জাফর আহমাদ : | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
আল্লাহ তা’আলা বলেন,“দৌড়াও এবং একে অপরের চেয়ে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা করো তোমার রবের মাগফিরাতের দিকে এবং সে জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের মত। তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে সে লোকদের জন্য যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের প্রতি ঈমান এনেছে। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। যাকে চান তিনি তা দান করেন। আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল।”(সুরা হাদীদ:২১)
মূল আয়াতে সাবিকু শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ প্রতিযোগীতামূলকভাবে দৌঁড়াও অর্থাৎ প্রতিযোগীতায় একে অপরকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়ার চেষ্টা করো। অর্থাৎপৃথিবীতে ধন-সম্পদ, আনন্দ ও সুখ এবং কল্যাণসমূহ হস্তগত করার জন্য যে চেষ্টা করা হচ্ছে তা পরিত্যাগ করে আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতকে লক্ষবস্তু বানাও। এবং এ দিকে দৌঁড়িয়ে সফলতা লাভের চেষ্টা করো। জীবনের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বানাতে হবে আল্লাহর ক্ষমা ও চীর সুখের জান্নাত। কিন্তু দু:খের বিষয় হলো, আমরা আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের পরিবর্তে দুনিয়ার সুখ-শান্তিকে বেশী প্রধান্য দিয়ে থাকি।
ফলে দুনিয়াকে আহরণ করার জন্য দিন রাত্রিকে একাকার করে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এই যাত্রা দেখে এ কথা মনে করার কোন সুযোগ নেই যে, আগামী কাল আমাকে মরতে হবে। যেনো আমি চীরস্থায়ী পৃথিবীতে বেঁচে থাকবো।কিন্তু মৃত্যু তো অবধারিত সত্য, সেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে। সেখানে বিচারালয় কায়েম হবে, প্রত্যেকের এ দুনিয়ার চেষ্টা-সাধনার হিসেব-নিকেশ গ্রহণ করা হবে। সে আদালতে কেউ কেউ হেরে যাবে আবার কেউ কেউ জিতে যাবে। যিনি দুনিয়াতে তার রবের মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে দৌঁড়েচ্ছে সেই কেবল জিতে যাবে। আল্লাহর ক্ষমা নিয়ে চীর সুখের জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং অন্যেরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
আল্লাহর ক্ষমা অত্যন্ত প্রবল। তাই তাঁর ক্ষমার দিকে আমাদের দৌঁড়ানো উচিত। ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত। নবী সা: বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা যখন ফিরাউনকে ডুবিয়ে দেন তখন সে বলল, আমি ঈমান আনলাম যে, কোন ইলাহ নেই, বনী ইসরাঈল যে আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে সে ইলাহ ব্যতীত। জিবরীল আ: বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি যদি আমার সে অবস্থা দেখতেন, যখন আমি সমুদ্রের কাল কাদা নিয়ে তার মুখে ঠেসে দিয়েছিলাম এ আশংকায় যে, তার প্রতিও আল্লাহর রহমত হয়ে যেতে পারে।”( সুনানে তিরমিযি: ৩১০৭, কিতাুবুত তাফসীর, বাবু মিন সুরাতে ইউনুস, ইমাম তিরমিযি হাদীসটি হাসান বা সহীহ বলেছেন) ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত যে, নবী সা: বলেছেন: জিবরীল আ: ফিরউনের মুখে মাটি ঠেসে ধরছিলেন এই আশংকায় যে, সে হয়ত লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে ফেলবে আর আল্লাহ তা’আলা তার উপর রহম করে ফেলবেন।”(সুনানে তিরমিযি:৩১০৮, কিতাুবুত তাফসীর, বাবু মিন সুরাতে ইউনুস, ইমাম তিরমিযি হাদীসটি হাসান-গরীব-সহীহ বলেছেন) আল্লাহর রহমান ও রহিম। তাঁর দয়া ও ক্ষমাশীলতা অত্যন্ত প্রবল। এই দয়া ও ক্ষমার পরিমাণ এতবেশী যে, পৃথিবী বিখ্যাত তাগুত, অহংকারী, আল্লাহদ্রোহী ও আল্লাহর দুশমন যে নিজেকে ‘সবচেয়ে বড় রব দাবী করেছিল’ তার এ বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা থেকেও আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা অনেক অনেক বেশী। সম্মানিত ফেরেশতা হযরত জিবরীল আমীন আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ও অত্যন্ত কাছের একজন ফেরেশতা। তিনি আল্লাহর দয়া ও ক্ষমার প্রাবল্যতার চিন্তা করেই ফেরাউনের সকল বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা সত্ত্বেও আল্লাহর তাকে মাফ করে দিতে পারেন, এ ভয়ে তিনি ফেরাউনের মুখে মাটি ঠেসে দিয়েছিলেন।
তাই আল্লাহ তা’আলা বলেন,“দৌড়ে চলো তোমাদের রবের ক্ষমার পথে এবং সেই পথে যা পৃথিবী ও আকাশের সমান প্রশস্ত জান্নাতের দিকে চলে গেছে, যা এমন সব আল্লাহভীরু লোকদের জন্য তৈরী করা হয়েছে।”(সুরা আলে ইমরান:১৩৩)
অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় আনন্দ উপভোগ করার জন্য যে ব্যক্তি তার সবকিছু ব্যয় করে ফেলে এবং কাল তার কাছে ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাদ্য ও মাথা গুঁজাবার ঠাই থাকবে কিনা সে কথা চিন্তা করে না সে ব্যক্তি এ পৃথিবীতে বড়ই নির্বোধ। ঠিক তেমনি ঐ ব্যক্তিও নিজের পায়ে কুঠারাঘাত করছে যে তার পার্থিব জীবন নির্মানের চিন্তায় এতই বিভোর যে আখিরাত সম্পর্কে একেবারেই গাফেল বা উদাসীন হয়ে গিয়েছে। অথচ আজকের দিনটির পরে কালকের দিনটি যেমন অবশ্যই আসবে তেমনি আখিরাতও আসবে। আর দুনিয়ার বর্তমান জীবনে যদি সে সেখানকার জন্য অগ্রীম কোন ব্যবস্থা না করে তাহলে সেখানে কিছুই পাবে না।
আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে ঈমানদাররা! আল্লাহকে ভয় করো। আর প্রত্যেককেই যেন লক্ষ রাখে সে আগামীকালের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই তোমাদের সেই সব কাজ সম্পর্কে অবহিত যা তোমরা করে থাক।”(সুরা হাশর:১৮)
আয়াতটিতে শুরু ও মধ্যেখানে দুইবার করে আল্লাহকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের বাচনভঙ্গির দ্বারা অত্যন্ত বিজ্ঞোচিতভাবে মানুষকে বুঝিয়েছেন যে, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার আরাম-আয়েশ করার জন্য যারা চিরস্থায়ী, অনন্ত অসীম সময়কালের পূঁজি সংগ্রহের কথা ভুলে যায় তারা মূলত: আল্লাহর ব্যাপারে নির্ভিক। তারা আল্লাহকে ভয় করে না বিধায় দুনিয়াকে তাদের সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্ধু বানিয়ে নেয়। আল্লাহকে ভয় করার অর্থ হলো, নিজের মধ্যে তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি করা। যারা তাকওয়ার গুণে সমৃদ্ধ কেবল তারাই আজকের চেয়ে আগামীকালের গুরুত্ব বেশী দেয়্। তাকওয়া মানে নিজের মধ্যে ভালো-মন্দের পার্থক্যবোধ সৃষ্টি করা। নিজের মধ্যে এই গুণ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত আদৌ সে অনুভব করতে পারবে না যে, সে যা কিছু করছে তা তার আখিরাতের জীবনকে সুন্দর ও সুসজ্জিত করছে না ধ্বংস করছে। তার মধ্যে এই অনুভূতি যখন সজাগ ও সচেতন হয়ে উঠে তখন তার নিজেকেই হিসেব-নিকেশ করে দেখতে হবে, সে তার সময়, সম্পদ, শ্রম, যোগ্যতা এবং প্রচেষ্টা যে পথে ব্যয় করছে তা তাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে না জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়টি বিবেচনা করা তার নিজের স্বার্থেই প্রয়োজন।
অন্যথায় নিজের ভবিষ্যত সে নিজের হাতেই ধ্বংস করবে। এই বিষয়টিই পরের আয়াতে ব্যক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার কারণে আল্লাহ তাদের নিজেদেরকেই ভুলিয়ে দিয়েছেন। তারাই ফাসেক।”( সুরা
আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার অনিবার্য ফল হলো, নিজেকে ভুলে যাওয়া, সে কার বান্দা সে কথা যখন কেউ ভুলে যায়, তখন অনিবার্যরূপে সে দুনিয়ায় তার একটা ভ’ল অবস্থান ঠিক করে নেয়। এই মৌলিক ভ্রান্তির কারণে তার গোটা জীবনই ভ্রান্তিতে পর্যবসিত হয়। অনুরূপভাবে সে যখন একথা ভুলে যায় যে সে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো বান্দা নয় তখন আর সে শুধু এদের বন্দেগী করে না। এমতাবস্থায় সে প্রকৃতই যার বান্দা তাকে বাদ দিয়ে যাদের সে বান্দা নয় এমন অনেকের বন্দেগী করতে থাকে। এটি আর একটি মারাত্মক ও সর্বাত্মক ভুল যা তার গোটা জীবনকেই ভুলে পরিণত করে। সে অসংখ্য রবের গোলামে পরিণত হয়। এবং সকল রব তার দ্বারা সকল কাজ করিয়ে নেয়।
আল কুরআনের দৃষ্টিতে দুনিয়ার জীবন সামগ্রী দু’প্রকারের। এক প্রকারের জীবন সামগ্রী আল্লাহ বিমুখ লোকদেরকে ফিতনার মধ্যে নিক্ষেপ করার জন্য দেয়া হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে তারা নিজেদেরকে দুনিয়া পূজা ও আল্লাহ বিস্মৃতির মধ্যে আরো বেশী করে হারিয়ে যায়। আপাত দৃষ্টিতে এটি নিয়ামত ঠিকই কিন্তু গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে এটি আল্লাহর লানত ও আযাবের পটভূমিই রচনা করে। এই সম্পদের লোভে দুনিয়াতে এক প্রকার ফাসাদ সে ছড়িয়ে দেয়। সম্পদ রক্ষা বা আরো সম্পদ আহরণের জন্য সে হেন হীনতর কাজ নাই যা সে করে না। সম্পদের মোহে সে এতটাই অন্ধ হয়ে পড়ে যে, তার সম্পদ লাভের প্রক্রিয়ার কারণে কত মানুষ দুর্ভোগের শিকার হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র বিপর্যয় সৃষ্টি হলো, তাতে তার কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। হালাল-হারামকে একাকার করে সম্পদ আহরণের ফলে সমাজে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয় প্রকারের জীবন সামগ্রী মানুষকে আরো বেশী সচ্ছল, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে তাকে তার আল্লাহ আরো বেশী কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত করেন। এভাবে সে আল্লাহর, তাঁর বান্দাদের এবং নিজের অধিকার আরো বেশী করে আদায় করতে সক্ষম হয়। আল্লাহর দেয়া উপকরণাদির সাহায্যে শক্তি সঞ্চয় করে সে দুনিয়ায় ভালো, ন্যায় ও কল্যাণের উন্নয়ন এবং মন্দ, বিপর্যয় ও অকল্যাণের পথ রোধ করার জন্য এর বেশী প্রভাবশালী ও কার্যকর প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এ হচ্ছে কুরআনের ভাষায় উত্তম জীবন সামগ্রী। অর্থাৎ এমন উন্নত পর্যায়ের জীবন সামগ্রী যা নিছক দুনিয়ার আয়েশ আরামের মধ্যেই খতম হয়ে যায় না বরং পরিণামে আখেরাতেরও শান্তির উপকরণে পরিণত হয়। এ সমস্ত উত্তম জীবন সামগ্রীর দ্বারা সে আগামীকালের বা আখিরাতের ঘর তৈয়ার করে নেয়।
যে ব্যক্তি আগামীকালের কথা চিন্তা করে কাজ করে সে ব্যক্তি চরিত্রগুণে ও নেক আমলের দ্বারা অনেক দুর এগিয়ে যায়। আর আল্লাহ তাকে আরো বেশী ও বড় মর্যাদা দান করেন। আল্লাহর দরবারে তাদের কৃতিত্ব ও সৎকাজকে নষ্ট করা হয় না। তাঁর কাছে যেমন অসৎকাজ ও অসৎবৃত্তি কোন মর্যাদা নেই তেমনি সৎকাজ ও সৎবৃত্তির কোন অমর্যাদা হয় না। যে ব্যক্তি নিজের চরিত্র ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে যেরূপ মর্যাদার অধিকারী প্রমাণ করবে তাকে আল্লাহর সে মর্যাদা অবশ্যই দেবেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিবেন। আখিরাতে কারো প্রতি জুলুম করা হবে না। যার যা প্রাপ্য তা তাকে যথাযথ বুঝিয়ে দেয়া হবে। যে অন্যায় করেছে সে তার অন্যায়ের প্রতিফল যথাযথভাবে পাবে। ভালো-মন্দ-এর পাওনা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা হবে না।
সুতরাং দুনিয়াতেই আখিরাতের পূঁজি সংগ্রহ করার জন্য প্রতিযোগীতামূলকভাবে দৌঁড়াও। আল্লাহর ক্ষমা ও চীর সুখের জান্নাতের জন্য দৌঁড়াও। দুনিয়ার সকল চেষ্টা-সাধনাকে আখিরাতের দিকে কেন্দ্রীভুত করুন। সৎ জীবন যাপন করুন। মানুষের কল্যাণের নিমিত্তে কাজ করুন।
Posted ১:০২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh