| বৃহস্পতিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
ফাঁসির মঞ্চ থেকে
কেনো জানি না আজ বহুদিন পর
কারাকক্ষের অন্তরালে বসেমায়ের কথা খুব মনে পড়ছে
মা বলতেন জানিসতো – কবিতা লিখে ভসত হয় না
আমি লজ্জায় অবনত হয়ে থাকতাম
কিন্তু আজ আমার সময় হয়েছে
আমি সাহসী সন্তানের মতো প্রশ্ন করতে পারি-
মা যারা কবিতা লেখে না
তাদেরও কি ভাত হয়
আমার মা এখন মৃত্যুর দিন গুনছে
আরপূর্বপুরুষেরা শুয়ে আছেন কবরে
জানি না ক্ষুধা তাদের মৃত্যুর কারণ
কি না আর প্রভুদের বিজ্ঞানতো ক্ষুধায় মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে না
রাত্রির তৃতীয় প্রহরে আমার ফাঁসি
শেষ সংবাদটি জানবার জন্যে
সাথিদের চোখে মুখে বৃষ্টিগর্ভ বায়ুর উদ্বেগ
আমার মৃত্যু তাদের চোখের আকাশে
হয়তো বসিয়ে দিয়েছে অসংখ্য বেদনার শিশির
যা ভালোবাসার রোদে মুক্তোর মতো
ঝিকমিক করে উঠবে
আমি সাথিদের কাছে ঋণী ও কৃতজ্ঞ
আমার যা কিছু কবিতা
সবই তাদের জীবনের সারাংশ
আমি শুধু সাজিয়েছি সত্যের অক্ষয় কালিতে
তাদের ভালোবাসার কথা আমি
মৃত্যুর সামান্য বেদনায় বিস্মৃত হইনি
সারাজীবন ধরে যে ভালোবাসা কেউ
আবিষ্কার করতেপারে না আজ মৃত্যুর
শিয়রে দাঁড়িয়ে তা আমি অনুভব করছি
এখন আমি এগিয়ে যাচ্ছি বধ্যভূমির দিকে
আমার ফাঁসি হবার মাত্র এক মিনিট বাকি
এরই মধ্যে আমি পতনপ্রবণ এক জাতির জন্য
অগ্নিগর্ভ মৃত্যুর উদাহরণ ছাড়া কি রেখে যাবো
শেষ বিচার
সময় এক সোনালি ঈগল
অনেক উঁচু থেকে সে দেখে
পাথুরে মাছ আর মর্মাহত খরগোশ
তীব্র খরস্রোতে শুয়ে আছে নারী ও শিশু
অনবরত ভেঙেযাওয়া বাঁধ
সারাচ্ছে পুরুষ
ইঁদুর পেঁচার অমর পাঁচালি
শুনছে রাজমিস্ত্রী ছুতোর কামার
নূহের নৌকা থেকে এখনো
যারা নামেনি তাদের অভিশাপ দিচ্ছে পাওনাদার
ভাঙা গাছের কোমরে হাত বুলাচ্ছে কাঠঠোকরা
ব্যথার চুড়ায় ছটফট করছে একটা ক্রুশবিদ্ধ ঘাসফড়িং
সক্রেটিসের মতো একটা লোক
ছাত্রদের খেতে দিচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ন আপেল
যা নিউটন গাছের নিচে কুড়িয়ে
পেয়েছিলো
প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়ার কথা
এখনো স্বীকার করেননি প্লেটো
কবি স্যাফোর প্রশংসায় তিনি পঞ্চমুখ
পৃথিবী ঘুরছে আর তার মাথায়
ঠোক্কর দিচ্ছে গ্যালিলিও
শিউরে উঠছে সূর্য
মৃত নক্ষত্রের সৎকার করছে
মিকাইল
সার্সি আয়োজিত অনুষ্ঠানে
ইউলিসিস শপথ নিচ্ছে সে আর
ইথাকায় ফিরবে না পেনোলপির কাছে
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থামাতে স্বয়ং যিশু এসেছেন সম্পূর্ণ নগ্ন
সদোম নগরীতে গর্ভবান পরুষেরা তাড়িয়ে দিচ্ছে-নারীদের
পিঁপড়েরা হয়েছে রেলগাড়ি
তারা গাজায় খাদ্য পৌঁছুবে শিশুদের
স্তালিনের ভোজসভায় ভোদকায়
বেহেড হিটলারের
শেষ পরিকল্পনা পাঠ করছেন মহাত্মা গান্ধী
এখন সর্বনাশের জয়োল্লাস
নেতানিয়াহু নামাজ আদায় করছেন মক্কায়
ফাউস্ট সময়কে সাবধান করছেন- আয়ু ফুরিয়ে আসছে
খসে পড়ছে তোমার ডানা
শুকিয়ে যাচ্ছে দৃষ্টি
এখনই ভেঙে ফেলতে হবে তোমার নখর
তবু হ্যামলেট অপেক্ষা করছে রাজা আসবেন
তবু এক মিনার অপেক্ষা করছে
ইমামের অবতরণের
শেষ বিচারের ভয়ে সময় তার ধারালো ঠোঁটে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীকে মহাশূন্য থেকে আরেক মহাশূন্যের দিকে
এক জীবনে
রোজ বিকেলে দু’চোখ মেলে খুঁজছি মাকে,
পাখির ডাকে পাতার ঠোঁটে লুকিয়ে থাকে।
ছায়ায় ঢাকা পথের ধুলো সবুজ ডানা,
সবার কাছে ব্যথার কথা বলতে মানা।
ভোরের আলো যখন আসে ঘাসের ঘরে,
ঘুম তখনো লেপ্টে আছে সাড়ম্বরে।
কাঠবেড়ালি বললো সেতো অনাদিকাল,
খুঁজছি তাকে জলেস্থলে শুধু আড়াল।
মৌমাছি খুব ব্যস্ত ছিলো বললো হেসে,
তার বাড়িতো জোছনাভরা চাঁদের দেশে।
হঠাৎ আসে সন্ধ্যেবেলা খুব সকালে,
যায় চলে সে ইচ্ছে হলে চক্রাবালে।
হারিয়ে মাকে ফেলবো নাকি হচ্ছি ভীত,
নীল পরী সে সাদা বাতাস অপ্রাকৃত।
যেখানে থাক দেখবো মাকে এক জীবনে,
বাংলাদেশের মাঠ নদী ও পলাশ বনে।
কবির বাক্স
একটা টিনের বাক্স
একটা ছাতা
সাধারণ এক লোক ঢুকলো
রাজধানীর গহ্বরে
কেউ তেমন তাকালো না
এমন আর কি – কতজনইতো আসে
এদিক সেদিক তাকানো দেখে
সার্জেন্ট জিজ্ঞেস করলো
এই যে কোথায় যাবেন
জিন্দাবাজার
হা হা মুর্দা বাজার নয় কোনো
গ্রামের সহজ মানুষ দেখলে
কেতাদুরস্ত শহুরে শয়তানরা যা করে
ঐ বাক্সে কি
তেমন কিছু না জামা কাপড়
খোলো দেখি
এতোক্ষণে কিছু উৎসাহী ভিড়
গোল হয়ে উঠছে লোকটিকে কেন্দ্র করে
তারা ঘুরছে যেভাবে পৃথিবী ঘোরে সূর্যের চারপাশে
সে বাক্সটা খুলতে শুরু করলো
আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা কলস্বরা নদী
জ্যান্ত কয়েকটা জিয়ল মাছ
একঝাঁক সবুজ টিয়ে উড়ে গেলো
এক গোছা সোনালি ধান-দুর্বা ঘাস-একটা লুঙ্গি যার
দৈর্ঘ্য প্রস্হ অনি:শেষ-আস্ত একটা গোবর লেপা উঠোন-পুঁইয়ের মাচান-আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের আদলে একটা কাসার থালা আরো কত কি
দর্শকদের শরীর থেকে শরীরে উচ্ছাস বিহঙ্গ
চোখ থেকে চোখে ঢেলে দেয়া উল্লাস
শিরদাঁড়ায় শীতলক্ষ্যা
সার্জেন্ট আর জনতার জিজ্ঞাসার শেষ নেই
তুমি জাদুকর নাকি জিন
মানুষ না ভিনগ্রহবাসী
তুমি কি নূহের বংশধর
লোকটি নিজেও জানে না তার
মস্তিষ্কের প্রেক্ষাগৃহে এই চলচ্চিত্রের উৎস
জানে না কি করে তার পিতা পিতামহের এই
তোরঙে এতো বিগ্রহ
সে ভাবলো দৈবক্রমে এসব স্রষ্টার উপহার
আবার জনতা জানতে চাইলো
তুমি কে
লোকটি ভাবলো সে বেকার তার সংগ্রহে
কিছু পদাবলী যা সে-লুকিয়ে রচনা করে
জীবন ও জীবীকার জন্য মাইল মাইল পথ
পার হয়ে এসেছে
মায়ের অশ্রুভেজা ভোর ছিঁড়ে
সে নাস্তা করে এসেছে সূর্যের সঙ্গে
তার কি পরিচয় সে দেবে
তবে সে কবিতা লেখে এই জনতার কাছে তার কি মূল্য
তবু সাহস করে
পৌরানিক পৃষ্ঠা থেকে উঠে আসা
সত্যদ্রষ্টা সে বললো আমি -কবি
ক্রমশঃ পাতলা হতে থাকলো ভিড়
এক অবর্ননীয় লজ্জায় অবনত হয়ে থাকলো সে
যতক্ষণ না এক দয়িতা প্রশ্ন করলো
তোমার আসল নাম কি
লোকটি নিরুত্তর
এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীরা যেতে যেতে
বললো – কবি কবি
তার নাম কবি
Posted ৪:০৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh