জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
কালিমা তাইয়্যেবা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্রতম ও সর্বশ্রেষ্ট কালাম বা কথা। তাই পৃথিবীর প্রথম মহামানব হযরত আদম আ: থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সা: পর্যন্ত সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম সকলেই মানুষের মাঝে এই একই কািলমার দাওয়াত দিয়েছেন। আল কুরআনে এই কালিমার অর্থ হচ্ছে, “আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ বা উপাস্য নাই।” যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তিনিই এক আল্লাহ যিনি ছাড়া ইবাদাতের আর কোন হকদার কেহ নেই। তাঁরই জন্য প্রশংসা দুনিয়ায়ও, আখেরাতেও। শাসন কর্তৃত্ব তাঁরই এবং তাঁরই দিকে তোমরা ফিরে যাবে।”(সুরা কাসাস:৭০) এই বাক্যের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহর নিরংকুশ সার্বভৌমত্বের ঘোষনা দিয়ে ঈমান নামক সবুজ অরণ্যের পবিত্র চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশ করেন। এটি আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলার ইজ্জতও বটে।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। “তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’আ করার সময় বলতেন, (হে আল্লাহ) তোমার ইজ্জতের আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (তোমার ইজ্জত এমনি যে,) ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নাই। তোমার মৃত্যু নেই। অথচ জীন-ইনসান সবাই মৃত্যু মুখে পতিত হয়।” (বুখারি: ৬৮৬৭,আ:প্র: কিতাবুত তাওহীদ,বাব: ওয়া হুয়া আজিজুল হাকিম)
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “এবং আল্লাহর সাথে অন্য মাবুদদেরকে ডেকো না। তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। সব জিনিসই ধ্বংস হবে কেবল মাত্র তাঁর সত্ত্বা ছাড়া। শাসন কর্তৃত্ব একামাত্র তাঁরই এবং তাঁরই দিকে তোমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে।” (সুরা কাসাস:৮৮)
কিন্তু এই কালিমায় ব্যবহৃত ‘ইলাহ” শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর অর্থ যেমন মাবুদ তেমনি এর অর্থ আইনদাতা, বিধানদাতা, শাসনকর্তা, পালনকর্তা, সার্বভৌম ক্ষমতার একক মালিক।
’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ একটি পরিপূর্ণ ও পবিত্র বাক্য। পৃথিবীতে আল্লাহর যত কালাম আছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট কালাম হচ্ছে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আল কুরআনে এটিকে ভাল কথা বা পবিত্র বাক্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং হাদীসে এটিকে সর্বশ্রেষ্ট যিক্র বলা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তুমি কি দেখছো না আল্লাহ কালিমা তাইয়্যেবার উপমা দিয়েছেন কোন জিনিসের সাহায্যে ? এর উপমা হচ্ছে যেমন একটি ভালো জাতের গাছ, যার শিঁকড় মাটির গভীরে প্রোথিত এবং শাখা-প্রশাখা আকাশে পৌঁছে গেছে। প্রতি মহুর্তে নিজের রবের হুকুমে সে ফলদান করে। এ উপমা আল্লাহ তা’আলা এ জন্য দেন যাতে লোকেরা এর সাহায্যে শিক্ষা লাভ করতে পারে। অন্যদিকে অসৎ বাক্যের উপমা হচ্ছে, একটি মন্দ গাছ, যাকে ভূপৃষ্ঠ থেকে উপড়ে দূরে নিক্ষেপ করা হয়, যার কোন স্থায়িত্ব নেই।”(সুরা ইবরাহিমঃ ২৪-২৫) জাবির বিন আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি সর্বশ্রেষ্ট যিকির হল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এবং সর্বশ্রেষ্ট দো’আ হলো “আলহামদুলিল্লাহ”। (সুনানে ইবনে মাযাহ: ৩৮০০, তিরমিযি: ৩৩৮৩, হাদীসের মান সহীহ)
“নেই কোন ইলাহ আল্লাহ ছাড়া” বাক্যটিতে ‘ইলাহ’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবহ একটি শব্দ। সাধারণভাবে আমরা এর তরজমা করি মা’বুদ। মা’বুদ অর্থ হচ্ছে, ‘ইবাদাতের যোগ্য’। আল কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা তথা: উলুহিয়াত, রুবুবিয়াত, উবুদিয়াত ও দ্বীনিয়াত এই কালিমার মধ্যে নিহিত রয়েছে। “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই” অর্থাৎ তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। ইলাহ শব্দটির মূল অক্ষর আলিফ-লাম-হা(ইলাহ)। এ মূল অক্ষর থেকে অভিধানে যেসব শব্দ পাওয়া যায়, তার বিবরণ এই:
—-তার আশ্রয়ে গিয়ে বা তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে আমি শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করেছি।
—-কোন দু:খ-কষ্টে পড়ে লোকটি ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছে, অত:পর অপর কোন ব্যক্তি তাকে আশ্রয় দান করেছে।
—-প্রবল আগ্রহ বশত: লোকটি অপর ব্যক্তির প্রতি মনোযোগ দিয়েছে।
—-মাতৃহারা উষ্ট্রীর বাচ্চা মাকে পেয়েই তার কোলে আশ্রয় নিয়েছে।
—-আচ্ছাদিত বা প্রচ্ছন্ন হয়েছে, বুলন্দ হয়েছে, ওপরে উঠেছে।
—-ইবাদাত করেছে।
ইলাহ অর্থ মাবুদ কোন্ কারণে কি সম্পর্কে হয়েছে, এ সকল ধাতুগত অর্থের প্রতি লক্ষ করলে তা জানা যায়। ইসলামী পরিভাষায় ইলাহ মানে আইনদাতা, বিধানদাতা,
কালিমার এই বিশ্লেষণ থেকে আমরা কালিমার দাওয়াতের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গণ্য করতে পারি। এবং এগুলো
কালিমার দাবীও বটে।
এক, দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তি পেতে হলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর দাসত্ব এবং রাসুল সা: এর আনুগত্য করতে হবে। আল্লাহর দাসত্বের অন্য কাউকে শরীক করা যাবে না। আল্লাহ এক, একক, একমাত্র। সেই সাথে নিশর্তভাবে তাঁর প্রেরিত রাসুল সা: এর আনুগত্য করতে হবে। তাঁর সাথেও অন্য কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি বা দেশের আনুগত্য করা যাবে না। কারণ তিনিই কেবল মহান আল্লাহর প্রেরিত ও মনোনিত মহামানব। সুতরাং তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কথার অনুসরণ করা হলে নির্ভেজাল শিরকে জড়িয়ে পড়তে হবে।
দুই, কালিমা দাবী অনুযায়ী খাঁটি মুসলিম হতে হবে। অর্থাৎ কথা ও কাজে গড়মিল পরিহার করতে হবে। মোনাফেকী নীতি বর্জন করতে হবে। কারণ একদিকে কালিমার দাবী অনুযায়ী মুসলিমের খাতায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য সকাল-বিকাল কালিমা জপ করবে, অন্যদিকে আল্লাহর সার্বভৌমত্বে শিরক করা হবে। সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মানা হবে অথচ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে অন্যের হুকুমকে মানা সুস্পষ্টভাবে মোনাফেকী আচরণ। এই আচরণ অবশ্যই পরিহার করতে হবে।
তিন, সংঘবদ্ধ প্রচষ্টার মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি সুবিচারপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থাৎ সমাজ থেকে খোদাদ্রোহী, জালিম ও অসৎ নেতৃত্ব তুলে দিয়ে তদস্থলে সৎ, যোগ্য ও খোদাভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সমাজ থেকে সকল প্রকার জুলুম, শোষণ ও দুর্নীতি দূর করে একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কালিমার এই তিন দফা দাওয়াতকে সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। এটিই কালিমার বিপ্লবী দাওয়াত।
সুরা কাসাসের ৮৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে “এবং আল্লাহর সাথে অন্য মাবুদদেরকে ডেকো না। তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। সব জিনিসই ধ্বংস হবে কেবল মাত্র তাঁর সত্ত্বা ছাড়া। শাসন কর্তৃত্ব একামাত্র তাঁরই এবং তাঁরই দিকে তোমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে।”
আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে “আল্লাহর সাথে অন্য মাবুদদেরকে ডেকো না। তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই।” আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে “ শাসন কর্তৃত্ব একামাত্র তাঁরই”। মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ এ বিশ্ব-জগতের নিছক স্রষ্টাই নন বরং এর পরিচালক ও ব্যবস্থাপকও তিনি। তিনি এ দুনিয়াকে অস্তিত্বশীল করার পর এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে কোথাও বসে যাননি। বরং কার্যত তিনিই সারা বিশ্ব-জাহানের ছোট বড় প্রত্যেকটি বস্তুর ওপর কর্তৃত্ব ও লালন-পালন করছেন। পরিচালনা ও শাসন কর্তৃত্বের যাবতীয় ক্ষমতা কার্যত তাঁরই হাতে নিবদ্ধ। প্রতিটি বস্তু তাঁর নির্দেশের অনুগত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণাও তাঁর নির্দেশ মেনে চলে। প্রতিটি বস্তু ও প্রাণীর ভাগ্যই চিরন্তনভাবে তাঁর নির্দেশের সাথে যুক্ত।
যে মৌলিক বিভ্রান্তিটির কারণে মানুষ কখনো শিরকের গোমরাহীতে লিপ্ত হয়েছে, আবার কখনো নিজেকে স্বাধীন ক্ষমতা সম্পন্ন ঘোষণা করার মতো ভ্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কুরআন এভাবে তার মুলোৎপাটন করেছে। বিশ্ব-জাহানের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা থেকে আল্লাহকে কার্যত সম্পর্কহীন মনে করার অনিবার্য ফল দাঁড়ায় দুটি। মানুষ নিজের ভাগ্যকে অন্যের হাতে বন্দী মনে করবে এবং তার সামনে মাথা নত করে দেবে অথবা নিজেকেই নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রা মনে করবে এবং নিজেকে সর্বময় কর্তৃত্বশীল স্বাধীন সত্তা মনে করে কাজ করে যেতে থাকবে। কুরআন শাশ্বত ও অনাদি-অনন্ত সত্য উপস্থাপন করছে যে, ভুমণ্ডলে ও নভোমণ্ডলে একমাত্র আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত। সার্বভৌমত্ব বলতে যা বুঝায় তা একমাত্র তাঁরই সত্তার একচেটিয়া অধিকার ও বৈশিষ্ট্য।
আর বিশ্ব-জাহানের এ ব্যবস্থাপনা একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বিশেষ, যেখানে ঐ একক সত্তা, সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের পূর্ণ অধিকারী। কাজেই এ ব্যবস্থার মধ্যে যে ব্যক্তি বা দল নিজের বা অন্য কারোর আংশিক বা পূর্ণ কর্তৃত্বের দাবীদার হয়, সে নিজেকে নিছক প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে রেখেছে। তাছাড়া এ ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করে মানুষের পক্ষে ঐ একক সত্তাকে একই সাথে ধর্মীয় অর্থেও একমাত্র মাবুদ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অর্থেও একমাত্র শাসক হিসাবে মেনে নেয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন সঠিক দৃষ্টিভংগী ও কর্মনীতি হতে পারে না। সার্বভৌমত্ব আল্লাহর, এই দাবী মেনে নেয়া কালেমার দাবী এবং এটিও আল্লাহর ইজ্জত। আল্লাহর সার্বভৌমত্বে কাউকে শরীক করা মানে আল্লাহর ইজ্জতে আঘাত হানা।
এমনিভাবে ইবাদাত হবে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য। দীনকে তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট করতে হবে। অর্থাৎ তাঁর দেয়া জীবন ব্যবস্থার মধ্যেই কেবল আমাদের জীবন ব্যবস্থা পরিচালনা করতে হবে। অন্য কারো ইবাদাত করা বা অন্যের দেয়া জীবন ব্যবস্থা মেনে মানে আল্লাহর ইজ্জতের উপর আঘাত করা। কালেমা তাইয়্যেবার মধ্যে ইলাহ শব্দটিই আল্লাহ ইজ্জতকে বিপুলভাবে প্রকাশ করে। তাই এ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর মধ্যে ইলাহ, রব, ইবাদাত ও দীন, আইন-কানুন সকলকিছু নিহিত রয়েছে।
Posted ১:৪৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh