল, কারফু তেলাপিয়া ইত্যাদি। তবে তেলাপিয়া মাছের চাষটা আমাদের পুকুরে বেশী হতো। খেতেও খুব মজা ছিল।
মাছ ধরার আগেরদিন বিকেলেই ভরত জাল, ঝাঁকিজাল, ঝাঁকা আর দলবল নিয়ে বাসায় আসত। নৌকা একটা পুকুরে সারা বছর পানিতে ডুবানো থাকত, মাছ ধরার সময় উঠানো হতো। ওই সময় আমরা পুকুরের ওই পাড়ে চাচাদের বাসায় যেতাম নৌকায় করে। চাচাতো বোনদের সাথে সারা পুকুর নৌকায় ঘুরাঘুরি করতাম।
প্রিয়জনদের সাথে নৌকায় গল্প করতে করতে ঘোরাঘুরি করার আনন্দ একেবারেই অন্যরকম এক আনন্দ!
সারা বছর অপেক্ষায় থাকতাম এই আনন্দ উপভোগ করার জন্য।
উঠানেই চলত ওদের রান্না আর খাওয়া-দাওয়া। দু’তিন দিন এভাবেই থাকত। কনকনে শীতের মধ্যে ওরা নিচে পাততো জাল আর ওপরে থাকতো শুধু মাত্র একটি কাঁথা।
শেষ রাত থেকেই ওরা ঠাণ্ডা পানিতে খালি গায়ে নেমে কাঁপত, কাঁপত আর মাছ ধরতো।
আম্মার মুখেই শুনেছি পুকুরে মাঝে মাঝে মাছ গাবা লাগে। গাবা লাগাটা কি তখন ভাল বুঝতাম না।
একদিন ভোরে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় শুনি পুকুরে মাছ গাবা লেগেছে। ঘুম থেকে এক লাফে উঠে পুকুর পাড়ে গিয়ে দেখি সারাটা পুকুরে বড় বড় হাজার হাজার সিলভার কার্প মাছের শুধু মাথা ভেসে আছে।
পানির উপর ঢেউ খেলতে খেলতে কিছু শক্তিশালী মাছের লাফ দেওয়া আমার চোখে মুখে একরাশ উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
সে এক অপরূপ দৃশ্য!
পুকুরের চার পাশের মানুষ পুকুরে নেমে সে মাছগুলো ধরছে।
সকালের নরম রোদ, হালকা কুয়াশায় হাতে মাছ ধরার জন্য যখন আমিও আমাদের বাসার পুকুর ঘাটে নেমে পড়লাম, তখন মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করে। পানি ছিটকে ওঠা আর মাছের নড়াচড়ার শব্দ সকালে এক অনন্য সুর তোলে।অতি সহজেই দু’হাতে দুটো বড় সিলভার কার্প মাছ ধরলাম। মাছগুলো একদম শান্ত…কোন নড়াচড়া নেই।
এভাবে বেশ কতোগুলো মাছ ধরলাম আর মনে মনে শান্তি পেলাম মাছ গাবা লাগা বিষয়টা বোঝার জন্য। আর অনুভুতি?
আমিই একজনা !
সে দৃশ্য এখনও আমাকে পুলকিত করে!
যাহোক, আরেকবার পরপর দু’দিন মাছ ধরে ভরতরা চলে গেল। পরের দিন সকাল বেলা দেখি পুকুরে একটি কাঠের কালো মোটা খুঁটি খাড়াখাড়ি ভাবে আস্তে আস্তে সারা পুকুর ঘুরছে।
কিন্তু কেউ কিছুতেই বুঝতে পারলো না বিষয়টা কি?
এমন কি ওটার কাছেও কেউ যেতে সাহস পাচ্ছে না।
তারমধ্যে ছোট বেলা থেকেই শুনে আসছি এই পুকুরে নাকি চরক গাছ আছে। পুকুরের পশ্চিম কোণে কালি মন্দির, মন্দিরের পেছনে অনেক পুরনো বটগাছ …. সেখানে চড়ক পূজা হয়।
চড়ক গাছ আসলে কোন গাছ নয়,এটি একটি কাঠামোর নাম, যা হিন্দুদের ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজার সময় ব্যবহৃত হয়। চড়ক গাছ একটি শক্ত কাঠের থাম বা দণ্ড, যার উপর একটি আড়াআড়ি বাঁশ লাগানো থাকে।
সারা বছর থাম পুকুরের পানিতে ভেজানো থাকে।
সাধারণত চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়ক পূজার আগের দিন এই গাছটি পরিষ্কার করে প্রস্তুত করা হয়।
এটি মূলত শিবের উপাসনার উদ্দেশ্যে আয়োজিত চড়ক পূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চারপাশের মানুষের চোখে নিশ্চয়ই দৃশ্যটা পড়েছে কিন্তু ভয়ে কেউ ওইখানে যাচ্ছে না।
আসেপাশের প্রতিবেশীরা নানা কথা বলছে… যা ছিল সবই ভয়ের। হিন্দু মুরুব্বীদের সন্দেহ এটা চরক গাছই হবে।
দুপুর পর্যন্ত একই অবস্থা।
দুপুরের রোদে পুকুরে ভেসে থাকা খুঁটিটা হঠাৎ দূর থেকে চরক গাছ মনে হলো। ঝলমলে আলোয়ও খুঁটিটার ছায়া অদ্ভুতভাবে দুলছিল, মনে হলো যেন প্রাণ আছে ভেতরে।
ওটা নিছক খুঁটি নয়, বরং কোনো রহস্যময় ছায়া,
যা দিনের আলোতেও ভয় জাগিয়ে তুলতে পারে, পুকুরে গোসল করতে যাই। ভৌতিক খুঁটি তখন পুকুরের প্রায় ঐ প্রান্তে। ঘাটে সিমেন্টের তক্তায় বসতেই ধপপাস করে একপাশে পড়ে গেলাম।
কি ব্যাপার! পড়ে গেলাম কেন?
চেয়ে দেখি সিমেন্টের তক্তায় দু’পাশে দুটি খুঁটি থাকে একটি নেই। অর্থাৎ একটি খুঁটিতে বড় একটি মাছ বেঁধে রেখেছিল জেলে। মাছটি ছুটতে না পেরে খুঁটিসহ উঠিয়ে সারা পুকুর ঘুরছে।
বাসায় এসে সবাইকে বললাম বিষয়টা। তার একটু পরেই আবার পুকুর পাড়ে গিয়ে দেখি খুঁটিটা আর নেই।
কোন বীরপুরুষ যেন ইতিমধ্যেই চুরি করে নিয়ে গেছে………।
Posted ১১:১৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh