নিউইয়র্ক : | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা শুধু নিজ নিজ বিশ্বাস পালনের অধিকারই দেয় না, অভিবাসী পরিবারগুলোর নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রেখেই মূলধারার শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি করে। নিউইয়র্কের মুসলিম অভিবাসী কমিউনিটিতে বেড়ে ওঠা একদল শিক্ষার্থীর সাম্প্রতিক সাফল্য যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
কেউ পবিত্র কোরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করেছে, কেউ দীর্ঘ সাত বছরের আলিম-আলিমাহ শিক্ষা শেষ করেছে, কেউ অর্জন করেছে কিরাআত ও ইজাযাহর উচ্চতর যোগ্যতা; একই সঙ্গে অনেকে সম্পন্ন করেছে হাইস্কুল ও জিইডি শিক্ষা।এই ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বিত পথচলার স্বীকৃতি মিলেছে দারুল উলুম নিউইয়র্কের ২০২৬ সালের গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে।

হিফজ, আলিম-আলিমাহ, হাফস ইজাযাহ, সাবআহ কিরাআত, দারুল ইফতা এবং হাইস্কুল-জিইডি প্রোগ্রাম মিলিয়ে এবার মোট ৭২ শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় সম্পন্ন করেছে।
গত ৮ আগস্ট জ্যামাইকার ১৫০-১১ ও ১৫০-১৫ হিলসাইড অ্যাভিনিউয়ে দারুল উলুম নিউইয়র্ক নিজস্ব ভবনে অনুষ্ঠিত হয় এ আয়োজন। বিপুলসংখ্যক মুসল্লি, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও কমিউনিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে আসর নামাজের পর শুরু হওয়া অনুষ্ঠান চলে রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত।
অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল উৎসব আর আবেগের আবহ। দীর্ঘদিনের অধ্যবসায় শেষে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের হাতে যখন স্বীকৃতির স্মারক তুলে দেওয়া হয়, তাদের আনন্দের অংশীদার হন বাবা-মা ও স্বজনেরাও। শিক্ষার্থীদের কোরআন তেলাওয়াত, হামদ-নাত ও বিভিন্ন পরিবেশনা অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেপ্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট এফ এ সর্দার বরকতউল্লাহর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন মুফতি মুজিবুর রহমান ও মুফতি আব্দুল্লাহ শিকান্দার।বক্তারা গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন। পাশাপাশি সন্তানদের ইসলামি শিক্ষায় আগ্রহী করে তুলতে অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ, শ্রম ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন লন্ডন থেকে আগত মাওলানা আসগর হোসেন। পরে তার পরিচালনায় দোয়ার মধ্য দিয়ে আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট এফ এ সর্দার বরকতউল্লাহ বক্তব্য রাখেন এবং একাডেমিক স্টাডিজ বিভাগের প্রদান মাওলানা সুহেল টেলি দারুল উলুমের শিক্ষাকার্যক্রমের উপর আলোচনা করেন।
দারুল উলুম নিউইয়র্কের শিক্ষা কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া।শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে রয়েছে সাধারণ শিক্ষা, হোমস্কুলিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতি। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মজগতের প্রয়োজন বিবেচনায় আইটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এসবের মধ্যে রয়েছে গুগল সাইবারসিকিউরিটি সার্টিফিকেটের মতো প্রোগ্রাম। কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের লক্ষ্য এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিকতা ধারণ করার পাশাপাশি আধুনিক সমাজ, উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও সক্ষম হবে।
তাদের কার্যক্রম শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কমিউনিটি আউটরিচ, কাউন্সেলিং ও ধর্মীয় দিকনির্দেশনার মাধ্যমেও নিউইয়র্কের মুসলিম কমিউনিটির সামাজিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে।প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের ৭২ শিক্ষার্থীর গ্র্যাজুয়েশন শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, শিক্ষক এবং বৃহত্তর কমিউনিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
এবারের গ্র্যাজুয়েশনে সবচেয়ে বড় একটি দল ছিল হিফজ প্রোগ্রামের। ২৪ শিক্ষার্থী পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পন্ন করেছে।গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে তাদের প্ল্যাকের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাক্ষরিত প্রেসিডেন্ট এডুকেশন অ্যাওয়ার্ড এবং কোরআন মেমোরাইজেশন সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।
হিফজ সম্পন্নকারীরা হলো-আমির মোহাম্মদ, মাহবীর আহমেদ, আসাদ উল্লাহ আলিফ, আফনান আবদুর রহমান, মাহারান খান, আবু আহবাব, জায়েদ ইসলাম, রাফায়ী আহমেদ কবির, মোস্তাকিম মিয়া, তামজিদ আহমেদ খান, আরিয়ান আহমেদ, হাসান শওকত শেখ, নাকিবুল আলম, নাফি আল আহাদ, আবদুল্লাহ খালিদ, জুবায়ের আলম, ফাহিম ইমতিয়াজ আসালাত, দ্বীন মোহাম্মদ, মো. তাসিন আহমেদ, রায়ান আজাদ, নাভিদ রহমান জাদ, হাফিজুল ইসলাম নাদিল, ফয়সাল সাজিদ এবং এম.ডি. তাওসিফ হাসান তাহা।দীর্ঘ সাত বছরব্যাপী আলিম-আলিমাহ প্রোগ্রাম থেকে এবার ১১ ছাত্র ও দুই ছাত্রীসহ মোট ১৩ জন শিক্ষা সম্পন্ন করেছে।
তারা হলো- হুজাইফা শওকত, মিজানুর রহমান, জুনায়েদ আহমেদ, আসিল হাসান, হাফিজুল্লাহ মায়ান, খালিদ রহমতি, মোহাম্মদ মুয়াজ আন্দা, মোহাম্মদ মুসা বাকি, হাশমত উল্লাহ বাবুরি, মোহাম্মদ আজিজ তারজি, মোহাম্মদ মাসুম আহমেদ, বখতিয়ার খানের কন্যা এবং মোহাম্মদ ইসমাইল হোসাইনের কন্যা।
হাফস ইজাযাহ প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেছে ১০ শিক্ষার্থী। তারা হলো- আহনাফ রাফিদ, কাজী আসিবুল্লাহ, সাফওয়ান খায়ের, উসমান মোহাম্মদ, সামিন ইয়াসির বিল্লাহ, আহমদজান নূরজি, মোহাম্মদ আবু সিফাত, মোহাম্মদ মুদাসসির, শাফায়েত ইসলাম শান্ত এবং তাশরিফ খান।কোরআন তেলাওয়াতের সাতটি স্বীকৃত কিরাআত পদ্ধতির উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে সাবআহ কিরাআত প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেছে পাঁচজন।তারা হলো- কারি কাজী আসিবুল্লাহ, কারি মুহাম্মদ আবু সিফাত, কারি উসমান মোহাম্মদ, কারি এহসান মুওয়াহহিদ উদ্দিন এবং কারি আরিয়ান মোহাম্মদ হুসাইন।
দারুল ইফতা প্রোগ্রাম থেকে এবার মুফতি আবদুল বাসিত রউফি গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। এ ছাড়া মাওলানা মুহাম্মদ মুয়াজ ও মাওলানা আবদুর রহমান খান ইফতা প্রোগ্রামের প্রথম বর্ষ সম্পন্ন করেছেন।শুধু ইসলামি শিক্ষাই নয়, শিক্ষার্থীদের মূলধারার একাডেমিক অগ্রযাত্রাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে দারুল উলুম নিউইয়র্ক। এবার ১৯ শিক্ষার্থী হাইস্কুল ও জিইডি পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেছে। তাদের মধ্যে ১১ জন পেন ফস্টার হাইস্কুল ডিপ্লোমা এবং আটজন জিইডি ডিপ্লোমা অর্জন করেছে।
পেন ফস্টার হাইস্কুল ডিপ্লোমা অর্জনকারীরা হলো-আদিল আহমদ, সৈয়দ শুদ্ধ, সাইফ আনিক, নোহান রাকিন, হায়দার আলী হিলাবি, সারিদ হাসান, মোহাম্মদ বারো, জাকওয়ান বিন খায়ের, আয়ান সৈয়দ রহমান, মুহসিন বিন ওহিদ আল আজিজ এবং মুত্তাকি উল্লাহ চৌধুরী।জিইডি সম্পন্নকারীরা হলোÑআলিফ ফিদা, শাফায়েত ইসলাম, আহনাফ রাফিদ, ইউনুস আহমেদ, ফারাবি রহমান, তাওসিফ আলম, মুহাম্মদ উসমানভ এবং মোহাম্মদ ফরহাদ মিয়া।
১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম নিউইয়র্ক প্রায় তিন দশক ধরে ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থী তাদের বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে।প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে ৩৮০ জনের বেশি হাফেজ, ২৭০ জনের বেশি আলিম ও আলিমাহ, ১৬ জনের বেশি ইফতা বা মুফতি এবং ৭০ জনের বেশি সাবআহ ও আশারা কিরাআতের কারি শিক্ষা সম্পন্ন করেছে।পাশাপাশি ২৭০ জনের বেশি শিক্ষার্থী হাইস্কুল বা জিইডি সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ২৫ শিক্ষার্থী ব্যাচেলর ডিগ্রি পর্যায়ে অধ্যয়ন করছে।
নিউইয়র্কের মতো বিশ্বনগরীতে এই শিক্ষার্থীদের অর্জন তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক গ্র্যাজুয়েশনের পরিসংখ্যান নয়। অভিবাসী মুসলিম পরিবারের নতুন প্রজন্ম যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে-দারুল উলুম নিউইয়র্কের এবারের ৭২ গ্র্যাজুয়েটের গল্প সেই সম্ভাবনারই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
Posted ২:৫১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh
(3112 বার পঠিত)
(2680 বার পঠিত)