শাহানাজ শিউলী : | বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
দশ সন্তানের জননী আমার মা। ছোটবেলায় আমার মা আমার নানীকে হারিয়েছেন। তারপর সৎ মায়ের কাছে মানুষ হয়েছেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে আমার মামা আমার মাকে বিয়ে দেন। বাবার বয়স তখন ২৬-২৭ বছর। মামা একটা চাকরি দিয়ে মাকে বিয়ে দেন। মা বেশি লেখাপড়া জানতেন না; কোনোরকমে অক্ষরজ্ঞান ও সই করতে পারতেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে মা মাতৃত্ব লাভ করেন। তারপর প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর মা মোট দশ সন্তানের জননী হন।
এত সন্তান নিয়ে বাবার কখনো ভাবনা ছিল না। তখন গ্রামের মৌলভীরা জন্মনিয়ন্ত্রণকে ইসলামের পরিপন্থী বা গর্হিত কাজ বলে অপব্যাখ্যা দিতেন। যদি দু-একজন কেউ জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতেন, তাহলে জানতে পারলে গ্রামের মৌলভীরা তাকে একঘরে করে রাখতেন। তার সাথে কারো যোগাযোগ কিংবা তার হাতের কোনো খাবার খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ করে দিতেন। এই ভয়ের কারণে কেউ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে সাহস পেত না। তাই সব বোঝা, সব কষ্ট একজন নারীকে সইতে হতো। সেই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে আমার মাকেও যেতে হয়েছিল।
দশটি সন্তান জন্ম দেওয়ার পর আমার মা একেবারে কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিলেন। গায়ের ও হাতের শিরা পর্যন্ত দেখা যেত তাঁর। দিনে দিনে তিনি রোগাটে হয়ে যেতে লাগলেন। তারপর তিনি কখনো শারীরিক সুস্থতা লাভ করতে পারেননি। রোগ, শোক, দুঃখ-যন্ত্রণা নিয়ে তিনি বাকি জীবন যাপন করেছেন। স্বস্তি বা সুখ কী—তা তাঁর জীবনে কখনো দেখা মেলেনি।
একমাত্র একজন মা-ই জানেন কতটা রাত জাগলে একজন ‘মা’ হওয়া যায়। কতটা ত্যাগ, কতটা কষ্ট সহ্য করে ‘মা’ ডাক শোনা যায়। এগুলো পুরুষের বোঝার কথা নয়, তারা বুঝবেও না কখনো। ‘মা’ শব্দটি অতি ছোট হলেও একে সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ করা অসম্ভব। এক গভীর অনুভূতি, এক গভীর মমত্ববোধ, এক মায়াময় স্পর্শ, এক অসীম দায়িত্ববোধ এবং এক আকাশ শীতল স্নেহময় ভালোবাসা—যা একমাত্র নারীরাই বিলিয়ে দিতে পারে। পৃথিবীর সব কিছু পুরুষেরা হাতের মুঠোয় করে এনে দিলেও এই অনুভূতির নাগাল কখনো পাবে না।
মাকে তখন আমি অতটা বুঝিনি। মা ঠিকমতো খেতে পাননি, ঘুমাতে পারেননি। মায়ের কাপড়ের অর্ধেকটা সবসময় সন্তানের প্রস্রাবে ভেজা থাকত। রাত জেগে মা পাহারা দিতেন সন্তান ঘুমোচ্ছে কি না, ক্ষুধা লেগেছে কি না কিংবা প্রস্রাবে ভেজা কাঁথার ওপর শুয়ে আছে কি না। ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠে ভেজা কাপড় বদলিয়ে দিতেন, দুধ খাইয়ে দিতেন। আবার কখনো নিজের শরীরের চাপে সন্তানের ক্ষতি না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতেন। এমনকি সন্তানের নাকের কাছে হাত নিয়ে পরীক্ষা করতেন নিঃশ্বাস ঠিকমতো চলছে কি না। সন্তানকে শুকনো জায়গায় রেখে নিজে ভেজা কাপড় বুকের ওপর দিয়ে শুকাতেন। এসব আমি নিজের চোখে দেখেছি, কারণ আমার পরেও আরও চারটি ভাই-বোন ছিল। কিন্তু কখনোই গভীরভাবে উপলব্ধি করিনি তাঁকে।
তাঁর টুকরো টুকরো কষ্টগুলো খুঁটিয়ে দেখিনি। এভাবে দশটি সন্তান মানুষ করা একটা নারীর জীবনে কত বড় চ্যালেঞ্জ, তা কখনো ভাবতে চাইনি। কখনো কাছে এসে বলিনি—”মা, তোমার কেমন লাগছে? কেমন আছো তুমি?” কখনো খেয়াল করিনি সবাইকে খাইয়ে তিনি খেয়েছেন কি না, কিংবা কতটুকুই বা খেয়েছেন। শুধু কি সন্তান পালন? তাকে করতে হয়েছে সংসারের সমস্ত কাজ। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ক্ষেতের ফসল আর রান্নাবান্না—সবই সামলাতে হতো মাকে।
তখনকার সময়ে আমাদের গ্রামে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। প্রচণ্ড গরমে মা পাখা দিয়ে বাবাকে বাতাস করতে করতে ঘুম পাড়াতেন, তারপর নিজে ঘুমাতেন। বাড়ি যেদিন মাংস রান্না হতো, দেখতাম মা সবার আগে এক বাটি ভালো মাংস বাবার জন্য তুলে রাখতেন। বাবা সেদিন তিন বেলা মাংস খেতেন। মা পাশে বসে বাতাস করতেন আর বাবা তৃপ্তি করে খেতেন। কখনো বাবাকে দেখিনি মাকে বলতে—”এক টুকরো মাংস তুমি খাও” কিংবা জিজ্ঞেস করতে—”তোমার জন্য আছে তো?” এরপর বাকিটুকু দশ সন্তানের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে নিজের জন্য কী জুটত, তা আজ শুধু উপলব্ধির ব্যাপার।
এসব স্মৃতি মনে পড়লে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারি না। কান্নায় কলিজা ফেটে যায় আমার। নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। মনে হয় নিজেকে দশবার ধিক্কার দিই। কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না। এই সবকিছু আমি হৃদয় দিয়ে বুঝেছি যখন আমি নিজে মা হয়েছি। এখন সবই ব্যথাতুর এক স্মৃতিময় যন্ত্রণা। নিজের দুই সন্তান মানুষ করতে গিয়ে মায়ের কথা মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে, বলতে ইচ্ছে করে—”মা, তুমি আমায় ক্ষমা করো।”
আমরা তখনই বুঝি, যখন সব হারিয়ে ফেলি। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝি না। এখন নিষ্ফল কেঁদে কী হবে? যাদের মা এখনো বেঁচে আছেন, তাঁরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধনী। স্বর্গ আমাদের কাছে থাকলেও আমরা মিছে স্বর্গের লোভে ছুটে বেড়াই। আসল স্বর্গ ফেলে কাল্পনিক স্বর্গের পেছনে ছোটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের যাদের মা আছেন, আসুন প্রতিদিন একটু জড়িয়ে ধরে বলিÑ”মাগো, তুমি কেমন আছো? খেয়েছ তো?” একটু ভালোবাসা আর দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে নিজের আত্মাকে শান্তি দিই। মা-ই একমাত্র সুখের ঠিকানা।
Posted ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh