নিউইয়র্ক : | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
নিউইয়র্কে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সেভ দ্য পিপল মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রজন্মের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও অতিথিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের সার্বিক সমন্বয় ও সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। এরপর সম্মাননা প্রদান, স্মৃতিচারণ, মুক্ত আলোচনা, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা এবং দলীয় আলোকচিত্রের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।উদ্বোধনী বক্তব্যে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘শুভ জন্মদিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখন সময় শুধু স্মৃতিচারণের নয়, অবদান রাখার।’ তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমান শিক্ষার্থী এবং সমাজের উন্নয়নে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। পাশাপাশি প্রবাসী প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরো জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
ভিডিও বার্তায় উপাচার্য বলেন, শিক্ষা ও গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করছে। গবেষণার পরিধি বৃদ্ধি, শিক্ষার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে-বিদেশে অবস্থানরত প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা গবেষণা, বৃত্তি, পরামর্শ, আন্তর্জাতিক সংযোগ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দুই কৃতী প্রাক্তন শিক্ষার্থীকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান। সম্মাননা পাওয়া অধ্যাপক মহসিন পাটোয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং কানাডার ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের মেডগার এভার্স কলেজে জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের শিক্ষকতা ও গবেষণা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থী ও গবেষকের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ৪৩টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক পাঠ্যপুস্তক ও গবেষণাগ্রন্থ রচনার পাশাপাশি গবেষণা ও গবেষণাগার উন্নয়নের জন্য তিনি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি অনুদান অর্জন করেছেন। ফুলব্রাইট সিনিয়র স্পেশালিস্ট অ্যাওয়ার্ড এবং সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক ‘স্যালুট টু দ্য স্কলার’ অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননায় তিনি ভূষিত হয়েছেন।
সম্মাননা গ্রহণের পর অধ্যাপক মহসিন পাটোয়ারী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেয়নি; নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধও শিখিয়েছে।’ তিনি নতুন প্রজন্মকে গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চায় আরো বেশি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।দ্বিতীয় সম্মাননা লাভ করেন মোহাম্মদ নাসির সিকদার। তিনি আইবিএমের সফটওয়্যার প্রকৌশলী, জীবনধারা বিষয়ক প্রশিক্ষক এবং ‘ওবেসিটি ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা। ২০০১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা নাসির সিকদার দীর্ঘদিন ধরে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, জীবনধারার ইতিবাচক পরিবর্তন এবং স্থূলতা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছেন।
একজন আন্তর্জাতিক সহনশীলতা ক্রীড়াবিদ হিসেবে তিনি ৩৯টি পূর্ণ ম্যারাথন, ১০টি আল্ট্রা ম্যারাথন এবং ২০৪টি অর্ধ-ম্যারাথন সম্পন্ন করেছেন। গত ছয় বছরে তিনি ১০ হাজার মাইলেরও বেশি পথ অতিক্রম করেছেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে এবং একটি সুস্থ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’মুক্ত আলোচনা ও স্মৃতিচারণ পর্বে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের ছাত্রজীবনের স্মৃতি এবং কর্মজীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। নাসির আলী খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে তাঁর নাম সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি বলেন, প্রবাসে থেকেও দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা প্রতিটি প্রাক্তন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব।মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের ঐক্য। আমরা ভিন্ন ভিন্ন পেশায় থাকলেও আমাদের পরিচয় একটাইÑ আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।’ আনিসুল কবির জাসির প্রস্তাব করেন, আগামী বছর থেকে নিউইয়র্কের প্রতিটি বরোভিত্তিক প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলার আয়োজন করা হলে আরো বেশি মানুষ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।আলোচনায় অংশ নেয়া আরো অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী তাঁদের জীবনের সাফল্যের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ক্যাম্পাসজীবন, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সহপাঠীদের বন্ধুত্বের অবদানের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরো শক্তিশালী প্রাক্তন শিক্ষার্থী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আয়োজক কমিটিতে ছিলেন স্বপন দাস, জহিরুল হক, মো. ইশতিয়াক উদ্দিন, কাজী জে. ইসলাম, মো. আশরাফুল আলম, দেলোয়ার মানিক, শেখ জিন্নাহ, এম. বদিউজ্জামান, মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির, মোহাম্মদ নাসির সিকদার, দীনা গুলশান, মহসিন পাটোয়ারী, মোহাম্মদ কাদের, মোহাম্মদ এইচ. খান, ইউসুফ আলী, সাইফুল ভূঁইয়া, জাসির কবির, সজল রোশন, এমডি. পারভেজ সাজ্জাদ, এমএসটি ওয়াহিদা শামসুন, দিলরুবা আয়েশা, শামিন আল আমিন এবং এমডি. আলমাসুর রহমান। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা হয়। পরে সবাই স্মৃতিবিজড়িত আলোকচিত্রে অংশ নেন। প্রবাসে থেকেও প্রিয় বিদ্যাপীঠের প্রতি ভালোবাসা, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শিক্ষা, গবেষণা, সমাজসেবা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন উপস্থিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
Posted ১:৩০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
Weekly Bangladesh | Weekly Bangladesh
(3082 বার পঠিত)
(2507 বার পঠিত)