বাংলাদেশ রিপোর্ট : | বৃহস্পতিবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২
বক্তব্য রাখছেন কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্্স।
মানবাধিকার লংঘনমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বাংলাদেশের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী একাধিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছুসংখ্যক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে কগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্্সের বক্তব্য নিয়ে দেশে সরকার ও রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেসম্যানের এই বক্তব্য কার পক্ষে গেল-এনিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে সরকার ও বিরোধী শিবিরে। সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত খণ্ডিত বক্তব্যই এ ধরনের বিতর্কের খোরাক সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র্যাব এবং প্রতিষ্ঠানটির কতিপয় কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে আরোপিত এ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তোলপাড় চলছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। সরকার এজন্য দায়ী করছে বিএনপিকে। দলটি নাকি মোটা অংকের অর্থ ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রে লবিষ্ট নিয়োগ করেছে। যার ফলশ্রুতিতে এসেছে নিষেধাজ্ঞা। এ নিষেধাজ্ঞার পরিধি অচিরেই আরো বাড়বে এমন আশংকায় রয়েছে সরকার। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনকে বাগে রাখতে আগে থেকেই সরকারের লবিষ্টরা কাজ করছে দেশটিতে। তারপরও হয়নি শেষ রক্ষা। সাম্প্রতিক কালে জারিকৃত নিষেধাজ্ঞার পর সরকার লবিংয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। বসে নেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী আওয়ামী ঘরানার বাংলাদেশীরাও। তারাও ধর্না দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের নিকট।
এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের বিবাদমান গ্রুপের একাংশের শীর্ষ এক নেতা ও আওয়ামী ঘরানার অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্সের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করেন। নিউইয়র্ক কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট-৫ থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্্স ১৯৯৮ সাল থেকে টানা এ আসনে প্রতিনিধিত্ব করছেন। ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রভাবশালী কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্্স হাউজ ফরেন এফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি আগে একবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। তার নির্বাচনী এলাকায় বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর বসবাস। স্থানীয় বাংলাদেশীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে প্রায়শই অংশ নেন তিনি। গত ৩১ জানুয়ারি কুইন্সের একটি রেস্টুরেন্টে ‘বাংলাদেশীজ ফর গ্রেগরি মিক্সে’র ব্যানারে ফান্ড রেইজিং ও মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করা হয়। আওয়ামী ঘরানার বলে সুপরিচিত ডেমোক্র্যাট মুর্শেদ আলমের সমন্বয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মূলত সবাই ছিলেন একই ঘরানার নেতাকর্মী। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার নেতিবাচক দিকের বিপরীতে ইতিবাচক একটি সংবাদের অন্বেষণই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিলো অবস্থা দৃষ্টে এমনটিই মনে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে কংগ্রেসম্যান ও সিনেটরগণ কোন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পূর্বে যথারীতি হোমওয়ার্ক করেন এবং কথা বলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে। কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্্স সেদিন তেমনিটি করেছেন। অনুষ্ঠানের পুরো ভিডিও এমনটিই সাক্ষ্য দেয়। আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে অভিজ্ঞ এ কংগ্রেসম্যান শুরুতে কথা বলছেন তার নির্বাচনী এলাকা, নিজ দল ও স্থানীয় কমিউনিটি নিয়ে।
বিশেষ করে কুইন্স কাউন্টির বহুজাতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার মতে স্থানীয় বাংলাদেশীরা যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়েও চিন্তা করেন। আর এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশীদের বিভিন্ন গ্রুপ তার সাথে দেখা করে বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্্স বলেন, বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার। নিম্ন আয়ের বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বাংলাদেশের উন্নয়নে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে আসছে। বিশেষ করে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র আমলে নিয়ে থাকে।
কিন্তু বিগত নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ধরণের সমালোচনা আছে। তিনি বলেন, গত নির্বাচন আরো স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতে পারতো। যুক্তরাষ্ট্র সবসময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উন্নয়ন এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করে বন্ধুপ্রতীম বাংলাদেশের নিকট। মানবাধিকার লংঘনসহ অন্যান্য বিষয়ে সরজমিনে সম্যক ধারণা নিতে তিনি এবছর বাংলাদেশ সফরের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে চান। এছাড়া ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট সহ তথ্য সংগ্রহ করতে চান বিভিন্ন পর্যায় থেকে। প্রয়োজনে কংগ্রেশনাল হিয়ারিং করার কথাও উল্লেখ করেন কংগ্রেসম্যান মিক্্স। এ পর্যায়ে তিনি তার বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন।
এরপর অনুষ্ঠানের সমন্বয়ক মুর্শেদ আলম সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা, লবিষ্ট নিয়োগ প্রসঙ্গে লিখিত দু’টি প্রশ্ন তাকে পড়ে শুনান। সেই প্রশ্নের উত্তরে গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। আমরা নিশ্চিত করে বলতে চাই যে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছি না। আমরা এখনো বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সঙ্গে কাজ করছি। বাংলাদেশের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন বলে উল্লেখ করেন কংগ্রেসম্যান মিকস। তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞাগুলো একটি সংস্থার কতিপয় ব্যক্তির ওপর আরোপ করা হয়েছে। আমরা সেখানকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছি। মিকস বলেন, ‘আমরা কারো কথা অনুযায়ী কিছু করব না। আর এমনটা সম্ভবও নয় এবং আমরা সবকিছু ভালোভাবে যাচাই করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’
কংগ্রেসম্যান মিক্্স শেষ পর্যায়ে যে কথাগুলো বলেন তারই অংশ বিশেষের ভিডিও সংবাদ আকারে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলে পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে একই খবর ছাপা হয়েছে সংযোজন-বিয়োজন করে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হয়েছে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস কংগ্রেসম্যান মিক্সের সংবাদটিকে লুফে নিয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে সেটেছে। শুধু তাই নয় সরকারের পক্ষে যায় এমন কায়দা করে সংবাদটি সাজিয়ে সরবরাহ করে দেশ ও প্রবাসের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। অনুষ্ঠানটিতে বাংলাদেশ দূতাবাস, নিউইয়র্ক কনুস্যুলেট কিংবা জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের কোন কর্মকর্তা অংশ নেননি। তাদের কোন পৃষ্ঠপোষকতাও ছিলোনা সেখানে। এমন অনেক অনুষ্ঠানই বাংলাদেশী বিভিন্ন মহলের আয়োজনে হয়ে থাকে। কিন্তু সেসব সংবাদ কখনোই আমলে নেয় না বাংলাদেশ দূতাবাস।
কুটনীতিতে নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতেই তারা এমনটি করেছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। সর্বত্রই সংবাদটি পরিবেশিত হয়েছে খন্ডিতভাবে। মূল বক্তব্যের কোন বিষয় এতে স্থান পায়নি। শুধু প্রশ্নত্তোর পর্বের বক্তব্যই উঠে এসেছে। যাতে শিরোনাম করা হয়েছে “বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে চায়না যুক্তরাষ্ট্র।” রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নয় যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে একটি প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মকর্তাদের উপর। বাংলাদেশ ও দেশটির সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে কেন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্টের ট্রেজারি বিভাগ সরাসরি প্রেসিডেন্টের আওতাধীন। তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায় দেশটি ২০১৩ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের ‘জেএসপি’ সুবিধা বাতিল করে। বিশ্বের সিংহভাগ রাষ্ট্র এই সুবিধা ভোগ করলেও দীর্ঘ এ সময়ে বাংলাদেশ ফিরে পায়নি জেএসপি সুবিধা। সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞাকে কংগ্রেসম্যান মিকস যেমন অপ্রয়োজনীয় বলে আখ্যা দেননি, তেমনি তিনি আশ্বাস দেননি তা প্রত্যাহারের। কংগ্রেসম্যান মিক্সের বক্তব্য কারো পক্ষে গিয়েছে এমনটি ভেবে উৎফুল্ল হওয়ার কোন কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন আয়োজকদের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে গত ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে র্যাবের সাত বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা জানায় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট পৃথকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা দেয়। এমন নিষেধাজ্ঞাকে ভিত্তিহীন ও সরকারবিরোধীদের চক্রান্ত উল্লেখ করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞায় থাকা কর্মকর্তারা হচ্ছেন সাবেক র্যাব মহাপরিচালক ও বর্তমান আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আনোয়ার লতিফ খান। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা তাদের সঙ্গে লেনদেন করতে পারবেন না।এ ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় তোলপাড় । সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের মার্কিন ভিসা বাতিল করা হয়েছে। সম্প্রতি এক চিঠির মাধ্যমে ভিসা বাতিলের বিষয়টি তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন নিষেধাজ্ঞাকে ভিত্তিহীন ও সরকারবিরোধীদের চক্রান্ত উল্লেখ করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
এদিকে এই নিষেধাজ্ঞার পরই বিএনপি ও জামায়াতের লবিস্ট নিয়োগের বিষয় সামনে আসে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ করতে বিএনপি-জামায়াত যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। দলটি উল্টো সরকারের বিরুদ্ধে লবিস্ট নিয়োগের অভিযোগ তুলেছে।
Posted ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh